হোম / আহতদের তালিকা / মো: মোস্তাফিজার রহমান
মো: মোস্তাফিজার রহমান

মো: মোস্তাফিজার রহমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র, মাষ্টার্স (ব্যবস্থাপনা বিভাগ)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সবুজ শ্যামল গ্রাম থেকে শিক্ষার পথ চলা
মো: মোস্তাফিজার রহমানের জন্ম ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি, রংপুর জেলার সদর থানার কেশবপুর পশ্চিম পাড়া গ্রামে। ৪নং সদ্যপুস্কুরিনী ইউনিয়নের এই শান্ত নিরিবিলি গ্রামে তার বেড়ে ওঠা। বাবা মো: মাহবুুল ইসলাম একজন কৃষক, আর মা উম্মে কুলছুম একজন গৃহিণী। পাঁচ সদস্যের পরিবারে তিন ভাইয়ের মধ্যে মোস্তাফিজার ছিলেন সবার বড়। ছোট ভাই মাহফুজুল ইসলাম কৃষিকাজে বাবার সঙ্গে হাত লাগান আর সবার ছোট বরকত উল্লাহ কেশবপুর আশরাফুল উলুম মাদরাসায় পড়াশুনা করেন।
শৈশব থেকেই মোস্তাফিজার ছিলেন শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী। গ্রামের বিদ্যালয়ে পড়াশোনার শুরু, মাঠে ধানক্ষেতের পাশে বই নিয়ে বসে থাকা ছিল তার প্রিয় অভ্যাস। প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় হওয়া ছেলেটি ধীরে ধীরে নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বর্তমানে তিনি দিনাজপুরের খোলাহাটি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগে মাস্টার্স করছেন।
গ্রামের সাদামাটা পরিবেশ তাকে শেখায় সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ আর সংগ্রাম। শৈশব-কৈশোরে বাবার সঙ্গে ক্ষেত-খামারে কাজ করলেও তার চোখে ছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ও ন্যায়ের পথে হেঁটে সমাজে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের নতুন জোয়ার
২০১৮ সাল দেশের ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ছড়িয়ে পড়ে “কোটা সংস্কার আন্দোলন”। সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হয় কোটা পদ্ধতির সংস্কার করা হবে এবং সেই ঘোষণা অনুযায়ী কোটা বাতিল করা হয়।
কিন্তু বাস্তবে সেই সিদ্ধান্ত ছিল অস্থায়ী। কোনো আইনগত ভিত্তি বা স্থায়ী গেজেট জারি না করায় দীর্ঘমেয়াদে আবারও ফিরে আসে পুরনো অবিচার। ২০২৩ সালের শেষ দিকে হাইকোর্টে একজন ব্যক্তি রিট করলে ২০২৪ সালের শুরুতেই সরকার কোটা পদ্ধতি পুনর্বহাল করে। এতে নতুন করে ছাত্রসমাজের মনে ক্ষোভ জমতে থাকে।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ ও ন্যায়ের দাবিতে দেশজুড়ে শুরু হয় আন্দোলনের দ্বিতীয় অধ্যায়।
মোস্তাফিজার রহমান একজন সুশিক্ষিত ও সচেতন ছাত্র হিসেবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকতে পারেননি। ইতিহাস, সমাজনীতি ও মানুষের অধিকার বিষয়ে জানাশোনা থাকায় তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, এটি কেবল কোটা নয়, এটি এক ধরনের শ্রেণিগত বৈষম্যের পুনর্জন্ম।
আবু সাঈদের রক্ত আর মোস্তাফিজারের সিদ্ধান্ত
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই এক নির্মম ঘটনা নাড়িয়ে দেয় পুরো দেশকে। রংপুরে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে এবং মুহূর্তেই সারা দেশের ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই ঘটনার পর মোস্তাফিজার আর নিজের জায়গায় বসে থাকতে পারেননি। তিনি প্রতিদিন সকালবেলা বন্ধুদের ডেকে আন্দোলনের মাঠে যেতেন। তাদের স্লোগানে থাকত:
“আমরা ন্যায়ের পক্ষে, আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে।”
