মো: হুজাইফা ইসলাম স্বপন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : কৃষক
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
মো: হুজাইফা ইসলাম স্বপন; জুলাই আন্দোলনের এক নির্ভীক বীর; ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার সালন্দর ইউনিয়নের সেনপাড়া গ্রামের এক হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ভিন্ন একটি নামে, কিন্তু নিয়তির লিখন যে কতটা চমকপ্রদ ও পরিপূর্ণ তা হুজাইফার জীবন দেখলেই বোঝা যায়। শৈশবে তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ, কিন্তু সেই সাধারণের গভীরে ছিল স্বপ্ন, সাহস এবং আত্মজিজ্ঞাসার এক অনন্ত আকাঙ্ক্ষা।পারিবারিক প্রেক্ষাপট
তাঁর পিতা নরেন সেন, একজন পরিশ্রমী কৃষক, যিনি নিঃস্বভাবে হলেও সততা ও শ্রমে গড়ে তুলেছিলেন জীবনের ভিত্। তাঁর মা অনদিলী সেন ছিলেন একজন স্নেহময়ী গৃহিণী, যিনি নিরবচ্ছিন্ন ভালোবাসা আর আদরের পরশে সন্তানদের প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়েছেন। কিন্তু জীবন সর্বদা সরলরেখায় চলে না। ধর্মান্তরের পর থেকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরে। হুজাইফা হয়ে ওঠেন একা, অথচ অন্তরে আগুন জ্বালানো এক সাহসী পথিক।
কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবন
একজন কৃষক হিসেবেই হুজাইফা ইসলাম স্বপনের পরিচয় গড়ে ওঠে; শ্রমজীবী মানুষের প্রতিচ্ছবি হয়ে। ঘাম ঝরিয়ে রোজগার করা মানুষটি শুধুমাত্র নিজের পরিবারের অন্ন জোগান দেননি, বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে রুখে দাঁড়ানোর এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। তিনি বর্তমানে তাঁর স্ত্রী মোছা: মার্জিয়া খাতুন ও একমাত্র সন্তান মো: আবরার হোসাইনকে নিয়ে এক ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। পরিবার থেকে বঞ্চিত হলেও নতুন এই ছোট্ট পরিবারেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন ভালোবাসা, আশ্রয় ও জীবনের অর্থ।
সংগ্রামী জীবন ও রাজনৈতিক সচেতনতা
মো: হুজাইফা ইসলাম স্বপনের সংগ্রামী জীবনের প্রকৃত সূচনা ঘটে যখন তিনি ছাত্র—জনতার ন্যায্য অধিকারের দাবিতে জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। একজন নও মুসলিম হিসেবে তিনি যেমন নিজের বিশ্বাস রক্ষায় দৃঢ় থেকেছেন, তেমনি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। তার সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও দৃঢ়চেতা মানসিকতা যেন সময়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক বজ্রকঠিন ব্যারিকেড। তিনি প্রমাণ করেছেন, বিপ্লবের বীজ কখনো জন্মসূত্রে আসে না, বরং তা জন্ম নেয় অন্তরের সাহসে, বিশ্বাসে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার দায়বোধে।
মো: হুজাইফা ইসলাম স্বপনের জীবনগাথা কেবল একটি জীবনের গল্প নয়; এ এক আত্মত্যাগ ও আদর্শে গঠিত আলোকিত চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। তাঁর মতো একজন তরুণ যিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, অথচ জাতির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আপসহীন, তিনি নিঃসন্দেহে হয়ে উঠতে পারেন আগামী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। তার জীবন যেন উচ্চারণ করে: “সাহসিকতা কোনো বংশে জন্ম নেয় না, জন্ম নেয় হৃদয়ে।”
