মো: নিজাম উদ্দিন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
মো: নিজাম উদ্দিন লালবাগে জন্ম নেওয়া এক শ্রমজীবী তরুণ, যিনি দারিদ্র্য ও পারিবারিক সংকটের মধ্যেও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে ডেলিভারিম্যান হিসেবে জীবিকা অর্জন করছিলেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মানবিকতার জায়গা থেকে অংশ নিতে গিয়ে ১৮ জুলাই ২০২৪-এ তিনি গুরুতর হামলার শিকার হন, ভেঙে যায় তাঁর পায়ের হাড় এবং ‘লকিং প্লেট’ বসিয়ে অস্ত্রোপচার করতে হয়। শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক ট্রমা ও কর্মক্ষমতা হারিয়েও তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সম্মানজনক জীবনে ফেরার আশায়। বর্তমানে তিনি পুনর্বাসন, চিকিৎসা সহায়তা এবং একটি স্থায়ী আয়ের উৎসের জরুরি প্রয়োজন বোধ করছেন।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
মো: নিজাম উদ্দিন
পেশা: ডেলিভারি ম্যান
ক্রমিক: ০০৪
আইডি: ঢাকা সিটি ০০৪
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
মো: নিজাম উদ্দিনের জন্ম লালবাগে, ঢাকার এক পুরনো ও ঘনবসতিপূর্ণ পাড়ায়, যেখানে প্রতিটি গলি যেন ইতিহাস বহন করে, আর প্রতিটি দেয়ালে জমে থাকে সংগ্রামের ধুলো। পুরান ঢাকার এই অংশে শিশুদের শৈশব মানেই চমৎকার বাস্তবতা। বাবা নাজিম উদ্দীন ছিলেন একজন ড্রাইভার। প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যেতেন। কিন্তু এই সংসারযুদ্ধ বেশি দিন চালাতে পারেননি। এক সকালে চিরতরে চোখ বন্ধ করে দিয়ে চলে যান, রেখে যান স্ত্রী আর ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের। মা নাসরিন বেগম তখন অনেক অসহায় হয়ে পড়েন।
সংসার চালানোর মতো আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছিলো। তাঁর শৈশব ছিলো খুবই চমৎকার! শখ ছিলো বড়ো হয়ে মানুষের সেবা করার, ছিলো খেলার সাথী ক্লাসরুমের সঙ্গী সবকিছুই। তিনি কঠিন বাস্তবতায় বড়ো হলেও শৈশব কেটেছে খুবই মধুরভাবে। তবে এক জিনিস কখনো ভাঙেনি- মায়ের শেখানো ন্যায়-অন্যায়ের জ্ঞান। মা বলতেন, "তুমি সবসময় সৎ থাকবে এবং সত্য কথা বলবে। তবে ভালো মানুষ হতে পারবে।" নিজাম জীবনে যত রকমের বাধা পেয়েছেন সেই বাধা-বিঘ্নই তাকে আরো উদ্দীপ্ত করে রাখতো। কঠিন বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও এইচএসসি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়েছে নিজাম উদ্দীনের।
পড়াশুনা ও কর্মজীবন
হযরতবাগ ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও ঢাকা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এইচএসসি। মো: নিজাম উদ্দিন যখন কলেজের ছাত্র তখন তার পিতাকে হারান। তাই নিজামসহ অন্য ভাইয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি, দোকানে কর্মচারি, কম্পিউটার প্রশিক্ষণে দেয়ার কাজ করতেন। একসময় যোগ দেন ফলের আড়তে এরপরে খান ট্রেডার্সে ডেলিভারিম্যান হিসেবে। পরে কিছুদিন কাজ করেছেন এবি গার্মেন্টসেও।
আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যাওয়া
২০২৪ সালের শুরু থেকেই দেশজুড়ে উত্তেজনা চলছিল। চাকরির সুযোগ বণ্টনে বৈষম্য, শিক্ষা ও চিকিৎসায় ভিন্ন আচরণ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিপীড়ন সব কিছু মিলে যেন সাধারণ মানুষের কন্ঠরোধ করে রাখা হচ্ছিল। নিজাম রাজনীতি করতেন না। তিনি কোনো সংগঠনের নিয়মিত কর্মীও ছিলেন না। কিন্তু তাঁর নিজের জীবনটাই ছিল বৈষম্যের বাস্তব উদাহরণ। একদিন ডেলিভারি দিতে গিয়ে গুলিস্তানে ট্রাফিক পুলিশের হাতে তুচ্ছ কারণে অপমানিত হন। তিনি বলেছিলেন: "আমি কি চোর, যে আমায় এভাবে ধাক্কা দেবেন?” উত্তরে পুলিশ বলেছিল: "তুই তো গরিব, গলা উঁচু করিস কেন?" সে দিন থেকেই তাঁর ভিতরে জমতে থাকে