হোম / আহতদের তালিকা / মো. মোকাররম হোসেন
মো. মোকাররম হোসেন

মো. মোকাররম হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : গার্মেন্টস শ্রমিক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মোকাররম আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। কর্মজীবন শুরুর পর থেকেই পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে হঠাৎ করেই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। আশুলিয়ায় পুলিশের ছোঁড়া গুলি দু’টি ব্যক্তিকে ভেদ করে তার চোখে এসে লাগে। চোখ নষ্ট হয়, এ ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং তার দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। একজন সাধারণ শ্রমিকের জীবনে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ ঘটনা শুধু তার নয়, পুরো পরিবারের ভবিষ্যতকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। মোকাররমের এ গল্প দারিদ্র্যর সাথে লড়াই করা এক তরুণের সংগ্রাম ও আওয়ামী নিপীড়নের নির্মম প্রতিচ্ছবি।
জুলাইয়ের দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকারের বর্বরতা ও পোশাক শ্রমিকদের প্রতিরোধ
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই সময়টিতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশের লাখো শিক্ষার্থী ও জনতা, পোশাক শ্রমিকেরাও ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। অন্যায়ভাবে ছাত্রলীগ ও পুলিশ কর্তৃক শিক্ষার্থীদের গুলি করে হত্যা, কুপিয়ে জখম ও নানা ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে পোশাক শ্রমিকেরাও রাস্তায় নেমেছিল। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও জীবনযাত্রার নিশ্চয়তার দাবিতে ইতঃপূর্বেও রাস্তায় নামেন শ্রমিকরা। কিন্তু জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থী ও জনতার এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জবাবে সরকার যেভাবে বর্বরোচিত দমন-পীড়ন চালায়, তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সম্ভব ছিল না।
পুলিশ ও সরকারি বাহিনীর হাতে গুলি খেয়ে অগণিত শিক্ষার্থী ও শ্রমিক রক্তাক্ত হন। আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের উপর চালানো হয় গুম, গ্রেফতার, লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলের অমানবিক হামলা। গার্মেন্টস শ্রমিক মো. মোকাররম হোসেনের চোখে গুলি লাগার ঘটনা সেই দমননীতির এক নির্মম উদাহরণ। তবুও শ্রমিকরা দমে যাননি। দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা ব্যারিকেড গড়ে তোলে, ফ্যাক্টরি বন্ধ রেখে আন্দোলনে অংশ নেয়, এমনকি নারী শ্রমিকরাও রাস্তায় নেমে এসে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ প্রতিরোধ ছিল শুধু ন্যায্য ছাত্র জনতার হত্যার বিচারের দাবি নয়, বরং শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাদের সম্মিলিত স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতিফলন।
সরকার যেভাবে এ আন্দোলন দমন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে তার চিত্র ফুটে ওঠেছে। গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও শ্রমিক-জনতার গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি এমন অবজ্ঞা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছু নয়। জুলাইয়ের দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই রাষ্ট্রযন্ত্র কাদের জন্য কাজ করছে, কারা চিরদিন অবহেলিত। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ ও লুটতরাজকারীরাই এতদিন এ রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা দেদারচে লুটপাট করেছিল।
ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় উত্তাল সাভারের আশুলিয়া
মো. মোকাররম হোসেন, একজন তরুণ গার্মেন্টস শ্রমিক, তিনি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে ছাত্র ও শ্রমিকদের যৌথ আন্দোলনে সাভারের আশুলিয়ায় অংশগ্রহণ করেন। ৪ আগস্ট, মোকাররম দুপুর ২টায় নিজের বাসা থেকে বের হন আন্দোলনে যোগ দিতে। শুরুতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চললেও বিকাল ৪টার দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পুলিশ ব্যাপকভাবে ছাত্র-জনতার উপর টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডারদের হাতেও তখন মরণাস্ত্র। রাস্তায় তখন মোকাররম ছিলেন সহযোদ্ধাদের সঙ্গে। পুলিশের গুলিতে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেই একই বুলেট মোকাররমের চোখে এসে লাগে। গুলি তার চোখের ওপরের অংশে লাগে এবং চোখের ভেতর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। তার একটি চোখ সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনা মোকাররমের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি এখন শুধু একজন শ্রমিক নন। তিনি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের জীবন্ত সাক্ষী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক সাহসী মানুষের নাম।
চিকিৎসার লড়াইয়ে মোকাররম
পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর মো. মোকাররম হোসেনকে দ্রুত আশুলিয়ার জনতা হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে তাকে হাসপাতালে পৌঁছানো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টসাধ্য। পথে ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং পুলিশের ক্যাডারদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার ভয় ছিল সবসময়। তবু সহযোদ্ধাদের সহযোগিতায় তিনি হাসপাতালে পৌঁছাতে সক্ষম হন। জনতা হাসপাতালে তাকে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এরপর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়, শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে, তখন মোকাররমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয় জাতীয় চক্ষু হাসপাতালে। সেখানে তিনি পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকেন। তার বাম চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়, কিন্তু চিকিৎসকেরা জানান, চোখে গর্ত হয়ে গেছে এবং চোখটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এই আঘাত শুধু তার চোখকেই ছিন্নভিন্ন করেনি, তার জীবন ও ভবিষ্যতকেও অন্ধকার করে দিয়েছে। আগে তিনি একটি গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন, কিন্তু দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণে এখন তাকে কাজ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। রাস্তায় বের হলে তার চোখ ও মাথায় তীব্র ব্যথা শুরু হয়, বিশেষ করে ঠাণ্ডা বাতাসে ব্যথা অসহনীয় হয়ে ওঠে। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় তাকে প্রতিদিন বাসে করে যাতায়াত করতে হয়, কারণ হাসপাতালে ভর্তি থাকার আর্থিক সঙ্গতি তার নেই। তার ডান চোখ আগে যতটা দেখতে পারত, এখন তা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে মোকাররমের চিকিৎসা চলমান, তবে তার জীবন ও কর্মক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রতিদিনই বাড়ছে। তার এই অবস্থা রাষ্ট্রীয় দমননীতির আরেকটি নির্মম পরিণতি, যেখানে একজন শ্রমিক শুধু চোখ নয়, হারিয়েছেন তার ভবিষ্যতের আলোও।
চোখে গুলিবিদ্ধমো. মোকাররম হোসেনের জন্ম ও পরিচয়
মো. মোকাররম হোসেন একজন গার্মেন্টস শ্রমিক, যিনি আন্দোলনের সময় সাভারের আশুলিয়ায় বসবাস করতেন। তার জন্ম ১৪ আগস্ট ২০০৩ সালে, শেরপুর জেলার নাতিনবাড়ি থানার অন্তর্গত নয়াবিল ইউনিয়নের আন্ধারুপাড়া গ্রামে। পিতার নাম মো. তোতা মিয়া, বয়স ৪৫ বছর, তিনি বাসের হেল্পার হিসেবে কাজ করেন এবং মাসে প্রায় ২২ হাজার টাকা আয় করেন। মাতা মোছা. মনিরা বেগম গৃহিণী, যার বয়স ৪০ বছর। মোকাররমের পরিবারে মোট ৬ জন সদস্য রয়েছে। তার বড় বোন ময়না (বয়স ২৫) বিবাহিত ও গৃহিণী। ছোট বোন ফারজানা বয়সে ৭ বছর এবং বর্তমানে ১ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরিবারটি আর্থিকভাবে অসচ্ছল। পূর্বে মোকাররম পোশাক শ্রমিক হিসাবে কাজ করলেও এখন সে বেকার। বাবার আয়ের উপরই পরিবারের ভরণপোষণ নির্ভরশীল।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো. মোকাররম হোসেন
জন্ম : ১৪/০৮/২০০৩
জন্মস্থান : গ্রাম: আন্ধারুপাড়া, ইউনিয়ন: নয়াবিল, থানা: নাতিন বাড়ি
নিজ জেলা : শেরপুর
পেশা : গার্মেন্টস শ্রমিক
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : গার্মেন্টস
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: আন্ধারুপাড়া, ইউনিয়ন: নয়াবিল, থানা: নাতিন বাড়ি, জেলা: শেরপুর
বর্তমান ঠিকানা : আশুলিয়া, সাভার
পিতা : মো. তোতা মিয়া, বয়স: ৪০, পেশা: বাসের হেল্পার
মাতা : মোছা. মনিরা বেগম, বয়স: ৩৫, পেশা: গৃহিণী
মাসিক আয় : ২২ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : বাসের হেলপার হিসাবে আয়
পরিবারের সদস্য : ০৬ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. ময়না, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ২৫, পেশা: গৃহিণী
২. ফারজানা, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ০৭, পেশা: ১ম শ্রেণির শিক্ষার্থী
আক্রমণকারী
সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের ছোড়া গুলি দু’জন ব্যক্তিকে ভেদ করে তার চোখে লাগে।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. আহত হয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন তাই মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান।
২. বাম চোখে পাথর বসাতে হবে ও ডান চোখেও উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