বিপ্লবী জুলাই যোদ্ধার মুখে শুনুন
আমি হুজাইফা ইসলাম স্বপন। বয়স ২৮। আমি ঠাকুরগাঁও শহরের মানুষ। এই শহরটা আমার চোখের সামনে বারবার বৈষম্যের দৃশ্য দেখেছে। ধনী—গরিবের ব্যবধান, ক্ষমতাসীনদের অত্যাচার আর সাধারণ মানুষের নীরব কান্না; সব কিছুই দেখেছি আমি এই শহরে বড় হতে হতে। আমি আর চুপ থাকতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম বৈষম্যহীন এক বাংলাদেশ। যেখানে আমার ছেলে মো: আবরার হোসাইন বেড়ে উঠবে মাথা উঁচু করে, যেখানে কোনো শিশুর চোখে থাকবে না ভয়। তাই যখন ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশ জুড়ে ছাত্র—জনতার ন্যায্য অধিকারের আন্দোলন শুরু হয়, আমি দ্বিধা করিনি। আমি উঠে দাঁড়িয়েছিলাম; আমার স্ত্রী মোছা: মার্জিয়াকে পাশে রেখে এবং আমার সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তা করে। আমি জানতাম, আমি ঝুঁকি নিচ্ছি। কিন্তু দেশের স্বার্থ, জাতির অধিকার; এসবই আমার কাছে সবচেয়ে বড় ছিল।
৪ আগস্ট ২০২৪। সে দিনটি আমার জীবনে আগুন হয়ে ফিরে আসে বারবার। আমি চৌরাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম অন্য সহযোদ্ধাদের সাথে। হাতগুলো ছিল শূন্যে তুলে ধরা, গলায় ছিল স্বাধীনতার শ্লোগান। হঠাৎ কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই গর্জে উঠলো অস্ত্র। আমার মনে আছে, মাথায় গুলি লাগার পর চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছিল! চোখ ঝাপসা হচ্ছিল। শরীরের ভেতর আগুনের মতো জ্বালা করছিল। পুলিশ গুলি করেছিল মাথা, চোখ, শরীর; কিছুই বাদ দেয়নি। আমি পড়ে যাই রক্তাক্ত অবস্থায়। চারপাশে চিৎকার, কান্না, আর সহযোদ্ধাদের আর্তনাদ, মনে হচ্ছিল যেন মৃত্যুই চারদিক থেকে আমাকে টেনে নিচ্ছে। সেই অবস্থায় আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তখনও আমি বুঝতে পারছিলাম না, বেঁচে থাকবো কি না। কিন্তু আমার অন্তর একটিবারও পিছপা হয়নি। আমি তখনও ভাবছিলাম; এই রক্ত যদি নতুন দিনের বীজ হয়ে ওঠে, যদি এই রক্তে জন্ম নেয় একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র,তবে এ রক্ত বৃথা যাবে না।
আমি হিন্দু পরিবার থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমার পরিবার আমাকে ত্যাগ করেছে, কিন্তু আমি সত্যকে ত্যাগ করিনি। আমি জানি, যে পথে আমি পা বাড়িয়েছি তা কণ্টকাকীর্ণ। কিন্তু আমার বিশ্বাস, যারা সত্যিকারের মানুষ, তারা কখনও পিছু হটে না। আজ আমি বেঁচে আছি; আশ্চর্য এক অলৌকিকতার সাক্ষ্য হিসেবে। আমার শরীর গুলিবিদ্ধ, কিন্তু হৃদয় অটুট। আমি স্বপ্ন দেখি এখনও, একটি বাংলাদেশ, যেখানে বিচার হবে সত্যের, যেখানে সন্তানেরা নির্ভয়ে রাস্তায় হাঁটবে, যেখানে একজন সাধারণ কৃষকের ছেলেও রাষ্ট্রের মালিকানা দাবি করতে পারবে। আমার এই পথচলা, আমার এই রক্ত, কোনো একদিন আলো হয়ে জ্বলবে ভবিষ্যতের পথে।
“আমি রক্ত দিয়েছি, কারণ আমি ভালোবাসি এই মাটিকে-এই মাটি যেন কারো দাসত্বে না থাকে, এই জাতি যেন নিজের ভাগ্য নিজেই লিখতে পারে।” মো: হুজাইফা ইসলাম স্বপন
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
যে গুলির ছোবলও আমার আদর্শকে পরাজিত করতে পারেনি, সে ব্যথা আজ আমার অহংকার!
