কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : আলিম পরীক্ষার্থী, দারুন্নাজাত ছিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
৩০টি বুলেটের আঘাত যার শরীরে
কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুম
পেশা: আলিম পরিক্ষার্থী
দারুন্নাজাত ছিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা
ক্রমিক- ৪৬৫
আইডি: চট্টগ্রাম- ৫৫
জন্ম ও শৈশব
২০০৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ফেনী জেলার দাগনভূঁঞা উপজেলার ৮নং জায়লস্কর ইউনিয়নের দক্ষিণ মাছিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুম। সবুজ মাঠ, নদীর কলকল ধ্বনি আর পাখির কুজন যেখানে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে মানুষের জীবনকে যুক্ত করে রাখে, সেই আবহেই বেড়ে ওঠেন তিনি। শৈশব থেকেই তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল নির্ভীকতা ও গভীর মননশীলতার ছাপ।
পারিবারিক জীবন
কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুমের পরিবার ছিল আদর্শিক মূল্যবোধে গড়া এক ঘরানা। তাঁর পিতা কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম, পেশায় একজন চাকরিজীবী, যিনি কঠোর পরিশ্রম ও সৎ জীবনের মাধ্যমে ছেলেকে গড়ে তুলেছেন নৈতিকতার শিক্ষায়। আর তাঁর মা খাদিজা বেগম ছিলেন সংসারের ছায়া, যিনি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও অসীম ধৈর্যের ছায়াতলে সন্তানদের মানুষ করেছেন। বড় ভাই কাজী আব্দুল্লাহ আল মামুন একজন চাকরিজীবী এবং ২য় ভাই আব্দুল্লাহ আল; মাসুম, তিনি একজন রেমিটেন্স যোদ্ধা এবং ছোট বোন সুমাইয়া আক্তার একজন ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী; এই বন্ধন ছিল ভালোবাসা ও সহানুভূতির এক অপরূপ নিদর্শন।
শিক্ষাজীবন ও আত্মগঠনের ধারা
শিক্ষাজীবনে কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ছিলেন মেধাবী ও মননশীল। তিনি ঢাকার দারুন্নাজাত ছিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছেন, যেখানে তিনি শুধু একাডেমিক জ্ঞানেই নয়, বরং নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় চেতনায় নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। শিক্ষার পাশাপাশি সমাজ ও সময়ের প্রতি তাঁর ছিল গভীর দায়বোধ, যা তাঁকে সময়ের প্রয়োজনে সাহসিকতার পথ বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
সংগ্রামী জীবন: ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক সাহসী কণ্ঠ
শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের কালো ছায়া যখন দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার কণ্ঠরোধ করছিল, তখন কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের একজন অগ্রসেনানী, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রমাণ দিয়েছেন; একজন ছাত্রও হতে পারে সময়ের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ফ্যাসিস্ট দমন-পীড়ন, নির্যাতন, গুম-খুনের বিপরীতে তিনি তুলে ধরেন সাহস, বিবেক ও আদর্শের পতাকা। তাঁর জীবন যেন এক উজ্জ্বল দীপশিখা, যা আলোকিত করে সাহসিকতার পথকে।
উত্তরাধিকার: প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা
কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুমের সংগ্রামী জীবন আমাদের সামনে তুলে ধরে একটি প্রেরণার কাহিনী; যেখানে স্বপ্ন, সংকল্প ও সাহসের সম্মিলনে গড়ে ওঠে সত্যিকারের নেতৃত্ব। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি প্রতীক, একটি চেতনা, যা আগামী প্রজন্মকে শিখিয়ে দেয়; অন্যায়ের সামনে নত না হয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিকতা।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ: জুলাই আন্দোলনের রক্তাক্ত দিন: এক যোদ্ধার জবানিতে ভয়াল বাস্তবতা
