হোম / আহতদের তালিকা / মো. তুহিন
মো. তুহিন

মো. তুহিন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম পরিচয়
মোহাম্মদ তুহিন একটি নাম, যে নামের ভেতর লুকিয়ে আছে মেধা, স্বপ্ন আর দেশের প্রতি এক উন্মাতাল ভালোবাসা। ২০০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফেনীর দক্ষিণ শালধর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা আব্দুর রসুল একজন কৃষক, মাতা নুর নেহার গৃহিণী। কৃষিভিত্তিক আয় আর সংগ্রামী বাস্তবতার মাঝেও তুহিন বেড়ে ওঠেন এক স্বপ্নবাজ মন নিয়ে। বর্তমানে তিনি ছাগলনাইয়ার মটুয়ায় বসবাস করেন এবং একজন শিক্ষার্থী হিসেবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। পরিবারে রয়েছে আরও ছয়জন সদস্য। তাদের ভালোবাসার মাঝেই গড়ে উঠেছে তার বোধ, চিন্তা আর প্রতিবাদী চেতনা।

জুলাই আন্দোলনের এক সাহসী মুখ হিসেবে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, বিকাল ২:৩০ মিনিটে ফেনীর মহিপালের হাজারী রোডে খুনি হাসিনা বিরোধী মিছিলে অংশ নেন তিনি। হঠাৎই শুরু হয় সন্ত্রাসী আওয়ামী লীগ ও পুলিশের দিক থেকে পরিকল্পিত হামলা। গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে শহর। সেই ভয়াবহ মুহূর্তে তুহিন গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। একটি অঙ্গার স্বপ্নে ভরা বুক মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু সে স্বপ্ন থেমে যায়নি, কারণ তুহিন শুধু আহত হননি, তিনি ইতিহাসে জেগে থেকেছেন একজন প্রত্যয়ী সৈনিক হিসেবে, যিনি জানতেন বুলেট ক্ষণিকের ব্যথা দেয়, কিন্তু স্বপ্নের মৃত্যু ঘটাতে পারে না।
আন্দোলনে ভুমিকা
মোহাম্মদ তুহিন ছিলেন সেইসব তরুণদের একজন, যাদের বুকের ভেতর ছিল আগুনে ঝলসানো স্বপ্ন। একটি ন্যায়ের বাংলাদেশ, যেখানে মানুষ নিজের মত প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হবে না, যেখানে ভোট হবে নিজের অধিকার, ভয় নয়। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, ঠিক দ্বিতীয় জামাতের সময়, ফেনীর মহিপালের হাজারী রোডে হাসিনার বিচার ও পদত্যাগের দাবিতে পতাকা হাতে দাঁড়িয়েছিলেন তুহিন। চারপাশে তখন কেবল প্রতিজ্ঞা, কণ্ঠে স্লোগান আর চোখে ছিলো স্বাধীনতার দুরন্ত দীপ্তি।
হঠাৎ করেই সেই দীপ্তি চাপা পড়ে গুলির শব্দে। আওয়ামী লীগের দোসর ও পুলিশ বাহিনী একত্র হয়ে আক্রমণ চালায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর। শুরু হয় প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, যেন এক রক্তপিপাসু শক্তি ক্ষুধার্ত হয়ে ছুটে আসছে প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করতে। এই নিষ্ঠুরতা, এই বর্বরতা কোনো রাজনীতি নয়, এক পরিকল্পিত নিপীড়ন, যেখানে ক্ষমতা তার লজ্জা হারিয়ে ফেলে।
এই সংঘর্ষের মাঝেই মোহাম্মদ তুহিনের ডান হাতে গুলি লাগে। রক্ত ঝরতে থাকে, কিন্তু সে রক্তে মুছে যায়নি তার স্বপ্ন বরং আরও গভীরভাবে লিখে দেয় ইতিহাসের পৃষ্ঠায়, যে তরুণরা গুলিতে পড়ে যায়, তারা শেষ হয়ে যায় না; তারা প্রতিরোধ হয়ে ফিরে আসে।
আওয়ামী শাসন সে দিন প্রমাণ করেছিল, তারা শুধু স্বৈর নয়- নৃশংস, বর্বর, এবং জনআতঙ্কের প্রতিমূর্তি। যারা নামাজের পরে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকা তরুণদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করে, তারা রাজনীতির পোশাকে হিংসার ভণ্ড মূর্তি। আর তুহিন? তিনি শুধু গুলিবিদ্ধ নন, তিনি এখন ইতিহাসের বুকে আগুন হয়ে লেখা এক নাম। এক সাহসী প্রতিবাদী, যে জানে, যন্ত্রণা ক্ষণিকের, কিন্তু ন্যায় চিরন্তন।
চিকিৎসা
আহত হওয়ার পর মোহাম্মদ তুহিনের চিকিৎসার যাত্রা ছিল এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের মতো ব্যথা, ভয় ও সাহসের মিশ্র এক গল্প। গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকার পর সহযোদ্ধারা তাকে দ্রুত সরিয়ে নেন কুমিল্লা বাস স্ট্যান্ড এলাকার একটি ছোট ফার্মেসিতে, যেখানে রক্তক্ষরণ বন্ধে তড়িঘড়ি করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানকার স্যালাইন আর গজে বাঁধা ক্ষত যেন কিছুটা হলেও শান্তি এনে দেয় শরীরকে, কিন্তু মনে তখনো ঝড় বইছে।
পরবর্তীতে তাঁকে নেওয়া হয় কুমিল্লার আলকেমী হাসপাতালে, যেখানে আরো উন্নত চিকিৎসা শুরু হয়। চিকিৎসকেরা বলেন- শুধু ওষুধে হবে না, গুলির ক্ষত এতটাই গভীর যে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। শেষমেশ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ভর্তি করে তার হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়। অপারেশনের আলোঝলমলে ঘরেও তুহিনের চোখে ছিল প্রতিবাদের ছায়া। একটি অসম লড়াইয়ে রক্ত দিয়ে লেখা সাহসের স্বাক্ষর। শরীরের ব্যথা ধীরে ধীরে কমতে থাকে, কিন্তু তার বুকের ভেতরে যে স্বপ্ন ছিল ন্যায়ের, তা হয়ে ওঠে আরও দৃঢ়, আরও অগ্নিময়।


নাম : মোহাম্মদ তুহিন
জন্মতারিখ : ০১-০১-২০০৩
জন্মস্থান : দক্ষিণ শালধর, ফেনী
পেশা : শিক্ষার্থী
স্থায়ী ঠিকানা : দক্ষিণ, শালধর, ৩ নং চিথলিয়া, পরশুরাম, ফেনী
বর্তমান ঠিকানা : মটুয়া, ছাগলনাইয়া, ফেনী
পিতা : আব্দুর রসুল (কৃষি, ৬৭)
মাতা : নুর নেহার (গৃহিণী)
আয় : প্রায় ২০,০০০ টাকা (কৃষি)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৭
মাওলানা দেলোয়ার (৩০), তৌওহিদুল ইসলাম (২৩)
ঘটনার স্থানঃ মহিপাল হাজারি রোড
আক্রমণকারীঃ আওয়ামীলীগ ও পুলিশ বাহীনি
আহত হওয়ার সময়ঃ ৪ই আগস্ট বিকাল ২:৩০ মিনিটে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