মো: মোহাম্মদ আলী
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
চাকুরিজীবী
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
মোহাম্মদ আলী
ক্রমিক- ৪২২
আইডি: চট্টগ্রাম বিভাগ- ১২
চট্টগ্রামের পূর্ব শহীদ নগরের সন্তান মোহাম্মদ আলী। বয়স মাত্র ছত্রিশ বছর। সংসারের হাল ধরতে বহু কষ্টে একটি চাকরি পেয়েছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল মায়ের মুখে হাসি ফোটানো, ছোট্ট মেয়েদের মানুষ করা এবং অল্প আয়ে হলেও পরিবারকে সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখা। কিন্তু ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের এক সকালে সেই স্বপ্ন হঠাৎ করেই ভেঙে যায়। যে স্বপ্নের দেশে তিনি পরিবার নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন, সেই দেশেই তিনি গুলি খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে পড়েন।
স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের বর্বরতা ও নাজমুলের আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, রবিবার। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ফজরের নামাজ শেষে ষোলো বছরের কিশোর নাজমুল হোসেন নীরবে প্রস্তুতি নিতে থাকে। পরিবারকে সে কিছুই বলে না কারণ বাবা-মা জানলে কখনোই তাকে রাজপথে যেতে দিতেন না। মা যখন চোখে স্নেহমাখা হাসি রেখে তাকে বিদায় জানালেন, বাবা তখনও ভাবছিলেন সন্তানের নিরাপদ শিক্ষাজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু নাজমুল ঘর থেকে বেরিয়ে বলে, “প্রাইভেটে যাচ্ছি।” বাস্তবে, তার হৃদয়ে ছিল অন্য শপথ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, গণআন্দোলনের কণ্ঠে নিজের কণ্ঠ মিলিয়ে দেওয়া।
কিছু বড় ভাইদের সাথে সে দিনের মধ্যেই ফেনীর মহীপাল এলাকায় চলে আসে। দুপুরে জোহরের নামাজ শেষে সে যোগ দেয় এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে। স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল চারপাশ মানুষ চাইছিল ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র আর স্বাধীনতার প্রকৃত চর্চা। নাজমুলের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, কোনো রাজনৈতিক স্বার্থও ছিল না। তার সঙ্গে ছিল শুধু দেশের ভবিষ্যতের জন্য আশা আর সহপাঠীর মতো নির্ভীক অংশগ্রহণ।
কিন্তু হঠাৎই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। আওয়ামী লীগের প্রহরীসুলভ সন্ত্রাসী বাহিনী আর ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। লাঠি, রড, বন্দুক হাতে তারা একের পর এক আঘাত আর গুলি চালাতে থাকে নিরস্ত্র জনতার উপর। এই আক্রমণ ছিল পূর্বপরিকল্পিত যেন ভিন্নমতের কণ্ঠকে রক্ত দিয়ে স্তব্ধ করা যায়।
এই বর্বর হামলার শিকার হয় নাজমুলও। মুহূর্তেই তার ঠোঁট ও মাথায় গুলি লাগে। কিশোরের বুকচেরা আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায়, শরীর রক্তে ভেসে যায়। যে ছেলেটি কিছুক্ষণ আগেও বইয়ের স্বপ্ন দেখছিল, তার জীবন হঠাৎই গুলির ক্ষতচিহ্নে ভরে যায়। ষোলো বছরের একটি কোমল প্রাণ রাজপথে ছটফট করতে থাকে আর চারদিক সাক্ষ্য দেয়, কিভাবে আওয়ামী ছত্রছায়ায় নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়েছে।
নাজমুলের গল্প শুধু একজন শিক্ষার্থীর কাহিনি নয়। এটি প্রমাণ করে, স্বৈরাচারী ক্ষমতালোভী শক্তি কতটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার পাশাপাশি এমনকি নিরীহ শিক্ষার্থী কিশোরদেরও ছাড়েনি। যে ছেলেটির হাতে কলম থাকার কথা, যার স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা নিয়ে পরিবারকে আলোকিত করা তার কপালে তারা ঠাঁই করে দিল রক্তাক্ত গুলির ক্ষত।