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোর একটি; এবং আমি বিশ্বাস করি, বাংলার ইতিহাসেও এক রক্তাক্ত অধ্যায়। সেদিন বিকেল ৪টার দিকে আমি ও আমার দুই-তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিলে যাত্রাবাড়ি রায়েরবাগ বাজারে ন্যায়ের দাবিতে আয়োজিত ছাত্র-জনতার মিছিলে অংশ নিই। আমাদের কণ্ঠে ছিল দ্রোহের শ্লোগান, চোখে ছিল স্বপ্নের আগুন। আমরা বিশ্বাস করতাম; সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকলে একদিন এই স্বৈরশাসনের অবসান হবেই। কিন্তু সেই বিশ্বাসকে পিষে দিতে খুব বেশি সময় লাগেনি। সন্ধ্যা নামার আগেই আমাদের উপর নেমে আসে ভয়ংকর এক বিভীষিকা। হঠাৎ করেই পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। অস্ত্র হাতে তারা যেভাবে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তা কোনোভাবেই মানবিক বা ন্যায়সংগত ছিল না। তারা বিনা উস্কানিতে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে; বিক্ষোভের মাটি রক্তে ভিজে ওঠে, বাতাস ভারী হয়ে যায় আর্তনাদে।
আমি বুঝে ওঠার আগেই আমার শরীরে একের পর এক গুলি লাগতে থাকে। আমার মনে আছে, শরীরের ভেতরটা যেন আগুনে জ্বলছিল। তারপর আর কিছু মনে নেই; শুধু অন্ধকার। পরে জেনেছি আমার শরীরে প্রায় ত্রিশটি বুলেট বিদ্ধ হয়েছিল। আমি রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। আমার প্রাণপ্রিয় সঙ্গীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে উদ্ধার করে ডেমরার আসলামিয়া হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে শুরু হয় আমার জীবনের আরেক যুদ্ধ; রক্তক্ষরণ থামানো, গুলিগুলো অপসারণ, আর মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসা। এই যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে আমাদের ওপর এমন বর্বরতা চালানো হলো, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা ছিল পরিকল্পিত গণহত্যার অংশ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করার এক নৃশংস চেষ্টা। আমরা কেবল আমাদের সাংবিধানিক অধিকার চেয়েছিলাম, কিন্তু তার জবাব এসেছিল গুলি দিয়ে।
আমার শরীরের প্রতিটি ক্ষত আজও সাক্ষ্য দেয় সেই দমন- পীড়নের। আমি আজও বেঁচে আছি, কিন্তু সেই বিকেলের ভয়াল চিত্র প্রতিদিন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমি জানি, এই যে আমি গুলি খেয়েছি, এই যে রক্ত দিয়েছি, এটা কেবল আমার একার নয়; এই প্রজন্মের প্রতিটি সাহসী কণ্ঠস্বরের প্রতিচ্ছবি।
আমি এখনও বিশ্বাস করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় সাহস। যদি আমার এ আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাহসী করে তোলে, যদি কেউ একবার হলেও সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়; তাহলে আমি মনে করব, আমার রক্ত বৃথা যায়নি।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
১৯ জুলাইয়ের সেই বিভীষিকাময় বিকেলে ফ্যাসিবাদী হামলায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আমি রাস্তায় রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলাম। শরীরের একাধিক স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, রক্তপাত থামছিল না। চারপাশে তখন আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা আর গুলির আওয়াজ। জীবন যেন একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সে সময় আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে উদ্ধার করেন। চারদিকে তখনও গুলির আওয়াজ থামেনি, রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আহত ও আতঙ্কিত মানুষের আর্তনাদ। কিন্তু আমার ভাইয়েরা পিছপা হননি। সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত তাঁদের জন্য ছিল বিপজ্জনক, কিন্তু তাঁদের চোখে শুধু একটাই উদ্দেশ্য আমাকে বাঁচাতে হবে।
রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তাঁরা আমাকে নিয়ে পৌঁছান ডেমরা ইসলামিয়া জেনারেল হাসপাতালে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরপরই জরুরি বিভাগে চিকিৎসকরা আমাকে ভর্তি করে নেন। প্রথমেই তারা আমার শরীর থেকে গুলিগুলো বের করার চেষ্টা শুরু করেন। ধৈর্য ও নিপুণ হাতে আমার ক্ষতস্থানগুলো পরীক্ষা করে কয়েকটি বুলেট অপসারণ করা হয়। এরপর ক্ষতস্থানগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার (ওয়াশ) করে জীবাণুমুক্ত করে দেয়। রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ব্যান্ডেজ করা হয় এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের তৎপরতা, সহযোদ্ধাদের সহযোগিতা এবং সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমি মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসি। হাসপাতালের ওই ছোট্ট বিছানায় শুয়ে থাকতে বুঝেছিলাম-স্বাধীনতার জন্য লড়াই শুধু রাজপথে নয়, হাসপাতালের বিছানাতেও চলে।
