হোম / আহতদের তালিকা / মো: আবু জাফর
মো: আবু জাফর

মো: আবু জাফর

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী, ফেনী সরকারি কলেজ

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

তার পিতা মো: খলিল মাতাব্বর, একজন পরিশ্রমী কৃষক দীর্ঘ প্রবাসজীবনের একঘেয়েমি ও ত্যাগের বিনিময়ে সন্তানদের মুখে হাসি ফুটাতে চেয়েছিলেন তিনি। মা, খাদিজা বেগম, ৪৫ বছর বয়সী এক মমতাময়ী গৃহিণী। তিনিই ছিলেন আবু জাফরের প্রথম শিক্ষক, আদর্শের বীজ যিনি সন্তানের হৃদয়ে বুনে দিয়েছিলেন।

১০ সদস্যের এক বড় পরিবারে বেড়ে উঠলেও, আবু জাফর সবসময় আলাদা ছিল তার মেধা, স্পষ্টভাষী মনোভাব আর সাহসিকতায়। ফেনী সরকারি কলেজে শিক্ষার্থী হিসেবে অধ্যয়নরত এই তরুণ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ছাত্রসমাজের আস্থার নাম, পথ প্রদর্শকের আলো। বর্তমানে তার বসবাস ফেনী সদর থানার অন্তর্গত ভাঙ্গাতাকিয়া ইউনিয়নের মাস্টারবাড়ী গ্রামে। সেখান থেকেই তিনি ছাত্র-জনতার দাবিতে রাজপথে নামেন কলম ফেলে নেন প্ল্যাকার্ড, স্লোগান আর রক্তমাখা সাহস।

আন্দোলনে অংশগ্রহণ
আবু জাফরের নামটি আজ ফেনীর মাটিতে এক অগ্নিশিখার মতো জ্বলে আছে। তিনি শুধু একজন ছাত্রই নন, ছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাহসী সৈনিক, ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক কণ্ঠস্বর। শুরু থেকেই ভোট আন্দোলন, কোটা আন্দোলন কিংবা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম প্রতিটি পদযাত্রায়, প্রতিটি স্লোগানে, প্রতিটি মিছিলে তাঁর দৃপ্ত উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। মিছিলের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে তিনি যেন প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন সেই প্রজন্মের, যারা বুকের রক্ত দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বুনছিল।
৪ আগস্ট ২০২৪ সেই রক্তাক্ত দুপুর। বেলা দুইটার দিকে নোয়াখালী ট্রাফিক চত্বর রোডে ছাত্ররা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে অবস্থান নেয়। চারদিকে উত্তাল জনতার কণ্ঠ, স্লোগানে মুখর আকাশ। সবার মুখে একটি স্লোগানই ছিল “এক দফা এক দাবি হাসিনা তুই কবে যাবি” “কথায় কথায় রাজাকার, বাংলা কি তোর বাপ দাদার”। কিন্তু সেই গর্জনের মাঝেই নেমে আসে অমানবিক আঘাত পুলিশের গুলি, আওয়ামী সন্ত্রাসীদের রামদা ও পিস্তলের বর্বর আক্রমণ। রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আবু জাফর। তাঁর শরীরে বিধে যায় এগারোটি বুলেট। একটি পায়ে, একটি হাতে, একটি মাথায় আর অসংখ্য গুলি তাঁর দেহকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। মাথায় লাগা বুলেট আজও বের করা যায়নি, যা তাঁর জীবনকথায় হয়ে আছে এক নীরব সাক্ষ্য কী ভয়ংকর মূল্য চুকাতে হয়েছিল গণতন্ত্রের জন্য, ন্যায়বিচারের জন্য, সমতার জন্য।
কিন্তু বুলেটের ক্ষতও থামাতে পারেনি তাঁর অঙ্গীকারকে। রক্তাক্ত অবস্থায়ও তাঁর চোখে ছিল অদম্য দীপ্তি, যেন তিনি বলছেন “এই লড়াই থেমে থাকবে না, আমার শরীর ভেঙে পড়লেও আমার স্বপ্ন ভাঙবে না

চিকিৎসা
চার আগস্ট ২০২৪। ফেনীর মহিপাল জুড়ে তখন উত্তাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেদিনের রক্তাক্ত দুপুরে, যোহরের নামাজ শেষ হওয়ার আগেই রাজপথ রঞ্জিত হয় গুলির শব্দে।

