হোম / আহতদের তালিকা / মো: শাহ আলম
মো: শাহ আলম

মো: শাহ আলম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

স্থায়ী ঠিকানা : হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়
মো: শাহ আলমের জীবন কাহিনি এক সংগ্রামী মানুষের গল্প, যিনি প্রতিকূলতার মাঝেও বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর লড়াই করে যাচ্ছেন। চাঁদপুর জেলার হাজিগঞ্জ উপজেলার রাজারগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মো: শাহ আলম। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে একেবারে গ্রামীণ পরিবেশে যেখানে ছিল মাটির ঘর, ধানের শিষে ভরা মাঠ আর খোলা আকাশের নিচে ছেলেবেলার হাসি-খুশি দিন। তবে সেই দিনগুলো সহজ ছিল না। খুব অল্প বয়সেই তিনি হারান তার পিতা ইলিয়াস এবং মাতা জাহানারাকে। পিতা-মাতার মৃত্যু তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে তোলে। এত অল্প বয়সে এত বড় ক্ষতি তাকে ভেতর থেকে নাড়া দিয়ে দেয়। আত্মীয়-স্বজনের সহানুভূতি আর প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় কোনোরকমে এগিয়ে চলে তার জীবন।
অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হওয়া মো: শাহ আলমকে খুব অল্প বয়সেই জীবিকা অর্জনের জন্য শহরমুখী হতে হয়। গ্রামের পড়াশোনা বা শৈশবের স্বপ্নগুলো আর পূরণ হয়নি। নিজের এবং পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে তিনি কর্মের সন্ধানে রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমান। বর্তমানে তিনি ঢাকার রায়েরবাজারের বাদামতলী এলাকায় বসবাস করছেন। সেখানে একটি ভাড়াবাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। ব্যক্তিজীবনে মো: শাহ আলম একজন পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল মানুষ। তার স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্রালাইসিস) রোগে আক্রান্ত, বিশেষ করে ডান পাশ একেবারেই অকেজো হয়ে গেছে। স্ত্রীকে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে হয় এবং তার দেখভালের পুরো দায়িত্বই মো: শাহ আলমের কাঁধে। তাদের দুই কন্যাসন্তান রয়েছে, যাদের মধ্যে বড় মেয়ে শারমিন বিবাহিত, তবে ছোট মেয়েটির এখনো শিক্ষাজীবন চলছে। পরিবারের প্রয়োজন, স্ত্রীর অসুস্থতা এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের চিন্তা এই তিনের ভার নিয়েই তিনি আজও সংগ্রাম করে চলেছেন। এই জীবনসংগ্রামে তার পাশে থাকার মতো মানুষ খুব কম। পিতামাতাহীন জীবনের শূন্যতা, স্ত্রীর অসুস্থতা, সীমিত আয় এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে মো: শাহ আলমের জীবন যেন একটি স্থায়ী সংকটের নাম। তবু হার না মানা মনোবল নিয়ে তিনি প্রতিদিন নতুন দিনের সূর্যকে বরণ করেন, কারণ তিনি জানেন সংগ্রামই বাঁচার একমাত্র উপায়। পারিবারিক অবস্থা মো: শাহ আলম একজন সাধারণ মানুষ, কিন্তু তার জীবনকাহিনি অসাধারণ সংগ্রাম আর দায়িত্বশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি একজন বিবাহিত ব্যক্তি, যার সংসারজীবন প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার এক অন্তহীন যাত্রা। বর্তমানে তিনি ঢাকার রায়েরবাজারের বাদামতলী এলাকায় একটি ছোট ভাড়া বাসায় পরিবারসহ বসবাস করছেন। তার স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর প্রালাইসিসে আক্রান্ত। ডান পাশ সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ায় তিনি স্বাভাবিক চলাফেরা কিংবা গৃহস্থালি কোনো কাজই করতে পারেন না। প্রতিটি দিনই তাঁর জন্য নির্ভরতার এক কঠিন বাস্তবতা বয়ে আনে। স্ত্রীর সেবা, চিকিৎসা ও মানসিক সাহচর্য সবকিছু একাই সামাল দেন মো: শাহ আলম। একজন স্বামী হিসেবে স্ত্রীকে যত্নে রাখার যে কর্তব্য, তিনি তা নিঃস্বার্থভাবে পালন করে চলেছেন। এই পরিবারে রয়েছে তার দুই কন্যা সন্তান। বড় মেয়ে শারমিন বিবাহিত এবং নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পিতার সংসারে সে তেমন সহযোগিতা করতে পারে না। ছোট মেয়ে সুমনা বর্তমানে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। লেখাপড়ায় মেধাবী হলেও আর্থিক অসচ্ছলতা ও পারিবারিক সংকট তার স্বাভাবিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও মো: শাহ আলম চান তার মেয়েটি যেন অন্তত শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানো এবং স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয় বহন করাই এখন তার জীবনের প্রধান দায়। এর আগে মো: শাহ আলম রাজধানীর রাস্তায় অটো রিকশা চালিয়ে পরিবারের খরচ চালাতেন। দিনভর খাটুনির পর যেটুকু আয় হতো, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলত। তিনিই ছিলেন এই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কিন্তু বয়স ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে এখন সেই কাজও নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে পরিবারের জীবিকা এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। এই পরিবার আজ সমাজের সহানুভূতি ও সহায়তার অপেক্ষায়। মো: শাহ আলমের নিঃস্বার্থ দায়িত্ববোধ, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা, মেয়ের ভবিষ্যতের চিন্তা সব মিলিয়ে তার জীবন এক নীরব বীরের প্রতিচ্ছবি। সীমাহীন কষ্টের মাঝেও তিনি লড়াই করে যাচ্ছেন, কারণ হাল না ছাড়া মানুষরাই আশার আলো জ্বালাতে পারে। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই, ঢাকার রায়েরবাজারের বাদামতলী এলাকায় ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা, যা বদলে দেয় মো: শাহ আলমের সারা জীবনের চেহারা। সেদিন দুপুরের দিকে ওই এলাকায় সৃষ্টি হয় এক সহিংস ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি। চারদিকে আতঙ্ক, চিৎকার আর ধোঁয়ার মধ্যে হঠাৎ করেই শুরু হয় পুলিশি গুলিবর্ষণ। কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও মো: শাহ আলম আলম অতি কাছ থেকে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি তখন রাস্তায় ছিলেন, প্রতিদিনের মতো প্রয়োজনীয় কাজ সেরে বাসায় ফিরছিলেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে তিনি সেই গুলির লক্ষ্যে পরিণত হন। তাঁর শরীরে একের পর এক গুলি এসে বিদ্ধ হতে থাকে চিকিৎসকদের হিসাব অনুযায়ী, ৬০টিরও বেশি গুলি তার শরীরে ঢুকে পড়ে। মুহূর্তেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারপাশে মানুষের দৌড়াদৌড়ি, আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি একা পড়ে ছিলেন রক্তাক্ত অবস্থায়।
