হোম / আহতদের তালিকা / আবুল হাসান
আবুল হাসান

আবুল হাসান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : নির্মাণ শ্রমিক, কাঠমিস্ত্রি

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়
মো: আবুল হাসান, পিতা এনায়েত উল্যাহ, জন্মগ্রহণ করেন ২০০০ সালের ২ এপ্রিল ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার এক নিবিড় গ্রামীণ পরিবেশে। সোনাগাজীর প্রকৃতি, মাঠ, খাল-বিল, আর জনপদের সরল মানুষদের সান্নিধ্যে তিনি বেড়ে উঠেছেন। জন্ম থেকেই তিনি ছিলেন অতি মেধাবী, প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন ও দৃঢ়চেতা মানসিকতার অধিকারী। তাঁর শৈশব কেটেছে নিষ্পাপ খেলাধুলা, অধ্যবসায় ও জ্ঞানের প্রতি সীমাহীন আগ্রহে। ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনার প্রতি অগাধ মনোযোগী ছিলেন। একদিকে যেখানে সমবয়সীরা সময় কাটাত খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদের মধ্যে, সেখানে তিনি জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য পড়াশোনায় ডুবে থাকতেন।
বর্তমানে তিনি ফেনী আলীয়া কামিল মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত। মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে তিনি সর্বদা সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন এবং শিক্ষকদের দৃষ্টিতে একজন ভদ্র, মেধাবী ও মনোযোগী ছাত্র হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁর চরিত্রের আরেকটি বড় দিক হলো তিনি ছিলেন অসীম সাহসী ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি দৃঢ়চিত্তে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। সমাজে কিংবা শিক্ষাঙ্গনে যে কোনো অনৈতিকতা তিনি কখনো মেনে নেননি। তাঁর কণ্ঠ সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে উচ্চারিত হয়েছে।
আবুল হাসানের ব্যক্তিত্বের মধ্যে ছিল এক অপার দৃঢ়তা ও সংগ্রামী মনোভাব। তিনি মনে করতেন, একটি সৎ, সচেতন ও সাহসী মানুষই সমাজকে পরিবর্তনের পথে নিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি সর্বদা নিজেকে প্রস্তুত রাখতেন সমাজের কল্যাণে কাজ করার জন্য। বন্ধু, সহপাঠী ও শিক্ষকরা তাঁকে শুধু একজন ছাত্র হিসেবেই চিনতেন না, বরং তাঁকে দেখতেন অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে। শিক্ষাজীবনে তিনি শুধু পাঠ্যপুস্তকের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং ইতিহাস, সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি নিয়মিত বই পড়তেন, চিন্তা করতেন এবং আলোচনায় যুক্ত হতেন। তাঁর মননশীলতা ও প্রখর যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনা তাঁকে সমবয়সীদের চেয়ে অনেক পরিণত করে তুলেছিল।
তাঁর সাহস ও সত্যনিষ্ঠা সবসময়ই তাঁকে এক বিশেষ মর্যাদায় উন্নীত করেছে। তিনি জানতেন, জীবনে বড় হতে হলে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। তাই বাধা-বিপত্তি, প্রতিকূলতা বা সামাজিক চাপ কোনো কিছুই তাঁকে কখনো নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। বরং এসবই তাঁকে আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী করেছে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট তারিখটি আমার জীবনে এক ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে আছে। সেদিন দেশের অন্যান্য স্থানের মতো ফেনীর মহিপালেও ছাত্র-জনতা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদী দমননীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করছিল। সকাল ১০টার দিকে আমি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করি এবং দুপুর ১টা পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করি। চারপাশে হাজারো মানুষের স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছিল “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।” আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তে ছিল উত্তাল আবেগ, ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার দৃঢ়তা।
দুপুরে আজানের ধ্বনি শোনা দিলে আমরা কয়েকজন ছাত্র নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে যাই। নামাজ শেষে প্রায় ১টা ৫০ মিনিটের দিকে আমরা আবার ময়দানে ফিরে আসি। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সেই আন্দোলনকে রক্তাক্ত করতে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলার পথ বেছে নেয়। হঠাৎ করেই চারদিক থেকে গুলি চালাতে শুরু করে। আমি বুঝে ওঠার আগেই একটি গুলি আমার বুকের ডান পাশে এসে বিদ্ধ হয়। গুলিটি আজও আমার শরীরে রয়ে গেছে এবং প্রতিনিয়ত আমাকে তীব্র যন্ত্রণার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমি রক্ত দিয়েছি।
এরপর বিকাল ৫টার দিকে মাস্টারপাড়ায় আবারও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। চারদিকে গুলির শব্দ, আতঙ্কে ছুটোছুটি করা মানুষ আর অসহায় ছাত্রদের রক্তাক্ত দেহ সব মিলে চারপাশে তৈরি হয় এক বিভীষিকাময় পরিবেশ। আমরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াই, আত্মগোপন করি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আমি বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে যাই, কারণ শহরে অবস্থান করা আর নিরাপদ ছিল না। বুকের গুলির ক্ষত আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিচ্ছে, তবুও মনোবল ভেঙে দিতে পারেনি।