আবু জাফর একজন সাহসী ছাত্রনেতা, ফেনী জেলার আন্দোলনের মুখ হামলার প্রধান লক্ষ্য হয়ে পড়েন। তার শরীরে বিদ্ধ হয় একে একে ১১টি বুলেট। রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। পা, হাত, বুক, এমনকি মাথাও গুলিবিদ্ধ তবু চোখে ছিল আগুন, ছিল প্রতিরোধের ভাষা।

আতঙ্কের মধ্যে তার সহযোদ্ধারা এগিয়ে আসে। তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় কাছাকাছি একটি হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও অপেক্ষা করছিল আরেক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। চিকিৎসার জায়গায় ছিল শাসকদলের অনুসারীরা চোখ রাঙানো, হুমকি, আর অন্ধ নির্যাতনের ভয়। কেউ তার শরীরের দিকে এগিয়ে এলো না। যেন মানবতা হারিয়ে ফেলেছিল সব সংবেদন। একজন গুলিবিদ্ধ ছাত্রনেতা, মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, আর হাসপাতালের শীতল দেয়ালগুলো নির্বাক দাঁড়িয়ে দেখছে নির্মম এ অমানবিকতা।

বন্ধুরা হতাশ হননি। সময় নষ্ট না করে তারা আবু জাফরকে নিয়ে যায় ফেনীর আলকেমী হাসপাতালে, যেখানে শুরু হয় তার প্রাথমিক চিকিৎসা। রক্তস্নাত দেহ, ব্যথায় কাঁপতে থাকা জ্ঞান হারাতে বসা মুখ সবকিছু পেরিয়ে চিকিৎসকের ছুরির নিচে আবারও জেগে ওঠে এক যোদ্ধা।

বুকে, হাতে, পায়ে থাকা কয়েকটি বুলেট বের করা সম্ভব হয়। কিন্তু মাথায় থাকা বুলেটটি এখনো তার শরীরে রয়ে গেছে প্রতিদিন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় একটি বিশ্বাসঘাতক দিনের, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের চিহ্ন। পরবর্তী পর্যায়ে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নেওয়া হয় ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার শরীরের আরও কয়েকটি বুলেট অপসারণ করা হয়। হয়তো সত্যিই অলৌকিক। অথবা, এটিই হলো আদর্শে বলীয়ান একজন নেতার অবিনাশী সত্তা।
আজো তার মাথার বুলেট রয়ে গেছে। সেই বুলেট যেন আন্দোলনের ইতিহাসে একটি জীবন্ত চিহ্ন একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন, যে প্রশ্ন করে রাষ্ট্রকে, সমাজকে, আর আমাদের বিবেককে।

প্রস্তাবনা
উনি এখনো পড়াশোনা করছেন তাই স্কলারশিপের ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হতো।জন্মপরিচয়
১৮ মার্চ ১৯৯৯ ফেনীর শান্ত সরল গ্রাম ছনুয়ায়, টংগীর পাড়ের মাটিতে জন্ম নেয় এক সন্তান যার চোখে ছিল স্বপ্ন, হৃদয়ে ছিল আদর্শ, আর ভবিষ্যতে লুকিয়ে ছিল আগুনের গল্প। মো: আবু জাফর একজন সাধারণ কৃষিপ্রধান এলাকার সন্তান, যার বেড়ে ওঠা হয়েছিল মেঠোপথের ধুলো মেখে, নদীর পাশে বিকেলবেলা দৌড়ে আর স্কুলব্যাগ কাঁধে করে স্বপ্ন বোনার মধ্য দিয়ে। মা-বাবার চোখের মণি, প্রতিবেশীর আদরের ছেলেটি খুব কম বয়সেই বুঝে গিয়েছিল জীবনের অন্য নাম লড়াই।





একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আবু জাফর
জন্মতারিখ : ১৮-০৩-১৯৯৯
জন্মস্থান : ফেনী
পেশা : শিক্ষার্থী, ফেনী সরকারি কলেজ
স্থায়ী ঠিকানা : টংগীর পাড়, ছনুয়া, ফেনী
ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : মাস্টারবাড়ী, ইউনিয়ন: ভাংগাতাকিয়া, থানা: ফেনী সদর, জেলা: ফেনী
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: খলিল মাতাব্বর
পিতার পেশা ও বয়স : প্রবাসী, ৬০
মায়ের নাম : খাদিজা বেগম
মাতার পেশা ও বয়স : গৃহীনি, ৪৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ১০
আহত হওয়ার স্থান : মহিপাল ট্রাফিক মোড়ে, ফেনী
আহত হওয়ার সময় : ০৪-০৮-২০২৪
আক্রমণকারী : আওয়ামী লীগ নেতা খোকন হাজারী বাবুল নিজাম ও অঙ্গ সংগঠনের সন্ত্রাসী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