৪ আগস্টের সেই বিভীষিকাময় দুপুরটা আজও চোখে ভাসে। আমি ঠাকুরগাঁও শহরের চৌরাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম। হাজারো ছাত্র—জনতার কাতারে, ন্যায্য অধিকার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে। হঠাৎ গুলির শব্দ; মুহূর্তেই শরীর ছিঁড়ে ঢুকে পড়ে লোহার বুলেট। মাথা, কাঁধ, বুক; আমি ঠিক বুঝতেই পারছিলাম না, কেনো দিক থেকে কে আমার শরীর ভেদ করছে। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, রক্তে ভিজে যায় জামা। চোখ ঘোলা হয়ে আসে, মনে হচ্ছিল এখানেই বুঝি শেষ...কিন্তু না, আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা তখনও আমাকে ধরে রেখেছিল। কেউ আমার মাথার নিচে হাত দিয়েছে, কেউ আবার ‘ভাই, কিছু হবে না’ বলে আমার বুকের উপর গুলি থামানোর চেষ্টা করছে। সেদিন তারা দেরি না করে আমাকে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পেঁৗছানোর পর আমি আধা অচেতন অবস্থায় ছিলাম। ডাক্তাররা দ্রুত আমার মাথা ও শরীর স্ক্যান করে দেখেন; একাধিক স্থানে গুলি ঢুকে গেছে।
কয়েকটি বুলেট বের করা হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। মাথার এক পাশে গভীর ক্ষত ছিল, সেখান থেকে বের করা হয় একটি গুলি। আমার কাঁধ ও বুক থেকেও অপারেশনের মাধ্যমে বের করে নেয়া হয় আরও কয়েকটি ধাতব খণ্ড। কিন্তু চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন সব গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। শরীরের গভীরে রয়ে গেছে কিছু বুলেটের টুকরো, যা এখনও আমার দেহে বয়ে বেড়াচ্ছি। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আমাকে স্থানান্তর করা হয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানে আরও পর্যবেক্ষণ চলে, ইনফেকশন ঠেকাতে দেয়া হয় ইনজেকশন, চলে ফিজিওথেরাপিও। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, এমন আঘাত থেকে বেঁচে ফেরা একপ্রকার অলৌকিকই। আমি আজও প্রতিদিন অনুভব করি সেই যন্ত্রণার স্মৃতি। ঘুমের মাঝে জেগে উঠি মাথার ব্যথায়। কাঁধের ভারী জ্বালায় কুঁকড়ে যাই। কিন্তু এসব ব্যথা আমার কাছে কোনো দুর্ভোগ নয়; বরং এ যেন স্বাধীনতা আর প্রতিবাদের এক জীবন্ত প্রমাণ। আমি বেঁচে আছি এই ব্যথা বয়ে, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বলতে পারি, এই মাটির জন্য, এই অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের জন্য আমি গুলি খেয়েছি। আমি ভয় পাইনি, মাথা নিচু করিনি।
আমার শরীরে রয়ে যাওয়া প্রতিটি গুলি যেন সাক্ষ্য দেয় বীর কখনো ঝুঁকি এড়িয়ে বাঁচে না, সে ঝুঁকি নিয়ে সত্যকে জাগিয়ে তোলে।”
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণচিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: হুজাইফা ইসলাম স্বপন
জন্ম তারিখ: ০১ জানুয়ারি ১৯৯৭
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : কৃষক
নিজ জেলা : শেরপুর
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: সেনপাড়া, ইউনিয়ন/পৌরসভা: সালন্দর, থানা: ঠাকুরগাঁও, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : নরেন সেন
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৬৫
