মো: সজিব মিয়া
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আহত হওয়ার স্থান : কাজলা, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা স্থায়ী ঠিকানা : আজমেরীগঞ্জ, রসুলপুর, হবিগঞ্জ
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
সজিব এখনো ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে প্রয়োজন ছিল দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা যা আর্থিক সঙ্কটের কারণে সম্ভব হয়নি সজিব এখনো ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে প্রয়োজন ছিল দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা যা আর্থিক সঙ্কটের কারণে সম্ভব হয়নি
মো: সজিব মিয়া ক্রমিক: ১২০ আইডি: ঢাকা সিটি ১২০
জন্ম পরিচয় মো: সজিব মিয়া ২০১০ সালের ১ মে জন্মগ্রহণ করেন হবিগঞ্জ জেলার আজমেরীগঞ্জ উপজেলার রসুলপুর গ্রামে। গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম নেওয়া সজিবের শৈশব কেটেছে একেবারে সাধারণ ও সংগ্রামী আবহে। ছোটবেলা থেকেই তার জীবনের পথ ছিল কাঁটায় ভরা। পিতা হারুন মিয়া বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন, ফলে বাবার স্নেহ ও ছায়া ছাড়া বড় হতে হয়েছে তাকে। পিতার অকাল মৃত্যু সজিবের জীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে। সংসারে তখন শুরু হয় অর্থনৈতিক টানাপোড়ন।
তার মা ছিনুরা খাতুন একজন গৃহকর্মী হিসেবে বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে তার মায়ের ওপরই নির্ভর করে চার সদস্যের পুরো পরিবার। ভাই শাহিন মাছের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও আয়ের পরিমাণ অপ্রতুল। বোন সাথী বিবাহিত এবং অন্য সংসারে, ফলে পরিবারে তেমন সহায়তা করতে পারেন না। এরকম কঠিন বাস্তবতায় সজিব মিয়া বেড়ে উঠলেও তিনি কখনো দমে যাননি। শৈশবেই জীবনের নানা রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছে সে। কখনো বিদ্যালয়ের খরচ যোগাড়ে হিমশিম খেতে হয়েছে, আবার কখনো না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে। তবুও সজিব মিয়া কখনো হাল ছাড়েননি। তার সহজ-সরল চরিত্র, ভদ্রতা ও আত্মসম্মানবোধ তাকে গ্রামের অনেকের কাছে সম্মানিত করেছে। প্রতিবেশীরা তাকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখে এবং তার সাহসিকতা ও সহনশীলতায় মুগ্ধ হয়। বর্তমানে সে পড়াশোনার পাশাপাশি মায়ের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কখোনো বাড়ির কাজ সামলায়, কখোনো ছোটখাটো কাজ করে কিছু আয় করার চেষ্টা চালায়। অল্প বয়সেই জীবনের কঠোরতা তাকে পরিণত করে তুলেছে। একদিন সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে মায়ের কষ্ট লাঘব করতে চায়। এটাই তার জীবনের মূল লক্ষ্য। দারিদ্র্য ও সংকটের মধ্যেও তার আত্মবিশ্বাস ও জীবনের প্রতি আশা অনেক বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। এই দৃঢ় মনোভাবই হয়তো একদিন সজিব মিয়াকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। পারিবারিক প্রেক্ষাপট সজিব মিয়ার পরিবারটি একেবারেই অভাবগ্রস্ত এবং সংগ্রামী একটি পরিবার। হবিগঞ্জ জেলার আজমেরীগঞ্জ উপজেলার রসুলপুর গ্রামের এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। সজিবের পিতা হারুন মিয়া কয়েক বছর আগে ইন্তেকাল করেন, যার ফলে পরিবারের ঘাড়ে নেমে আসে এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের যাবতীয় ভার এসে পড়ে মা ছিনুরা খাতুনের কাঁধে। তিনিই এখন পরিবার পরিচালনার একমাত্র মূল ভরসা। অন্যের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে কোনোরকমে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। চার সদস্যবিশিষ্ট এই পরিবারে সজিবের একজন বড় ভাই আছেন শাহিন। তিনি মাছ বিক্রির মতো অস্থায়ী ও অনিশ্চিত একটি পেশার মাধ্যমে অল্প আয়ে সংসারে সহায়তা করে থাকেন। তার উপার্জন এতটাই সীমিত যে, তা দিয়ে প্রতিদিনের খাবার যোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হয়। পরিবারের একমাত্র বোন সাথী বিবাহিত এবং তিনি বর্তমানে শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছেন। ফলে সংসারে বাস্তবিক কোনো অর্থনৈতিক অবদান