আল আমিন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শিক্ষার্থী (মাস্টার্স)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
সবুজের মাঝে বেড়ে ওঠা
নীলফামারীর তহশীলদাপাড়া গ্রামের একটি ছোট্ট ঘরে ২০০০ সালের ৭ জুন জন্ম নেয় এক শিশু। নাম রাখা হয় আল আমিন। ছোটবেলা থেকেই তার চোখ ছিল দীপ্ত, কৌতূহলী ও স্বপ্নময়। গ্রামটির চারপাশ জুড়ে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে, সরষে ফুলের হাসি, আর দূরে দেখা মেলে তিস্তা নদীর শান্ত প্রবাহ। সেই নদী যেন ছিল তার শৈশবের সাথী, যার ক‚লে বসে সে স্বপ্ন দেখত শহরের আলো ছোঁয়ার। পিতা নুরুল ইসলাম একজন কৃষক। প্রতিদিন সকালে হাল ধরে মাঠে ছুটে যেতেন, আর মা ফুলো বেগম সংসার সামলাতেন নিঃশব্দ এক সংগ্রামী নারী হিসেবে। ছয় সদস্যের পরিবার দুই বোন, এক ভাই, আর মা-বাবার মাঝে আল আমিন ছিল আশার প্রদীপ। বড় বোন নুরনাহার বিবাহিত, ছোট বোন নুরানী-ও সংসারী হয়ে উঠেছে। কিন্তু ভাই ফারুক জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে অক্ষম। যার জীবনের অক্ষমতা যেন পুরো পরিবারকে এক অদৃশ্য শূন্যতায় আটকে রেখেছিল। তবু সবুজ প্রকৃতির কোলে, খোলা আকাশের নিচে, আল আমিন বড় হয়েছে বইয়ের গন্ধ আর মায়ের দোয়ার মাঝে। ছোট স্কুলের টিনের চালার নিচে বসে সে শেখে কীভাবে মানুষ হতে হয়। গরিব ঘরের ছেলে হয়েও তার চোখে ছিল বিশাল পৃথিবী।
স্বপ্নের শহরে সংগ্রাম
এইচএসসি পাশ করে আল আমিন ভর্তি হয় গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। শহরের বিশালতা আর ব্যস্ততার মাঝে প্রথমদিকে নিজেকে হারিয়ে ফেললেও সে ফিরে আসে নিজের লক্ষ্য নিয়ে। বর্তমানে সে মাস্টার্স করছে সেখান থেকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে দেশ, সমাজ ও মানুষের অধিকার নিয়ে তার ভাবনা আরও গভীর হয়ে ওঠে। কিন্তু উচ্চশিক্ষা তো শুধু ক্লাসের ভেতরে শেষ হয় না। সংসারের দায় তার কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিদিন। বাবা ফসল ফলান কষ্ট করে, কিন্তু সেই ফসলে আর সংসারের চাহিদা মেলে না। মায়ের মুখের চিন্তা, ভাইয়ের নিরবতা আর বোনদের ভবিষ্যতের অজানা পথ তাকে ভিতরে ভিতরে পুড়িয়ে দিত। এজন্যই সে কলেজে পড়ার পাশাপাশি একটা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে সিসিটিভি অপারেটর হিসেবে পার্ট-টাইম কাজ নেয়। সারাদিন কাজ করে সে মাস শেষে যে অল্প কিছু টাকা পেত, তা দিয়েই চালাতে হতো সংসার। কখনো হয়তো রাতের খাবারে শুধু ডাল-ভাত, তবুও তিনি কোনোদিন হাঁপিয়ে পড়েনি। কারণ সে জানত শিক্ষাই মুক্তির একমাত্র পথ।
ন্যায়ের পক্ষে পথে নামা
২০১৮ সালে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, তখনও আল আমিন ছাত্র হলেও সরাসরি জড়িত ছিল না। তবে সেই সময় ছাত্রদের যে স্পষ্ট বার্তা ছিল ন্যায়বিচার চাই, সেটি তার মনে গেঁথে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সরকারের প্রতিশ্রুতি ফিকে হয়ে যায়, আর সংস্কারের নামে হয় প্রহসন। স্থায়ী সমাধানের বদলে সরকার ছাত্রদের দাবি উপেক্ষা করে। আর তাই, ২০২৪ সালে সেই পুরোনো দাবিকে ঘিরেই আবার ফুঁসে ওঠে ছাত্রসমাজ। এবার আন্দোলন আরও ব্যাপক, আরও সুসংগঠিত। শিক্ষার্থীরা শুধু কোটা নয়, চেয়েছিল মর্যাদা, সমতা ও স্বচ্ছতা। গাজীপুর, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে ছাত্ররা রাস্তায় নামে। কিন্তু সরকার বুঝিয়ে দেয় তাদের দৃষ্টি জনগণের ন্যায্য দাবির দিকে নয়, বরং তা কিভাবে দমন করা যায়।