মায়ের নাম : অনদিনী সেন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫৫
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
বাড়ী : নও মুসলিম হওয়ায় বাড়িতে জায়গা দেয়নি, ভাড়া বাসায় থাকেন
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
পারিবারিক তথ্য
১. মোছা: মার্জিয়া খাতুন, বয়স: ২০, সম্পর্ক: স্ত্রী
২. মো: আবরার হোসাইন, বয়স: ২.৫ বছর, সম্পর্ক: ছেলে
আহত হওয়ার স্থান ও সময় : চৌরাস্তায়, ঠাকুরগাঁও, ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২.৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী ও আওয়ামী মদদপুষ্ট পুলিশ
তাঁর পিতা নরেন সেন, একজন পরিশ্রমী কৃষক, যিনি নিঃস্বভাবে হলেও সততা ও শ্রমে গড়ে তুলেছিলেন জীবনের ভিত্। তাঁর মা অনদিলী সেন ছিলেন একজন স্নেহময়ী গৃহিণী, যিনি নিরবচ্ছিন্ন ভালোবাসা আর আদরের পরশে সন্তানদের প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়েছেন। কিন্তু জীবন সর্বদা সরলরেখায় চলে না। ধর্মান্তরের পর থেকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরে। হুজাইফা হয়ে ওঠেন একা, অথচ অন্তরে আগুন জ্বালানো এক সাহসী পথিক।
কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবন
একজন কৃষক হিসেবেই হুজাইফা ইসলাম স্বপনের পরিচয় গড়ে ওঠে; শ্রমজীবী মানুষের প্রতিচ্ছবি হয়ে। ঘাম ঝরিয়ে রোজগার করা মানুষটি শুধুমাত্র নিজের পরিবারের অন্ন জোগান দেননি, বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে রুখে দাঁড়ানোর এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। তিনি বর্তমানে তাঁর স্ত্রী মোছা: মার্জিয়া খাতুন ও একমাত্র সন্তান মো: আবরার হোসাইনকে নিয়ে এক ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। পরিবার থেকে বঞ্চিত হলেও নতুন এই ছোট্ট পরিবারেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন ভালোবাসা, আশ্রয় ও জীবনের অর্থ।
সংগ্রামী জীবন ও রাজনৈতিক সচেতনতা
মো: হুজাইফা ইসলাম স্বপনের সংগ্রামী জীবনের প্রকৃত সূচনা ঘটে যখন তিনি ছাত্র—জনতার ন্যায্য অধিকারের দাবিতে জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। একজন নও মুসলিম হিসেবে তিনি যেমন নিজের বিশ্বাস রক্ষায় দৃঢ় থেকেছেন, তেমনি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। তার সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও দৃঢ়চেতা মানসিকতা যেন সময়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক বজ্রকঠিন ব্যারিকেড। তিনি প্রমাণ করেছেন, বিপ্লবের বীজ কখনো জন্মসূত্রে আসে না, বরং তা জন্ম নেয় অন্তরের সাহসে, বিশ্বাসে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার দায়বোধে।
মো: হুজাইফা ইসলাম স্বপনের জীবনগাথা কেবল একটি জীবনের গল্প নয়; এ এক আত্মত্যাগ ও আদর্শে গঠিত আলোকিত চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। তাঁর মতো একজন তরুণ যিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, অথচ জাতির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আপসহীন, তিনি নিঃসন্দেহে হয়ে উঠতে পারেন আগামী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। তার জীবন যেন উচ্চারণ করে: “সাহসিকতা কোনো বংশে জন্ম নেয় না, জন্ম নেয় হৃদয়ে।”
