হোম / আহতদের তালিকা / মো: হালিম
মো: হালিম

মো: হালিম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : অটো রিকশাচালক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

গ্রামীণ জীবনের সরল সুখ
দারিদ্র্যের মাঝেও হালিমের জীবন ছিল শান্তিপূর্ণ। তিনি পেশায় একজন অটোরিকশা চালক। সকাল থেকে পঞ্চগড় জেলার কানাপাড়া গ্রামে ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২ সালে জন্ম নেন মো: আব্দুল হালিম। তার জন্ম এই শ্যামল-সবুজ প্রকৃতির কোলে, যেখানে মাঠের ধান গন্ধ ছড়িয়ে দেয়। মাটির স্নেহ আর আকাশের নিচে গ্রামের মানুষ বাঁচে ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে। ছোটবেলা থেকেই হালিম বেড়ে ওঠেন দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে। বাবা শাহাবুদ্দিন তখন একজন খেটে খাওয়া কৃষক ছিলেন, যিনি আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ, কাজকর্ম তেমন করতে পারেন না। হালিমের মা হালিমা বেগম বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেন, যার শোক আজও তার হৃদয়কে নাড়া দেয়।
ক রাত অবধি সড়কে অটো চালিয়ে যা আয় হতো, তাই দিয়েই চলে সংসার। তার সংসারে আছে দু’টি মেয়ে। একজন সাফা মরিয়ম, বয়স বারো, পড়ে প্রগতি মডেল স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে। মেয়েটি অত্যন্ত মেধাবী ও ভদ্র, বাবার চোখের মনি। আরেকজন ছোট্ট পরী লামিয়া আক্তার তাইয়্যেবা মাত্র দুই বছর বয়স। হাঁটতে শেখা মেয়েটির হাসিমুখ যেন হালিমের জীবন সংগ্রামের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিত। অভাব ছিল, তবে অশান্তি ছিল না। সুখ বলতে এটুকুই নিজের উপার্জনে সন্তানদের একটু একটু করে বড় করা। কিন্তু শান্ত এই জীবন এক সময় হঠাৎই ঝড়ের মুখে পড়ে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের আগুন
২০১৮ সালে ঢাকার রাজপথে শিক্ষার্থীরা দাঁড়ায় কোটা সংস্কারের দাবিতে। তারা বলেছিল, সরকারি চাকরিতে যেন মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়। কারণ, ৫৬ শতাংশ কোটা রেখে মেধাবীদের জন্য মাত্র ৪৪ শতাংশ আসন ছিল, যা তরুণ সমাজে হতাশা তৈরি করেছিল। সরকার তাদের দাবি আংশিক মেনে নিলেও স্থায়ী প্রজ্ঞাপন দেয়নি। পরে একজন ব্যক্তি আদালতে রিট করলে আদালতের আদেশে পুরনো কোটা আবার ফিরে আসে। ২০২৪ সালে জুলাইয়ের মাঝামাঝি, সেই পুরনো ক্ষোভে আগুন জ্বলে ওঠে। সারা দেশের শিক্ষার্থীরা আবার রাস্তায় নামে। তারা চেয়েছিল কেবল একটি ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক কোটা ব্যবস্থা। কিন্তু এই গণতান্ত্রিক দাবির জবাবে সরকার নেমে পড়ে নির্মম দমনপীড়নে। শাহবাগে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও টোকাই সন্ত্রাসীরা শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। নারী শিক্ষার্থীরাও রক্ষা পায়নি। গণধোলাই, রক্তপাত, গুলিবর্ষণ সব ছিল সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। জেলা শহর, উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও।
হালিম তখন তার অটো নিয়ে জীবিকার চিন্তায় ব্যস্ত থাকলেও এই গণআন্দোলন তার মনেও নাড়া দেয়। কারণ তার মেয়েও একজন শিক্ষার্থী। তার ভবিষ্যতও তো এই দেশেই!
রক্তাক্ত ৪ আগস্ট যে দিন সবকিছু বদলে গেল
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, সকাল ১০টা। জায়গা জালাশি ভাসানীর মোড়, পঞ্চগড় সদর। আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ এসে পৌঁছায় হালিমের এলাকাতেও। হালিম সেদিন বাড়িতে বসে থাকতে পারেননি। তিনি ভাবলেন, আমার সন্তানদের জন্যই তো এই দেশ। যদি এখন প্রতিবাদ না করি, তাহলে ভবিষ্যতে ওরা কোথায় দাঁড়াবে?