ক্ষোভ। এই দেশের রাস্তা, হাসপাতাল, চাকরি সব কিছুতে ক্ষমতার শর্ত কেন থাকবে? তিনি বুঝে যান এই 'নিরীহ জীবন' আসলে শেকলে বাঁধা। জুলাই মাসে যখন সারা দেশে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, তখন নিজাম আর চুপ থাকতে পারেননি। তিনি জানান, "আমি কোনোদিন রাজপথে দাঁড়াইনি। কিন্তু এবার মনে হলো, না দাঁড়ালে আমি মানুষ থাকতে পারব না।" ১৮ জুলাইয়ে প্রথম অংশ নেন একটি প্রতিবাদ সভায়। সেখান থেকে নতুন পল্টনের যোগাযোগ তৈরি হয়। বন্ধুরা বলেন, "তুই সামনে থাকিস না, তোর মা ছাড়া কেউ নেই।" কিন্তু নিজাম বলেছিলেন: "যাদের কেউ নাই, তারাই তো লড়বে।” এই অভিমান, এই আত্মসম্মানবোধ নিয়েই তিনি ১৮ জুলাইয়ের রাতে উপস্থিত ছিলেন নতুন পল্টন মাঠে, যেখানে ইতিহাসের এক নির্মম পর্বের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে।
হামলার বিবরণ ও আহত হওয়ার মুহূর্ত
বীভৎস স্মৃতির সেই সময়টা ছিলো ১৮ জুলাই, ২০২৪। রাষ্ট্র থেকে বৈষম্যকে তুলে দিতে দেশব্যাপী ছিলো উত্তাল ও থমথমে পরিস্থিতি। মো: নিজাম উদ্দিন কোনো ছাত্র ছিলেন না, ছিলেন একজন সাধারণ জনগণ। জীবনবাজি রেখে লড়াই করতে যিনি ছাত্রদের পক্ষে নিজের নেমেছিলেন। স্থান ছিলো নতুন পল্টন মাঠ, আজিমপুর সংলগ্ন এলাকা। জুলাইয়ের মাঝামাঝি, ঢাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সম্পূর্ণ শাটডাউন অর্থনীতি, শিক্ষা, যোগাযোগ সব কিছু বন্ধ করে মানুষ রাস্তায়। দাবিগুলো ছিল পরিষ্কার: বৈষম্যের অবসান, জবাবদিহিতা, দাও একটি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেদিন রাতে, পল্টনের "লিবিং লিয়ানা" নামের একটি বিল্ডিংয়ে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রায় ১২-১৫ জন আন্দোলনকারী, যাদের একজন ছিলেন মো: নিজাম উদ্দিন বাপ্পি। বাইরে তখন রীতিমতো ভয়াবহ পরিস্থিতি। পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলীয় সমর্থকদের মিশ্র বাহিনী এলাকা ঘিরে ফেলে। আশপাশে শোনা যাচ্ছিল বিক্ষিপ্ত গুলির শব্দ, লাঠির বাড়ি, মানুষের আর্তনাদ। মোঃ নিজাম উদ্দিনসহ আরো কয়েকজন সাধারণ জনগণ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছিলেন। আর এই সহযোগিতাই সহ্য হচ্ছিলো না ফ্যাসিস্ট হাসিনার পালিত বিবেকহীন পুলিশদের হঠাৎ করেই "লিভিং লিয়ানা" ভবনের সামনে পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ায়। কোনো সতর্কতা ছাড়াই তারা গুলি করতে করতে মূল গেটের তালা ভেঙে ফেলে।
ভেতরে যারা ছিল, তারা চিৎকার করেনি। সবাই নিশ্চুপ। কিন্তু সেই নিরবতা ভেঙে দেয় পুলিশের চিৎকার," বের হয়ে আয় বলে গালি দিচ্ছিলো, একেকজন নেতা সেজেছিস!" তখন অনেকেই ছাদ বা পেছনের দিক দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। নিজাম পালাননি। না কোনো বীরত্ব দেখানোর জন্য, বরং তাঁর পেছনে যাওয়ার পথ ছিল না। সিঁড়ির নিচে একটি অন্ধকার কোণে মেঝেতে শুয়ে ছিলেন তিনি।
একজন পুলিশ সদস্য তাঁকে প্রথমে চুল ধরে টেনে তোলে। নিজাম প্রতিরোধ করে শুধু বলেন, "ভাই আমি কিছু করিনি, গুলি কইরেন না।" তারপর শুরু হয় লাথি, ঘুষি, বুটের আঘাত। এক পর্যায়ে ২ জন পুলিশ তাঁর পা ধরে টানতে থাকে এরপরে একত্রে ৬ জন পুলিশ তার বাঁ পায়ের হাঁটুতে শক্ত বুট দিয়ে সজোরে আঘাত করে। নিজাম চিৎকার করলেও থেমে যায় না অত্যাচার। হাড়ের ভেতরে তখনই শব্দ হয়, পায়ের হাড় সেখানেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এমনকি টানতে গিয়ে তারা বলে, "মরিস নাই তো? মরলে তো আর মিছিলে যাইতি না।" একজন সহযোদ্ধা তাঁকে ধরে রাখতে চাইলে তাকেও মারধর করা হয়। শেষমেশ তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় সিঁড়ির নিচেই ফেলে যায় পুলিশ, কারণ নিজের পায়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় কয়েক ঘণ্টা পরে তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
