হোম / আহতদের তালিকা / আব্দুল করিম
আব্দুল করিম

আব্দুল করিম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী, বিজিবি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

কৃষক ঘরের এক স্বপ্নচারী সন্তান আব্দুল করিমের শৈশব

২০০২ সালের ৩০ ডিসেম্বর, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামে জন্ম নেন আব্দুল করিম। একজন সাধারণ ঘরের অসাধারণ সাহসী সন্তান। তাঁর জন্ম এক কৃষক পরিবারে। পিতা মোঃ জাফর আহমদ (৪২) পেশায় একজন কৃষক; মাটি চষে, ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের পাঁচ সন্তানকে বড় করে তুলছেন তিনি। মা জয়নাব খাতুন (৩৫) একজন গৃহিণী, যিনি নিঃশব্দে ভালোবাসার ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছেন সংসার।পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আব্দুল করিম মাঝের একজন। বড় বোন জান্নাতুল ফেরদৌস (২৭) ইতোমধ্যে বিবাহিত এবং ফাজিল শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট ভাই আব্দুর রহিম (২০) কলেজে পড়ে। দুই ছোট বোনের মধ্যে জান্নাতুল মাওয়া (১৭) দশম শ্রেণিতে এবং সবার ছোট ভাই আব্দুল ওয়াহেদ (১৫) সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। করিমের বাবা একজন কৃষক হলেও তাঁর স্বপ্ন ছিল সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলা যাতে তারা মাটির সীমা পেরিয়ে আকাশ ছুঁতে পারে।
অসম বাস্তবতা: শিক্ষিত হয়েও অনিশ্চয়তা
আব্দুল করিম নিজের পড়াশুনা শেষ করে বড় কিছু করার স্বপ্ন বুনছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায় আর্থিক সীমাবদ্ধতা ছিল চিরসঙ্গী। এর পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা নীতি, নিয়োগে দলীয়করণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং মেধাহীনদের নিয়োগের দুঃসংবাদ তাঁর ভবিষ্যতকে অন্ধকার করে তোলে। তিনি ছিলেন সেই লক্ষ লক্ষ তরুণদের একজন, যারা রাষ্ট্রের কাছে সমান সুযোগ দাবি করেছিল, কিন্তু বদলে পেয়েছিল নিগ্রহ ও অবহেলা।

৪ আগস্ট ২০২৪: রক্তাক্ত বিকেল ও সাহসিকতার মুহূর্ত
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অথচ গৌরবময় দিন। সে দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সারাদেশের সাধারণ জনগণ ও ছাত্রসমাজ আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর চাম্বল বাজার মোড়ে সেদিন ঘটেছিল এক লোমহর্ষক বেদনাহত ঘটনা। আব্দুল করিম চাম্বল বাজার মোড়ে সেদিন মিছিলে অংশ নেন। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সেই মিছিল আচমকা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। মিছিলটি বিকাল ৪টার দিকে বাজারে আসা মাত্র ওঁতপেতে থাকা আওয়ামী লীগের স্থানীয় চেয়ারম্যান মুজিবের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ইট-পাটকেল, রড, লাঠি, দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মিছিলের ওপর আক্রমণ চালায়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। হঠাৎ করে সামনে থেকে গোলাগুলি শুরু হয়। এরই মধ্যে একপর্যায়ে করিমের মাথা ও পিঠে গুলি লাগে। তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে যান। তাঁর চিৎকার, মিছিলের উত্তাল শ্লোগান, আর বন্দুকের গর্জনে মুহূর্তেই চাম্বল বাজার যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। কিছু আন্দোলনকারী ভাই তার দিকে ছুটে গিয়ে তাঁকে রক্ষা করেন। কোলে তুলে নেন আব্দুল করিমকে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা করিমকে সেখান থেকে বের করে আনেন। আব্দুল করিমের শরীর তখন রক্তাক্ত। পুরো রাস্তায় তার রক্তের দাগ। এই অবস্থায় সদর হাসপাতালে নেয়ার কোনো উপায় তখন ছিল না। ওঁতপেতে থাকা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়। আহতদের ওপর দ্বিতীয় দফায় আক্রমণ চালায়। তাই গুলিবিদ্ধ আব্দুল করিমকে তার সহযোদ্ধা ও আন্দোলনকারী গোপনে গ্রামের এক ডাক্তারখানায় নিয়ে যান, সেখানে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।

কিন্তু গোপনে তার যথাযথ চিকিৎসা লাভ করা সম্ভব ছিল না। তার শারীরিক অবস্থা ক্রমশ অবনত হতে থাকলে আত্মীয়-স্বজন ও সহযোদ্ধারা তাকে নিয়ে বেসরকারি একটি হাসপাতালে ভর্তি করে। অবস্থা এতোই ভয়াবহ ছিল যে, আহত শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার চিকিৎসার সুযোগটুকুও ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা দেয়নি। অনেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে, অনেকে সুচিকিৎসার অভাবে শহীদ হয়ে যায়। যা আজ চিন্তা করাও যেন কঠিন। অতঃপর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পলায়নের পর আব্দুল করিম বিভাগীয় একটি বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি হয়। সেখানেই তার চিকিৎসা চলতে থাকে। একসময় সে বাড়িতে চলে আসে।
নীরব প্রতিবাদ থেকে রক্তাক্ত ভূমিকা