আমার শরীরে তখনও কিছু গুলি রয়ে গিয়েছিল, যেগুলো অপারেশনের মাধ্যমে অপসারণের প্রয়োজন ছিল। চিকিৎসকরা আমার অবস্থা স্থিতিশীল করার পর সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। পুরো সময়জুড়ে আমার পাশে ছিলেন সহযোদ্ধারা, যারা আমাকে সাহস দিয়েছেন, সেবা করেছেন, এক মুহূর্তের জন্যও একা হতে দেননি।
এই চিকিৎসা শুধু শারীরিক ছিল না; এ ছিল জীবনের টানে প্রাণপণ লড়াই। আহত শরীর নিয়ে আমি নতুন করে উপলব্ধি করি; এই আন্দোলনের মূল্য কতটা রক্তাক্ত, কতটা বাস্তব। এই ক্ষতগুলো আমার জন্য শুধু গুলির চিহ্ন নয়, বরং এক একটি যুদ্ধপদক, যা আমাকে সারাজীবন মনে করিয়ে দেবে; আমি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্কলারশিপ হলে ভাল হয়, স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুম
জন্ম তারিখ : ০৮-০৯-২০০৪
জন্মস্থান : দাগনভূঁঞা, ফেনী
পেশা : আলিম পরীক্ষার্থী, দারুন্নাজাত ছিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: দ: মাছিমপুর, ইউনিয়ন: ৮ নং জায়লস্কর, থানা: দাগনভূঁঞা, জেলা: ফেনী
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম
পিতার পেশা ও বয়স : চাকরিজীবী, ৫০
মায়ের নাম : খাদিজা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৭
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ২০,০০০ টাকা
আয়ের উৎস : চাকরি
বাড়ি : টিনের বেড়ার বাড়ি, বন্যার সময় নষ্ট হয়ে গেছে, এখন বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা হয়
সম্পদ : ১৫ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. কাজী আব্দুল্লাহ আল মামুন, বয়স :২৯, পেশা চাকরি, সম্পর্ক: ভাই
২. কাজী আব্দুল্লাহ আল মাসুম, বয়স :২৫, পেশা প্রবাসী, সম্পর্ক: ভাই
৩. সুমাইয়া আক্তার, বয়স: ১৫, পেশা ছাত্রী, শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী রায়েরবাগ, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই, ২০২৪, সন্ধ্যা ৭.০০ মিনিট
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগ এর সন্ত্রাসীরা
কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুম
পেশা: আলিম পরিক্ষার্থী
দারুন্নাজাত ছিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা
ক্রমিক- ৪৬৫
আইডি: চট্টগ্রাম- ৫৫
জন্ম ও শৈশব
২০০৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ফেনী জেলার দাগনভূঁঞা উপজেলার ৮নং জায়লস্কর ইউনিয়নের দক্ষিণ মাছিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুম। সবুজ মাঠ, নদীর কলকল ধ্বনি আর পাখির কুজন যেখানে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে মানুষের জীবনকে যুক্ত করে রাখে, সেই আবহেই বেড়ে ওঠেন তিনি। শৈশব থেকেই তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল নির্ভীকতা ও গভীর মননশীলতার ছাপ।
পারিবারিক জীবন
কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুমের পরিবার ছিল আদর্শিক মূল্যবোধে গড়া এক ঘরানা। তাঁর পিতা কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম, পেশায় একজন চাকরিজীবী, যিনি কঠোর পরিশ্রম ও সৎ জীবনের মাধ্যমে ছেলেকে গড়ে তুলেছেন নৈতিকতার শিক্ষায়। আর তাঁর মা খাদিজা বেগম ছিলেন সংসারের ছায়া, যিনি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও অসীম ধৈর্যের ছায়াতলে সন্তানদের মানুষ করেছেন। বড় ভাই কাজী আব্দুল্লাহ আল মামুন একজন চাকরিজীবী এবং ২য় ভাই আব্দুল্লাহ আল; মাসুম, তিনি একজন রেমিটেন্স যোদ্ধা এবং ছোট বোন সুমাইয়া আক্তার একজন ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী; এই বন্ধন ছিল ভালোবাসা ও সহানুভূতির এক অপরূপ নিদর্শন।
শিক্ষাজীবন ও আত্মগঠনের ধারা
শিক্ষাজীবনে কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ছিলেন মেধাবী ও মননশীল। তিনি ঢাকার দারুন্নাজাত ছিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছেন, যেখানে তিনি শুধু একাডেমিক জ্ঞানেই নয়, বরং নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় চেতনায় নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। শিক্ষার পাশাপাশি সমাজ ও সময়ের প্রতি তাঁর ছিল গভীর দায়বোধ, যা তাঁকে সময়ের প্রয়োজনে সাহসিকতার পথ বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