এই হামলা শুধু নাজমুলের বিরুদ্ধে নয় এটি পুরো জাতির ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে কলঙ্কজনক আঘাত। ষোলো বছরের এক কিশোরের রক্ত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় স্বৈরাচার ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে কতটা নির্মম হতে পারে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ কেউ নিরাপদ নয়, যদি তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। নাজমুলের ক্ষতচিহ্ন, তার পরিবারের অশ্রু, আর তার অকাল রক্তক্ষরণ তাই এক জাতির রক্তাক্ত ইতিহাস হয়ে থাকবে যা প্রমাণ করবে, গণমানুষের শক্তিকে কোনো স্বৈরাচারই চিরকাল দমন করতে পারে না।
আহত হওয়ার পর
চারদিকে তখন শুধু চিৎকার আর দৌড়ঝাঁপ। আওয়ামী পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের ভয়ে অনেকেই ছুটছিল জীবন বাঁচাতে। তবুও কিছু সাহসী ছাত্র ও সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসে আলীকে বাঁচাতে। তারা তাকে দ্রুত তুলে নিয়ে যায় চট্টগ্রামের ন্যাশনাল হাসপাতালে। গুলির ব্যথায় কাতরাতে থাকা মোহাম্মদ আলীর চোখে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন এই কি সেই দেশ, যেখানে সাধারণ মানুষ কণ্ঠ তুললেই স্বৈরাচার গুলি চালায়?
পরে তাকে শমসের পাড়া হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই শুরু হয় প্রাথমিক চিকিৎসা। গুলির ক্ষত ছিল গুরুতর; বিশেষ করে বুকের আঘাত তাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। ডাক্তাররা সর্বাত্মক চেষ্টা করেন এবং ধীরে ধীরে তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। তবে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পরও তাকে বারবার ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। চিকিৎসা চলতে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে।
চিকিৎসা ও সংগ্রাম
মোহাম্মদ আলী একজন সাধারণ চাকরিজীবী। মাসিক আয় মাত্র ১২ হাজার টাকা। সেই সামান্য আয়ে মায়ের ভরণপোষণ, দুই কন্যার পড়াশোনা আর আট সদস্যের সংসারের খরচই যেখানে সামলানো কষ্টকর, সেখানে আকস্মিক এই চিকিৎসা ব্যয় একেবারেই অমানবিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
তার মা মরিয়ম বেগম, বয়স ৬০ বছর। স্বামীহারা এই বৃদ্ধা মায়ের ভরসা ছিল একমাত্র ছেলে। সেই ছেলেকেই আজ রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে তার বুক ফেটে যায়। দুই কন্যা নুসরাত জাহান (১৩) ও ছোট্ট হুমায়রা (৩) বাবার কষ্ট বুঝে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সংসারের প্রতিটি দিন তখন শুধু ব্যথা, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তায় ভরা।
অপারেশনের পর থেকে কিছুটা সুস্থ হলেও মোহাম্মদ আলীর শরীর আর আগের মতো নেই। হাঁটতে গেলে ব্যথা করে, বুকের ক্ষত মনে করিয়ে দেয় সেই দুঃসহ দিনটির কথা। চিকিৎসকরা তাকে বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন, কিন্তু সংসারের চাপে সেটি মানা প্রায় অসম্ভব।
পরিবার ও পুনর্বাসন
মোহাম্মদ আলীর পরিবার আজও লড়ছে। তাদের মাসিক আয় সীমিত, ঘরটি সেমিপাকা, সাথে মাত্র এক গণ্ডা জমি। এই বাস্তবতায় পরিবারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভবিষ্যৎ বড়ই অনিশ্চিত। তবুও আলীর আশা একদিন হয়তো ভালো একটি চাকরি পেলে সংসারের ভার কিছুটা লাঘব হবে।
