হোম / আহতদের তালিকা / মো: দ্বীন ইসলাম
মো: দ্বীন ইসলাম

মো: দ্বীন ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শ্রমিক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

কারখানার কিশোর
থেকে ছাত্র জনতার
সহযাত্রীপরিবারে সদস্য সংখ্যা ছিল মোট নয়জন পিতা, মাতা এবং সাত ভাই-বোন। পরিবারটি রাজধানীর লালবাগ এলাকায় সরকারের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ছোট্ট ঘরে বাস করত। টিনের চাল, বেড়া আর সামনে ছোট্ট একটুখানি উঠোন। সেখানেই একসাথে সব ভাই বোন বেড়ে উঠত খেলাধুলা, ঝগড়া আর হাসিমাখা দিনগুলোর মধ্যে দিয়ে। তার বাবা নরু মিয়া পেশায় একজন অটোরিকশা চালক, বয়স ৫১। প্রতিদিন ভোরবেলা গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতেন। আর মা রোজিনা বেগম, বয়স ৩৫, গৃহিণী হলেও সংসারের ছোটখাটো কাজের পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের মানুষ করতেই ব্যস্ত থাকতেন। মাসিক আয় মিলিয়ে হয় মাত্র পনেরো হাজার টাকা। এই আয়ে নয় সদস্যের সংসার চালানো কতোটা কঠিন তা বলে বোঝানো যাবে না। তার বোন মোছা: বৃষ্টি খাতুন তখনো স্কুলে পড়ে, বয়স ১৫। নয়ন, সাথী, আওয়াল, আলী আর সোনিয়া সবাই ছোট। শৈশব কাটছে অভাবের ছায়ায়, কিন্তু ভালোবাসার আলোতে। আর ঠিক এই আবহেই বেড়ে উঠতে থাকে দ্বীন ইসলাম। শিশুকাল থেকেই সে বুঝে গিয়েছিল এই জীবনে তার জন্য খেলাধুলা কিংবা স্বপ্ন দেখা অত সহজ হবে না।
শৈশবেই দায়ভার
দ্বীন ইসলামের বয়স তখন মাত্র আট। পাড়ার অন্য ছেলেরা যখন স্কুল শেষে মাঠে দৌড়াচ্ছে, সে তখন মা’র হাত ধরে বাজার থেকে চাল-ডাল টেনে আনছে। কারণ তার পরিবারে সে-ই ছিল বড় ছেলে। প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সে লেখাপড়া করেছিল ঠিকই, কিন্তু পঞ্চম শ্রেণির গণ্ডি পেরোতেই বাবার পকেটে খাবার কেনার টাকাই থাকত না, শিক্ষা খরচ তো অনেক পরের কথা। শেষমেশ একদিন বই-খাতা গুটিয়ে হাতে তুলে নেয় জীবিকার হাল। জুতার একটি ছোট কারখানায় কাজ নেয় সে। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তাকে কারখানার ভেতরে কাটাতে হতো। কাজ করত ১২ ঘণ্টা, কিন্তু মজুরি মাসে খুবই অল্প টাকা । বয়স ছিল কম, তাই বেশি কাজ দিলেও মজুরি কম দিত। তবে দ্বীন থেমে থাকেনি। মাঝে মাঝে বাইক সার্ভিসিং সেন্টারে গিয়ে কাজ শিখত। চেষ্টা করছিল যেন অন্য কোনো ভালো কাজ ধরতে পারে। তার স্বপ্ন ছিল না বড় অফিসার হওয়া, শুধু চাইত পরিবারের মুখে যেন দু’বেলা ভাত তুলে দিতে পারে।
আন্দোলনের ঢেউ ও গুলিবিদ্ধ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাস। ঢাকা শহরে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের নতুন জোয়ার। ছাত্ররা দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসে জড়ো হয় রাজধানীর রাজপথে। দ্বীন ইসলাম কাজের ফাঁকে ফাঁকে আন্দোলন দেখতে যেত। জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে আন্দোলনের প্রচণ্ড গতি দেখে মাঝে মাঝে সরকার কারফিউ জারি করতো। কলকারখানা, গার্মেন্টস বন্ধ থাকতো।

৫ আগস্ট ২০২৪। দুপুর ১২টা। ঢাকা কলেজের সামনে হাজারো ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ করছিল। হাতে ব্যানার, মুখে শ্লোগান দিচ্ছিলো। হঠাৎ করেই পুলিশ আসে, সঙ্গে আরো কয়েকজন আওয়ামী সন্ত্রাসী। শুরু হয় নির্বিচার গুলি, রাবার বুলেট, টিয়ারশেল। রাস্তা কাঁপছে, মানুষ দৌড়াচ্ছে, কেউ পড়ে যাচ্ছে রক্তে ভিজে। দ্বীন তখনও দাঁড়িয়ে, চোখে কোনো ভয় নেই। এক পর্যায়ে দ্বীন ইসলাম মিছিলের সামনে চলে যায়। তার ছোট্ট শরীরটা তখন রাস্তায় একা দাঁড়িয়েছিল ছাত্রদের পতাকা হাতে। ঠিক সে সময় পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। ১০ থেকে ১৫টি রাবার বুলেট গিয়ে লাগে তার শরীরে, হাতে, পিঠে ও কোমরে। রক্তে ভিজে যায় জামা-কাপড়। সে ধপ করে পড়ে যায় রাস্তায়।
চারপাশে তখন শুধু আর্তনাদ। কেউ কেউ তাকে টেনে তুলতে চায়, কিন্তু গুলির ভয় তাদের বাধা দেয়। অবশেষে কয়েকজন ছাত্র ঝুঁকি নিয়ে তাকে তুলে নেয়, দ্রুত ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকরা তার অপারেশন করে গুলি বের করে। কয়েকদিন থাকতে হয় ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে। সাত দিন বিশ্রামের পর সে সুস্থ হয়ে ওঠে।



একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : দ্বীন ইসলাম
জন্ম তারিখ : ২০০৮
জন্মস্থান : ঢাকা
পেশা : শ্রমিক
প্রতিষ্ঠান : জুতার কারখানা
নিজ জেলা : রংপুর
বর্তমান ঠিকানা : লালবাগ, ঢাকা
গ্রাম : সোনাতন
ইউনিয়ন : হারাগাছ
থানা : কাউনিয়া
জেলা : রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : নরু মিয়া
মায়ের নাম : রোজিনা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : শ্রমিক (অটোরিকশা চালক), ৫১
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৫
মাসিক আয় : ১৫ হাজার
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৯ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. মোছা: বৃষ্টি খাতুন, বয়স: ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: বোন
২. নয়ন ইসলাম, বয়স: ১০, পেশা: শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: ভাই
৩. সাথী আক্তার, বয়স: ৯, পেশা: শিক্ষার্থী (সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়), সম্পর্ক: বোন
৪. আওয়াল হোসেন, বয়স: ৫, পেশা:, সম্পর্ক: ভাই
৫. আলী হোসেন বয়স : ৪ বছর, সম্পর্ক: ভাই
৬. সোনিয়া খাতুন, বয়স: ২ বছর, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : ঢাকা কলেজের সামনে
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
কর্মসংস্থানে প্রস্তাবনা : মাসিক সহযোগিতা করার ব্যবস্থা করা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