রাখতে পারছেন না। তাদের গ্রামের বাড়িতে কিছু পরিমাণ জমি থাকলেও সেখানে বসতঘর বা স্থায়ীভাবে বসবাসযোগ্য কোনো ঘর নেই। ভাঙাচোরা ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টি চুয়ে পড়ে, বর্ষাকালে আশ্রয়ের জন্য অন্যের ঘরে যেতে হয় অনেক সময়। রাতে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন সবাই, বিশেষ করে মা ও ছোট ভাই-বোনেরা। ঘরহীন এই জীবনে প্রতিনিয়তই তাদের সামনে দাঁড়ায় নানা প্রতিকূলতা। খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতেও তাই হিমশিম খেতে হয়। এই পরিবারের জীবনে অভাব যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। সজিব প্রতিদিন এসব বাস্তবতা চোখের সামনে দেখে বড় হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের বেড়াজালে ঘেরা তার শৈশব তাকে দ্রুত পরিণত করে তুলেছে। কিন্তু তবুও সে আশা ছাড়েনি। নিজের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। সজিবের মতো একটি সাহসী ও সহনশীল মনোবলই হয়তো ভবিষ্যতে তাদের জীবনে নতুন আশার আলো নিয়ে আসবে। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানাধীন কাজলা এলাকায় এক ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটে যা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই দিন এলাকাবাসী ও ছাত্র-যুবাদের এক শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি চলাকালীন হঠাৎ করেই শুরু হয় পুলিশী হামলা। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে দমন নীতির বাস্তবায়ন ঘটে। ঠিক এ মুহূর্তেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল মো: সজিব মিয়া এক কিশোর বয়সী পিতৃহীন শিশু, যিনি সেদিনের বিভীষিকাময় ঘটনার শিকার হন। সজিব সেখানে কোনো সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তিনি কেবল আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছিলেন, কিন্তু আকস্মিকভাবে ছোড়া পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। একটি কিশোর শরীরে গুলির আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে এলাকাবাসী উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যায়। শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল, তীব্র ব্যথায় ছটফট করছিল সে। একজন সদ্য কৈশোরে পা রাখা ছেলেশিশুর জন্য এটি ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, যা শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও তাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। পিতৃহীন এই কিশোরের জীবনে এমনিতেই অভাব-অনটন ও নিরাপত্তাহীনতা প্রতিদিনের বাস্তবতা ছিল, তার ওপর এমন ভয়াবহ হামলা তার জীবনযুদ্ধে এক নতুন ধাক্কা এনে দেয়। শারীরিক ক্ষত অনেকটা সময় নিয়ে সেরে উঠলেও মানসিক আঘাত এত সহজে মুছে যায় না। গুলির শব্দ, রক্ত, চিৎকার এসব দৃশ্য তার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। রাতে ঘুমাতে গেলে সে সব ভয়াবহ মুহূর্ত বারবার ফিরে আসে তার মনে। সজিব এখনো ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল দীর্ঘমেয়াদী, কিন্তু অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পিতৃহীন এই ছেলেটি এখন জীবনের এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বলি হওয়া একটি নিষ্পাপ কিশোরের গল্প এটি, যে কেবল একটি শান্তিপূর্ণ দিনে জীবনযাপনের চেষ্টা করছিল। কিন্তু ক্ষমতার নির্মম নির্মাণে সে হয়ে ওঠে আরেকটি ক্ষতের নাম। তার জীবন এখন সাহস, সংগ্রাম ও সহনশীলতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরই মো: সজিব মিয়াকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক)-এ নিয়ে যাওয়া হয়। আহত অবস্থায় তাকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। গুলির আঘাতে তার শরীরের ক্ষতস্থানে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং প্রচণ্ড ব্যথায় ছটফট করছিল সে। চিকিৎসকেরা দ্রুততার সঙ্গে ক্ষত স্থান পরিষ্কার করে সাময়িক সেলাই ও ব্যান্ডেজ করে তার জীবনরক্ষা করেন। তবে প্রাথমিক চিকিৎসার পর সজিবের জন্য প্রয়োজন ছিল দীর্ঘমেয়াদি ও বিশেষায়িত চিকিৎসা যার মধ্যে শারীরিক থেরাপি, নিয়মিত