এই ঘটনার খবর আশপাশের মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় কয়েকজন সাহসী ব্যক্তি তার জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন, তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলির গভীর ক্ষত, রক্তক্ষরণ এবং চেতনা হারানো অবস্থায় তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। একাধিক অস্ত্রোপচার, রক্ত সঞ্চালন ও বিশেষ যত্নের পর কোনওরকমে তার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়। তবে এই ঘটনার পর মো: শাহ আলমের জীবন আর আগের মতো নেই। তার শরীরে এখনো কিছু গুলির টুকরো রয়ে গেছে, যা ব্যথা, অসাড়তা ও অক্ষমতা সৃষ্টি করছে। চলাফেরা, কাজকর্ম বা দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিকতা সবই আজ প্রশ্নের মুখে। পরিবার, বিশেষ করে তাঁর প্রালাইসিস আক্রান্ত স্ত্রী ও শিক্ষার্থী কন্যাকে নিয়ে তার জীবন এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই নির্মম ঘটনার শিকার হয়েও মো: শাহ আলম আজ ন্যায় ও সহানুভূতির আশায় বুক বেঁধে আছেন। তার একটিই চাওয়া মানবিক সহায়তা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে যেন তার মতো নিরপরাধ মানুষ আর এভাবে নিপীড়নের শিকার না হয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মো: শাহ আলমের জীবন এক গভীর সংকটে পতিত হয়। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই পুলিশের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর, তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত ঢাকার ধানমন্ডিস্থ হলিকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি টানা দুই সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েন। রক্তাক্ত, নিথর ও জ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকা এই মানুষটিকে বাঁচাতে চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালান। হলিকেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসা টিম তার শরীরে গুলির চিহ্ন শনাক্ত করে প্রাথমিক অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীরের কিছু গুলির টুকরো বের করা সম্ভব হয়, এবং বিভিন্ন চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর জীবন রক্ষা করা যায়। তবে এতগুলো গুলির আঘাতে তার দেহে রয়ে গেছে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন, অভ্যন্তরীণ জটিলতা এবং ব্যথা। তার চলাফেরায় অসুবিধা দেখা দেয়, শরীরের কিছু অংশে অসাড়তা অনুভব করেন এবং দৈনন্দিন কাজে আগের মতো সক্রিয় থাকতে পারেন না। দুই সপ্তাহের চিকিৎসার পরও আর্থিক সংকট পরিবারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব না হওয়ায় তাকে ঢাকার হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে দেখানো হয়, যেখানে তাকে বাড়ি থেকেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বলা হয়। সেই থেকে মো: শাহ আলম আলম মূলত ঘরে বসেই সীমিত চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। তবে চাঁদপুরে বিশেষায়িত কোনো পুনর্বাসন ব্যবস্থা না থাকায় এবং প্রয়োজনীয় থেরাপি, নিয়মিত ফিজিওথেরাপি বা আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা না পাওয়ায় তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি তেমন হয়নি। ব্যথা, দুর্বলতা ও মানসিক চাপ তাঁর জীবনের স্থায়ী সঙ্গী হয়ে উঠেছে। কর্মক্ষমতা হারিয়ে তিনি এখন নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন পরিবারের ওপর, অথচ পরিবারটিই তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই অবস্থায় মো: শাহ আলম আলমের জীবন এক অন্ধকার গহ্বরে যেন আটকে গেছে। উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা পেলে তিনি হয়তো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারতেন। কিন্তু অনটনের বাস্তবতা তাকে সেই পথ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। তার জীবন আজ সমাজের সহানুভূতি ও সহায়তার অপেক্ষায়। এই তথ্যসমূহে স্পষ্ট যে মো: শাহ আলম আলম শুধুমাত্র একজন সংগ্রামী ব্যক্তি নন, বরং তিনি একটি অসহায় পরিবারের স্তম্ভ, যার জীবন আজ চরম সংকটে। তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সহানুভূতি ও যথাযথ সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন।
একনজরে পরিচিতি
নাম : মো: শাহ আলম
স্থায়ী ঠিকানা : হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর
পিতা : মো: ইলিয়াস, মৃত
মাতা : জাহানারা বেগম, মৃত
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাজার, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা প্রস্তাবনা
১. শাহ আলমের চিকিৎসার খরচ বহন করা
২. জীবিকা নির্বাহের জন্য তার জন্য একটা অটো গড়ির ব্যাবস্থা করা যেতে পারে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