হোম / আহতদের তালিকা / মো: রাজীব মিয়া
মো: রাজীব মিয়া

মো: রাজীব মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : গার্মেন্টস কর্মী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

পরিচিতি জানুয়ারির দশ তারিখ। কুয়াশায় ঢাকা এক শীতের সকাল। হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার মিরপুর বাজার ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম ভূগলীতে জন্ম নেন মো: রাজীব মিয়া। মা মাহবুবা বেগম তখন মাত্র কুড়ি পেরিয়েছেন, আর বাবা আব্দুর রাজ্জাক মাটি আঁকড়ে বাঁচতে শিখেছেন। সেই মাটির ঘরেই চোখ খুলেছিলেন রাজীব, যেন এক আশ্বাস নিয়ে সে শুধু এই পরিবারের ছেলে নয়, একদিন সে হবে তাদের ভরসা। বাড়িতে ভাই-বোন ছিল অনেক। রাজীব ছিলেন সবার বড়। তার পরে ছোট ভাই আলমগীর আর তিন বোন ডলি, সুমা, রুমা। বাবা কৃষক, সামান্য জমি চাষ করতেন। মা সংসার সামলাতেন, শীত-গ্রীষ্ম যেকোনো সময়ই। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু ছিল হাসি। রাজীব ছোটবেলা থেকেই জানতেন এই সংসার টেনে তুলতে হলে তাকেই কিছু করতে হবে। তাই স্কুল শেষ হতেই তিনি বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। একসময় পাড়ি জমান গাজীপুরে, সুমি অ্যাপারেলস নামের একটি গার্মেন্টসে চাকরি নেন। দিনগুলো কাটছিলো পরিশ্রমে, ঘামে, তবুও কিছুটা স্বস্তিতে। মাসিক বেতন পেতেন প্রায় ১২-১৫ হাজার টাকা। সেটা দিয়ে ভাই-বোনদের পড়াশোনা চলত, মায়ের ওষুধ কেনা হতো, ঘরের চাল পাল্টানোর কথা ভাবা যেত। স্বপ্নগুলো ছোট ছিল, কিন্তু নিজের হাতে গড়া।
আন্দোলনের ডাক ২০২৪ সালের জুন মাসের শেষ দিকে গাজীপুরের রাস্তায় নতুন শ্লোগান উঠতে শুরু করে। “বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্ররা জেগেছে”। টেলিভিশন, ফেসবুক, পথের পাশে ছাপানো লিফলেট সবখানে তরুণদের ডাক। রাজীব মনে মনে কিছুটা বিস্মিত হন। “ছাত্ররা এত সাহসী হলো! এভাবে কথা বলছে!” তার ভেতরে থাকা চাপা অন্যায়বোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রাজীব নিজে ছাত্র ছিলেন না তখন, কিন্তু যে দাবিগুলো ছাত্ররা তুলছিল তাতো সকল মানুষের দাবি। সবার জন্য সমান অধিকার, সবার জন্য সুশাসন, পুলিশের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। গার্মেন্টসে কাজের ফাঁকে তিনি উত্তরা-আজমপুর এলাকায় ছাত্রদের আন্দোলনে যান, পাশে দাঁড়ান। একদিন নিজের টাকা দিয়ে কিছু পানি আর মুড়ি কিনে নিয়ে যান ছেলেমেয়েদের জন্য। সেই থেকে এক ধরনের বন্ধন তৈরি হয়। রাজীব ও আন্দোলনের মধ্যে গড়ে ওঠে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।
গুলির মধ্যে ছিন্নভিন্ন স্বপ্ন সেদিন ছিল সোমবার। ৫ আগস্ট ২০২৪। বিকেল ৪টা। উত্তরা পূর্ব থানার সামনের সড়কে রাজীব তখন দাঁড়িয়ে আছেন ছাত্রদের পাশে। হঠাৎ চারদিক থেকে আসতে শুরু করে সশস্ত্র হামলা। ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং পুলিশ তারা যেন একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রদের ওপর। চারপাশে ককটেল ফাটে, টিয়ারগ্যাস ছোঁড়া হয়, রাইফেলের গুলি ছুটে আসে হাওয়ার মতো। কিন্তু হাওয়ার মতো নয়, তা ছিল আগুন। রাজীব দৌড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পা যেন আটকে যায়। একটা মুহূর্তে তিনি অনুভব করেন, তার শরীর ভারী হয়ে যাচ্ছে। যেন শরীর নয়, জ্বলন্ত লোহা। তখনই বিদ্ধ হয় তার শরীর। ১৭৬টি ছররা গুলি। মাথায় ৬৬টি। চোখে ৫টি। চারটি অপারেশনে বের করা গেলেও একটি এখনো চোখের ভেতরে। দুই হাতে প্রায় ৩০টি, বুকে ৫০-৬০টি। এরপর মাটিতে পড়ে যান রাজীব। চোখে ঝাপসা, মুখে ধুলা, গায়ে রক্ত। তিনি শুধু ভাবেন, “এটাই কি আমার শেষ?” চিকিৎসা, জমি বন্ধক, ভাইয়ের