চিকিৎসা ও হাড় জোড়া লাগানো তাঁর ডান পায়ের হাড় এমনভাবে ভেঙে গিয়েছিল যে, তা শুধু প্লাস্টার করে সারানো সম্ভব ছিল না। জরুরি অপারেশনে "লকিং প্লেট” লাগাতে হয়, যাতে হাড়কে জোড়া দিয়ে স্থিতিশীল রাখা যায়। চিকিৎসকেরা জানান, "এই ধরনের ইনজুরি এক ধরনের যন্ত্রণা তৈরি করে, যা কেবল শরীর নয়, মনকেও ভেঙে দিতে পারে।" মোঃ নিজাম উদ্দিন প্রতিদিন ফিজিওথেরাপি করতে বাধ্য হন। নিয়ম করে ক্যালসিয়াম খেতে হয়। "লকিং প্লেট" ভবিষ্যতে আবার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে খুলে ফেলা লাগবে যার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন ধীরে ধীরে। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার খরচ বহন করা হয় তবে যাতায়াত, ওষুধ, খাবার, রুটিন চেকআপ ইত্যাদির খরচ তাঁর নিজের ঘাড়েই বর্তায়।
মানসিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত পরিবর্তন
১৮ জুলাইয়ের সেই রাত শুধু তাঁর পায়ের হাড়ই ভাঙেনি ভেঙে দিয়েছে তাঁর ভিতরের অনেকখানি মানুষটাকেও।
একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, যিনি দিনশেষে একটি সাদামাটা জীবনের আশা নিয়ে বেঁচে থাকতেন, সেই মো: নিজাম উদ্দিন আজ একজন আংশিক পঙ্গু হয়ে উঠেছেন শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবে। হাসপাতালের সাদা ছাদ, ভাঙা পায়ের ব্যথা, নিশ্চুপ রাত্রিতে হঠাৎ গুলির শব্দ কানে বাজা, বুটের আঘাতে ছিন্ন হাড়ের সে মুহূর্ত সব কিছু যেন প্রতিনিয়ত তাকে তাড়া করে ফেরে। তিনি আজও ঘুমাতে গেলে চমকে উঠে বসেন। একা চলতে গেলে কাঁধের পেছনে তাকিয়ে দেখেন কেউ আসছে কি না।
এই রাষ্ট্র, এই সমাজ, এই পুলিশের পোশাক সব কিছুর প্রতি তাঁর মনে তৈরি হয়েছে ভয়, অবিশ্বাস আর এক ধরনের আতঙ্ক। একসময় যিনি মানুষের ভিড়ে কাজ করতেন, সহজে কথা বলতেন আজ তাঁর চেহারায় গম্ভীর নীরবতা, কথায় অনিচ্ছা, আর চোখে এক ধরনের সতর্ক চাহনি। সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো তিনি আজ আর নিজেকে আগের মতো মানুষ ভাবতে পারেন না। নিজাম বলেন, "আমি আগে মানুষ ছিলাম। এখন আমি খুঁড়িয়ে হাঁটি, কাজ করতে পারি না, লোকজন দয়া করে কথা বলে।" এই 'দয়া' শব্দটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আহত করে।
শারীরিক ট্রমার পাশাপাশি মানসিক ক্ষত নিয়েও তাঁকে প্রতিদিন বাঁচতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত কাউন্সেলিং নেয়া দরকার হলেও অর্থাভাবে সেটা চালিয়ে যেতে পারেননি। মানুষের ভেতর থেকে ক্রমশ যেন হারিয়ে যাচ্ছে সেই প্রাণবন্ত, বিশ্বাসী নিজাম, যিনি একসময় জীবনের প্রতিটি দিনকে সংগ্রাম বলেই দেখতেন, কিন্তু মাথা নত করতেন না। তবে হ্যাঁ, তিনি এখনও বেঁচে আছেন। এই বেঁচে থাকাটাও এক ধরনের লড়াই, যেখানে প্রতিদিন নিজেকে বোঝান, "আমি কিছুই করিনি, শুধু ন্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। তাই আমার পা ভেঙেছে, মন ভেঙেছে। কিন্তু আমি পুরোপুরি ভাঙিনি।"
বর্তমান জীবন ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
অপারেশনের পর নিজাম উদ্দীনের দিনগুলো শুরু হয় খুব ভোরে, যখন শহর এখনও নিস্তব্ধ, আর তার পায়ের জোড়া লাগানো হাড় তখনও যেন রাতের ভেতরে জমে থাকা যন্ত্রণার শব্দে কাঁপতে থাকে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ তিনি ঠিকমতো উঠে বসতেই পারতেন না। বিছানা থেকে পা নামাতে গেলে মনে হতো কারও হাতুড়ি আঘাত করছে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে একদিন তাঁর হাড় ছিলো অক্ষত। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে মাস নয় বছর। "লকিং প্লেট" অপারেশনে বসানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি খুলে ফেলার জন্য আরেকবার ছুরি-কাচির নিচে যেতে হবে। নিজাম এখন ফিজিওথেরাপির পাশাপাশি নিয়মিত ক্যালসিয়াম ও ব্যথানাশক ওষুধ খান।