বুড়ির হাট মোড়, বাংলাদেশ ব্যাংক, মেডিকেল মোড় এলাকা জুড়ে ছাত্র-ছাত্রীরা একত্রিত হয়ে দাঁড়াত। কিন্তু সরকার আন্দোলনকে রুখে দিতে চাচ্ছিল। তাদের হাতিয়ার ছিল পুলিশ বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন। মোস্তাফিজার বুঝে গিয়েছিলেন, এ লড়াই সহজ নয়। তবু সত্যের পথে দাঁড়ানো ছাড়া তার কোনো বিকল্প ছিল না।
চতুর্মুখী হামলা ও রক্তাক্ত যুবক
৩১ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২টা। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বুড়ির হাট মোড় পর্যন্ত ছাত্রদের পদযাত্রা চলছিল। মোস্তাফিজার ছিলেন সবার সামনে। হঠাৎ করে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একদল কর্মী।
হাতের লাঠি, বাঁশ, হেলমেট সব নিয়ে আক্রমণ শুরু হয়। বিক্ষোভকারী ছাত্র-ছাত্রীরা দিগি¦দিক ছুটতে থাকে। মোস্তাফিজারও দৌঁড়াতে থাকেন।
কিন্তু কিছু সিভিল পোশাকের পুলিশ তাকে পিছন থেকে ধরে ফেলে। শুরু হয় নির্মম প্রহার। মাথা, মুখ ও পা কোনো জায়গা বাদ যায়নি। কিল, ঘুষি, লাঠিচার্জ ও পুলিশের বুটের আঘাতে রক্তাক্ত হয় তার শরীর। রক্তে ভেসে যায় মোস্তাফিজারের জামা। এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে যান তিনি। কয়েকজন ছাত্র ও স্থানীয় জনতা সাহস করে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান রংপুর সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
হাসপাতালের অমানবিকতা ও ঘরে ফেরা
হাসপাতালে মোস্তাফিজারের যন্ত্রণা কমেনি বরং আরেকরকম অভিজ্ঞতা তাকে বিষণ্ণ করে তোলে। কারণ, সরকারি হাসপাতালের দায়িত্বশীল চিকিৎসকদের জায়গায় নিয়োজিত ছিল ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতাদের নির্দেশে থাকা হাসপাতালের কিছু দলকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যকর্মী।
তারা মূল্যায়ন করছিল, কে ছাত্রলীগ, কে আন্দোলনকারী। তাই মোস্তাফিজারকে ঠিকভাবে চিকিৎসা দিচ্ছিল না কেউ। ওষুধে গড়িমসি, ব্যান্ডেজে অবহেলা, রিপোর্ট করাতে দেরি সবকিছু যেন তাকে দ্বিতীয়বার আহত করছিল। অনেক অনুরোধের পর তার চিকিৎসা দেয়া হয়। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হয়। চার দিন পর চিকিৎসকেরা তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। বাড়ি ফিরে তিনি স্থানীয় এক পল্লি চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নেন। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন। তবে তার মাথার ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, মুখে আঘাতের দাগ থেকে গেছে। তবে প্রাণে বেঁচে গেছেন।আঘাতের মাঝে হার না মানা এক জীবন



একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: মোস্তাফিজার রহমান
জন্ম তারিখ : ১ জানুয়ারি ২০০০
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : ছাত্র, মাষ্টার্স (ব্যবস্থাপনা বিভাগ)
প্রতিষ্ঠান : কারমাইকেল কলেজ, দিনাজপুর
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : পশ্চিম কেশবপুর, ইউনিয়ন : কেশবপুর, থানা : রংপুর সদর, জেলা : রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মাহবুবুল ইসলাম
মায়ের নাম : মোছা: উম্মে কুলছুম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৮
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাইবোন বিবরণ
১. মাহফুজুল ইসলাম, বয়স: ২৪, পেশা: কৃষক, সম্পর্ক: ভাই
২. বরকত উল্লাহ, বয়স: ১০, পেশা: হেফজ বিভাগ, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বুড়ির হাট মোড়
আহত হওয়ার সময় : ৩১ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২টা
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়া

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