আওয়ামী সরকার পুলিশের লাঠি, রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস, এমনকি সন্ত্রাসী বাহিনীর সহায়তায় আন্দোলনকারীদের রক্তে রাজপথ রাঙিয়ে দেয়। গ্রেফতার, গুম, নির্যাতন যেন ছাত্রদের অপরাধ ছিল কেবল কথা বলা, প্রতিবাদ জানানো। এই নিষ্ঠুরতা দেখে ঘরে বসে থাকতে পারেনি আল আমিন।
রক্তাক্ত ৫ আগস্ট
৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২টা। গাজীপুরের সফিপুর এলাকায় হাজারো ছাত্র-জনতা জমায়েত হয়। তাদের সাথে যোগ দেয় গার্মেন্টস শ্রমিক, ভ্যানচালক, রিকশাওয়ালা, এমনকি অভিভাবকরাও। আন্দোলন হয়ে উঠে গণমানুষের আন্দোলন। সেই মুহূর্তে, শাসকগোষ্ঠী দেখিয়ে দেয় তাদের নির্মম চেহারা। সৈরাচারী সরকারের পুলিশ আনসার বাহিনী এবং আওয়ামী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা দেশী বিদেশী অস্ত্র নিয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে।একদিকে ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করতেছিল। তারা ছিল নিরস্ত্র। কিন্তু এই ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনেই শুরু হয় গুলি, ধাওয়া, লাঠিপেটা, গুম ও নির্যাতনের ধারাবাহিক বর্বরতা। আল আমিন সেই দিন নিজ চোখে দেখেন তার সহযোদ্ধাদের রক্তাক্ত শরীর। গুলিবিদ্ধ বন্ধুদের চিৎকারে কেঁপে ওঠে তার হৃদয়। সে নিজেও রক্ষা পায় না। পুলিশ ও আনসার বাহিনীর উপুর্যুপরি চালানো গুলিতে তার শরীরে ঢুকে পড়ে প্রায় ২০০টির মতো ছোড়া গুলি। শরীর রক্তে ভেসে যায়, তার জামা রক্তে লাল হয়ে জায়।সেই মুহূর্তটা ছিল তার জন্য খুবই ভয়ংকর। তিনি কিছুই বুঝতে পারছিলেন না কোন দিকে যাবেন। ধীরে ধীরে তার শরীর মিশতে শুয়ে পড়ে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে শুধু শুনতে পায় কিছু কণ্ঠস্বর, ওকে তাড়াতাড়ি তুলো! হাসপাতালে নিয়ে যাও! সেখান থেকে আন্দোলনকারী ছাত্ররাই তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
এক জীবন্ত শহীদের যন্ত্রণা
কালিয়াকোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ প্রায় দুই দিন ছিলেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি নিজ বাসস্থান নীলফামারীতে চলে যান। ভর্তি হন নীলফামারী সদর হাসপাতালে। কিন্তু অবস্থা ছিল শোচনীয় চিকিৎসকেরাও বিস্মিত হয় তার শরীরে থাকা বিপুল সংখ্যক গুলি দেখে। সেখান থেকে পাঠানো হয় রংপুর সিএমএইচ-এ, এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অপারেশন হলেও তার শরীরে এখনও প্রায় ১৫০টির মতো ছোড়া গুলি রয়ে গেছে। প্রতিটি রাত এখন তার জন্য আতঙ্ক। শরীরটা যেন ঘুমাতে জানে না কেবল কাঁপে, কাঁদে, ব্যথায় ছটফট করে। কিন্তু এই যন্ত্রণা তাকে দুর্বল করেনি। বরং সে বিশ্বাস করে আমার শরীরে গুলি আছে, কিন্তু