এই ঘটনা কেবল আমার একার নয়, এটি বাংলাদেশের চলমান ফ্যাসিস্ট দমননীতির এক নগ্ন চিত্র। শেখ হাসিনার শাসনামলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নিরস্ত্র ছাত্ররা আক্রান্ত হয়েছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে দমন করার জন্য এমনভাবে গুলি চালানো হয়েছে, যেন জনগণ ভয় পেয়ে চুপ হয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ফ্যাসিস্ট দমননীতি কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আজ আমি বুকের ভেতরে গুলি নিয়ে বেঁচে আছি, প্রতিটি মুহূর্তে ব্যথার সঙ্গে লড়াই করছি। তবে এই ক্ষত আমাকে দুর্বল করে না, বরং আরও শক্ত করে। কারণ আমি জানি, আমার শরীরে রয়ে যাওয়া এই গুলি ফ্যাসিস্ট হাসিনার দমননীতির বিরুদ্ধে এক জীবন্ত সাক্ষ্য। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আন্দোলনে আমি রক্ত দিয়েছি, কষ্ট সহ্য করছি কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের জন্য আমার প্রতিবাদ কখনো থামবে না।
চিকিৎসা
৪ আগস্ট ২০২৪ ফেনীর মহিপালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে আমি প্রাণে বাঁচার তাগিদে ফেনীর আনসার ক্যাম্প হাসপাতালে যাই এবং সেখানে তড়িঘড়ি করে প্রাথমিক ব্যান্ডেজ করি। বুকের ডান পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তক্ষরণ হওয়ায় অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। পরে বিকাল ৪টার দিকে আমাকে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে আমি প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করি। কিন্তু দ্রুত বোঝা যায়, আমার শারীরিক অবস্থা গুরুতর এবং ফেনীতে উন্নত চিকিৎসা সম্ভব নয়। এ কারণে ফেনীর চিকিৎসক ডা: আদনান ও ডা: মোবারক আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার পর একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেও গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকেরা জানান, বুকের ভেতরে গুলি এমন জায়গায় আটকে আছে, যা বের করার চেষ্টা করলে প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পরে আমাকে পুনরায় ফেনী সদর হাসপাতালে ফিরিয়ে আনা হয় এবং সেখানে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ ও সিভিল সার্জনের প্রত্যয়ন সাপেক্ষে আমাকে ঢাকার মহাখালী বক্ষব্যাধী হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঢাকায় পৌঁছানোর পরও চিকিৎসকেরা আমার শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে জানান, মৃত্যুঝুঁকি থাকায় অপারেশন করা সম্ভব নয়। ফলে গুলিটি শরীরের ভেতর রেখেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। আমি সেখানে টানা তিনদিন ভর্তি থেকে ওষুধ, পর্যবেক্ষণ ও সাপোর্টিভ চিকিৎসা গ্রহণ করি। পরবর্তীতে কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলে আমাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় এবং আমি বাড়ি ফিরে আসি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর পরেও বুকের ডান পাশে এখনো গুলি রয়েছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
আমি মো: আবুল হাসান, ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ফেনীর মহিপালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হই। আমার বুকের ডান পাশে একটি গুলি বিদ্ধ হয়, যা আজও শরীরের ভেতরে রয়ে গেছে। ফেনী সদর হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সর্বশেষ ঢাকার মহাখালী বক্ষব্যাধী হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও মৃত্যুঝুঁকির কারণে গুলি অপসারণ সম্ভব হয়নি। বর্তমানে আমি আংশিক সুস্থ হলেও বুকের ভেতরে গুলি থাকার কারণে প্রতিনিয়ত ব্যথা অনুভব করি, শ্বাসকষ্ট ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছি।
এ অবস্থায় আমার উন্নত চিকিৎসা জরুরি প্রয়োজন। ফেনী, চট্টগ্রাম বা ঢাকার চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে আমার জীবন হুমকির মুখে রয়েছে। তাই আমার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় আমাকে বিদেশে উন্নতমানের কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে (যেমন ভারত, সিঙ্গাপুর বা অন্য কোনো উন্নত দেশ) দ্রুত পাঠানো প্রয়োজন, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞ সার্জনদের তত্ত্বাবধানে ঝুঁকিমুক্তভাবে অপারেশন সম্ভব হতে পারে। আমার সুস্থ জীবন ফিরে পেতে এবং ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ কারণে আমি সরকার, দাতব্য সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধ করছি যেন আমাকে দ্রুত বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
নাম : মোঃ আজহার হোসেন
জন্ম তারিখ : ১-৯-২০০০
জন্মস্থান : সোনাগাজী, ফেনী
পেশা : নির্মাণ শ্রমিক, কাঠমিস্ত্রি
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চরমজলিশপুর, ৯ নং ওয়ার্ড, দাস ইউনিয়ন, দাগনভূঞা, ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: ৩ নং ওয়ার্ড, পোল্লাকান্দা, ফেনী পৌরসভা, ফেনী
পিতার নাম : মোস্তাফিজুর রহমান
পিতার পেশা ও বয়স : দিনমজুর, ৫৫
মাতার নাম : রাবেয়া খাতুন
মাতার পেশা : গৃহিণী
ভাই-বোনের সংখ্যা : ১,২০০০০/-

আহত হওয়ার বিবরণ
১. ১৯ জুলাই - রায়েরবাগের সামনে
২. গুলিতে আহত হন, মাথায়
৩. গুরুতর আহত, সংকটাপন্ন
৪. আহত হওয়ার স্থান : ৩ নং ওয়ার্ড, রায়েরবাগ
৫. আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪
আক্রমণকারী : আওয়ামী লীগ ক্যাডার, পুলিশ, সেনা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