আব্দুল করিম তখন শুধুমাত্র একজন শিক্ষিত বেকার তরুণই ছিলেন না তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এক বাস্তব দলিল। তার শরীরের গুলির চিহ্ন যেন প্রমাণ করে দেয় এই দেশে সত্য বলা, অধিকার দাবি করা এবং প্রতিবাদ করা এখন একটি অপরাধ। আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমে ছাত্র- ছাত্রীদের ট্যাগ দেয় ‘রাজাকার’ বলে। তারপর শুরু করে দমননীতি আর বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ড।
তার ওপর চালানো এই বর্বর হামলা শুধু তার শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করেনি, একটি পরিবারের ভরসা, একটি গ্রামের সম্ভাবনা এবং একটি প্রজন্মের স্বপ্নকেও চূর্ণ করেছে।
গ্রামে ফিরে, এক অসমাপ্ত যুদ্ধের স্মৃতি
বর্তমানে করিম গ্রামের নিজ ঘরে থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু তাঁর মাথা ও পিঠে গুলির ক্ষতচিহ্ন এখনো ব্যথা দেয়, মনে করিয়ে দেয় আন্দোলনের সেই রক্তাক্ত বিকেলকে। তার পরিবারের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন, কারণ এখনও সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস কৃষিকাজই। তিনি এখন চিকিৎসা ও নিরাপত্তার অভাবে দিন কাটাচ্ছেন এক উদ্বেগ অনিশ্চয়তার মধ্যে। তবু তাঁর চোখে এখনো আলো আছে আলো আছে পরিবর্তনের, সমতার এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের।

করিম মানে কণ্ঠরুদ্ধ একটা বাংলাদেশ
আব্দুল করিম কেবল একজন আহত প্রতিবাদকারী নন, তিনি হচ্ছেন সেই তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা সমান অধিকার চেয়েছিল, কিন্তু উত্তরে পেয়েছে গুলি আর লাঠি। তাঁর গল্প যেন গোটা বাংলাদেশেরই এক প্রতিচ্ছবি যেখানে গণতন্ত্র মুখে থাকলেও বাস্তবে প্রতিবাদ মানে শত্রু হওয়া।
এখন সময় করিমের পাশে দাঁড়াবার। সময় তাকে শুধু সহানুভূতির নয়, ন্যায্য বিচার ও চিকিৎসার অধিকার দেয়ার। কারণ করিমের গল্প শুধু তার একার নয় এটি আমাদের সময়ের, আমাদের সমাজের, আমাদের দায়বদ্ধতার প্রতিচ্ছবি।

আক্রমণকারী
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর চাম্বল বাজারে ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণে নেতৃত্ব দেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান মুজিবের গুণ্ডাবাহিনী, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা এবং তাদের সাথে ছিল পুলিশ। অনেকের হাতে ছিল অস্ত্র, চাপাতি, লাঠিসোঁটা
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ০৪-০৮-২০২৪, বিকাল-৪টা
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. যোগ্যতা অনুসারে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা

নাম : আব্দুল করিম
জন্ম তারিখ : ৩০/১২/২০০২
জন্মস্থান : পশ্চিম বড়ঘোনা, ইউনিয়ন-গণ্ডামারা, থানা-বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী, বিজিবি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : অধ্যয়নরত, বিজিবি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম
স্থায়ী ঠিকানা : পশ্চিম বড়ঘোনা, ইউনিয়ন-গণ্ডামারা, থানা-বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : পশ্চিম বড়ঘোনা, ইউনিয়ন-গণ্ডামারা, থানা-বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
পিতা : মোঃ জাফর আহমদ/পেশা-কৃষক/বয়স-৪২
মাতা : জয়নাব খাতুন/পেশা-গৃহিণী/বয়স-৩৫
মাসিক আয় : ৯ হাজার টাকা
বাড়ি : টিনের বাড়ি, ৪ গণ্ডা পরিমাণ জমি
আয়ের উৎস : কৃষিকাজ
পরিবারের সদস্য : ০৭ জন
ভাই-বোনের তথ্যাদি
১. জান্নাতুল ফেরদৌস, সম্পর্ক: বোন, বয়স:২৭ পেশা: শিক্ষার্থী-ফাজিল (বিবাহিত)
২. আব্দুর রহিম, সম্পর্ক: ভাই, বয়স: ২০, পেশা: শিক্ষার্থী (কলেজ)
৩. জান্নাতুল মাওয়া, সম্পর্ক: বোন, বয়স: ১৭, পেশা: শিক্ষার্থী, ১০ শ্রেণি
৪. আব্দুল ওয়াহেদ, সম্পর্ক: ভাই, বয়স: ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী: ৭ম শ্রেণি

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