হৃদয়ে আছে সাহস। সে আজও বেঁচে আছে, রক্তের বিনিময়ে দেশের গণতন্ত্র, শিক্ষা, অধিকার ও সমতার লড়াইয়ের এক জীবন্ত ইতিহাস হয়ে। আল আমিন এখন শুধু একজন আহত ছাত্র নন একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি, যে বুক পেতে দিয়েছিল ন্যায়ের সংগ্রামে। তার শরীরে গেঁথে থাকা প্রতিটি গুলি, যেন রাষ্ট্রের জুলুমের সাক্ষ্য, আবার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, আগামী প্রজন্মের প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আল আমিন
জন্ম তারিখ : ৭ জুন ২০০০
জন্মস্থান : নীলফামারী
পেশা : শিক্ষার্থী (মাস্টার্স)
প্রতিষ্ঠান : ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ
নিজ জেলা : নীলফামারী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: তহশীলদাপাড়া, ইউনিয়ন: ৫নং ধমপাল, থানা: জলঢাকা, জেলা: নীলফামারী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : নুরুল ইসলাম
মায়ের নাম : ফুলো বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. নুরনাহার, বয়স: ৩০, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
২. ফারুক, বয়স: ২৬, প্রতিবন্ধী, সম্পর্ক: ভাই
৩. নুরানী, বয়স: ২০, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : শফিপুর, গাজিপুর
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২টা
আক্রমণকারী : আনসার বাহিনী
চিকিৎসার প্রস্তাবনা : উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে বাকিগুলি গুলো বের করার ব্যবস্থা করা
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়া
নীলফামারীর তহশীলদাপাড়া গ্রামের একটি ছোট্ট ঘরে ২০০০ সালের ৭ জুন জন্ম নেয় এক শিশু। নাম রাখা হয় আল আমিন। ছোটবেলা থেকেই তার চোখ ছিল দীপ্ত, কৌতূহলী ও স্বপ্নময়। গ্রামটির চারপাশ জুড়ে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে, সরষে ফুলের হাসি, আর দূরে দেখা মেলে তিস্তা নদীর শান্ত প্রবাহ। সেই নদী যেন ছিল তার শৈশবের সাথী, যার ক‚লে বসে সে স্বপ্ন দেখত শহরের আলো ছোঁয়ার। পিতা নুরুল ইসলাম একজন কৃষক। প্রতিদিন সকালে হাল ধরে মাঠে ছুটে যেতেন, আর মা ফুলো বেগম সংসার সামলাতেন নিঃশব্দ এক সংগ্রামী নারী হিসেবে। ছয় সদস্যের পরিবার দুই বোন, এক ভাই, আর মা-বাবার মাঝে আল আমিন ছিল আশার প্রদীপ। বড় বোন নুরনাহার বিবাহিত, ছোট বোন নুরানী-ও সংসারী হয়ে উঠেছে। কিন্তু ভাই ফারুক জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে অক্ষম। যার জীবনের অক্ষমতা যেন পুরো পরিবারকে এক অদৃশ্য শূন্যতায় আটকে রেখেছিল। তবু সবুজ প্রকৃতির কোলে, খোলা আকাশের নিচে, আল আমিন বড় হয়েছে বইয়ের গন্ধ আর মায়ের দোয়ার মাঝে। ছোট স্কুলের টিনের চালার নিচে বসে সে শেখে কীভাবে মানুষ হতে হয়। গরিব ঘরের ছেলে হয়েও তার চোখে ছিল বিশাল পৃথিবী।
স্বপ্নের শহরে সংগ্রাম
