হোম / আহতদের তালিকা / মো: রিদওয়ান ওয়ালীদ নোমান
মো: রিদওয়ান ওয়ালীদ নোমান

মো: রিদওয়ান ওয়ালীদ নোমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো: রিদওয়ান ওয়ালীদ নোমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু একজন শিক্ষার্থী। তার জন্ম ২০০৪ সালের ২৮ নভেম্বর ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার বেগুনবাড়ী ইউনিয়নের হঠাৎপাড়া গ্রামে। সে বর্তমানে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। রিদওয়ানের পিতা রেজাউল করিম ইতোমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন। তার মা নাসরিন আক্তার একজন গৃহিণী। রিদওয়ানের পরিবারের সদস্য সংখ্যা মাত্র তিনজন। ছোট ভাই নাহিদ রেজা বর্তমানে বেগুনবাড়ী আদর্শ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় তাদের সংসার চলে চাচাদের আর্থিক সহায়তার উপর নির্ভর করে। নিজে কোনো আয় না করলেও রিদওয়ান নিয়মিত পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রাম করছে। তার জীবনযাপন অত্যন্ত সাধারণ ও সীমাবদ্ধতায় ঘেরা হলেও শিক্ষা অর্জনের জন্য তার মনোবল দৃঢ়। বাবাহীন এই পরিবারের ওপর জীবনের নানা সংকট এসে পড়লেও রিদওয়ান ও তার পরিবার আত্মসম্মান নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। রিদওয়ানের এই সংগ্রামী জীবনের পেছনে রয়েছে এক অনুচ্চারিত প্রত্যয়, শিক্ষার মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা। সমাজের এমন বহু তরুণের মতো সেও একদিন নিজ প্রচেষ্টায় পরিবারের অভাব—অনটনের শৃঙ্খল ছিন্ন করে আলোর পথে এগিয়ে যেতে চায়। তার এই পথচলায় সমাজের সহানুভূতি ও সহায়তা খুবই প্রয়োজন।
আন্দোলনে যোগদান
মো: রিদওয়ান ওয়ালীদ নোমান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একজন সাহসী ও সক্রিয় কর্মী। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী। দেশের চলমান বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও সাধারণ জনগণ যখন রাস্তায় নেমে আসে, তখন রিদওয়ানও যুক্ত হয় এই ন্যায়ের সংগ্রামে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসজুড়ে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় সে নিয়মিত আন্দোলনে অংশ নেয়। বিশেষ করে ৪ আগস্ট ২০২৪ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্মান্তিক এক দিন। সে দিন রিদওয়ান অন্যান্য সহপাঠী ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ের চৌরাস্তায় অবস্থান করছিলেন। সরকারবিরোধী মিছিল চলাকালে পুলিশ হঠাৎই গুলি চালায় এবং ছাত্র—জনতার ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। চৌরাস্তাটি মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। রাবার বুলেট, ছররা গুলি ও লাঠিচার্জে বহু মানুষ আহত হন, অনেকে জীবন হারান। এই হামলার সময় রিদওয়ান ওয়ালীদ নোমান নিজেও পুলিশের রাবার বুলেটে আহত হন। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। তার সহযোদ্ধারা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ ও গ্রেফতার আতংকে হাসপাতালে সেদিন তার জন্য কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাবঞ্চিত এই তরুণ আন্দোলনকারীকে শেষ পর্যন্ত নিজ উদ্যোগে ও পরিবারের সহায়তায় চিকিৎসা করাতে হয়। রিদওয়ানের এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ক্ষত নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতিচ্ছবি। তিনি একজন স্বপ্নবান তরুণ, যিনি সমাজে ন্যায়বিচার ও সমতার জন্য পথে নেমেছিলেন। আজ সে তরুণকে শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মনোবেদনারও শিকার হতে হয়েছে। তার এ সাহসিকতা ও ত্যাগ তরুণ সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও গুম : গণতন্ত্রের জন্য হুমকি
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা শাসনামলে যে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং গুমের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য ভয়াবহ হুমকিতে পরিণত হয়েছিল। বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, আন্দোলন দমন, এবং ভিন্নমতের মানুষকে গুম করে দেয়ার যে প্রবণতা তা এক গভীর শঙ্কায় ফেলেছিল বাংলাদেশকে। ২০০৯ সালের পর থেকে বহু রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক এবং এমনকি সাধারণ নাগরিকও নিখেঁাজ হয়েছেন, যাদের অনেকে আর ফেরেননি। তাদের পরিবারের আর্তনাদ, দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা, আর ন্যায়বিচারের আকুতি বারবার চাপা পড়ে গেছে ক্ষমতার অন্ধকার রাজনীতিতে। র‍্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে গুমে জড়িত থাকার অভিযোগ বহুবার উঠলেও তার বিচার এখনো হয়নি।
রাষ্ট্রের এই নিপীড়ন শুধু গুমেই সীমাবদ্ধ ছিল না, আটক, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, পুলিশী হেফাজতে মৃত্যু, এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডেও ব্যাপক হারে আওয়ামী প্রশাসন জড়িত ছিল। রাজনৈতিক আন্দোলন, মানববন্ধন কিংবা সামাজিক প্রতিবাদকে দমন করতে ক্ষমতাসীন সরকার প্রশাসন ও দলীয় বাহিনীকে একযোগে ব্যবহার করেছে আওয়ামী লীগ। এতে করে জনগণের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুবার বাংলাদেশে গুমের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞাও এসেছে র‍্যাব কর্মকর্তাদের ওপর। কিন্তু সরকার এসব অভিযোগকে অস্বীকার করেছে এবং তথ্য উন্মোচনকে দেশবিরোধী কাজ হিসেবে দেখিয়েছে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হচ্ছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার। কিন্তু আওয়ামী লীগের অধীনে বাংলাদেশ যেন একটি ভয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে ভিন্নমত মানেই ছিল স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার আর তাদের জন্য থাকতো হয়রানি কিংবা নিখেঁাজ হওয়ার শঙ্কা। এই ভয়াবহ বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্যই রেদওয়ানদের মতো শিক্ষার্থীরা জুলাইয়ে বুক উঁচু করে পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিল। হাজার হাজার শহীদ আর আহত শিক্ষার্থী ও জনতার রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন করে আওয়ামী লীগের ভয়াল ফ্যাসিবাদ থেকে। ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই শিক্ষার্থীরা জুলাই আন্দোলনে শরীক হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে নতুন আলোকিত বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: রিদওয়ান ওয়ালীদ নোমান
জন্ম তারিখ : ২৮—১১—২০০৪
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : শিক্ষার্থী
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: হঠাৎপাড়া, ইউনিয়ন: বেগুনবাড়ী, থানা: সদর ঠাকুরগাঁও, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত মো: রেজাউল করিম
মায়ের নাম : মোছা: নাসরিন আক্তার, পেশা: গৃহিণী
আয়ের উৎস : (চাচাদের আর্থিক সহায়তা)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ০৩ জন
ভাই—বোনদের বিবরণ
১. নাহিদ রেজা, বয়স: ১৪, পেশা: শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠান: বেগুনবাড়ি আদর্শ বিদ্যালয়, শ্রেণী: ৯ম, সম্পর্ক: ভাই
আহত হওয়ার স্থান : চৌরাস্তা, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. শিক্ষাবৃত্তি ও আর্থিক অনুদান
২. স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা
৩. বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কার্ড চালু
৪. রেশন কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তভুর্ক্তকরণ
৫. ঘর নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