সবচেয়ে কষ্টকর অংশটি হলো হাঁটার সময় হঠাৎ থেমে যাওয়া পায়ের মধ্যে এক ধরণের ব্লক তৈরি হয়, এক ধরনের কাঁপুনি, যেন শরীর নয়, ভিতরের বিশ্বাসটাই থেমে যেতে চায়। তবু থেমে থাকেননি নিজাম। তিনি এখন বাসায় বসে ছোটখাটো লেখালেখি করেন।
মাঝে মাঝে বন্ধুদের মোবাইলে অনলাইন অর্ডার ম্যানেজ করার কাজ দেখেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন তিনি হয়তো ডেস্ক জব করবেন, হয়তো একটি ছোট চাকরি, যেখানে কেউ তাঁকে চুল ধরে টানবে না, পায়ে বুট মারবে না, শুধু তাঁর যোগ্যতা দিয়ে কাজ করতে পারবে। একবার নিজাম বলেছিলেন: "ডেলিভারিম্যান ছিলাম বলে কেউ কিছু মনে করতো না। কিন্তু আমি জানি, আমি দেশের জন্য পথে নেমেছিলাম। এখন আমি শুধু পা না, আমার জায়গাটাও ফিরে পেতে চাই।" তিনি চান না এই রাষ্ট্রের কোনো যুবক, তার মতো কোনো রাত যাপন করুক যেখানে সিঁড়ির নিচে শুয়ে থাকতে হয় বুটের শব্দ শুনে; কিংবা চিকিৎসার পরে একজন মানুষ নিজেকে বোঝাতে থাকে "তুই এখনও মানুষ।"
নিজাম বিশ্বাস করেন, শরীর ভাঙলেও মন ভাঙা উচিত নয়। তাঁর প্রতিটি ব্যথার ফাঁকে তিনি একটি স্বপ্ন বুনছেন একটি সম্মানজনক জীবনের। ভবিষ্যতে হয়তো তিনি হবেন একজন ছোট অফিস সহকারী, হয়তো কাউকে কম্পিউটারে ডাটা এন্ট্রি করে দেবেন। কিন্তু তাঁর জন্য সেটা শুধু একটি চাকরি হবে না, সেটা হবে "ফিরে আসা" একজন পিষে ফেলা মানুষের নীরব জয়ের ইতিহাস"।
ইতিহাসের বুকে তার কণ্ঠস্বর
আমি মোঃ নিজাম উদ্দিন বাপ্পি। না, আমি কোনো নেতা নই, আমি কোনো কবিও নই, যে শব্দে শব্দে বিপ্লব লিখে ফেলতে পারি। আমি একজন ডেলিভারিম্যান, যে সকালে ফলের আড়তে খাটে, আর বিকেলে গার্মেন্টসে লোকের জামা গোনে। তবু আমি দাঁড়িয়েছিলাম রাস্তায়, কারণ সে রাস্তায় শুধু ছাত্ররা ছিল না, ছিল আমারই মতো হাজারো বঞ্চিত মানুষের মুখ। যাদের বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে বৈষম্যের পাঠ নেয়, যাদের মায়েরা হাসপাতালে দাঁড়িয়ে বিনা চিকিৎসায় চোখ বন্ধ করে।
আমি গুলি চাইনি, আমি মরার জন্য শুয়ে পড়িনি সেদিন সেই সিঁড়ির নিচে, আমি শুধু চেয়েছিলাম একটা ন্যায়ের আওয়াজে আমার ছোট্ট কণ্ঠ মিলাতে। তারা আমার পা ভেঙে দিয়েছে। আজ আমি ভালোভাবে হাঁটতে পারি না। কিন্তু আমার ভাঙা পায়ের চেয়ে শক্ত এখন আমার বিশ্বাস। আমার ব্যথার চেয়ে গাঢ় আমার স্মৃতি। আমি জানি, একদিন ইতিহাস পেছনে তাকাবে। ছোট একটা নাম পাবে "নিজাম উদ্দিন, এক নামহীন লড়াকু, যে নিজের জীবন দিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল রাষ্ট্রের বুকে।" হয়তো সে ইতিহাসের পাতায় আমার ছবি থাকবে না, কিন্তু আমার এই কণ্ঠস্বর ভাঙা পা, থেমে যাওয়া স্বপ্ন, তবু নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা নিয়ে বলা সেই কণ্ঠস্বর তা থাকবে ইতিহাসের বুকের গভীরতম করোটিতে।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১। পায়ের "লকিং প্লেট" মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি ডেক্স জবের ব্যবস্থা
৩। কোনো ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেয়া (কাপড়ের/মুদি দোকান হতে পারে)
৪। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে ঋণ প্রদান
৫। পায়ের "Locking Plate" খোলার জন্য চিকিৎসা সহায়তা
৬। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তি
৭। ঘর নির্মাণ বা সংস্কারে সরকারি সহায়তা
এক নজরে মো: নিজাম উদ্দিন
মো: নিজাম উদ্দিন
জন্ম তারিখ ০১-০৩-১৯৮৮
জনন্মস্থান লালবাগ
নিজ জেলা ঢাকা
পেশা
ডেলিভারিম্যান
কর্মরত প্রতিষ্ঠান
ফলের আড়ত, খান ট্রেডার্স এবং এবি গার্মেন্টস
স্থায়ী ঠিকানা
