মো: ইসমাইল হোসেন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : ছাত্র ও শ্রমিক
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
শৈশব
ইসমাইল হোসেনের জন্ম ২০০৮ সালের ১ আগস্ট, দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থানার রামপুর মণ্ডলপাড়ায়। ছোট্ট ইসমাইলের শৈশবটা ছিল অন্যদের মতো উজ্জ্বল নয়। চোখে স্বপ্ন থাকলেও তা পূরণ করার আশ্রয় ছিল না। তার বাবা মো: এনামুল হক ছিলেন একজন নাইট গার্ড, আর মা মোছা: এসপেয়ারা গৃহিণী। কিন্তু পরিবারটা বেশিদিন একসঙ্গে থাকেনি। খুব অল্প বয়সে ইসমাইলকে ফেলে তার মা অন্য জায়গায় বিয়ে করে সংসার পেতে নেন। বাবাও আরেক জায়গায় গিয়ে আলাদা সংসার শুরু করেন। ইসমাইল থেকে যায় নিঃসঙ্গ, অনাথের মতো। কেউ আর তার খোঁজ রাখত না। আপন ঘর না থাকায় সে আশ্রয় নেয় অন্যের বাড়িতে। খাবার জুটত বাড়ির কাজ করে। কোনো অভিযোগ ছিল না তার, বরং জীবনের তাগিদে সে সংগ্রাম করত নীরবে।
বুলেটের দাগে লেখা এক সাহসী গল্পতবুও থেমে থাকেনি ইসমাইল। রামনাথপুর দাখিল মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কেবল বইয়ের মধ্যে জীবন আটকে থাকেনি। দিনে সে মাদ্রাসায় যেত, আর বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলত বাস হেলপার হিসেবে কাজ। চলন্ত বাসে ডাকাডাকি, সিট খালি করা, ভাড়া তোলা সবই শিখে গিয়েছিল সে। এই কাজের মধ্য দিয়েই সে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাত। ছোট ভাই মুন্নার পড়াশুনার দিকেও চোখ রাখত। এ বয়সেই সে যেন হয়ে উঠেছিল নিজের পরিবারের অভিভাবক।
সংগ্রামের রং চটা রুটিন
দিনে পড়া, রাতে কাজ ইসমাইলের দিনলিপিতে অবকাশের সময় ছিল না। রংপুর শহরের টেক্সটাইল মোড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় বাস হেলপার হিসেবে তার চেনাজানা ছিল। বাসের ড্রাইভাররা তাকে পছন্দ করত, কারণ সে ছিল ভদ্র, কাজের প্রতি যত্নবান এবং সময়ানুবর্তী।
ইসমাইল জানত, এই কাজটা স্থায়ী নয়। তবু সে কোনো কাজকে ছোট মনে করত না। সে জানত, শ্রম দিয়েই হয়তো একদিন সে পড়ালেখার বড় স্বপ্ন ছুঁতে পারবে। দারিদ্র্য তাকে থামাতে পারেনি, সমাজের অবহেলাও নয়। তার চোখে ছিল মায়ের শূন্যতা, বাবার অবহেলা আর নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্ন যা তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে গড়তে শিখিয়েছিল।
আন্দোলনের আগুনে দৃষ্টিহীনতার ছায়া
২০১৮ সালে বাংলাদেশে ছাত্ররা “কোটা সংস্কার আন্দোলন” করলে সরকার চাপের মুখে সাময়িকভাবে কোটা সংস্কার মেনে নেয় কিন্তু এর স্থায়ী কোনো সমাধান দেননি। হাইকোটে রিট করলে সেখানে কোটা ব্যবস্থার পুনর্বহালের রায় আসে। ২০২৪ সালে আবার যখন সরকারি চাকরিতে বৈষম্যের চিহ্ন ফুটে উঠল, তখন নতুন করে গর্জে উঠল ছাত্র-জনতার আন্দোলন।
সরকার এই আন্দোলন দমন করতে গিয়ে হত্যা করে আবু সাঈদ নামে এক ছাত্রকে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই উত্তাল হয়ে ওঠে সারাদেশ। বিক্ষোভের আগুন লাগে রংপুরেও, বিশেষ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে।
১৯ জুলাই ২০২৪, বিকেল ৫টা। সেদিন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় ইসমাইল তার বন্ধুদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেয়। প্রথমবার কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণ। সে শুধু চেয়েছিল ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক। কিন্তু সরকার ও প্রশাসন সেটি মেনে নেয়নি।
পুলিশ, বিজিবি, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা মিলে আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর চড়াও হয়। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট সবই ব্যবহার করা হয়। ইসমাইলের শরীরে পড়ে সাতটা রাবার বুলেট। বিশেষ করে তার চোখে লাগে তিনটা গুলি। সে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকে। চারদিকে ধোঁয়া, গুলির শব্দ আর আতঙ্ক।
চিকিৎসা
