হোম / আহতদের তালিকা / মো. আব্দুল বারেক:
মো. আব্দুল বারেক:

মো. আব্দুল বারেক:

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

কৃষিকাজ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা


এক কৃষক জীবনের গল্প
মো. আব্দুল বারেক একজন প্রান্তিক কৃষক, যিনি নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের চাঁদগাও চকপাড়া গ্রামে বসবাস করেন। জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪০ সালের ১ জানুয়ারি, এই গ্রামেরই মাটিতে। তার পিতা মৃত আব্দুল গনি এবং মাতা মৃত শারবানু। সারা জীবন কৃষিকাজ করে দিন কাটানো এই মানুষটির এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার সময়, তবুও তিনি মানবিক কারণে শিক্ষার্থীদের উপর আগ্রাসী হামলার নিন্দা জানাতে রাজপথে নেমেছিলেন। কৃষিকাজ থেকে যা আয় হতো তা দিয়েই সংসার চালিয়ে নিতেন।তার মাসিক আয় প্রায় ৭ হাজার টাকা, যা আসে কৃষিকাজ থেকে এবং কিছুটা মেয়ে স্বপ্নার চাকরি থেকে। স্বপ্না (বয়স ২৭) বর্তমানে একটি গার্মেন্টসে কর্মরত, বাবার দেখভাল তিনিই করেন। কিন্তু পুলিশের গুলিতে চোখ হারিয়ে তিনি এখন কর্মহীন।

আব্দুল বারেকের পরিবার ছোট। মাত্র তিনজন সদস্য। বৃদ্ধ বয়সে এটাই যেন তার জন্য আশীর্বাদ। তবু অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বয়সজনিত সমস্যা এবং শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে প্রতিদিন তাকে লড়াই করতে হয়। বর্তমান সময়ে যেখানে কৃষির সঙ্গে জড়িত মানুষদের জীবন ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে, সেখানে আব্দুল বারেকের মতো মানুষরা আজও নিজেদের আত্মসম্মান ও শ্রমের মাধ্যমে বেঁচে আছেন। তার জীবন কেবলই একজন কৃষকের নয়, বরং একটি প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি, যারা নিজেদের ভূমির সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আজও দেশের মাটিকে রক্ষা করে চলেছেন। কিন্তু জুলাইয়ে তার উপর হওয়া অত্যাচারের কারণে তিনি আজ কর্মহীন হয়ে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ছুটছেন।

জুলাই আন্দোলন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ঐতিহাসিক এক গণআন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল চাহিদা ছিল কোটা সংস্কার, শিক্ষার সুযোগ ও বেকারত্বের অবসান। কিন্তু শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলনের জবাবে সরকার দলীয় সংগঠন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ যে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা ছিল চরম সহিংস ও অমানবিক। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ ও সরকার দলীয় ক্যাডাররা একযোগে হামলা চালায়। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ দেশের বহু এলাকায় ছাত্র-জনতার উপর সরাসরি গুলিবর্ষণ করা হয়। এর নেতৃত্বে ছিল ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা, যাদের সহায়তা করে পুলিশ। এই হামলায় অসংখ্য মানুষ আহত হন ও অঙ্গহানি ঘটে, কেউ কেউ চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান। বিশেষ করে পেছন দিক থেকে ছররা গুলি ছুঁড়ে ছাত্রদের পায়ে, চোখে ও পিঠে আঘাত করা হয়, যা ছিল পরিকল্পিত ও নির্মম। জুলাইয়ের এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল গভীর সংকটে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে গুলি চালিয়ে সরকার তার গণবিচ্ছিন্ন অবস্থান-ই যেন স্পষ্ট করে তুলেছিল।