কান্না, আর স্ত্রীর লড়াই ছাত্ররাই তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় হাসপাতালে। প্রথমে সামান্য চিকিৎসা, তারপর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি। চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু চিকিৎসা মানে ছিল টাকার জন্য যুদ্ধ। ছোট ভাই আলমগীর দোকানে কাজ করতেন, মাসে সামান্য আয়। সেই ছেলেটিই ভাইয়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। জমি বন্ধক রাখতে হয়। সংসারের চাল বেচে চিকিৎসা চালানো হয়। অপারেশন হয় একের পর এক। চোখে গুলি থেকে যায় একটিই, সেটি আজও বের হয়নি। রাজীব আজ আর আগের মতো দেখতে পারেন না, কাজ করতে পারেন না। গার্মেন্টসের চাকরি চলে গেছে। একসময় যে মানুষটি পুরো সংসার চালাতেন, আজ তার হাতে নেই কাজ, চোখে নেই দৃষ্টি। তার স্ত্রী এখন গার্মেন্টসে কাজ করেন। তিন-চার মাস হলো মাত্র চাকরি নিয়েছেন। সেই আয় দিয়েই চলে নয় জনের সংসার। অথচ রাজীব ঘরে বসে থাকেন, শুনেন ছেলেমেয়ের হাসি, আর নিজে চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকেন যেখানে আকাশ আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নেই। ন্যায়বিচার চায় রাজীব, দয়া নয় রাজীব বলেন,“আমি সাহায্য চাই না। আমি চাই আমার জন্য ন্যায়বিচার হোক। আমি তো শুধু পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। ওদের দাবিগুলো সবার, আমারও ছিল। তাই যদি গুলি খাওয়ার অপরাধ হয়, তাহলে আমি অপরাধী।” আজ রাজীব একটি নিঃশব্দ সংগ্রামের নাম। তার চোখে এখনো গুলি, কিন্তু তার চোখেই সমাজকে দেখা যায় কে পাশে দাঁড়ায়, কে ফিরিয়ে নেয় মুখ। রাজীব জানেন না, তিনি আর কখনো চোখের আলো ফিরে পাবেন কি না। তবে তিনি চান, যেন তার পরিবারটিকে আর কোনোদিন অভাব আর অন্ধকার স্পর্শ না করে। প্রস্তাবনা ১. চোখের অস্ত্রোপচারের পূর্ণ সরকারি সহায়তা। ২. এককালীন ক্ষতিপূরণ কমপক্ষে ৫ লক্ষ টাকা। ৩. মাসিক চিকিৎসা ভাতা। ৪. রাজীবের স্ত্রীর জন্য নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা। ৫. পরিবারের সদস্যদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা।
এক নজরে মো: রাজীব মিয়া
নাম : মো: রাজীব মিয়া
জন্ম তারিখ : ১০-০১-১৯৯০
জন্মস্থান : হবিগঞ্জ, সিলেট
পেশা : গার্মেন্টস কর্মী
প্রতিষ্ঠানের : সুমি এপারেজ লিমিটেড, টঙ্গী, গাজীপুর
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: ভূগলী, ইউনিয়ন: মিরপুর বাজার, থানা: বাহুবল, জেলা: হবিগঞ্জ
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: টঙ্গী গোপালপুর, ইউনিয়ন: মুন্না নগর, থানা: পূর্ব টঙ্গী, জেলা: গাজীপুর
পিতার নাম : আব্দুর রাজ্জাক
মাতার নাম : মাহবুবা বেগম
পিতার পেশা : কৃষি, বয়স: ৬৫
বছর মায়ের পেশা : গৃহিণী, বয়স: ৫৫
বছর মাসিক আয় : ১৫,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি ও চাকরি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৯ জন
ভাই-বোনের বিবরণ
১. মোহাম্মদ আলমগীর, বয়স: ২২ বছর, দোকান কর্মচারী
২. ডলি, বয়স: ২০ বছর, পেশা: ছাত্রী, ডিগ্রি ৩. মোসা সুমা, বয়স: ১৮ বছর, পেশা: ছাত্রী
৪. মোছাম্মদ রুমা, পেশা: ছাত্রী, বয়স: ১৬ বছর
আহত হওয়ার বিবরণ
ঘটনার স্থান : উত্তরা, আজমপুর পূর্ব থানার সামনে
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪:০০টা আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশলীগ গুলিবিদ্ধ : শরীরে ১৭৬টি ছররা গুলি, ৬৬টি মাথায়, ৫টি চোখে, দুই হাতে ৩০টি এবং বুকে প্রায় ৫০-৬০টি
চিকিৎসা : জাতীয় চক্ষু হাসপাতাল
চিকিৎসার খরচ : জমি বন্ধক রেখে চিকিৎসার খরচ যোগাড় ব্যয় : ৩৫ হাজার টাকা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