হোম / আহতদের তালিকা / আকাশ মিয়া
আকাশ মিয়া

আকাশ মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

সেলসম্যান

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সংক্ষিপ্ত পরিচয়
আকাশ মিয়া নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের বিয়াশি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম তারিখ ১৫ জুন ২০০৫। আর্থিক অনটনের কারণে অল্প বয়সেই নারায়ণগঞ্জের একটি মিষ্টির দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু জুলাইয়ে আওয়ামী লীগের উপজেলা চেয়ারম্যান ইফতেখারুল ইসলাম ও তার দোসরদের আক্রমণে তিনি এখন পঙ্গু হয়ে জীবন কাটাচ্ছে।


পিতা মো. দুলাল মিয়া (বয়স ৫০) একজন কৃষক, এবং মাতা মোছা. রূপা আক্তার (বয়স ৪৫) গৃহিণী। পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস হলো বাবার কৃষিকাজ। বাবার অক্লান্ত পরিশ্রমেই তাদের সংসার চলে। তাদের মাসিক আয় মাত্র ৭ হাজার টাকা। আকাশের আরও চার ভাই-বোন রয়েছে। ভাই সাগর (বয়স ১৭), নারায়ণগঞ্জের একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করেন, আর ছোট ভাই আতিকুল (বয়স ১৪) সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। তার ছোট দুই ভাই-বোন জিসান (বয়স ৯) ও মরিয়ম (বয়স ৬) যথাক্রমে দ্বিতীয় ও প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সবচেয়ে ছোট বোন খাদিজা, যার বয়স মাত্র ২ বছর। আকাশের জন্মস্থান বিয়াশি গ্রামে হলেও তিনি নারায়ণগঞ্জে কাজ করতেন। কিন্তু বর্তমানে পঙ্গু হয়ে তিনি তার নিজ এলাকা নেত্রকোনাতেই বসবাস করেন। অর্থনৈতিক কষ্ট, পঙ্গুত্ব এবং পরিবারে এত বড় সদস্যসংখ্যা প্রতিনিয়ত তার জীবনের সংগ্রাম কঠিনতর করে তুলছে।

আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও জবাবদিহিতার অভাব
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের দুঃশাসন, দমননীতি ও জবাববিহীন এক শাসনব্যবস্থা এদেশবাসী পূর্বে কখনোই প্রত্যক্ষ করেনি। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে দলীয় প্রভাব, প্রশাসনের দলীয়করণ এবং বিরোধী মতের দমন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে ফেলেছে বহু পূর্বেই।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন সরকারের রাজনীতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছিল। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গুম, গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা কিংবা ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণের ঘটনা বারবার প্রমাণ করে এই সরকার ক্ষমতায় টিকে ছিল কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। এর চেয়েও বড় যে সমস্যা, তা হলো জবাবদিহিতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতার কোনো ঘটনার পর সরকার পক্ষ থেকে জবাবদিহি তো দূরের কথা, তদন্ত পর্যন্ত হতো না। কেউ বিচার দাবি করলে তাকেও গুম কিংবা হত্যা করা হতো। অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে, যদি না তারা বিরোধীপন্থী হতো। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ, বিচার ব্যবস্থায় নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, আওয়ামী লীগ একটি ফ্যাসিবাদী শাসনে রূপ নিয়েছিল। জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা ছিল না কখনোই। বরং দলীয় স্বার্থ রক্ষাই হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। এই পরিস্থিতিতে একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে রাস্তায় নেমেছিল সর্বস্তরের মানুষেরা। মানুষের কণ্ঠরোধ, আন্দোলনে গুলি, সাংবাদিক নিপীড়ন সব মিলে বাংলাদেশের সামনে আওয়ামী লীগকে হটানো ব্যথিত আর কোনো রাস্তা ছিল না। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি মাঠে নেমেছিল আকাশ মিয়ার মতো নাগরিকেরা। স্বাধীনতা আর জনগণের সার্বভৌমত্ব শুধু কাগজেই থেকে যেত।
পুলিশ দৌড় দিতে বলে পেছন থেকে গুলি করে
আকাশ মিয়া, একজন সাধারণ তরুণ। পেশায় ছিলেন মিষ্টির দোকানের সেলসম্যান, কর্মস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জ। জীবনের তাগিদে যেমন পরিশ্রম করতেন, তেমনি দেশের অন্যায়- অবিচারের প্রতিবাদেও ছিলেন অগ্রগামী। ১৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। সেই সাহসিকতা তাকে ২০ জুলাইয়ের ভয়াল বিকেলের দিকে ঠেলে দেয়।
২০ জুলাই সকালেও তিনি আন্দোলনে যোগ দেন, আবার বিকেলেও। বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে নারায়ণগঞ্জের চট্টগ্রাম রোডে ঘটে যায় বিভীষিকাময় এক ঘটনা। আওয়ামী লীগের উপজেলা চেয়ারম্যান ইফতেখারুল ইসলাম ও তার অনুসারীরা এবং পুলিশ সম্মিলিতভাবে শান্তিপূর্ণ শিক্ষার্থী জনতার উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ভয় আর বিভ্রান্তির মুহূর্তে আকাশ আত্মরক্ষায় দৌড়ে পাশের মিষ্টির দোকানে আশ্রয় নেন। যেখানে কিছুক্ষণ আগেই তিনি কর্মরত ছিলেন।
কিন্তু তার আশ্রয়স্থল তাকে রক্ষা করতে পারেনি। পুলিশ তাকে অনুসরণ করে দোকানে প্রবেশ করে, শুরু হয় জেরা। আকাশ বারবার হাতজোড় করে ক্ষমা চান ও বোঝান তিনি নির্দোষ। কিন্তু ক্ষমা পাওয়া তো শুধু মুখের কথা নয়! এক পুলিশ সদস্য তার বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে রাখে। অনেক অনুনয়ের পর পুলিশ তাকে যেতে বলে। কিন্তু যখন আকাশ পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করেন, তখনই ঘটে সেই নিষ্ঠুরতা। পেছন থেকে তার হাঁটুর কাছে গুলি ছোড়া হয়।
ছড়রা গুলিতে তার পায়ের হাড়, রগ, মাংস সব ছিঁড়ে যায়। তিনি ধপ করে পড়ে যান। চিৎকারে আশপাশ কেঁপে ওঠে। স্থানীয়রা ছুটে আসতে চায় কিন্তু পুলিশ থাকায় সাথে সাথে আসতে পারেনি। পুলিশ চলে গেলে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ডাক্তারদের ভাষায়, “পা রাখা যাবে না,” তাকে বাঁচাতে পা কেটে ফেলতে হয়। আকাশ আজ পঙ্গু। কিন্তু তার স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিবাদ কেবল শব্দে নয়; রক্ত, মাংস ও হাড়ের বিনিময়ে গড়ে ওঠেছিল জুলাইয়ে এক-একটি ইতিহাস।

