হোম / আহতদের তালিকা / মো: আতিকুর রহমান শুভ
মো: আতিকুর রহমান শুভ

মো: আতিকুর রহমান শুভ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী (পদার্থবিজ্ঞান, অনার্স ৪র্থ বর্ষ)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

গ্রামবাংলার মাটিতে শুভর বেড়ে ওঠা
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ থানার এক ছোট্ট গ্রাম মালগাঁও। নিস্তব্ধতা আর সবুজের ছায়ায় মোড়া এই গ্রামে জন্ম নিয়েছিল এক শান্ত স্বভাবের, স্বপ্নময় কিশোর মো: আতিকুর রহমান শুভ। তার জন্ম ২০০০ সালের ৫ই মে। কৃষক পিতা মো: আবুল কালাম আজাদ আর গৃহিণী মা মোছা: জাহানারা বেগমের ঘরে সে ছিল দ্বিতীয় সন্তান। বড় ভাই সাগর আহমেদ সানি ও ছোট বোন ইশরাত জাহান নিশুকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল তাদের পাঁচ সদস্যের নির্লোভ এক পরিবার। কোটা সংস্কার আন্দোলনের
এক তরুণ সৈনিক

গ্রামের মাটির গন্ধ, কাঁচা রাস্তায় সাইকেল চালানো আর পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি। এই ছিল শুভর শৈশবের সারাংশ। তার বাবার পকেট কখনোই খুব বেশি সচ্ছল ছিল না, তবুও কখনো সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়নি। বাবা চাষাবাদ করতেন, মা সংসার সামলাতেন। আর শুভ পড়াশোনায় এগিয়ে যেতে থাকত ধীরে ধীরে, নীরবে। পাঠশালা শেষ করে সে ভর্তি হয় পীরগঞ্জের একটি কলেজে। পরবর্তীতে মেধার জোরে সে স্থান করে নেয় দিনাজপুর সরকারি কলেজে, পদার্থবিজ্ঞান অনার্সের শিক্ষার্থী হিসেবে। চতুর্থ বর্ষে পৌঁছানো ছেলেটির স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা নিয়ে একদিন দেশের জন্য কিছু করবে। দেশের কৃষক পরিবার, সাধারণ মানুষ, নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াবে। সে শুধু নিজের জন্য নয়, নিজের চারপাশের মানুষের জন্যই ভাবত বেশি।

আন্দোলনের আগুন ২০১৮ থেকে ২০২৪
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় শুভ ছিল দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। তখন থেকেই সে সমাজের অন্যায়, বৈষম্য, অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখেছিল। দেশের লাখো শিক্ষার্থীর মতো তার মনেও প্রশ্ন জেগেছিল, কেন মেধাবীরা বঞ্চিত হবে, কেন বৈষম্য থাকবে রাষ্ট্রের চাকরিতে?
সেই আন্দোলনে সে সরাসরি জড়িত না থাকলেও, মনের ভেতর এক স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল। ২০১৮ সালের আন্দোলন দমন হলেও প্রশ্নগুলো থেকে গিয়েছিল সমাজে, শুভর মনে। ২০২৪ সাল। আবার জেগে উঠল শিক্ষার্থীরা। দাবির কেন্দ্রবিন্দু সেই পুরোনো কথা, ন্যায়বিচার, সমতা, কোটা সংস্কার। শুভ এবার আর দর্শক নয়, সক্রিয় সৈনিক। দিনাজপুর কলেজ মোড়ে, জেলা স্কুল চত্বরে, পলিটেকনিক মোড়ে যেখানেই আন্দোলন, সেখানেই শুভ। সে শুধু স্লোগান দেয়নি, নেতৃত্বও দিয়েছে। তার মতো হাজারো শিক্ষার্থী ছিল যারা বিশ্বাস করত এই আন্দোলন তাদের ভবিষ্যতের জন্য, বঞ্চিতদের জন্য, একটি ন্যায্য সমাজ গড়ার জন্য। তারা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি চালাত, রাস্তায় দাঁড়িয়ে সচেতনতা তৈরি করত, বক্তব্য দিত তবুও সহ্য হয়নি ক্ষমতাসীনদের কাছে।
দুবার আহত শুভ, তবুও দমে যায়নি

