হোম / আহতদের তালিকা / মো: তারেক হোসেন
মো: তারেক হোসেন

মো: তারেক হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শ্রমিক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সবুজ শ্যামলে বেড়ে ওঠা
রংপুর জেলার কাউনিয়া থানার সোনাতন গ্রামে ২০০৪ সালের ১৩ আগস্ট জন্ম নেয় এক কিশোর, নাম মো: তারেক হোসেন। প্রকৃতির কোলে, নদী-খাল-বিল ঘেরা আর সবুজ ধানের ক্ষেতের পাশে তার শৈশব কেটেছে। ভোরে পাখির ডাক আর সন্ধ্যায় কুয়াশাঢাকা গন্ধে গাঁয়ের পরিবেশ তাকে গড়ে তুলেছিল প্রকৃতির সন্তান হিসেবে। গ্রামের মাঠে ফুটবল খেলা, আম গাছে চড়ে কাঁচা আম পাড়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া এই ছিল তার ছেলেবেলার চিত্র। তারেকের পরিবার ছিল স্বল্প আয়ের। বাবা মো: মাহতাব হোসেন দিনমজুর ছিলেন, বয়স ৫৪। মা মোছা: রিনা বেগম একজন গৃহিণী, বয়স ৪৫। তাদের সংসারে ছিল পাঁচ জন সদস্য। তিন ভাই এবং মা-বাবা। বড় ভাই রিপন বাবু গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন, আর মেজো ভাই রবিউল হাসানও শ্রমিক। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল তারেক অন্তত লেখাপড়া শিখে কিছু একটা করবে। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় স্বপ্নের সঙ্গে একমত হয় না।

তার ব্যথা আজ প্রজন্মের অনুপ্রেরনাজীবনের শুরুতেই সংগ্রাম
তারেকের লেখাপড়ার ইচ্ছা ছিল প্রবল, কিন্তু পরিবারের দৈন্যদশা তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অভাবের তীব্রতা তাকে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করে। কৈশোরেই হাত ধরতে হয় জীবিকার। বড় ভাইদের অনুসরণ করে তিনিও কাজে নেমে পড়েন। টাঙ্গাইলের সোহাগপাড়ায় একটি গার্মেন্টসে শ্রমিকের চাকরি পান। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা, কখনও কখনও রাত অবধি কঠিন পরিশ্রম করতেন। মাসশেষে অল্প কিছু টাকা হাতে পেলেও সেই টাকায় সংসারে মায়ের মুখে একটু হাসি ফুটত, ছোট ভাইয়ের পড়াশুনার খরচ চালানো যেত। নিজেকে ভুলে, স্বপ্নকে চেপে কেবল পরিবারের জন্য জীবন কাটাতে থাকেন তারেক।
উত্তাল সময়ের শুরু
২০২৪ সালের জুন-জুলাই মাস থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় এক ভয়ঙ্কর গণআন্দোলন। সরকারি চাকরিতে বৈষম্য, ন্যায্য অধিকার, ন্যূনতম মজুরি, কর্মপরিবেশ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, সব কিছু নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমে ওঠে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, তরুণ, এমনকি দিনমজুরেরাও রাস্তায় নেমে আসে।
টাঙ্গাইলসহ দেশের অনেক জায়গাতেই এ আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছায়। গার্মেন্টস শ্রমিকদের অনেকেই এই সময় কাজে গেলেও দুপুরে বা ছুটির পর আন্দোলনে যোগ দিত। তারেক সেই তরুণদেরই একজন, যার মধ্যে ছিল প্রতিবাদের আগুন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর স্পৃহা তার বুক ভরে উঠেছিল।
প্রতিবাদের মুহূর্তে রক্তাক্ত তারেক
৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২টা। তারেক গার্মেন্টস থেকে দুপুরের লাঞ্চ ব্রেকে বের হন। সে সময়ই টাঙ্গাইলের সোহাগপাড়ায় শুরু হয় ছাত্র-জনতা এবং পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ। মিছিল এগিয়ে যাচ্ছিল শান্তিপূর্ণভাবে, হঠাৎ করেই পুলিশ টিয়ার গ্যাস এবং রাবার বুলেট ছুঁড়ে দেয়। তারেক তখন বাড়ি ফেরার পথে ছিলেন, হঠাৎ এক দলে যোগ দিয়ে দাঁড়িয়ে যান প্রতিবাদীদের পাশে। পুলিশ হঠাৎ এক গলিতে ঢুকে সরাসরি লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ছোঁড়ে। একের পর এক গুলি এসে লাগে ছাত্র-জনতার উপর। তার চোখের সামনেই কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে। বেশ কয়েকজন আহত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। তারেকের গায়ে প্রায় ৪০টির মতো ছররা গুলি বিঁধে যায়। সে মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মানুষ তাকে ধরাধরি করে নিয়ে যায় কাছের একটি ক্লিনিকে, কিন্তু চিকিৎসা না দিয়ে তারা তাকে পালাতে বলে, কারণ আওয়ামী সন্ত্রাসীরা কিছুক্ষণ আগেই হাসপাতালে হামলা করেছিল। আহত তারেককে তখন কালিয়াকৈর উপজেলার একটি ছোট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাশেষে তার শরীর থেকে গুলি বের করা হয়।
রংপুরে যন্ত্রণার দিনগুলো
চিকিৎসা শেষ করে কিছুদিন পর তারেক ফিরে আসে নিজ গ্রাম রংপুরের সোনাতনে। শরীরের যন্ত্রণা তখনও কেটে যায়নি, কিন্তু চোখে-মুখে ছিল সাহস আর প্রত্যয়। গুলির দাগ আজও শরীরে বহন করছে সে, যা- তার সাহসিকতার স্মারক হয়ে রয়েছে। তিনি নিজ জন্মস্থান রংপুরে আসেন। তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তিনি রংপুর সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এই ছেলেটি শুধু গার্মেন্টস শ্রমিকই নয়, এক সাহসী তরুণ, যে দেশ, অধিকার আর সম্মান রক্ষায় নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিল।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: তারেক হোসেন
জন্ম তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০০৪
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শ্রমিক
প্রতিষ্ঠান : নির্মাণ শ্রমিক
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: সোনাতন, ইউনিয়ন: নাজিরদহ, থানা: কাউনিয়া, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মাহাতাব হোসেন
মায়ের নাম : মোছা: রিনা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : দিনমজুর, ৫৪
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
মাসিক আয় : ১৫ হাজার
আয়ের উৎস : দিনমজুর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাইবোনদের বিবরণ
১. রিপন বাবু, বয়স: ৩০, পেশা: শ্রমিক (গার্মেন্টস), সম্পর্ক: ভাই
২. রবিউল হাসান, বয়স: ২০, পেশা: শ্রমিক, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : সোহাগপাড়া, টাঙ্গাইল
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
চিকিৎসার প্রস্তাবনা : তার ঘাড়ে দ’ুটি ছররাগুলি আছে যেটা বের করা দরকার
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : এককালীন সহায়তা করা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