পথচারী এক যুবক ও কিছু ছাত্র তাকে উদ্ধার করে দ্রুত নিয়ে যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে নেয়ার পর শুরু হয় অপারেশন। শরীরের গুলিগুলো কোনোমতে বের করা গেলেও, তার চোখ আর বাঁচানো যায়নি। ডাক্তার তাকে জানিয়ে দিলেন যে, তার চোখের আলো আর ফিরবে না। ইসমাইল কিছু বলতে পারল না। চোখের চারপাশে ব্যান্ডেজ, শরীরে ব্যথা আর মনের ভিতর বিশাল এক শূন্যতা। সে বুঝতে পারছিল, তার পৃথিবীটা আর আগের মতো রঙিন থাকছে না। চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত সব মিলিয়ে তার পরিবার খরচ করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অথচ তার জমি নেই, ঘর নেই, কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। এখন সে অন্যের বাড়িতে পড়ে আছে। নিঃস্ব, দৃষ্টিহীন, অথচ মনোবলে পরিপূর্ণ। ইসমাইল হোসেনের গল্প কেবল একজন ছাত্রের গল্প নয় এটি একটি সংগ্রামী প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি।বৃদ্ধির ছায়া ছাড়া একটি
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: ইসমাইল হোসেন
জন্ম তারিখ : ১ আগস্ট ২০০৮
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : ছাত্র ও শ্রমিক
প্রতিষ্ঠান : রামনাথপুর দাখিল মাদ্রাসা
নিজ জেলা : দিনাজপুর
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: রামপুর মণ্ডলপাড়া, ইউনিয়ন: রামপুর, থানা: পার্বতীপুর, জেলা: দিনাজপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: এনামুল হক
মায়ের নাম : মোছা: এসপেয়ারা
পিতার পেশা ও বয়স : নাইট গার্ড, ৫০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. মুন্না, বয়স: ১২, পেশা: মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : টেক্সটাইল মোড়, রংপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪ বিকেল পাঁচটা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও বিজিবি
কর্মসংস্থানে প্রস্তাবনা : আর্থিক সহায়তা করা। স্থানীয় বাজারে একটা দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়া।
ইসমাইল হোসেনের জন্ম ২০০৮ সালের ১ আগস্ট, দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থানার রামপুর মণ্ডলপাড়ায়। ছোট্ট ইসমাইলের শৈশবটা ছিল অন্যদের মতো উজ্জ্বল নয়। চোখে স্বপ্ন থাকলেও তা পূরণ করার আশ্রয় ছিল না। তার বাবা মো: এনামুল হক ছিলেন একজন নাইট গার্ড, আর মা মোছা: এসপেয়ারা গৃহিণী। কিন্তু পরিবারটা বেশিদিন একসঙ্গে থাকেনি। খুব অল্প বয়সে ইসমাইলকে ফেলে তার মা অন্য জায়গায় বিয়ে করে সংসার পেতে নেন। বাবাও আরেক জায়গায় গিয়ে আলাদা সংসার শুরু করেন। ইসমাইল থেকে যায় নিঃসঙ্গ, অনাথের মতো। কেউ আর তার খোঁজ রাখত না। আপন ঘর না থাকায় সে আশ্রয় নেয় অন্যের বাড়িতে। খাবার জুটত বাড়ির কাজ করে। কোনো অভিযোগ ছিল না তার, বরং জীবনের তাগিদে সে সংগ্রাম করত নীরবে।
বুলেটের দাগে লেখা এক সাহসী গল্পতবুও থেমে থাকেনি ইসমাইল। রামনাথপুর দাখিল মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কেবল বইয়ের মধ্যে জীবন আটকে থাকেনি। দিনে সে মাদ্রাসায় যেত, আর বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলত বাস হেলপার হিসেবে কাজ। চলন্ত বাসে ডাকাডাকি, সিট খালি করা, ভাড়া তোলা সবই শিখে গিয়েছিল সে। এই কাজের মধ্য দিয়েই সে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাত। ছোট ভাই মুন্নার পড়াশুনার দিকেও চোখ রাখত। এ বয়সেই সে যেন হয়ে উঠেছিল নিজের পরিবারের অভিভাবক।
সংগ্রামের রং চটা রুটিন
দিনে পড়া, রাতে কাজ ইসমাইলের দিনলিপিতে অবকাশের সময় ছিল না। রংপুর শহরের টেক্সটাইল মোড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় বাস হেলপার হিসেবে তার চেনাজানা ছিল। বাসের ড্রাইভাররা তাকে পছন্দ করত, কারণ সে ছিল ভদ্র, কাজের প্রতি যত্নবান এবং সময়ানুবর্তী।
