হোম / আহতদের তালিকা / মো. বাচ্চু মিয়া
মো. বাচ্চু মিয়া

মো. বাচ্চু মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : চাকরি (বর্তমানে পঙ্গুত্ব বরণ করায় বেকার)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো. বাচ্চু মিয়ার জন্ম ২০০৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, জামালপুর সদর উপজেলার কৈডোলা ইউনিয়নের উত্তর পাড়ায়। তার শৈশব কাটে চরম অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত এক পরিবারে। বাবা মো. জালাল মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। ফলে সংসারের হাল ধরতে হয় মা আছিয়া বেগমকে, যিনি একজন ইট ভাটার শ্রমিক। ৪৫ বছর বয়সী হলেও আজও শ্রমিকের জীবনযাপন করেন। পরিবারে ছয়জন সদস্য। স্ত্রী, দুই ভাই ও তিন বোন। বড় ভাই রাসেল রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন। তার দুই বড় বোন জাহানারা ও ফরিদা বিবাহিত। ছোট বোন জেসমিনও একইভাবে পরিবারের সদস্য হিসেবে গৃহস্থালি সামলান। এত কিছুর পরেও বাচ্চু নিজের জীবনে একটি স্বপ্ন বুনেছেন একদিন আত্মনির্ভরশীল হয়ে মায়ের কষ্ট লাঘব করবেন। সে স্বপ্ন নিয়েই তিনি ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি শুরু করেন।


বাচ্চু মিয়া একজন শ্রমজীবী তরুণ হিসেবে ঢাকায় গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত ছিলেন। তাঁর কাজ ছিল কঠোর, কিন্তু পরিবারকে সাহায্য করার তীব্র ইচ্ছা তাকে প্রতিদিনকার শ্রমে উৎসাহিত করতো। প্রতিদিন সকালে উঠে সময়মতো কাজে যাওয়া, মেশিন চালানো, ধৈর্য ধরে সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করাই ছিল তাঁর রুটিন। বয়স অল্প হলেও দায়িত্ববোধ ছিল তার অনেক বেশি। তাঁর মাসিক আয় ছিল অল্প, কিন্তু তা দিয়েই কিছুটা সঞ্চয় করতেন। ভবিষ্যতে একটি ছোট দোকান খুলে স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্ন এক ঝটকায় থেমে যায় ১৯ জুলাইয়ের আন্দোলনের দিন যখন হঠাৎ করে পুলিশের গুলিতে তার জীবন চিরতরে বদলে যায়।
বাচ্চু ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ শুরু করলে সংসারের খানিকটা ভার লাঘব হয়। কিন্তু এখন বাচ্চুর পঙ্গুত্ব তাকে আর উপার্জনে সক্ষম রাখে না। ফলে তার মা নিজেই আবার ঢাকা শহরে এসে ইট ভাঙ্গার কাজ শুরু করেছেন, যা শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে ভীষণ কষ্টদায়ক !
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে ছাত্র ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের জোয়ার ওঠে। চাকরিতে বৈষম্য, ধর্মীয় অধিকার হরণ ও সরকার দলীয় বাহিনীর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তরুণরা রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকার রামপুরা, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষেরা একত্র হয়ে প্রতিবাদ করতে থাকে। ১৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে এমনই একটি আন্দোলনের মধ্যে পড়ে যান মো. বাচ্চু মিয়া, যিনি সে সময় গার্মেন্টস থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ি ফেরার পথে ছিলেন। তার কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না, কোনো কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নেননি। তবুও এই দমনমূলক রাষ্ট্রীয় সহিংসতা থেকে রক্ষা পাননি। তার মতো সাধারণ একজন মানুষ, যিনি কেবল রুটি-রুজির চিন্তায় পথে ছিলেন, তিনি আজ চিরজীবনের জন্য পঙ্গু।
১৯ জুলাই ২০২৪, সকাল ১০টার দিকে অফিস থেকে ছুটি পাওয়ার পর মো. বাচ্চু মিয়া রামপুরা হাজিপাড়া এলাকা দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। সে সময় রাস্তার মোড়ে চলছিল ছাত্রদের একটি প্রতিবাদী মিছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি চালায়। একটি গুলি এসে সরাসরি তার ডান পায়ে লাগে, হাঁটুর কাছে বিদ্ধ হয়। প্রচণ্ড ব্যথায় সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে যায়। আশেপাশের মানুষ তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে অপারেশন করে গুলি বের করা হয়, তাকে দুই ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে সেই থেকে তিনি পা বাঁকাতে পারেন না, সোজা হয়ে হাঁটাও সম্ভব হয় না। বর্তমানে তিনি ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন। কাজের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন।
চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্য
আহত হওয়ার পর মো. বাচ্চু মিয়াকে রাজধানীর একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। সেখানে অপারেশন করে তার পায়ের গুলি বের করা হয় এবং দু'ব্যাগ রক্ত দিতে হয়। চিকিৎসার জন্য প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়, যার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা ধার করতে হয় তার পরিবারকে। অপারেশনের পরও তার পা পুরোপুরি সোজা হয় না, ফলে হাঁটাচলা করতে হয় একটি সাধারণ ক্রাচে ভর করে। উন্নতমানের ক্রাচ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা অর্থাভাবে সম্ভব হয়নি। তিনি উপজেলা প্রশাসনের কাছে উন্নতমানের ক্রাচের জন্য আবেদন করেছেন, কিন্তু এখনো কোনো সহায়তা পাননি। মাসে প্রায় ২ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয় তাকে, যা পরিবারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক সহায়তা তার জীবনের সবচেয়ে বড় চাহিদা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


একনজর প্রফাইল আহত ব্যক্তির পুরো
নাম : মো. বাচ্চু মিয়া
জন্ম তারিখ : ৬-২-২০০৪
জন্মস্থান : জামালপুর সদর
পেশা : চাকরি (বর্তমানে পঙ্গুত্ব বরণ করায় বেকার)
নিজ জেলা : জামালপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: কৈডোলা উত্তরপাড়া, ইউনিয়ন: কৈডোলা, থানা: জামালপুর সদর, জেলা: জামালপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো. জালাল (মৃত)
মায়ের নাম : মোছা. আছিয়া বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : ইট ভাটার শ্রমিক, ৪৫
মাসিক আয় : ২০ হাজার
আয়ের উৎস : বড় ভাই ও মায়ের শ্রমিক পেশার উপার্জন
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. রাসেল (২৮), রাজমিস্ত্রী, ভাই
২. জাহানারা (৩০), গৃহিণী, বোন
৩. ফরিদা (২৩), গৃহিণী, বোন
৪. জেসমিন (১৭), গৃহিণী, বোন
ঘটনার স্থান : রামপুরা, ঢাকা
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