বিপ্লবী জুলাই যোদ্ধার মুখে শুনুন
আমি হুজাইফা ইসলাম স্বপন। বয়স ২৮। আমি ঠাকুরগাঁও শহরের মানুষ। এই শহরটা আমার চোখের সামনে বারবার বৈষম্যের দৃশ্য দেখেছে। ধনী—গরিবের ব্যবধান, ক্ষমতাসীনদের অত্যাচার আর সাধারণ মানুষের নীরব কান্না; সব কিছুই দেখেছি আমি এই শহরে বড় হতে হতে। আমি আর চুপ থাকতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম বৈষম্যহীন এক বাংলাদেশ। যেখানে আমার ছেলে মো: আবরার হোসাইন বেড়ে উঠবে মাথা উঁচু করে, যেখানে কোনো শিশুর চোখে থাকবে না ভয়। তাই যখন ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশ জুড়ে ছাত্র—জনতার ন্যায্য অধিকারের আন্দোলন শুরু হয়, আমি দ্বিধা করিনি। আমি উঠে দাঁড়িয়েছিলাম; আমার স্ত্রী মোছা: মার্জিয়াকে পাশে রেখে এবং আমার সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তা করে। আমি জানতাম, আমি ঝুঁকি নিচ্ছি। কিন্তু দেশের স্বার্থ, জাতির অধিকার; এসবই আমার কাছে সবচেয়ে বড় ছিল।
৪ আগস্ট ২০২৪। সে দিনটি আমার জীবনে আগুন হয়ে ফিরে আসে বারবার। আমি চৌরাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম অন্য সহযোদ্ধাদের সাথে। হাতগুলো ছিল শূন্যে তুলে ধরা, গলায় ছিল স্বাধীনতার শ্লোগান। হঠাৎ কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই গর্জে উঠলো অস্ত্র। আমার মনে আছে, মাথায় গুলি লাগার পর চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছিল! চোখ ঝাপসা হচ্ছিল। শরীরের ভেতর আগুনের মতো জ্বালা করছিল। পুলিশ গুলি করেছিল মাথা, চোখ, শরীর; কিছুই বাদ দেয়নি। আমি পড়ে যাই রক্তাক্ত অবস্থায়। চারপাশে চিৎকার, কান্না, আর সহযোদ্ধাদের আর্তনাদ, মনে হচ্ছিল যেন মৃত্যুই চারদিক থেকে আমাকে টেনে নিচ্ছে। সেই অবস্থায় আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তখনও আমি বুঝতে পারছিলাম না, বেঁচে থাকবো কি না। কিন্তু আমার অন্তর একটিবারও পিছপা হয়নি। আমি তখনও ভাবছিলাম; এই রক্ত যদি নতুন দিনের বীজ হয়ে ওঠে, যদি এই রক্তে জন্ম নেয় একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র,তবে এ রক্ত বৃথা যাবে না।
আমি হিন্দু পরিবার থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমার পরিবার আমাকে ত্যাগ করেছে, কিন্তু আমি সত্যকে ত্যাগ করিনি। আমি জানি, যে পথে আমি পা বাড়িয়েছি তা কণ্টকাকীর্ণ। কিন্তু আমার বিশ্বাস, যারা সত্যিকারের মানুষ, তারা কখনও পিছু হটে না। আজ আমি বেঁচে আছি; আশ্চর্য এক অলৌকিকতার সাক্ষ্য হিসেবে। আমার শরীর গুলিবিদ্ধ, কিন্তু হৃদয় অটুট। আমি স্বপ্ন দেখি এখনও, একটি বাংলাদেশ, যেখানে বিচার হবে সত্যের, যেখানে সন্তানেরা নির্ভয়ে রাস্তায় হাঁটবে, যেখানে একজন সাধারণ কৃষকের ছেলেও রাষ্ট্রের মালিকানা দাবি করতে পারবে। আমার এই পথচলা, আমার এই রক্ত, কোনো একদিন আলো হয়ে জ্বলবে ভবিষ্যতের পথে।
“আমি রক্ত দিয়েছি, কারণ আমি ভালোবাসি এই মাটিকে-এই মাটি যেন কারো দাসত্বে না থাকে, এই জাতি যেন নিজের ভাগ্য নিজেই লিখতে পারে।” মো: হুজাইফা ইসলাম স্বপন
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
যে গুলির ছোবলও আমার আদর্শকে পরাজিত করতে পারেনি, সে ব্যথা আজ আমার অহংকার!
