হোম / আহতদের তালিকা / মো: ময়নুল ইসলাম
মো: ময়নুল ইসলাম

মো: ময়নুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

ধুলামাটি-ঘামে গড়া শৈশব
২০০০ সালের ১ ডিসেম্বর, দিনাজপুর জেলার এক মাটির ঘরে জন্ম নেয় এক সংগ্রামী যুবক মো: ময়নুল ইসলাম। তার গ্রাম পশ্চিম বৈদাহার, ইউনিয়ন বেপারীটোলা, থানার নাম বিরামপুর। সাধারণ এক কৃষক পরিবারের এ ছেলেটির জীবনের শুরু থেকেই ছিল অভাব, দারিদ্র্য আর দায়িত্বের ছাপ। তার বাবা মো: মোস্তফার রহমান একজন কৃষক, বর্তমানে বয়স ৬২ বছর। অনেকটাই ক্লান্ত শরীর নিয়ে আজও জমিতে কাজ করেন সংসারের হাল ধরার জন্য।

মা মাজেদা একজন গৃহিণী, বয়স ৪৭। সংসারে ছয় ভাই-বোনের মধ্যে ময়নুল হলো চতুর্থ, তবে ভাইদের মধ্যে সে-ই বড়। চার বোনই বিবাহিত, ছোট ভাই ওয়ায়েজ করনী দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। বাল্যকাল থেকেই সংসারের অভাব ঘোচাতে বাবার পাশে জমিতে কাজ করতো ময়নুল। হাল ধরতো, বীজ ছিটাতো, সেচ দিতো। চাষের পাশাপাশি এক বীজ ভাণ্ডারের দোকানে পার্ট টাইম কাজ করত। এই কাজে দিনশেষে যা পেত, তা দিয়ে সংসারে চাল, তেল বা বই কেনার খরচ মেটাতো। এইভাবেই তার সময় কাটতো। অন্যদের শৈশব যেখানে খেলাধুলা আর নির্ভার আনন্দে কাটে, সেখানে ময়নুলের শৈশব কেটেছে দায়িত্বের ভারে ও সংগ্রামের গন্ধে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঢেউ ও বিরামপুরের জাগরণ
২০২৪ সাল বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন মোড়। দেশজুড়ে আবারও শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউ। শিক্ষিত তরুণ সমাজ সরকারি চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চায়। “যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি চাই” এই দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, কলেজ চত্বর থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জের অলিগলি।
এই আন্দোলনের উত্তাপ পৌঁছে যায় দিনাজপুরের বিরামপুর পর্যন্ত। কলেজপড়ুয়া ছাত্ররা সংগঠিত হয়, মিছিল করে, পথসভা করে। ময়নুল তখন পড়ালেখার পাশাপাশি আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। সে বিশ্বাস করতো, সমাজ পরিবর্তন করতে হলে নির্ভীক হতে হবে। তার চোখে ছিল আগুন, মনে ছিল সাহস। বৈষম্য দূর করা, স্বাধীনভাবে বসবাস করার চেতনা এসব ধারণ করেই সে নেমে পড়ে রাজপথে।
বিভীষিকাময় ৫ আগস্ট রাজপথে রক্তাক্ত বিরামপুর
৫ আগস্ট ২০২৪, দিনটি বিরামপুর তথা দিনাজপুরের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। দুপুর গড়িয়েছিল ১টার দিকে। বিরামপুর থানার সামনে কোটা সংস্কারের দাবিতে এক শান্তিপূর্ণ মিছিল চলছিল। হাজারো ছাত্র-জনতা স্লোগান দিচ্ছিল: “মেধার মূল্য দাও, কোটা প্রথা বাদ দাও।” হঠাৎ করেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। স্থানীয় থানার ওসির নির্দেশে ছাত্রদের ওপর শুরু হয় গুলি ও লাঠিচার্জ। কোনো রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই পুলিশ সরাসরি ছররা গুলি ছুঁড়ে মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের দিকে। ময়নুল তখন মিছিলের সামনে অবস্থান করছিল। তার এক হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, অন্য হাতে আন্দোলনের ব্যানার।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে দেখতে পায় তার সহপাঠীরা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। কেউ রক্তাক্ত, কেউ আহত, কেউ কাঁদছে। হঠাৎ একটি ছররা গুলি তার মাথা লক্ষ্য করে আসে। গুলিটি তার মাথা ছুঁয়ে চলে যায়, পা ও হাতে বিদ্ধ হয় অসংখ্য ছররা গুলি। রক্তে ভেসে যায় শরীর, ছেঁড়াফাটা জামা-কাপড়, রাস্তার পিচে গড়িয়ে পড়ে তরতাজা তরুণের রক্ত। পুলিশ কোনো করুণা দেখায়নি। বারবার গুলি করেছে, লাঠিপেটা করেছে, এমনকি আহতদের ওপরও চলে নির্যাতন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সে দিনটি ছিল এক নিঃশ্বাসে দুঃস্বপ্নের মতো যেখানে প্রতিবাদের জবাবে এসেছিল গুলি।
রক্ত, যন্ত্রণা ও হাসপাতালের বিছানায় এক যোদ্ধা
গুলিবিদ্ধ ময়নুলকে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানান, তার মাথা, পা ও হাতে প্রায় ৩৫টির মতো ছররা গুলি বিদ্ধ হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভালো চিকিৎসা না পাওয়ায় তিনি দিনাজপুর সরকারি মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তার অপারেশন করে কিছু গুলি বের করা হয়। বাকি গুলিগুলো বের করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসা চলাকালীন তার যন্ত্রণা যেন পিছু ছাড়ে না। মাথার যন্ত্রণা, শরীরজুড়ে ছররা গুলির দাগ, আর রাতে ঘুম ভাঙার পর চিৎকার এই ছিল তার বাস্তবতা। পরিবারের সদস্যরা পাশে থাকলেও ব্যথা ভাগ করে নেয়ার ক্ষমতা ছিল না কারো।
তার চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারের ওপর নেমে আসে নতুন বোঝা। প্রায় ৩০ হাজার টাকা লেগে যায়। তার কৃষক বাবা ভেঙে পড়েন খরচ বহন করতে যেয়ে।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা: চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়া। এককালীন সহায়তা করা।

নাম : মো: ময়নুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ১ ডিসেম্বর ২০০০
জন্মস্থান : দিনাজপুর
পেশা : শিক্ষার্থী
নিজ জেলা : দিনাজপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: পশ্চিম বৈদাহার, ইউনিয়ন: বেপারীটোলা, থানা: বিরামপুর, জেলা: দিনাজপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মোস্তফার রহমান
মায়ের নাম : মাজেদা
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৬২
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৭
আয়ের উৎস : কৃষিকাজ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. মারজিয়া আক্তার, বিবাহিত, সম্পর্ক : বোন
২. আরজিনা আক্তার, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
৩. আরজিনা আক্তার, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
৪. শারমিন আক্তার, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
৫. ওয়ায়েজ করুনী, বয়স: ২০, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: দ্বাদশ শ্রেণী, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : বিরামপুর থানার সামনে
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