সংগ্রামী জীবন: ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক সাহসী কণ্ঠ
শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের কালো ছায়া যখন দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার কণ্ঠরোধ করছিল, তখন কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের একজন অগ্রসেনানী, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রমাণ দিয়েছেন; একজন ছাত্রও হতে পারে সময়ের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ফ্যাসিস্ট দমন-পীড়ন, নির্যাতন, গুম-খুনের বিপরীতে তিনি তুলে ধরেন সাহস, বিবেক ও আদর্শের পতাকা। তাঁর জীবন যেন এক উজ্জ্বল দীপশিখা, যা আলোকিত করে সাহসিকতার পথকে।
উত্তরাধিকার: প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা
কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুমের সংগ্রামী জীবন আমাদের সামনে তুলে ধরে একটি প্রেরণার কাহিনী; যেখানে স্বপ্ন, সংকল্প ও সাহসের সম্মিলনে গড়ে ওঠে সত্যিকারের নেতৃত্ব। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি প্রতীক, একটি চেতনা, যা আগামী প্রজন্মকে শিখিয়ে দেয়; অন্যায়ের সামনে নত না হয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিকতা।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ: জুলাই আন্দোলনের রক্তাক্ত দিন: এক যোদ্ধার জবানিতে ভয়াল বাস্তবতা
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোর একটি; এবং আমি বিশ্বাস করি, বাংলার ইতিহাসেও এক রক্তাক্ত অধ্যায়। সেদিন বিকেল ৪টার দিকে আমি ও আমার দুই-তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিলে যাত্রাবাড়ি রায়েরবাগ বাজারে ন্যায়ের দাবিতে আয়োজিত ছাত্র-জনতার মিছিলে অংশ নিই। আমাদের কণ্ঠে ছিল দ্রোহের শ্লোগান, চোখে ছিল স্বপ্নের আগুন। আমরা বিশ্বাস করতাম; সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকলে একদিন এই স্বৈরশাসনের অবসান হবেই। কিন্তু সেই বিশ্বাসকে পিষে দিতে খুব বেশি সময় লাগেনি। সন্ধ্যা নামার আগেই আমাদের উপর নেমে আসে ভয়ংকর এক বিভীষিকা। হঠাৎ করেই পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। অস্ত্র হাতে তারা যেভাবে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তা কোনোভাবেই মানবিক বা ন্যায়সংগত ছিল না। তারা বিনা উস্কানিতে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে; বিক্ষোভের মাটি রক্তে ভিজে ওঠে, বাতাস ভারী হয়ে যায় আর্তনাদে।
আমি বুঝে ওঠার আগেই আমার শরীরে একের পর এক গুলি লাগতে থাকে। আমার মনে আছে, শরীরের ভেতরটা যেন আগুনে জ্বলছিল। তারপর আর কিছু মনে নেই; শুধু অন্ধকার। পরে জেনেছি আমার শরীরে প্রায় ত্রিশটি বুলেট বিদ্ধ হয়েছিল। আমি রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। আমার প্রাণপ্রিয় সঙ্গীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে উদ্ধার করে ডেমরার আসলামিয়া হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে শুরু হয় আমার জীবনের আরেক যুদ্ধ; রক্তক্ষরণ থামানো, গুলিগুলো অপসারণ, আর মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসা। এই যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে আমাদের ওপর এমন বর্বরতা চালানো হলো, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা ছিল পরিকল্পিত গণহত্যার অংশ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করার এক নৃশংস চেষ্টা। আমরা কেবল আমাদের সাংবিধানিক অধিকার চেয়েছিলাম, কিন্তু তার জবাব এসেছিল গুলি দিয়ে।
আমার শরীরের প্রতিটি ক্ষত আজও সাক্ষ্য দেয় সেই দমন- পীড়নের। আমি আজও বেঁচে আছি, কিন্তু সেই বিকেলের ভয়াল চিত্র প্রতিদিন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমি জানি, এই যে আমি গুলি খেয়েছি, এই যে রক্ত দিয়েছি, এটা কেবল আমার একার নয়; এই প্রজন্মের প্রতিটি সাহসী কণ্ঠস্বরের প্রতিচ্ছবি।
আমি এখনও বিশ্বাস করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় সাহস। যদি আমার এ আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাহসী করে তোলে, যদি কেউ একবার হলেও সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়; তাহলে আমি মনে করব, আমার রক্ত বৃথা যায়নি।
চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা
১৯ জুলাইয়ের সেই বিভীষিকাময় বিকেলে ফ্যাসিবাদী হামলায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আমি রাস্তায় রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলাম। শরীরের একাধিক স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, রক্তপাত থামছিল না। চারপাশে তখন আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা আর গুলির আওয়াজ। জীবন যেন একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সে সময় আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে উদ্ধার করেন। চারদিকে তখনও গুলির আওয়াজ থামেনি, রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আহত ও আতঙ্কিত মানুষের আর্তনাদ। কিন্তু আমার ভাইয়েরা পিছপা হননি। সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত তাঁদের জন্য ছিল বিপজ্জনক, কিন্তু তাঁদের চোখে শুধু একটাই উদ্দেশ্য আমাকে বাঁচাতে হবে।
রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তাঁরা আমাকে নিয়ে পৌঁছান ডেমরা ইসলামিয়া জেনারেল হাসপাতালে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরপরই জরুরি বিভাগে চিকিৎসকরা আমাকে ভর্তি করে নেন। প্রথমেই তারা আমার শরীর থেকে গুলিগুলো বের করার চেষ্টা শুরু করেন। ধৈর্য ও নিপুণ হাতে আমার ক্ষতস্থানগুলো পরীক্ষা করে কয়েকটি বুলেট অপসারণ করা হয়। এরপর ক্ষতস্থানগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার (ওয়াশ) করে জীবাণুমুক্ত করে দেয়। রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ব্যান্ডেজ করা হয় এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের তৎপরতা, সহযোদ্ধাদের সহযোগিতা এবং সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমি মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসি। হাসপাতালের ওই ছোট্ট বিছানায় শুয়ে থাকতে বুঝেছিলাম-স্বাধীনতার জন্য লড়াই শুধু রাজপথে নয়, হাসপাতালের বিছানাতেও চলে।
আমার শরীরে তখনও কিছু গুলি রয়ে গিয়েছিল, যেগুলো অপারেশনের মাধ্যমে অপসারণের প্রয়োজন ছিল। চিকিৎসকরা আমার অবস্থা স্থিতিশীল করার পর সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। পুরো সময়জুড়ে আমার পাশে ছিলেন সহযোদ্ধারা, যারা আমাকে সাহস দিয়েছেন, সেবা করেছেন, এক মুহূর্তের জন্যও একা হতে দেননি।
এই চিকিৎসা শুধু শারীরিক ছিল না; এ ছিল জীবনের টানে প্রাণপণ লড়াই। আহত শরীর নিয়ে আমি নতুন করে উপলব্ধি করি; এই আন্দোলনের মূল্য কতটা রক্তাক্ত, কতটা বাস্তব। এই ক্ষতগুলো আমার জন্য শুধু গুলির চিহ্ন নয়, বরং এক একটি যুদ্ধপদক, যা আমাকে সারাজীবন মনে করিয়ে দেবে; আমি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, অবশিষ্ট গুলিগুলো অপসারণের ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
স্কলারশিপ হলে ভাল হয়, স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : কাজী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাইমুম
জন্ম তারিখ : ০৮-০৯-২০০৪
জন্মস্থান : দাগনভূঁঞা, ফেনী
পেশা : আলিম পরীক্ষার্থী, দারুন্নাজাত ছিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: দ: মাছিমপুর, ইউনিয়ন: ৮ নং জায়লস্কর, থানা: দাগনভূঁঞা, জেলা: ফেনী
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম
পিতার পেশা ও বয়স : চাকরিজীবী, ৫০
মায়ের নাম : খাদিজা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৭
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
মাসিক আয় : ২০,০০০ টাকা
আয়ের উৎস : চাকরি
বাড়ি : টিনের বেড়ার বাড়ি, বন্যার সময় নষ্ট হয়ে গেছে, এখন বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা হয়
সম্পদ : ১৫ শতক পরিমাণ জায়গা আছে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. কাজী আব্দুল্লাহ আল মামুন, বয়স :২৯, পেশা চাকরি, সম্পর্ক: ভাই
২. কাজী আব্দুল্লাহ আল মাসুম, বয়স :২৫, পেশা প্রবাসী, সম্পর্ক: ভাই
৩. সুমাইয়া আক্তার, বয়স: ১৫, পেশা ছাত্রী, শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী রায়েরবাগ, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই, ২০২৪, সন্ধ্যা ৭.০০ মিনিট
আক্রমণকারী : আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগ এর সন্ত্রাসীরা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