৪ আগস্টের সেই বিভীষিকাময় দুপুরটা আজও চোখে ভাসে। আমি ঠাকুরগাঁও শহরের চৌরাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম। হাজারো ছাত্র—জনতার কাতারে, ন্যায্য অধিকার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে। হঠাৎ গুলির শব্দ; মুহূর্তেই শরীর ছিঁড়ে ঢুকে পড়ে লোহার বুলেট। মাথা, কাঁধ, বুক; আমি ঠিক বুঝতেই পারছিলাম না, কেনো দিক থেকে কে আমার শরীর ভেদ করছে। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, রক্তে ভিজে যায় জামা। চোখ ঘোলা হয়ে আসে, মনে হচ্ছিল এখানেই বুঝি শেষ...কিন্তু না, আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা তখনও আমাকে ধরে রেখেছিল। কেউ আমার মাথার নিচে হাত দিয়েছে, কেউ আবার ‘ভাই, কিছু হবে না’ বলে আমার বুকের উপর গুলি থামানোর চেষ্টা করছে। সেদিন তারা দেরি না করে আমাকে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পেঁৗছানোর পর আমি আধা অচেতন অবস্থায় ছিলাম। ডাক্তাররা দ্রুত আমার মাথা ও শরীর স্ক্যান করে দেখেন; একাধিক স্থানে গুলি ঢুকে গেছে।
কয়েকটি বুলেট বের করা হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। মাথার এক পাশে গভীর ক্ষত ছিল, সেখান থেকে বের করা হয় একটি গুলি। আমার কাঁধ ও বুক থেকেও অপারেশনের মাধ্যমে বের করে নেয়া হয় আরও কয়েকটি ধাতব খণ্ড। কিন্তু চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন সব গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। শরীরের গভীরে রয়ে গেছে কিছু বুলেটের টুকরো, যা এখনও আমার দেহে বয়ে বেড়াচ্ছি। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আমাকে স্থানান্তর করা হয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানে আরও পর্যবেক্ষণ চলে, ইনফেকশন ঠেকাতে দেয়া হয় ইনজেকশন, চলে ফিজিওথেরাপিও। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, এমন আঘাত থেকে বেঁচে ফেরা একপ্রকার অলৌকিকই। আমি আজও প্রতিদিন অনুভব করি সেই যন্ত্রণার স্মৃতি। ঘুমের মাঝে জেগে উঠি মাথার ব্যথায়। কাঁধের ভারী জ্বালায় কুঁকড়ে যাই। কিন্তু এসব ব্যথা আমার কাছে কোনো দুর্ভোগ নয়; বরং এ যেন স্বাধীনতা আর প্রতিবাদের এক জীবন্ত প্রমাণ। আমি বেঁচে আছি এই ব্যথা বয়ে, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বলতে পারি, এই মাটির জন্য, এই অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের জন্য আমি গুলি খেয়েছি। আমি ভয় পাইনি, মাথা নিচু করিনি।
আমার শরীরে রয়ে যাওয়া প্রতিটি গুলি যেন সাক্ষ্য দেয় বীর কখনো ঝুঁকি এড়িয়ে বাঁচে না, সে ঝুঁকি নিয়ে সত্যকে জাগিয়ে তোলে।”
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণচিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: হুজাইফা ইসলাম স্বপন
জন্ম তারিখ: ০১ জানুয়ারি ১৯৯৭
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : কৃষক
নিজ জেলা : শেরপুর
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: সেনপাড়া, ইউনিয়ন/পৌরসভা: সালন্দর, থানা: ঠাকুরগাঁও, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : নরেন সেন
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৬৫
মায়ের নাম : অনদিনী সেন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫৫
পারিবারিক অবস্থা : নিম্ন মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ১০,০০০
আয়ের উৎস : কৃষি
বাড়ী : নও মুসলিম হওয়ায় বাড়িতে জায়গা দেয়নি, ভাড়া বাসায় থাকেন
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
পারিবারিক তথ্য
১. মোছা: মার্জিয়া খাতুন, বয়স: ২০, সম্পর্ক: স্ত্রী
২. মো: আবরার হোসাইন, বয়স: ২.৫ বছর, সম্পর্ক: ছেলে
আহত হওয়ার স্থান ও সময় : চৌরাস্তায়, ঠাকুরগাঁও, ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২.৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী ও আওয়ামী মদদপুষ্ট পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