এইচএসসি পাশ করে আল আমিন ভর্তি হয় গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। শহরের বিশালতা আর ব্যস্ততার মাঝে প্রথমদিকে নিজেকে হারিয়ে ফেললেও সে ফিরে আসে নিজের লক্ষ্য নিয়ে। বর্তমানে সে মাস্টার্স করছে সেখান থেকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে দেশ, সমাজ ও মানুষের অধিকার নিয়ে তার ভাবনা আরও গভীর হয়ে ওঠে। কিন্তু উচ্চশিক্ষা তো শুধু ক্লাসের ভেতরে শেষ হয় না। সংসারের দায় তার কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিদিন। বাবা ফসল ফলান কষ্ট করে, কিন্তু সেই ফসলে আর সংসারের চাহিদা মেলে না। মায়ের মুখের চিন্তা, ভাইয়ের নিরবতা আর বোনদের ভবিষ্যতের অজানা পথ তাকে ভিতরে ভিতরে পুড়িয়ে দিত। এজন্যই সে কলেজে পড়ার পাশাপাশি একটা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে সিসিটিভি অপারেটর হিসেবে পার্ট-টাইম কাজ নেয়। সারাদিন কাজ করে সে মাস শেষে যে অল্প কিছু টাকা পেত, তা দিয়েই চালাতে হতো সংসার। কখনো হয়তো রাতের খাবারে শুধু ডাল-ভাত, তবুও তিনি কোনোদিন হাঁপিয়ে পড়েনি। কারণ সে জানত শিক্ষাই মুক্তির একমাত্র পথ।
ন্যায়ের পক্ষে পথে নামা
২০১৮ সালে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, তখনও আল আমিন ছাত্র হলেও সরাসরি জড়িত ছিল না। তবে সেই সময় ছাত্রদের যে স্পষ্ট বার্তা ছিল ন্যায়বিচার চাই, সেটি তার মনে গেঁথে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সরকারের প্রতিশ্রুতি ফিকে হয়ে যায়, আর সংস্কারের নামে হয় প্রহসন। স্থায়ী সমাধানের বদলে সরকার ছাত্রদের দাবি উপেক্ষা করে। আর তাই, ২০২৪ সালে সেই পুরোনো দাবিকে ঘিরেই আবার ফুঁসে ওঠে ছাত্রসমাজ। এবার আন্দোলন আরও ব্যাপক, আরও সুসংগঠিত। শিক্ষার্থীরা শুধু কোটা নয়, চেয়েছিল মর্যাদা, সমতা ও স্বচ্ছতা। গাজীপুর, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে ছাত্ররা রাস্তায় নামে। কিন্তু সরকার বুঝিয়ে দেয় তাদের দৃষ্টি জনগণের ন্যায্য দাবির দিকে নয়, বরং তা কিভাবে দমন করা যায়।
আওয়ামী সরকার পুলিশের লাঠি, রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস, এমনকি সন্ত্রাসী বাহিনীর সহায়তায় আন্দোলনকারীদের রক্তে রাজপথ রাঙিয়ে দেয়। গ্রেফতার, গুম, নির্যাতন যেন ছাত্রদের অপরাধ ছিল কেবল কথা বলা, প্রতিবাদ জানানো। এই নিষ্ঠুরতা দেখে ঘরে বসে থাকতে পারেনি আল আমিন।
রক্তাক্ত ৫ আগস্ট
৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২টা। গাজীপুরের সফিপুর এলাকায় হাজারো ছাত্র-জনতা জমায়েত হয়। তাদের সাথে যোগ দেয় গার্মেন্টস শ্রমিক, ভ্যানচালক, রিকশাওয়ালা, এমনকি অভিভাবকরাও। আন্দোলন হয়ে উঠে গণমানুষের আন্দোলন। সেই মুহূর্তে, শাসকগোষ্ঠী দেখিয়ে দেয় তাদের নির্মম চেহারা। সৈরাচারী সরকারের পুলিশ আনসার বাহিনী এবং আওয়ামী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা দেশী বিদেশী অস্ত্র নিয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে।একদিকে ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করতেছিল। তারা ছিল নিরস্ত্র। কিন্তু এই ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনেই শুরু হয় গুলি, ধাওয়া, লাঠিপেটা, গুম ও নির্যাতনের ধারাবাহিক বর্বরতা। আল আমিন সেই দিন নিজ চোখে দেখেন তার সহযোদ্ধাদের রক্তাক্ত শরীর। গুলিবিদ্ধ বন্ধুদের চিৎকারে কেঁপে ওঠে তার হৃদয়। সে নিজেও রক্ষা পায় না। পুলিশ ও আনসার বাহিনীর উপুর্যুপরি চালানো গুলিতে তার শরীরে ঢুকে পড়ে প্রায় ২০০টির মতো ছোড়া গুলি। শরীর রক্তে ভেসে যায়, তার জামা রক্তে লাল হয়ে জায়।