হোম / আহতদের তালিকা / আবদুল মান্নান
আবদুল মান্নান

আবদুল মান্নান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ব্যবসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
১৯৮৭ সালের ২৬ নভেম্বর, ফেনী জেলার সোনাগাজী থানার ভোর বাজার ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম গোয়ালিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল মান্নান। তার জন্ম এক সাধারণ পরিবারে হলেও ছোটবেলা থেকেই ছিলো অনেক স্বপ্ন আর সংগ্রামের গল্প। পিতা মোঃ হানিফ ছিলেন পরিশ্রমী মানুষ, কিন্তু তিনি বেশ কিছু বছর আগে মারা যান। ফলে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মা সজিবা খাতুনের কাঁধে। মা একজন গৃহিণী হলেও অসীম ধৈর্য ও মমতায় সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। মান্নানের শৈশব কেটেছে গ্রামের মাটির গন্ধ, সবুজ মাঠ আর নদীর ধারে খেলাধুলা করে। স্কুলে পড়াশোনা তেমন দূর এগোয়নি, তবে ছোটবেলা থেকেই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

তিনি বড় হতে হতে বুঝতে পারেন, সংসারের হাল ধরতে হলে তাকে অর্থ উপার্জনের পথ বেছে নিতে হবে। তাই ধীরে ধীরে তিনি ব্যবসার কাজে মনোনিবেশ করেন এবং নিজের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেন। সংসারে তার স্ত্রী এবং চার সন্তান। লিমা আক্তার, শিখা, নাহিম আক্তার ও জিহাদ। সংসার ছোট হলেও দায়িত্ব ছিলো অনেক বড়। মাসিক প্রায় ১৪,৫০০ টাকা আয়ে তিনি কোনোভাবে পরিবারকে চালাতেন। তবুও গ্রামের মানুষদের কাছে তিনি ছিলেন সৎ, পরিশ্রমী আর সাহসী একজন মানুষ।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে ২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শিক্ষার্থীরা ন্যায্য দাবির জন্য রাস্তায় নামে। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য। দেশের সর্বত্র ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করে। সেসময় সাধারণ ব্যবসায়ী হলেও মান্নান শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলন গভীরভাবে অনুসরণ করতেন। তাদের প্রতি তার সহানুভূতি ছিল প্রবল। কারণ তিনি জানতেন, অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই ঝুঁকি নেওয়া, কিন্তু এ ঝুঁকিই পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
সময়ের ব্যবধানে আসে ২০২৪ সালের আন্দোলন। এবার ছাত্ররা এক দফা আন্দোলনের ডাক দেয় "কোটা সংস্কার না হলে কোনো আপস নেই"। জুলাই-আগস্ট মাসজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। রাস্তায় নামে হাজার হাজার ছাত্র, তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যোগ দেয়। ব্যবসায়ী হয়েও আব্দুল মান্নান মনে করলেন, এটি কেবল ছাত্রদের আন্দোলন নয়, বরং দেশের ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন। তাই তিনি নিজের অবস্থান ভুলে গিয়ে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
ঘটনার দিন
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। দুপুরের সময় ফেনীর মইপাল এলাকায় ছাত্ররা এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। সেই কর্মসূচিতে অংশ নিতে যান আব্দুল মান্নান। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সমাবেশ মুহূর্তেই রূপ নেয় সংঘর্ষে। ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ এবং পুলিশ মিলে ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়। রাস্তায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। ইট-পাটকেল উড়ে আসে দুই দিক থেকে। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই এক বড় ইট এসে আঘাত করে আব্দুল মান্নানের মাথায়। মুহূর্তেই রক্তে ভিজে যায় তার শরীর। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মাথার ক্ষত থেকে প্রবল রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আশপাশের মানুষ ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও সাহসী কিছু ছাত্র এগিয়ে আসে। তারা তাকে ধরে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় থেকে সরিয়ে নেয়। পুলিশ তখনও নির্মমভাবে ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ করছে, গুলি ছুঁড়ছে। অনেকেই গুরুতর আহত হয়। পরিস্থিতি ছিলো আতঙ্ক আর মৃত্যুভয়ে ভরপুর। সেই ভয়াবহ মুহূর্তের ভেতর থেকেই ছাত্ররা মান্নানকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।
চিকিৎসা ও সুস্থতা
হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর আব্দুল মান্নানকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হলেও সবার চোখে স্বস্তি ছিলো, তিনি বেঁচে ফিরেছেন। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে একজন ডাক্তারকে ডেকে আনা হয়। তিনি মান্নানের মাথায় সেলাই দেন এবং ওষুধ লিখে দেন। কয়েকদিন রক্তপাত বন্ধ হলেও প্রচণ্ড ব্যথায় তিনি কষ্ট পেয়েছেন। তাকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ বিশ্রামে থাকতে হয়েছে। সন্তানরা বাবার পাশে বসে তাকে সেবা দিয়েছে। স্ত্রী ভোর থেকে রাত পর্যন্ত তার যত্নে ব্যস্ত থেকেছেন। ধীরে ধীরে ক্ষত শুকাতে শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যে তিনি হাঁটাচলা করতে পারেন, কাজেও ফেরেন। আজ তিনি পুরোপুরি সুস্থ। মাথার ক্ষতচিহ্ন এখনো রয়ে গেছে, যা তাকে সেই রক্তাক্ত দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে তিনি গর্ব অনুভব করেন—কারণ তিনি কেবল একজন ব্যবসায়ী নন, ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানো একজন সাধারণ মানুষ, যিনি নিজের রক্ত দিয়ে আন্দোলনের ইতিহাসে একটি সাক্ষ্য রেখে গেছেন।

একনজরে ব্যাক্তির বিবরণ
নাম : আবদুল মান্নান
জন্ম তারিখ : ২৬ নভেম্বর ১৯৮৭, জন্মস্থান : ফেনী
পেশা : ব্যবসা
নিজ জেলা : ফেনী
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম: গোয়ালিয়া, ইউনিয়ন : ভোর বাজার, থানা: সোনাগাজী, জেলা : ফেনী
পিতার নাম : মো: হানিফ (মৃত)
মায়ের নাম : সজিবা খাতুন, পেশা ও বয়স : গৃহিণী
মাসিক আয় : ১৪,৫০০ টাকা, আয়ের উৎস: ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৬ জন (স্ত্রী, মেয়ে-৩, ছেলে-১ ও আবদুল মান্নান)
সন্তানদের বিবরণ
১. লিমা আক্তার, বয়স : ১৮, পেশা: গৃহিণী, সম্পর্ক: মেয়ে
২. শিখা, বয়স : ১১, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৫ম, সম্পর্ক: মেয়ে
৩. নাহিম আক্তার, বয়স : ৭, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: ৩য়, সম্পর্ক: মেয়ে
৪. জিহাদ, বয়স : ৮, পেশা: ছাত্র, সম্পর্ক: ছেলে

ঘটনার স্থান : চৌধুরী বাড়ি রোড, মহিপাল, ফেনী
আহত হওয়ার সময়কাল : ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২.০০ টা
আক্রমণকারী : ফেনী জেলার ঘাতক আওয়ামী কর্মী ও পেটোয়া পুলিশ বাহিনী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