তিনি তাই স্থানীয় আন্দোলনে শরিক হন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ছাত্র-জনতা যখন নিজেদের দাবি নিয়ে স্লোগানে গলা ফাটাচ্ছিল, তখন ছাত্রলীগ, যুবলীগ আর পুলিশের যৌথ হামলা শুরু হয়। চারদিক থেকে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, সরাসরি গুলিবর্ষণ আর লাঠিচার্জে রণক্ষেত্র হয়ে যায় মোড়টি। ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। হালিমও প্রাণভয়ে পেছনে পালাতে গেলে ছাত্রলীগের কয়েকজন সন্ত্রাসী তাকে ধরে ফেলে। তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। লাঠি, হকস্টিক দিয়ে তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে এমনভাবে আঘাত করা হয় যে, পায়ের হাড় ভেঙে যায়।
তিনি মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকেন। তিনি কাতরাতে কাতরাতে প্রাণভয়ে সামনের দিকে আগাতে থাকেন। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে ছাত্র-জনতা উদ্ধার করে স্থানীয় ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। সেখানে তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিলে তিনি বাড়িতে চলে আসেন।
চিকিৎসার দুর্ভোগ আর অসহায় বাস্তবতা
আব্দুল হালিম প্রথমে গ্রামেই একজন কবিরাজের শরণাপন্ন হন। দিন চলে যায়, ব্যথা কমে না। পা ফুলে ওঠে, হাঁটা তো দূরের কথা, চলাফেরাই দায়। পরে তিনি ভর্তি হন পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে। চিকিৎসকেরা বলেন, হাড়ে গুরুতর ফাটল, জয়েন্টে সমস্যা। সেখানে হালকা কিছু চিকিৎসার পর তাকে রংপুর মেডিকেল পাঠানো হয়। তখন তিনি স্থানীয় এক প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা করান। ধারদেনা করে ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয় তার চিকিৎসায়। বর্তমানে পায়ের জয়েন্টে জোড়া লাগলেও তা পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছেন, ভারী কিছু বহন করা যাবে না। এখনও তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন।
স্বপ্নভঙ্গ আর টিকে থাকার লড়াই
একদিন যে হালিম ছিলেন তার মেয়েদের জন্য এক সাহসী অবলম্বন, আজ তিনিই পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। প্রগতি মডেল স্কুলে পড়া সাফা এখন বাবার জন্য চিন্তায় কাতর থাকে। ছোট মেয়ে লামিয়া এখনো বোঝে না বাবার পায়ে কী হয়েছে, তবে মাঝে মাঝে বাবার পায়ের কাছে বসে কান্না করে। জীবনটা যেন থেমে গেছে হালিমের। আয় নেই, সহায়তা নেই, কেবল সংসারের দায়িত্ব। এই অবস্থায় তিনি শুধু একটাই আশা করেন এই স্বৈরাচারী সরকারের পতন হোক, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর কখনো এই নির্মমতার শিকার না হয়।
তার গলায় একটাই কথা, আমি রাজনীতিবিদ নই, আমি অটোরিকশা চালক। কিন্তু মানুষ হিসেবে অন্যায় দেখেও চুপ থাকতে পারিনি। পায়ে হাড় ভাঙলেও মন ভাঙেনি। এখনও আশা করি, এ দেশের ছাত্ররা একদিন জয়ী হবে।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
স্থানীয় বাজারে একটি মুদির দোকান দিয়ে দেয়া।
প্রস্তাবিত বাজেট
৩ লক্ষ টাকা।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: হালিম
জন্ম তারিখ : ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২
জন্মস্থান : পঞ্চগড়
পেশা : অটো রিকশাচালক
নিজ জেলা : পঞ্চগড়
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : কানাপাড়া, ইউনিয়ন : হাফিজাবাদ, থানা : পঞ্চগড় সদর, জেলা : পঞ্চগড়
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : শাহাবুদ্দিন
মায়ের নাম : হালিমা বেগম, মৃত
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৬০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. সাফা মরিয়ম, বয়স: ১২, পেশা: শিক্ষার্থী (প্রগতি মডেল স্কুল), শ্রেণি: ৭ম, সম্পর্ক: মেয়ে
২. লামিয়া আক্তার তাইয়্যেবা, বয়স: ২বছর, সম্পর্ক: মেয়ে
ঘটনার স্থান : জালাশি ভাসানীর মোড়, সদর
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১০ টা
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ ও যুবলীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