বাসা: ১৯৪/৪, এলাকা: লালবাগ, থানা: লালবাগ, জেলা: ঢাকা
বর্তমান ঠিকানা
বাসা: ১০, আব্দুল আজিজ লেন, এলাকা: লালবাগ, থানা: লালবাগ, জেলা: ঢাকা
পিতা
মৃত নাজিম উদ্দীন
মাতা
নাসরিন বেগম, বয়স ও পেশা: গৃহিণী (৬২)
বাড়ি
নেই (ভাইদের সাথে ভাড়া বাসায় থাকেন)
সম্পদ
বাড়ি নির্মাণের মতো সামান্য জমি রয়েছে
আক্রমণকারী
কুখ্যাত আওয়ামী পেটোয়া বাহিনী
আহত হওয়ার তারিখ:
১৮ জুলাই ২০২৪
পেশা: ডেলিভারি ম্যান
ক্রমিক: ০০৪
আইডি: ঢাকা সিটি ০০৪
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
মো: নিজাম উদ্দিনের জন্ম লালবাগে, ঢাকার এক পুরনো ও ঘনবসতিপূর্ণ পাড়ায়, যেখানে প্রতিটি গলি যেন ইতিহাস বহন করে, আর প্রতিটি দেয়ালে জমে থাকে সংগ্রামের ধুলো। পুরান ঢাকার এই অংশে শিশুদের শৈশব মানেই চমৎকার বাস্তবতা। বাবা নাজিম উদ্দীন ছিলেন একজন ড্রাইভার। প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যেতেন। কিন্তু এই সংসারযুদ্ধ বেশি দিন চালাতে পারেননি। এক সকালে চিরতরে চোখ বন্ধ করে দিয়ে চলে যান, রেখে যান স্ত্রী আর ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের। মা নাসরিন বেগম তখন অনেক অসহায় হয়ে পড়েন।
সংসার চালানোর মতো আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছিলো। তাঁর শৈশব ছিলো খুবই চমৎকার! শখ ছিলো বড়ো হয়ে মানুষের সেবা করার, ছিলো খেলার সাথী ক্লাসরুমের সঙ্গী সবকিছুই। তিনি কঠিন বাস্তবতায় বড়ো হলেও শৈশব কেটেছে খুবই মধুরভাবে। তবে এক জিনিস কখনো ভাঙেনি- মায়ের শেখানো ন্যায়-অন্যায়ের জ্ঞান। মা বলতেন, "তুমি সবসময় সৎ থাকবে এবং সত্য কথা বলবে। তবে ভালো মানুষ হতে পারবে।" নিজাম জীবনে যত রকমের বাধা পেয়েছেন সেই বাধা-বিঘ্নই তাকে আরো উদ্দীপ্ত করে রাখতো। কঠিন বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও এইচএসসি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়েছে নিজাম উদ্দীনের।
পড়াশুনা ও কর্মজীবন
হযরতবাগ ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও ঢাকা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এইচএসসি। মো: নিজাম উদ্দিন যখন কলেজের ছাত্র তখন তার পিতাকে হারান। তাই নিজামসহ অন্য ভাইয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি, দোকানে কর্মচারি, কম্পিউটার প্রশিক্ষণে দেয়ার কাজ করতেন। একসময় যোগ দেন ফলের আড়তে এরপরে খান ট্রেডার্সে ডেলিভারিম্যান হিসেবে। পরে কিছুদিন কাজ করেছেন এবি গার্মেন্টসেও।
আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যাওয়া
২০২৪ সালের শুরু থেকেই দেশজুড়ে উত্তেজনা চলছিল। চাকরির সুযোগ বণ্টনে বৈষম্য, শিক্ষা ও চিকিৎসায় ভিন্ন আচরণ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিপীড়ন সব কিছু মিলে যেন সাধারণ মানুষের কন্ঠরোধ করে রাখা হচ্ছিল। নিজাম রাজনীতি করতেন না। তিনি কোনো সংগঠনের নিয়মিত কর্মীও ছিলেন না। কিন্তু তাঁর নিজের জীবনটাই ছিল বৈষম্যের বাস্তব উদাহরণ। একদিন ডেলিভারি দিতে গিয়ে গুলিস্তানে ট্রাফিক পুলিশের হাতে তুচ্ছ কারণে অপমানিত হন। তিনি বলেছিলেন: "আমি কি চোর, যে আমায় এভাবে ধাক্কা দেবেন?” উত্তরে পুলিশ বলেছিল: "তুই তো গরিব, গলা উঁচু করিস কেন?" সে দিন থেকেই তাঁর ভিতরে জমতে থাকে ক্ষোভ। এই দেশের রাস্তা, হাসপাতাল, চাকরি সব কিছুতে ক্ষমতার শর্ত কেন থাকবে? তিনি বুঝে যান এই 'নিরীহ জীবন' আসলে শেকলে বাঁধা। জুলাই মাসে যখন সারা দেশে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, তখন নিজাম আর চুপ থাকতে পারেননি। তিনি জানান, "আমি কোনোদিন রাজপথে দাঁড়াইনি। কিন্তু এবার মনে হলো, না দাঁড়ালে আমি মানুষ থাকতে পারব না।" ১৮ জুলাইয়ে প্রথম অংশ নেন একটি প্রতিবাদ সভায়। সেখান থেকে নতুন পল্টনের যোগাযোগ তৈরি হয়। বন্ধুরা বলেন, "তুই সামনে থাকিস না, তোর মা ছাড়া কেউ নেই।" কিন্তু নিজাম বলেছিলেন: "যাদের কেউ নাই, তারাই তো লড়বে।” এই অভিমান, এই আত্মসম্মানবোধ নিয়েই তিনি ১৮ জুলাইয়ের রাতে উপস্থিত ছিলেন নতুন পল্টন মাঠে, যেখানে ইতিহাসের এক নির্মম পর্বের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে।