পুনর্বাসনের জন্য তার প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল কাজ, যাতে পরিবারের পাঁচ সদস্যের জীবন কিছুটা হলেও নিরাপদ হয়। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে কোনো সহায়তা এখনো তারা পায়নি। বরং যে রাষ্ট্র তাকে গুলি করেছে, সেই রাষ্ট্র আজ নীরব দর্শক।
একটি জাতির প্রতিচ্ছবি
মোহাম্মদ আলীর ঘটনা কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো জাতির জন্য এক লজ্জাজনক সাক্ষ্য। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা প্রমাণ করে দিয়েছে তাদের কাছে গণতন্ত্র মানে নিছক ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা। সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী কিংবা নিরীহ শিক্ষার্থী কেউই তাদের দমননীতির বাইরে নয়।
আলীর রক্তাক্ত শরীর আজ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই দেশে সত্য বলাই অপরাধ, এই দেশে ন্যায়ের জন্য দাঁড়ানো মানেই গুলির মুখে পড়া।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোহাম্মদ আলী
জন্ম : ১০ জুলাই ১৯৮৮, পূর্ব শহীদ নগর, চট্টগ্রাম
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম পূর্ব শহীদ নগর, থানা বায়েজিদ, ৩নং ওয়ার্ড, চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : মহব্বত সর্দার বাড়ি, থানা বায়েজিদ, ৩নং ওয়ার্ড, চট্টগ্রাম
পেশা : চাকুরিজীবী
পরিবার : ৮ সদস্য
মা মরিয়ম বেগম (৬০, গৃহিণী); ২ কন্যা নুসরাত জাহান (১৩, ৯ম শ্রেণি), হুমায়রা (৩, শিশু)
মাসিক আয় : ১২,০০০ টাকা (চাকুরি)
আহত হওয়ার স্থান : নিউমার্কেট মোড়ে
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১টা
আক্রমণকারী : স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের গুলিতে আহত
চিকিৎসা : ন্যাশনাল হাসপাতাল শমসের পাড়া হাসপাতাল পরবর্তীতে বাসায় ও ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা
অবস্থা : অপারেশনের পর মোটামুটি ভালো আছেন, তবে নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন
পুনর্বাসন : ভালো একটি চাকরি ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সহায়তা জরুরি
ক্রমিক- ৪২২
আইডি: চট্টগ্রাম বিভাগ- ১২
চট্টগ্রামের পূর্ব শহীদ নগরের সন্তান মোহাম্মদ আলী। বয়স মাত্র ছত্রিশ বছর। সংসারের হাল ধরতে বহু কষ্টে একটি চাকরি পেয়েছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল মায়ের মুখে হাসি ফোটানো, ছোট্ট মেয়েদের মানুষ করা এবং অল্প আয়ে হলেও পরিবারকে সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখা। কিন্তু ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের এক সকালে সেই স্বপ্ন হঠাৎ করেই ভেঙে যায়। যে স্বপ্নের দেশে তিনি পরিবার নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন, সেই দেশেই তিনি গুলি খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে পড়েন।
স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের বর্বরতা ও নাজমুলের আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, রবিবার। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ফজরের নামাজ শেষে ষোলো বছরের কিশোর নাজমুল হোসেন নীরবে প্রস্তুতি নিতে থাকে। পরিবারকে সে কিছুই বলে না কারণ বাবা-মা জানলে কখনোই তাকে রাজপথে যেতে দিতেন না। মা যখন চোখে স্নেহমাখা হাসি রেখে তাকে বিদায় জানালেন, বাবা তখনও ভাবছিলেন সন্তানের নিরাপদ শিক্ষাজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু নাজমুল ঘর থেকে বেরিয়ে বলে, “প্রাইভেটে যাচ্ছি।” বাস্তবে, তার হৃদয়ে ছিল অন্য শপথ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, গণআন্দোলনের কণ্ঠে নিজের কণ্ঠ মিলিয়ে দেওয়া।