১৬ জুলাই ২০২৪।
দিনাজপুর সরকারি কলেজ মোড়ে চলছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন। রাস্তা ব্লক করা হয়, শত শত শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে থাকে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে। শুভও ছিল তাদের একজন। শুরুতে কিছু সময় শান্তিপূর্ণ থাকলেও, আধাঘণ্টা পর হঠাৎই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এসে তাদের আন্দোলন বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। ছাত্ররা অনড়, শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান চালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসী মেয়েদের ওপর হামলা চালায়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, কেউ কেউ ছুটে পালায়। শুভ তখনও পিছু হটেনি। সে সামনে দাঁড়িয়েছিল, প্রতিবাদ জানিয়েছিল। তবে তাদের কথা কে শুনে? ছাত্রলীগ আর পুলিশের যৌথ লাঠিচার্জে অনেকেই মারাত্মকভাবে আহত হয়। শুভ নিজেও পড়ে যায় আঘাতের শিকার ঘাড়, পা ও কাঁধে লাঠির আঘাতে ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ে সে। কিন্তু সেদিন আন্দোলন থেমে যায়নি, বরং তাদের মনোবল আরও দৃঢ় হয়।

৪ আগস্ট ২০২৪।
দিনাজপুর পলিটেকনিক মোড় থেকে শুরু হওয়া এক দফার আন্দোলনে শুভ আবারও ছিল সম্মুখ সারিতে। বালুবাড়ীর জোড়াব্রিজে পৌঁছাতেই পুলিশের টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ শুরু হয়। বিষাক্ত গ্যাসে তার চোখ জ্বলতে থাকে, কাশতে কাশতে রক্ত উঠে আসে মুখ দিয়ে। হঠাৎ শ্বাসকষ্টে সে প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এক পাশের গলিতে গিয়ে সে কিছু সময় আশ্রয় নেয়, কিন্তু থেমে থাকেনি। ৪৫ মিনিট পর আবার ফিরে আসে মিছিলে। তখনই পুলিশ শুরু করে গুলিবর্ষণ। সেই গুলির এক টুকরো স্প্লিন্টার গিয়ে তার হাতে আঘাত করে। ব্যথায় কাতর শুভ তখনো অন্যদের বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। তার চোখ, শ্বাসনালী আর হাতে গভীর ক্ষতের দাগ রেখে যায় সেই দিন।

চিকিৎসার বেদনা ও সাহস
১৬ জুলাই-এর আঘাতের পরপরই শুভকে স্থানীয় পরিচিত এক চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। সেখানে তার ঘাড়, কাঁধ ও পায়ের ক্ষত জায়গাগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। লাঠির আঘাতে তার চলাফেরাও কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবারের লোকজন আর আন্দোলনের বন্ধুরা তাকে সেবাযত্ন করে। ৪ আগস্ট ছিল আরও ভয়াবহ। বিষাক্ত টিয়ার গ্যাসে তার চোখের ক্ষরণ শুরু হয়। নিশ্বাস নিতে পারছিল না, মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসছিল বারবার। দ্রুত তাকে নেওয়া হয় ইসলামি ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতালে। সেখানেই তার চোখ, শ্বাসনালী ও হাতে গুলির আঘাতের প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসকেরা বলেন, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন। শুভর হাতে ব্যান্ডেজ, চোখে ওষুধ, মুখে ইনহেলার এই নিয়েই সে ফিরেছিল হাসপাতাল থেকে। অথচ এই যন্ত্রণাতেও তার চোখে ছিল এক গভীর দৃঢ়তা এই সংগ্রাম থামানো যাবে না।

নাম : মো: আতিকুর রহমান শুভ
জন্ম তারিখ : ৫ মে ২০০০
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : শিক্ষার্থী (পদার্থবিজ্ঞান, অনার্স ৪র্থ বর্ষ)
প্রতিষ্ঠান : দিনাজপুর সরকারি কলেজ
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: মালগাঁও, ইউনিয়ন: ৭নং হাজিপুর, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: আবুল কালাম আজাদ
মায়ের নাম : মোছা: জাহানারা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৪
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৮
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. সাগর আহমেদ সানি, বয়স: ২৫, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: অনার্স ৪র্থ বর্ষ, সম্পর্ক: ভাই
২. ইশরাত জাহান নিশু, বয়স: ১৭, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: দ্বাদশ, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : জোড়া ব্রিজ, কলেজ মোড়, দিনাজপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৬ জুলাই ২০২৪ এবং ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টা
আক্রমণকারী : পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