সেই মুহূর্তটা ছিল তার জন্য খুবই ভয়ংকর। তিনি কিছুই বুঝতে পারছিলেন না কোন দিকে যাবেন। ধীরে ধীরে তার শরীর মিশতে শুয়ে পড়ে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে শুধু শুনতে পায় কিছু কণ্ঠস্বর, ওকে তাড়াতাড়ি তুলো! হাসপাতালে নিয়ে যাও! সেখান থেকে আন্দোলনকারী ছাত্ররাই তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
এক জীবন্ত শহীদের যন্ত্রণা
কালিয়াকোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ প্রায় দুই দিন ছিলেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি নিজ বাসস্থান নীলফামারীতে চলে যান। ভর্তি হন নীলফামারী সদর হাসপাতালে। কিন্তু অবস্থা ছিল শোচনীয় চিকিৎসকেরাও বিস্মিত হয় তার শরীরে থাকা বিপুল সংখ্যক গুলি দেখে। সেখান থেকে পাঠানো হয় রংপুর সিএমএইচ-এ, এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অপারেশন হলেও তার শরীরে এখনও প্রায় ১৫০টির মতো ছোড়া গুলি রয়ে গেছে। প্রতিটি রাত এখন তার জন্য আতঙ্ক। শরীরটা যেন ঘুমাতে জানে না কেবল কাঁপে, কাঁদে, ব্যথায় ছটফট করে। কিন্তু এই যন্ত্রণা তাকে দুর্বল করেনি। বরং সে বিশ্বাস করে আমার শরীরে গুলি আছে, কিন্তু হৃদয়ে আছে সাহস। সে আজও বেঁচে আছে, রক্তের বিনিময়ে দেশের গণতন্ত্র, শিক্ষা, অধিকার ও সমতার লড়াইয়ের এক জীবন্ত ইতিহাস হয়ে। আল আমিন এখন শুধু একজন আহত ছাত্র নন একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি, যে বুক পেতে দিয়েছিল ন্যায়ের সংগ্রামে। তার শরীরে গেঁথে থাকা প্রতিটি গুলি, যেন রাষ্ট্রের জুলুমের সাক্ষ্য, আবার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, আগামী প্রজন্মের প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আল আমিন
জন্ম তারিখ : ৭ জুন ২০০০
জন্মস্থান : নীলফামারী
পেশা : শিক্ষার্থী (মাস্টার্স)
প্রতিষ্ঠান : ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ
নিজ জেলা : নীলফামারী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: তহশীলদাপাড়া, ইউনিয়ন: ৫নং ধমপাল, থানা: জলঢাকা, জেলা: নীলফামারী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : নুরুল ইসলাম
মায়ের নাম : ফুলো বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. নুরনাহার, বয়স: ৩০, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
২. ফারুক, বয়স: ২৬, প্রতিবন্ধী, সম্পর্ক: ভাই
৩. নুরানী, বয়স: ২০, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : শফিপুর, গাজিপুর
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২টা
আক্রমণকারী : আনসার বাহিনী
চিকিৎসার প্রস্তাবনা : উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে বাকিগুলি গুলো বের করার ব্যবস্থা করা
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়া
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