চিকিৎসার অভাবে পা কেটে ফেলতে হয়
আকাশ মিয়া জুলাইয়ের উত্তাল আন্দোলনের সাহসী এক যোদ্ধা। তার শরীরে বহন করে চলেছেন রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার এক ভয়ংকর সাক্ষ্য। ২০ জুলাই চট্টগ্রাম রোডে যখন তার পায়ের মাত্র এক ফুট দূর থেকে গুলি ছোড়া হয়, তখন কেউ ভাবেনি তিনি বেঁচে থাকবেন কিনা। এই তরুণটির জীবনে নেমে এসেছে চিরস্থায়ী অন্ধকার। অন্তত ৬০০ ছররা গুলি তার হাঁটুতে বিদ্ধ হয়, ছিন্নভিন্ন করে ফেলে পায়ের সব রগ, পেশি ও হাড়। মুহূর্তেই তার দেহ লুটিয়ে পড়ে রক্তে ভেজা রাস্তায়। তাকে আশেপাশের আন্দোলনকারীরা উদ্ধার করে দ্রুত নিয়ে যায় নিকটস্থ পঙ্গু হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে চিকিৎসা তো ছিল একরকম নিষিদ্ধ শব্দ। আন্দোলনকারী মানেই আতঙ্ক, নিষিদ্ধ। ডাক্তারদের কাছে, হাসপাতালের কাছেও। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের ভয়াবহ নজরদারি, আর পুলিশের গ্রেপ্তার আতঙ্কে হাসপাতালের পরিবেশ ছিল থমথমে। কেউই এগিয়ে আসেনি আকাশকে আশ্বাস দিতে, সাহস দিতে কিংবা দ্রুত চিকিৎসা দিতে।

তিন দিন পরে, অবশেষে অপারেশন হয়। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাঁটুর উপর থেকে পা কেটে ফেলতে হয়। অপারেশনের পর তার পায়ের সেন্সরও কাজ করে না। এখন কৃত্রিম পায়ের উপর ভর করে বেঁচে আছেন আকাশ, এক ব্যথাতুর অস্তিত্ব নিয়ে। আকাশের নিজের ভাষ্যমতে, সময়মতো চিকিৎসা পেলে হয়তো পা বাঁচানো যেত। কিন্তু চিকিৎসকরা ভয়ের বশবর্তী হয়ে তাকে চিকিৎসার চেয়ে মুক্তির পথ খোঁজে দেন; পা কেটে ফেলার মধ্য দিয়ে। এ এক নিঃশব্দ হত্যাকাণ্ড, যেখানে পুলিশের অস্ত্র তার জীবন কেঁড়ে নিয়েছে। এ বেঁচে থাকা যেন বেঁচে থাকা নয়। অস্ত্রধারীরা এ সাহস পেয়েছিল রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার অভাবের কারণে। আকাশের কৃত্রিম পা আজ তার জীবন চালানোর একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু প্রতিটি ধাপে তিনি অনুভব করেন, যদি চিকিৎসার অধিকার পেতেন, যদি ভয় না থাকত, তবে হয়তো একটি পা নয়, একটি ভবিষ্যৎ রক্ষা পেত।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আকাশ মিয়া
জন্ম : ১৫/০৬/২০০৫
জন্মস্থান : বিয়ামি, ফতেপুর, মদন, নেত্রকোনা
নিজ জেলা : নেত্রকোনা
পেশা : সেলসম্যান
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : নারায়ণগঞ্জে মিষ্টির দোকানে কাজ করতেন; এখন পঙ্গু
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: বিয়াশি, ইউনিয়ন: ফতেপুর, উপজেলা: মদন, জেলা: নেত্রকোনা
পিতা : মো. দুলাল মিয়া, বয়স: ৫০, পেশা: কৃষক
মাতা : মোছা. রূপা আক্তার, বয়স: ৪৫, গৃহিণী
মাসিক আয় : ৭ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : বাবার কৃষিকাজ
পরিবারের সদস্য : ০৯ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. সাগর, বয়স: ১৭, সম্পর্ক: ভাই, পেশা: মিষ্টির দোকানে কাজ
২. আতিকুল, বয়স: ১৪, সম্পর্ক: ভাই, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ৭ম
৩. জিসান, বয়স: ০৯, সম্পর্ক: ভাই, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ২য়
৪. মরিয়ম, বয়স: ০৬, সম্পর্ক: বোন, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ১ম
৫. খাদিজা, বয়স: ২, সম্পর্ক: বোন
আক্রমণকারী
পুলিশ ও নারায়ণগঞ্জের উপজেলা চেয়ারম্যান ইফতেখারুল ইসলাম ও তার অনুসারী
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৩. খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তকরণতার পরিবার সদস্য সংখ্যা ৯ জন।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