কিছু বড় ভাইদের সাথে সে দিনের মধ্যেই ফেনীর মহীপাল এলাকায় চলে আসে। দুপুরে জোহরের নামাজ শেষে সে যোগ দেয় এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে। স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল চারপাশ মানুষ চাইছিল ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র আর স্বাধীনতার প্রকৃত চর্চা। নাজমুলের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, কোনো রাজনৈতিক স্বার্থও ছিল না। তার সঙ্গে ছিল শুধু দেশের ভবিষ্যতের জন্য আশা আর সহপাঠীর মতো নির্ভীক অংশগ্রহণ।
কিন্তু হঠাৎই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। আওয়ামী লীগের প্রহরীসুলভ সন্ত্রাসী বাহিনী আর ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। লাঠি, রড, বন্দুক হাতে তারা একের পর এক আঘাত আর গুলি চালাতে থাকে নিরস্ত্র জনতার উপর। এই আক্রমণ ছিল পূর্বপরিকল্পিত যেন ভিন্নমতের কণ্ঠকে রক্ত দিয়ে স্তব্ধ করা যায়।
এই বর্বর হামলার শিকার হয় নাজমুলও। মুহূর্তেই তার ঠোঁট ও মাথায় গুলি লাগে। কিশোরের বুকচেরা আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায়, শরীর রক্তে ভেসে যায়। যে ছেলেটি কিছুক্ষণ আগেও বইয়ের স্বপ্ন দেখছিল, তার জীবন হঠাৎই গুলির ক্ষতচিহ্নে ভরে যায়। ষোলো বছরের একটি কোমল প্রাণ রাজপথে ছটফট করতে থাকে আর চারদিক সাক্ষ্য দেয়, কিভাবে আওয়ামী ছত্রছায়ায় নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়েছে।
নাজমুলের গল্প শুধু একজন শিক্ষার্থীর কাহিনি নয়। এটি প্রমাণ করে, স্বৈরাচারী ক্ষমতালোভী শক্তি কতটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার পাশাপাশি এমনকি নিরীহ শিক্ষার্থী কিশোরদেরও ছাড়েনি। যে ছেলেটির হাতে কলম থাকার কথা, যার স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা নিয়ে পরিবারকে আলোকিত করা তার কপালে তারা ঠাঁই করে দিল রক্তাক্ত গুলির ক্ষত।
এই হামলা শুধু নাজমুলের বিরুদ্ধে নয় এটি পুরো জাতির ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে কলঙ্কজনক আঘাত। ষোলো বছরের এক কিশোরের রক্ত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় স্বৈরাচার ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে কতটা নির্মম হতে পারে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ কেউ নিরাপদ নয়, যদি তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। নাজমুলের ক্ষতচিহ্ন, তার পরিবারের অশ্রু, আর তার অকাল রক্তক্ষরণ তাই এক জাতির রক্তাক্ত ইতিহাস হয়ে থাকবে যা প্রমাণ করবে, গণমানুষের শক্তিকে কোনো স্বৈরাচারই চিরকাল দমন করতে পারে না।
আহত হওয়ার পর
চারদিকে তখন শুধু চিৎকার আর দৌড়ঝাঁপ। আওয়ামী পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের ভয়ে অনেকেই ছুটছিল জীবন বাঁচাতে। তবুও কিছু সাহসী ছাত্র ও সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসে আলীকে বাঁচাতে। তারা তাকে দ্রুত তুলে নিয়ে যায় চট্টগ্রামের ন্যাশনাল হাসপাতালে। গুলির ব্যথায় কাতরাতে থাকা মোহাম্মদ আলীর চোখে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন এই কি সেই দেশ, যেখানে সাধারণ মানুষ কণ্ঠ তুললেই স্বৈরাচার গুলি চালায়?