ইসমাইল জানত, এই কাজটা স্থায়ী নয়। তবু সে কোনো কাজকে ছোট মনে করত না। সে জানত, শ্রম দিয়েই হয়তো একদিন সে পড়ালেখার বড় স্বপ্ন ছুঁতে পারবে। দারিদ্র্য তাকে থামাতে পারেনি, সমাজের অবহেলাও নয়। তার চোখে ছিল মায়ের শূন্যতা, বাবার অবহেলা আর নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্ন যা তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে গড়তে শিখিয়েছিল।
আন্দোলনের আগুনে দৃষ্টিহীনতার ছায়া
২০১৮ সালে বাংলাদেশে ছাত্ররা “কোটা সংস্কার আন্দোলন” করলে সরকার চাপের মুখে সাময়িকভাবে কোটা সংস্কার মেনে নেয় কিন্তু এর স্থায়ী কোনো সমাধান দেননি। হাইকোটে রিট করলে সেখানে কোটা ব্যবস্থার পুনর্বহালের রায় আসে। ২০২৪ সালে আবার যখন সরকারি চাকরিতে বৈষম্যের চিহ্ন ফুটে উঠল, তখন নতুন করে গর্জে উঠল ছাত্র-জনতার আন্দোলন।
সরকার এই আন্দোলন দমন করতে গিয়ে হত্যা করে আবু সাঈদ নামে এক ছাত্রকে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই উত্তাল হয়ে ওঠে সারাদেশ। বিক্ষোভের আগুন লাগে রংপুরেও, বিশেষ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে।
১৯ জুলাই ২০২৪, বিকেল ৫টা। সেদিন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় ইসমাইল তার বন্ধুদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেয়। প্রথমবার কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণ। সে শুধু চেয়েছিল ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক। কিন্তু সরকার ও প্রশাসন সেটি মেনে নেয়নি।
পুলিশ, বিজিবি, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা মিলে আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর চড়াও হয়। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট সবই ব্যবহার করা হয়। ইসমাইলের শরীরে পড়ে সাতটা রাবার বুলেট। বিশেষ করে তার চোখে লাগে তিনটা গুলি। সে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকে। চারদিকে ধোঁয়া, গুলির শব্দ আর আতঙ্ক।
চিকিৎসা
পথচারী এক যুবক ও কিছু ছাত্র তাকে উদ্ধার করে দ্রুত নিয়ে যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে নেয়ার পর শুরু হয় অপারেশন। শরীরের গুলিগুলো কোনোমতে বের করা গেলেও, তার চোখ আর বাঁচানো যায়নি। ডাক্তার তাকে জানিয়ে দিলেন যে, তার চোখের আলো আর ফিরবে না। ইসমাইল কিছু বলতে পারল না। চোখের চারপাশে ব্যান্ডেজ, শরীরে ব্যথা আর মনের ভিতর বিশাল এক শূন্যতা। সে বুঝতে পারছিল, তার পৃথিবীটা আর আগের মতো রঙিন থাকছে না। চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত সব মিলিয়ে তার পরিবার খরচ করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অথচ তার জমি নেই, ঘর নেই, কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। এখন সে অন্যের বাড়িতে পড়ে আছে। নিঃস্ব, দৃষ্টিহীন, অথচ মনোবলে পরিপূর্ণ। ইসমাইল হোসেনের গল্প কেবল একজন ছাত্রের গল্প নয় এটি একটি সংগ্রামী প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি।বৃদ্ধির ছায়া ছাড়া একটি
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: ইসমাইল হোসেন
জন্ম তারিখ : ১ আগস্ট ২০০৮
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : ছাত্র ও শ্রমিক
প্রতিষ্ঠান : রামনাথপুর দাখিল মাদ্রাসা
নিজ জেলা : দিনাজপুর
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: রামপুর মণ্ডলপাড়া, ইউনিয়ন: রামপুর, থানা: পার্বতীপুর, জেলা: দিনাজপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: এনামুল হক
মায়ের নাম : মোছা: এসপেয়ারা
পিতার পেশা ও বয়স : নাইট গার্ড, ৫০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. মুন্না, বয়স: ১২, পেশা: মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : টেক্সটাইল মোড়, রংপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪ বিকেল পাঁচটা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও বিজিবি
কর্মসংস্থানে প্রস্তাবনা : আর্থিক সহায়তা করা। স্থানীয় বাজারে একটা দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়া।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