রক্তাক্ত জুলাই : মদনের দুপুরবেলার এক ভয়াবহ দৃশ্য
জুলাইয়ের উত্তাল আন্দোলনের ঢেউ যখন দেশের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ে, পিছিয়ে ছিল না নেত্রকোনার মদন উপজেলার। জনতার জাগরণের সেই বাতাস ছুঁয়ে যায় এই নিভৃত জনপদকেও। ১৮ জুলাই, এক রৌদ্রদগ্ধ দুপুর। সময় তখন ঠিক বারোটা। মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল দুই বিপরীত শক্তি। একদিকে সাধারণ ছাত্র-জনতা, অন্যদিকে ক্ষমতার মোড়কে সজ্জিত সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা, যারা পুলিশের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে অপেক্ষা করছিলো জনতার উপর অস্ত্রহাতে আক্রমণের জন্য।
প্রথমে শুরু হয় উত্তেজনা, তারপর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। মুখে শ্লোগান, চোখে ক্রোধ, বুক ভরা প্রতিবাদ। “আমার ভাই মরলো কেন, খুনি হাসিনা জবাব দে”, “আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না” প্রভৃতি শ্লোগানে চারিদিক সয়লাভ হয়ে যায়। ছাত্র-জনতার কণ্ঠস্বর যখন ফেটে পড়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, তখনই যেন দুর্বৃত্ত শক্তি থেমে থাকতে পারে না। তাদের সর্বশক্তি নিয়ে একসময় দেশীয় অস্ত্র হাতে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করে নিরস্ত্র জনতার উপর। দৃশ্যপট আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যখন আওয়ামী লীগের স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এই হামলায় পুলিশও সরাসরি অংশ নেয়। গুলি ছুড়তে শুরু করে পুলিশ।
নিরাপত্তার প্রতীক যেই বাহিনী, তারাই যখন জনগণের দিকে বন্দুক তোলে, তখন ন্যায়বিচারের আর কোনো আশ্রয় থাকে না। ঠিক তখনই, গুলি চলে। এক ছররা গুলি এসে বিদ্ধ হয় ৮৫ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল বারেকের ডান চোখে। মুহূর্তেই নিথর হয়ে পড়েন তিনি অচেতন শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জনতার মাঝে। মদনের আকাশে সেদিন আর সূর্য ছিল না, ছিল শুধু ধোঁয়া, চিৎকার আর রক্ত। মানুষের চোখে ছিল আতঙ্ক, আর বুকের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ। এই ঘটনা শুধু একটি উপজেলার নয়, পুরো জাতির আত্মাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল প্রশ্ন তুলেছিল, এ কেমন রাষ্ট্র যেখানে প্রতিবাদ মানেই গুলি!

আব্দুল বারেকের চিকিৎসা
১৮ জুলাইয়ের সেদিনের ঘটনায় আহত হয়ে অজ্ঞান অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকা বৃদ্ধ আব্দুল বারেককে প্রথমে নেওয়া হয় মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। বয়স ও আঘাতের তীব্রতায় তিনি তখন সম্পূর্ণ অচেতন। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তখনো ছিল না নিরাপদ চিকিৎসার পরিবেশ। চিকিৎসকেরা চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে কোনোমতে তার প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। কারণ চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী, আর মাথার ওপরে ঝুলে আছে পুলিশের গ্রেপ্তারের ভয়।

এক নজরে পরিচিতি
নাম : মো. আব্দুল বারেক
জন্ম : ০১/০১/১৯৪০
জন্মস্থান : চাঁনগাও চকপাড়া, জাহাঙ্গীরপুর, মদন, নেত্রকোনা
নিজ জেলা : নেত্রকোনা
পেশা : কৃষিকাজ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চাঁনগাও চকপাড়া, ইউনিয়ন: জাহাঙ্গীরপুর, উপজেলা: মদন, জেলা: নেত্রকোণা
পিতা : মৃত আব্দুল গণি
মাতা : মৃত শারবানু
মাসিক আয় : ৭ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : কৃষিকাজ ও মেয়ের চাকরি
পরিবারের সদস্য : ৩ জন
সন্তানের তথ্যাদি
স্বপ্না, বয়স: ২৭, পেশা: গার্মেন্টস কর্মী, সম্পর্ক: মেয়ে
আক্রমণকারী
পুলিশ ও ছাত্রলীগ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. চোখের চিকিৎসার ব্যবস্থা
৪. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তকরণ
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা
৬. গরুর খামারের ব্যবস্থা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