পরে তাকে শমসের পাড়া হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই শুরু হয় প্রাথমিক চিকিৎসা। গুলির ক্ষত ছিল গুরুতর; বিশেষ করে বুকের আঘাত তাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। ডাক্তাররা সর্বাত্মক চেষ্টা করেন এবং ধীরে ধীরে তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। তবে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পরও তাকে বারবার ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। চিকিৎসা চলতে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে।
চিকিৎসা ও সংগ্রাম
মোহাম্মদ আলী একজন সাধারণ চাকরিজীবী। মাসিক আয় মাত্র ১২ হাজার টাকা। সেই সামান্য আয়ে মায়ের ভরণপোষণ, দুই কন্যার পড়াশোনা আর আট সদস্যের সংসারের খরচই যেখানে সামলানো কষ্টকর, সেখানে আকস্মিক এই চিকিৎসা ব্যয় একেবারেই অমানবিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
তার মা মরিয়ম বেগম, বয়স ৬০ বছর। স্বামীহারা এই বৃদ্ধা মায়ের ভরসা ছিল একমাত্র ছেলে। সেই ছেলেকেই আজ রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে তার বুক ফেটে যায়। দুই কন্যা নুসরাত জাহান (১৩) ও ছোট্ট হুমায়রা (৩) বাবার কষ্ট বুঝে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সংসারের প্রতিটি দিন তখন শুধু ব্যথা, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তায় ভরা।
অপারেশনের পর থেকে কিছুটা সুস্থ হলেও মোহাম্মদ আলীর শরীর আর আগের মতো নেই। হাঁটতে গেলে ব্যথা করে, বুকের ক্ষত মনে করিয়ে দেয় সেই দুঃসহ দিনটির কথা। চিকিৎসকরা তাকে বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন, কিন্তু সংসারের চাপে সেটি মানা প্রায় অসম্ভব।
পরিবার ও পুনর্বাসন
মোহাম্মদ আলীর পরিবার আজও লড়ছে। তাদের মাসিক আয় সীমিত, ঘরটি সেমিপাকা, সাথে মাত্র এক গণ্ডা জমি। এই বাস্তবতায় পরিবারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভবিষ্যৎ বড়ই অনিশ্চিত। তবুও আলীর আশা একদিন হয়তো ভালো একটি চাকরি পেলে সংসারের ভার কিছুটা লাঘব হবে।
পুনর্বাসনের জন্য তার প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল কাজ, যাতে পরিবারের পাঁচ সদস্যের জীবন কিছুটা হলেও নিরাপদ হয়। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে কোনো সহায়তা এখনো তারা পায়নি। বরং যে রাষ্ট্র তাকে গুলি করেছে, সেই রাষ্ট্র আজ নীরব দর্শক।
একটি জাতির প্রতিচ্ছবি
মোহাম্মদ আলীর ঘটনা কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো জাতির জন্য এক লজ্জাজনক সাক্ষ্য। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা প্রমাণ করে দিয়েছে তাদের কাছে গণতন্ত্র মানে নিছক ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা। সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী কিংবা নিরীহ শিক্ষার্থী কেউই তাদের দমননীতির বাইরে নয়।
আলীর রক্তাক্ত শরীর আজ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই দেশে সত্য বলাই অপরাধ, এই দেশে ন্যায়ের জন্য দাঁড়ানো মানেই গুলির মুখে পড়া।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোহাম্মদ আলী
জন্ম : ১০ জুলাই ১৯৮৮, পূর্ব শহীদ নগর, চট্টগ্রাম
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম পূর্ব শহীদ নগর, থানা বায়েজিদ, ৩নং ওয়ার্ড, চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : মহব্বত সর্দার বাড়ি, থানা বায়েজিদ, ৩নং ওয়ার্ড, চট্টগ্রাম
পেশা : চাকুরিজীবী
পরিবার : ৮ সদস্য
মা মরিয়ম বেগম (৬০, গৃহিণী); ২ কন্যা নুসরাত জাহান (১৩, ৯ম শ্রেণি), হুমায়রা (৩, শিশু)
মাসিক আয় : ১২,০০০ টাকা (চাকুরি)
আহত হওয়ার স্থান : নিউমার্কেট মোড়ে
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১টা
আক্রমণকারী : স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের গুলিতে আহত
চিকিৎসা : ন্যাশনাল হাসপাতাল শমসের পাড়া হাসপাতাল পরবর্তীতে বাসায় ও ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা
অবস্থা : অপারেশনের পর মোটামুটি ভালো আছেন, তবে নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন
পুনর্বাসন : ভালো একটি চাকরি ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সহায়তা জরুরি
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