হামলার বিবরণ ও আহত হওয়ার মুহূর্ত
বীভৎস স্মৃতির সেই সময়টা ছিলো ১৮ জুলাই, ২০২৪। রাষ্ট্র থেকে বৈষম্যকে তুলে দিতে দেশব্যাপী ছিলো উত্তাল ও থমথমে পরিস্থিতি। মো: নিজাম উদ্দিন কোনো ছাত্র ছিলেন না, ছিলেন একজন সাধারণ জনগণ। জীবনবাজি রেখে লড়াই করতে যিনি ছাত্রদের পক্ষে নিজের নেমেছিলেন। স্থান ছিলো নতুন পল্টন মাঠ, আজিমপুর সংলগ্ন এলাকা। জুলাইয়ের মাঝামাঝি, ঢাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সম্পূর্ণ শাটডাউন অর্থনীতি, শিক্ষা, যোগাযোগ সব কিছু বন্ধ করে মানুষ রাস্তায়। দাবিগুলো ছিল পরিষ্কার: বৈষম্যের অবসান, জবাবদিহিতা, দাও একটি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেদিন রাতে, পল্টনের "লিবিং লিয়ানা" নামের একটি বিল্ডিংয়ে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রায় ১২-১৫ জন আন্দোলনকারী, যাদের একজন ছিলেন মো: নিজাম উদ্দিন বাপ্পি। বাইরে তখন রীতিমতো ভয়াবহ পরিস্থিতি। পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলীয় সমর্থকদের মিশ্র বাহিনী এলাকা ঘিরে ফেলে। আশপাশে শোনা যাচ্ছিল বিক্ষিপ্ত গুলির শব্দ, লাঠির বাড়ি, মানুষের আর্তনাদ। মোঃ নিজাম উদ্দিনসহ আরো কয়েকজন সাধারণ জনগণ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছিলেন। আর এই সহযোগিতাই সহ্য হচ্ছিলো না ফ্যাসিস্ট হাসিনার পালিত বিবেকহীন পুলিশদের হঠাৎ করেই "লিভিং লিয়ানা" ভবনের সামনে পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ায়। কোনো সতর্কতা ছাড়াই তারা গুলি করতে করতে মূল গেটের তালা ভেঙে ফেলে।
ভেতরে যারা ছিল, তারা চিৎকার করেনি। সবাই নিশ্চুপ। কিন্তু সেই নিরবতা ভেঙে দেয় পুলিশের চিৎকার," বের হয়ে আয় বলে গালি দিচ্ছিলো, একেকজন নেতা সেজেছিস!" তখন অনেকেই ছাদ বা পেছনের দিক দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। নিজাম পালাননি। না কোনো বীরত্ব দেখানোর জন্য, বরং তাঁর পেছনে যাওয়ার পথ ছিল না। সিঁড়ির নিচে একটি অন্ধকার কোণে মেঝেতে শুয়ে ছিলেন তিনি।
একজন পুলিশ সদস্য তাঁকে প্রথমে চুল ধরে টেনে তোলে। নিজাম প্রতিরোধ করে শুধু বলেন, "ভাই আমি কিছু করিনি, গুলি কইরেন না।" তারপর শুরু হয় লাথি, ঘুষি, বুটের আঘাত। এক পর্যায়ে ২ জন পুলিশ তাঁর পা ধরে টানতে থাকে এরপরে একত্রে ৬ জন পুলিশ তার বাঁ পায়ের হাঁটুতে শক্ত বুট দিয়ে সজোরে আঘাত করে। নিজাম চিৎকার করলেও থেমে যায় না অত্যাচার। হাড়ের ভেতরে তখনই শব্দ হয়, পায়ের হাড় সেখানেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এমনকি টানতে গিয়ে তারা বলে, "মরিস নাই তো? মরলে তো আর মিছিলে যাইতি না।" একজন সহযোদ্ধা তাঁকে ধরে রাখতে চাইলে তাকেও মারধর করা হয়। শেষমেশ তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় সিঁড়ির নিচেই ফেলে যায় পুলিশ, কারণ নিজের পায়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় কয়েক ঘণ্টা পরে তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
চিকিৎসা ও হাড় জোড়া লাগানো তাঁর ডান পায়ের হাড় এমনভাবে ভেঙে গিয়েছিল যে, তা শুধু প্লাস্টার করে সারানো সম্ভব ছিল না। জরুরি অপারেশনে "লকিং প্লেট” লাগাতে হয়, যাতে হাড়কে জোড়া দিয়ে স্থিতিশীল রাখা যায়। চিকিৎসকেরা জানান, "এই ধরনের ইনজুরি এক ধরনের যন্ত্রণা তৈরি করে, যা কেবল শরীর নয়, মনকেও ভেঙে দিতে পারে।" মোঃ নিজাম উদ্দিন প্রতিদিন ফিজিওথেরাপি করতে বাধ্য হন। নিয়ম করে ক্যালসিয়াম খেতে হয়। "লকিং প্লেট" ভবিষ্যতে আবার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে খুলে ফেলা লাগবে যার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন ধীরে ধীরে। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার খরচ বহন করা হয় তবে যাতায়াত, ওষুধ, খাবার, রুটিন চেকআপ ইত্যাদির খরচ তাঁর নিজের ঘাড়েই বর্তায়।
মানসিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত পরিবর্তন
১৮ জুলাইয়ের সেই রাত শুধু তাঁর পায়ের হাড়ই ভাঙেনি ভেঙে দিয়েছে তাঁর ভিতরের অনেকখানি মানুষটাকেও।
একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, যিনি দিনশেষে একটি সাদামাটা জীবনের আশা নিয়ে বেঁচে থাকতেন, সেই মো: নিজাম উদ্দিন আজ একজন আংশিক পঙ্গু হয়ে উঠেছেন শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবে। হাসপাতালের সাদা ছাদ, ভাঙা পায়ের ব্যথা, নিশ্চুপ রাত্রিতে হঠাৎ গুলির শব্দ কানে বাজা, বুটের আঘাতে ছিন্ন হাড়ের সে মুহূর্ত সব কিছু যেন প্রতিনিয়ত তাকে তাড়া করে ফেরে। তিনি আজও ঘুমাতে গেলে চমকে উঠে বসেন। একা চলতে গেলে কাঁধের পেছনে তাকিয়ে দেখেন কেউ আসছে কি না।
এই রাষ্ট্র, এই সমাজ, এই পুলিশের পোশাক সব কিছুর প্রতি তাঁর মনে তৈরি হয়েছে ভয়, অবিশ্বাস আর এক ধরনের আতঙ্ক। একসময় যিনি মানুষের ভিড়ে কাজ করতেন, সহজে কথা বলতেন আজ তাঁর চেহারায় গম্ভীর নীরবতা, কথায় অনিচ্ছা, আর চোখে এক ধরনের সতর্ক চাহনি। সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো তিনি আজ আর নিজেকে আগের মতো মানুষ ভাবতে পারেন না। নিজাম বলেন, "আমি আগে মানুষ ছিলাম। এখন আমি খুঁড়িয়ে হাঁটি, কাজ করতে পারি না, লোকজন দয়া করে কথা বলে।" এই 'দয়া' শব্দটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আহত করে।
শারীরিক ট্রমার পাশাপাশি মানসিক ক্ষত নিয়েও তাঁকে প্রতিদিন বাঁচতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত কাউন্সেলিং নেয়া দরকার হলেও অর্থাভাবে সেটা চালিয়ে যেতে পারেননি। মানুষের ভেতর থেকে ক্রমশ যেন হারিয়ে যাচ্ছে সেই প্রাণবন্ত, বিশ্বাসী নিজাম, যিনি একসময় জীবনের প্রতিটি দিনকে সংগ্রাম বলেই দেখতেন, কিন্তু মাথা নত করতেন না। তবে হ্যাঁ, তিনি এখনও বেঁচে আছেন। এই বেঁচে থাকাটাও এক ধরনের লড়াই, যেখানে প্রতিদিন নিজেকে বোঝান, "আমি কিছুই করিনি, শুধু ন্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। তাই আমার পা ভেঙেছে, মন ভেঙেছে। কিন্তু আমি পুরোপুরি ভাঙিনি।"
বর্তমান জীবন ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
অপারেশনের পর নিজাম উদ্দীনের দিনগুলো শুরু হয় খুব ভোরে, যখন শহর এখনও নিস্তব্ধ, আর তার পায়ের জোড়া লাগানো হাড় তখনও যেন রাতের ভেতরে জমে থাকা যন্ত্রণার শব্দে কাঁপতে থাকে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ তিনি ঠিকমতো উঠে বসতেই পারতেন না। বিছানা থেকে পা নামাতে গেলে মনে হতো কারও হাতুড়ি আঘাত করছে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে একদিন তাঁর হাড় ছিলো অক্ষত। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে মাস নয় বছর। "লকিং প্লেট" অপারেশনে বসানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি খুলে ফেলার জন্য আরেকবার ছুরি-কাচির নিচে যেতে হবে। নিজাম এখন ফিজিওথেরাপির পাশাপাশি নিয়মিত ক্যালসিয়াম ও ব্যথানাশক ওষুধ খান।
সবচেয়ে কষ্টকর অংশটি হলো হাঁটার সময় হঠাৎ থেমে যাওয়া পায়ের মধ্যে এক ধরণের ব্লক তৈরি হয়, এক ধরনের কাঁপুনি, যেন শরীর নয়, ভিতরের বিশ্বাসটাই থেমে যেতে চায়। তবু থেমে থাকেননি নিজাম। তিনি এখন বাসায় বসে ছোটখাটো লেখালেখি করেন।