ড্রেসিং, এক্সরে ও পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। পরিবারটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত, আর একটি নিরুপায় পিতৃহীন কিশোরের উন্নত চিকিৎসা গ্রহণের মতো সামর্থ্য তাদের ছিল না। ফলে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়। তখন থেকেই তার চিকিৎসার দায়িত্ব পড়ে মায়ের ওপর, যিনি নিজেই একজন গৃহকর্মী হিসেবে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাসায় ফিরে আসার পর ঘরের এক কোণে বিছানায় পড়ে থাকতে হয় সজীবকে। ওষুধ, খাবার ও চিকিৎসার খরচ যোগাড় করতে গিয়ে পরিবার আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার ক্ষতস্থান মাঝে মাঝে ফুলে ওঠে, জ্বর আসে, ব্যথা বেড়ে যায়, কিন্তু কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয় ফার্মেসি বা গ্রামের ওষুধের দোকান থেকে কিছু সাধারণ ওষুধ এনে সাময়িকভাবে ব্যথা কমানোর চেষ্টা চালানো হয় মাত্র। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, পরিবারের পুরুষ অভিভাবক না থাকায় চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত বা অর্থ যোগাড়ের ক্ষেত্রেও যথাযথ সহযোগিতা পাওয়া যায় না। ছিনুরা খাতুন, একজন মায়ের মতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তার সামর্থ্য সীমিত। ফলে সজিবের উন্নত চিকিৎসার পথ এক প্রকার বন্ধই হয়ে গেছে।
প্রস্তাবনা ১. সজিবের চিকিৎসার খরচ বহন করা। ২. জীবিকা নির্বাহের জন্য তার মায়ের একটা দোকানের ব্যবস্থা করা দেওয়া যেতে পারে। এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি সহিংসতার ফল নয়, বরং রাষ্ট্রীয়
অবহেলা ও দারিদ্র্যের এক বাস্তবচিত্রও বটে। গুলিবিদ্ধ হওয়া এক কিশোর যখন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন তা সমাজের ন্যায়ের চিত্রকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সজিবের জীবন তাই এখনো যন্ত্রণাময়, কিন্তু তার চোখে এখনও এক টুকরো আশা জ্বলছে যদি একদিন সে সুস্থ হয়ে উঠে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে।
এক নজরে মো: সজিব মিয়া
নাম : মো: সজিব মিয়া
পিতা : মো: হারুন মিয়া, মৃত
মাতা : ছিনুরা খাতুন
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : কাজলা, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা স্থায়ী ঠিকানা : আজমেরীগঞ্জ, রসুলপুর, হবিগঞ্জ
মো: সজিব মিয়া ক্রমিক: ১২০ আইডি: ঢাকা সিটি ১২০
জন্ম পরিচয় মো: সজিব মিয়া ২০১০ সালের ১ মে জন্মগ্রহণ করেন হবিগঞ্জ জেলার আজমেরীগঞ্জ উপজেলার রসুলপুর গ্রামে। গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম নেওয়া সজিবের শৈশব কেটেছে একেবারে সাধারণ ও সংগ্রামী আবহে। ছোটবেলা থেকেই তার জীবনের পথ ছিল কাঁটায় ভরা। পিতা হারুন মিয়া বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন, ফলে বাবার স্নেহ ও ছায়া ছাড়া বড় হতে হয়েছে তাকে। পিতার অকাল মৃত্যু সজিবের জীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে। সংসারে তখন শুরু হয় অর্থনৈতিক টানাপোড়ন।
তার মা ছিনুরা খাতুন একজন গৃহকর্মী হিসেবে বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে তার মায়ের ওপরই নির্ভর করে চার সদস্যের পুরো পরিবার। ভাই শাহিন মাছের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও আয়ের পরিমাণ অপ্রতুল। বোন সাথী বিবাহিত এবং অন্য সংসারে, ফলে পরিবারে তেমন সহায়তা করতে পারেন না। এরকম কঠিন বাস্তবতায় সজিব মিয়া বেড়ে উঠলেও তিনি কখনো দমে যাননি। শৈশবেই জীবনের নানা রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছে সে। কখনো বিদ্যালয়ের খরচ যোগাড়ে হিমশিম খেতে হয়েছে, আবার কখনো না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে। তবুও সজিব মিয়া কখনো হাল ছাড়েননি। তার সহজ-সরল চরিত্র, ভদ্রতা ও আত্মসম্মানবোধ তাকে গ্রামের অনেকের কাছে সম্মানিত করেছে। প্রতিবেশীরা তাকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখে এবং তার সাহসিকতা ও সহনশীলতায় মুগ্ধ হয়। বর্তমানে সে পড়াশোনার পাশাপাশি মায়ের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কখোনো বাড়ির