মাঝে মাঝে বন্ধুদের মোবাইলে অনলাইন অর্ডার ম্যানেজ করার কাজ দেখেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন তিনি হয়তো ডেস্ক জব করবেন, হয়তো একটি ছোট চাকরি, যেখানে কেউ তাঁকে চুল ধরে টানবে না, পায়ে বুট মারবে না, শুধু তাঁর যোগ্যতা দিয়ে কাজ করতে পারবে। একবার নিজাম বলেছিলেন: "ডেলিভারিম্যান ছিলাম বলে কেউ কিছু মনে করতো না। কিন্তু আমি জানি, আমি দেশের জন্য পথে নেমেছিলাম। এখন আমি শুধু পা না, আমার জায়গাটাও ফিরে পেতে চাই।" তিনি চান না এই রাষ্ট্রের কোনো যুবক, তার মতো কোনো রাত যাপন করুক যেখানে সিঁড়ির নিচে শুয়ে থাকতে হয় বুটের শব্দ শুনে; কিংবা চিকিৎসার পরে একজন মানুষ নিজেকে বোঝাতে থাকে "তুই এখনও মানুষ।"
নিজাম বিশ্বাস করেন, শরীর ভাঙলেও মন ভাঙা উচিত নয়। তাঁর প্রতিটি ব্যথার ফাঁকে তিনি একটি স্বপ্ন বুনছেন একটি সম্মানজনক জীবনের। ভবিষ্যতে হয়তো তিনি হবেন একজন ছোট অফিস সহকারী, হয়তো কাউকে কম্পিউটারে ডাটা এন্ট্রি করে দেবেন। কিন্তু তাঁর জন্য সেটা শুধু একটি চাকরি হবে না, সেটা হবে "ফিরে আসা" একজন পিষে ফেলা মানুষের নীরব জয়ের ইতিহাস"।
ইতিহাসের বুকে তার কণ্ঠস্বর
আমি মোঃ নিজাম উদ্দিন বাপ্পি। না, আমি কোনো নেতা নই, আমি কোনো কবিও নই, যে শব্দে শব্দে বিপ্লব লিখে ফেলতে পারি। আমি একজন ডেলিভারিম্যান, যে সকালে ফলের আড়তে খাটে, আর বিকেলে গার্মেন্টসে লোকের জামা গোনে। তবু আমি দাঁড়িয়েছিলাম রাস্তায়, কারণ সে রাস্তায় শুধু ছাত্ররা ছিল না, ছিল আমারই মতো হাজারো বঞ্চিত মানুষের মুখ। যাদের বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে বৈষম্যের পাঠ নেয়, যাদের মায়েরা হাসপাতালে দাঁড়িয়ে বিনা চিকিৎসায় চোখ বন্ধ করে।
আমি গুলি চাইনি, আমি মরার জন্য শুয়ে পড়িনি সেদিন সেই সিঁড়ির নিচে, আমি শুধু চেয়েছিলাম একটা ন্যায়ের আওয়াজে আমার ছোট্ট কণ্ঠ মিলাতে। তারা আমার পা ভেঙে দিয়েছে। আজ আমি ভালোভাবে হাঁটতে পারি না। কিন্তু আমার ভাঙা পায়ের চেয়ে শক্ত এখন আমার বিশ্বাস। আমার ব্যথার চেয়ে গাঢ় আমার স্মৃতি। আমি জানি, একদিন ইতিহাস পেছনে তাকাবে। ছোট একটা নাম পাবে "নিজাম উদ্দিন, এক নামহীন লড়াকু, যে নিজের জীবন দিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল রাষ্ট্রের বুকে।" হয়তো সে ইতিহাসের পাতায় আমার ছবি থাকবে না, কিন্তু আমার এই কণ্ঠস্বর ভাঙা পা, থেমে যাওয়া স্বপ্ন, তবু নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা নিয়ে বলা সেই কণ্ঠস্বর তা থাকবে ইতিহাসের বুকের গভীরতম করোটিতে।
পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা
১। পায়ের "লকিং প্লেট" মাসিক হারে পুনর্বাসন ভাতা প্রদান
২। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি ডেক্স জবের ব্যবস্থা
৩। কোনো ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেয়া (কাপড়ের/মুদি দোকান হতে পারে)
৪। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে ঋণ প্রদান
৫। পায়ের "Locking Plate" খোলার জন্য চিকিৎসা সহায়তা
৬। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অন্তর্ভুক্তি
৭। ঘর নির্মাণ বা সংস্কারে সরকারি সহায়তা
এক নজরে মো: নিজাম উদ্দিন
মো: নিজাম উদ্দিন
জন্ম তারিখ ০১-০৩-১৯৮৮
জনন্মস্থান লালবাগ
নিজ জেলা ঢাকা
পেশা
ডেলিভারিম্যান
কর্মরত প্রতিষ্ঠান
ফলের আড়ত, খান ট্রেডার্স এবং এবি গার্মেন্টস
স্থায়ী ঠিকানা
বাসা: ১৯৪/৪, এলাকা: লালবাগ, থানা: লালবাগ, জেলা: ঢাকা
বর্তমান ঠিকানা
বাসা: ১০, আব্দুল আজিজ লেন, এলাকা: লালবাগ, থানা: লালবাগ, জেলা: ঢাকা
পিতা
মৃত নাজিম উদ্দীন
মাতা
নাসরিন বেগম, বয়স ও পেশা: গৃহিণী (৬২)
বাড়ি
নেই (ভাইদের সাথে ভাড়া বাসায় থাকেন)
সম্পদ
বাড়ি নির্মাণের মতো সামান্য জমি রয়েছে
আক্রমণকারী
কুখ্যাত আওয়ামী পেটোয়া বাহিনী
আহত হওয়ার তারিখ:
১৮ জুলাই ২০২৪
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