কাজ সামলায়, কখোনো ছোটখাটো কাজ করে কিছু আয় করার চেষ্টা চালায়। অল্প বয়সেই জীবনের কঠোরতা তাকে পরিণত করে তুলেছে। একদিন সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে মায়ের কষ্ট লাঘব করতে চায়। এটাই তার জীবনের মূল লক্ষ্য। দারিদ্র্য ও সংকটের মধ্যেও তার আত্মবিশ্বাস ও জীবনের প্রতি আশা অনেক বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। এই দৃঢ় মনোভাবই হয়তো একদিন সজিব মিয়াকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। পারিবারিক প্রেক্ষাপট সজিব মিয়ার পরিবারটি একেবারেই অভাবগ্রস্ত এবং সংগ্রামী একটি পরিবার। হবিগঞ্জ জেলার আজমেরীগঞ্জ উপজেলার রসুলপুর গ্রামের এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। সজিবের পিতা হারুন মিয়া কয়েক বছর আগে ইন্তেকাল করেন, যার ফলে পরিবারের ঘাড়ে নেমে আসে এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের যাবতীয় ভার এসে পড়ে মা ছিনুরা খাতুনের কাঁধে। তিনিই এখন পরিবার পরিচালনার একমাত্র মূল ভরসা। অন্যের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে কোনোরকমে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। চার সদস্যবিশিষ্ট এই পরিবারে সজিবের একজন বড় ভাই আছেন শাহিন। তিনি মাছ বিক্রির মতো অস্থায়ী ও অনিশ্চিত একটি পেশার মাধ্যমে অল্প আয়ে সংসারে সহায়তা করে থাকেন। তার উপার্জন এতটাই সীমিত যে, তা দিয়ে প্রতিদিনের খাবার যোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হয়। পরিবারের একমাত্র বোন সাথী বিবাহিত এবং তিনি বর্তমানে শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছেন। ফলে সংসারে বাস্তবিক কোনো অর্থনৈতিক অবদান রাখতে পারছেন না। তাদের গ্রামের বাড়িতে কিছু পরিমাণ জমি থাকলেও সেখানে বসতঘর বা স্থায়ীভাবে বসবাসযোগ্য কোনো ঘর নেই। ভাঙাচোরা ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টি চুয়ে পড়ে, বর্ষাকালে আশ্রয়ের জন্য অন্যের ঘরে যেতে হয় অনেক সময়। রাতে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন সবাই, বিশেষ করে মা ও ছোট ভাই-বোনেরা। ঘরহীন এই জীবনে প্রতিনিয়তই তাদের সামনে দাঁড়ায় নানা প্রতিকূলতা। খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতেও তাই হিমশিম খেতে হয়। এই পরিবারের জীবনে অভাব যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। সজিব প্রতিদিন এসব বাস্তবতা চোখের সামনে দেখে বড় হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের বেড়াজালে ঘেরা তার শৈশব তাকে দ্রুত পরিণত করে তুলেছে। কিন্তু তবুও সে আশা ছাড়েনি। নিজের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। সজিবের মতো একটি সাহসী ও সহনশীল মনোবলই হয়তো ভবিষ্যতে তাদের জীবনে নতুন আশার আলো নিয়ে আসবে। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানাধীন কাজলা এলাকায় এক ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটে যা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই দিন এলাকাবাসী ও ছাত্র-যুবাদের এক শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি চলাকালীন হঠাৎ করেই শুরু হয় পুলিশী হামলা। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে দমন নীতির বাস্তবায়ন ঘটে। ঠিক এ মুহূর্তেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল মো: সজিব মিয়া এক কিশোর বয়সী পিতৃহীন শিশু, যিনি সেদিনের বিভীষিকাময় ঘটনার শিকার হন। সজিব সেখানে কোনো সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তিনি কেবল আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছিলেন, কিন্তু আকস্মিকভাবে ছোড়া পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। একটি কিশোর শরীরে গুলির আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে এলাকাবাসী উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যায়। শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল, তীব্র ব্যথায় ছটফট করছিল সে। একজন সদ্য কৈশোরে পা রাখা ছেলেশিশুর জন্য এটি ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, যা শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও তাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। পিতৃহীন এই কিশোরের জীবনে এমনিতেই অভাব-অনটন ও নিরাপত্তাহীনতা প্রতিদিনের বাস্তবতা ছিল, তার ওপর এমন ভয়াবহ হামলা তার জীবনযুদ্ধে এক নতুন ধাক্কা এনে দেয়। শারীরিক ক্ষত অনেকটা সময় নিয়ে সেরে উঠলেও মানসিক আঘাত এত সহজে মুছে যায় না। গুলির শব্দ, রক্ত, চিৎকার এসব দৃশ্য তার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। রাতে ঘুমাতে গেলে সে সব ভয়াবহ মুহূর্ত বারবার ফিরে আসে তার মনে। সজিব এখনো ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল দীর্ঘমেয়াদী, কিন্তু অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পিতৃহীন এই ছেলেটি এখন জীবনের এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বলি হওয়া একটি নিষ্পাপ কিশোরের গল্প এটি, যে কেবল একটি শান্তিপূর্ণ দিনে জীবনযাপনের চেষ্টা করছিল। কিন্তু ক্ষমতার নির্মম নির্মাণে সে হয়ে ওঠে আরেকটি ক্ষতের নাম। তার জীবন এখন সাহস, সংগ্রাম ও সহনশীলতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরই মো: সজিব মিয়াকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক)-এ নিয়ে যাওয়া হয়। আহত অবস্থায় তাকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। গুলির আঘাতে তার শরীরের ক্ষতস্থানে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং প্রচণ্ড ব্যথায় ছটফট করছিল সে। চিকিৎসকেরা দ্রুততার সঙ্গে ক্ষত স্থান পরিষ্কার করে সাময়িক সেলাই ও ব্যান্ডেজ করে তার জীবনরক্ষা করেন। তবে প্রাথমিক চিকিৎসার পর সজিবের জন্য প্রয়োজন ছিল দীর্ঘমেয়াদি ও বিশেষায়িত চিকিৎসা যার মধ্যে শারীরিক থেরাপি, নিয়মিত ড্রেসিং, এক্সরে ও পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। পরিবারটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত, আর একটি নিরুপায় পিতৃহীন কিশোরের উন্নত চিকিৎসা গ্রহণের মতো সামর্থ্য তাদের ছিল না। ফলে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়। তখন থেকেই তার চিকিৎসার দায়িত্ব পড়ে মায়ের ওপর, যিনি নিজেই একজন গৃহকর্মী হিসেবে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাসায় ফিরে আসার পর ঘরের এক কোণে বিছানায় পড়ে থাকতে হয় সজীবকে। ওষুধ, খাবার ও চিকিৎসার খরচ যোগাড় করতে গিয়ে পরিবার আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার ক্ষতস্থান মাঝে মাঝে ফুলে ওঠে, জ্বর আসে, ব্যথা বেড়ে যায়, কিন্তু কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয় ফার্মেসি বা গ্রামের ওষুধের দোকান থেকে কিছু সাধারণ ওষুধ এনে সাময়িকভাবে ব্যথা কমানোর চেষ্টা চালানো হয় মাত্র। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, পরিবারের পুরুষ অভিভাবক না থাকায় চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত বা অর্থ যোগাড়ের ক্ষেত্রেও যথাযথ সহযোগিতা পাওয়া যায় না। ছিনুরা খাতুন, একজন মায়ের মতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তার সামর্থ্য সীমিত। ফলে সজিবের উন্নত চিকিৎসার পথ এক প্রকার বন্ধই হয়ে গেছে।
প্রস্তাবনা ১. সজিবের চিকিৎসার খরচ বহন করা। ২. জীবিকা নির্বাহের জন্য তার মায়ের একটা দোকানের ব্যবস্থা করা দেওয়া যেতে পারে। এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি সহিংসতার ফল নয়, বরং রাষ্ট্রীয়
অবহেলা ও দারিদ্র্যের এক বাস্তবচিত্রও বটে। গুলিবিদ্ধ হওয়া এক কিশোর যখন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন তা সমাজের ন্যায়ের চিত্রকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সজিবের জীবন তাই এখনো যন্ত্রণাময়, কিন্তু তার চোখে এখনও এক টুকরো আশা জ্বলছে যদি একদিন সে সুস্থ হয়ে উঠে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে।
এক নজরে মো: সজিব মিয়া
নাম : মো: সজিব মিয়া
পিতা : মো: হারুন মিয়া, মৃত
মাতা : ছিনুরা খাতুন
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : কাজলা, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা স্থায়ী ঠিকানা : আজমেরীগঞ্জ, রসুলপুর, হবিগঞ্জ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