হোম / আহতদের তালিকা / আব্দুল্লাহ আল মামুন
আব্দুল্লাহ আল মামুন

আব্দুল্লাহ আল মামুন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
২০০৩ সালের ১ জানুয়ারি, নতুন বছরের প্রথম দিনে চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি থানার দাদিয়াপাড়া গ্রামে জন্ম নেন মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন। জন্মের সময় থেকেই যেন তার জীবন পরিবারে এক নতুন আলো বয়ে আনে। বাবা মকবুল হোসেন ছিলেন গ্রামের একজন সম্মানিত শিক্ষক। তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে। মা ফাহিমা বেগম সংসার সামলাতেন; তার স্নেহ ও ত্যাগেই পরিবারটি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল।
শৈশবে আব্দুল্লাহ ছিল চঞ্চল ও প্রাণবন্ত। পাড়ার মাঠে বন্ধুদের নিয়ে খেলাধুলা, নদীর ধারে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখা ু সবকিছুতেই ছিল তার সরল আনন্দ। তবে খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনার প্রতিও তার আগ্রহ ছিল গভীর। মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রিয় ছাত্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে আরবি, বাংলা ও ইসলামি ইতিহাস বিষয়ে তার দক্ষতা ছিল উল্লেখযোগ্য। পরিবারের আর্থিক অবস্থা মধ্যবিত্ত হলেও বাবা মকবুল হোসেন কখনো সন্তানদের শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করেননি। মাসিক যে বেতন পেত তা দিয়ে চার সদস্যের সংসার চালানো ছিল কষ্টসাধ্য, তবুও সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য সর্বদা চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। মামুনের ভাইবোনদের মধ্যে আঃ রহমান তখন নবম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবারটি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক ু এ ছিল সবার অভিন্ন স্বপ্ন। গ্রামীণ পরিবেশের মধ্যেই আব্দুল্লাহ বেড়ে উঠেছিল। ফজরের আজান শুনে ঘুম থেকে ওঠা, কোরআন শরিফ পড়া, মক্তবে যাওয়া, বিকেলে খেলাধুলা ু এভাবেই কাটতো তার শৈশব। জীবনের প্রথম থেকেই শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বেড়ে ওঠা এই তরুণের মাঝে দেখা যেত দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
সময় এগোতে থাকে, দেশও পাল্টাতে থাকে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে আবারও তীব্রভাবে সামনে আসে কোটা সংস্কার আন্দোলন। আগেও এ আন্দোলন হয়েছিল, কিন্তু এবার এর বিস্তার আরও গভীর ও ব্যাপক। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত ছাত্রসমাজের দাবি একটাই ু অন্যায্য কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করতে হবে। আব্দুল্লাহ তখন হাজিগঞ্জ আহমাদিয়া কামিল মাদরাসার ছাত্র। প্রতিদিন ক্লাস শেষে সে বন্ধুদের সঙ্গে দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করত। আন্দোলনের খবর শুনে তার মনে ক্ষোভ জন্ম নেয়। কেননা, সে বুঝতে পেরেছিল এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা থাকলে তার মতো হাজারো ছাত্র ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। হাজিগঞ্জে স্থানীয় ছাত্ররাও একত্রিত হয়ে সমন্বয়কের মাধ্যমে আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করে। গ্রামের মাঠ থেকে শহরের মোড়ে মোড়ে শ্লোগান ভেসে আসত “কোটা নয়, চাই সমান অধিকার,মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চাই”। আব্দুল্লাহও সেই স্লোগানে কণ্ঠ মিলিয়েছিল। তার বাবা একজন শিক্ষক হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেয়েছিল। শান্তিপূর্ণ মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে তারা তাদের দাবি জানাচ্ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাজিগঞ্জে আন্দোলনের ডাকে চারদিক থেকে ছাত্ররা জমায়েত হতে থাকে। সেদিন ৪ আগস্ট ২০২৪ সালের সকালটি ছিল মামুনের জীবনের এক বিশেষ সকাল ু সে বুঝতে পারেনি কয়েক ঘণ্টা পর তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে।
আহত হওয়ার ঘটনা
৪ আগস্ট ২০২৪ সালের বেলা ১১টা ৩০ মিনিট। হাজিগঞ্জ পাইলট মসজিদের সামনে থেকে একটি বিশাল মিছিল শুরু হয়। ছাত্র-জনতার সমন্বয়ে তৈরি সেই মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। আব্দুল্লাহ ছিল মিছিলের মাঝামাঝি অংশে। স্লোগানে মুখরিত চারদিক, সবার দাবি ছিলো একটাই স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন। কিন্তু রজনীগন্ধা মার্কেটের কাছে পৌঁছাতেই পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে যায়। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনীরা আগেই ওঁত পেতে ছিল। মুহূর্তেই তারা লাঠি-সোটা, রড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিছিলে। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন স্থানীয় ছাত্রলীগ সভাপতি মেহেদী হাসান রাব্বী। শান্তিপূর্ণ মিছিল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
মামুনের দিকে কয়েকজন হামলাকারী সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই লাঠির আঘাত তার ওপর পড়তে থাকে। প্রথম আঘাতেই ডান হাত ভেঙে যায়, এরপর আরেকটি শক্ত আঘাতে বাঁ হাতও ভেঙে যায়। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আব্দুল্লাহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারপাশে ছিল বিশৃঙ্খলা, আতঙ্ক আর মানুষের চিৎকার। তার সহপাঠীরা চিৎকার করতে থাকে ু “আব্দুল্লাহকে বাচাও। কেউ কেউ হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করলেও তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অবশেষে ছাত্র-জনতা এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করে। আব্দুল্লাহ তখন জ্ঞান হারানোর উপক্রম, দুই হাত থেকে প্রচণ্ড ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছিল সারা শরীরে।
সেদিনের সেই হামলা শুধু আবদুল্লাহর শরীর নয়, তার জীবনের স্বাভাবিক ধারাকেই ভেঙে দিয়েছিল।
চিকিৎসা
হামলার পরপরই স্থানীয়রা আব্দুল্লাহকে দ্রুত হাজিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকরা তার দুই হাতে প্লাস্টার দেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পন্ন করেন। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে দ্রুত চাঁদপুর সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চাঁদপুর হাসপাতালে চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। নিয়মিত চেকআপ এবং উন্নত চিকিৎসা ছাড়া পুরোপুরি সুস্থ হওয়া কঠিন। মামুনের পরিবারের উপর যেন এক আকাশ ভেঙে পড়ে। বাবা মকবুল হোসেন হতাশ কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলেটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েছিল, আজ ওর দুই হাত ভেঙে গেল। আমরা এখন কিভাবে সামলাব?” মা ফাহিমা বেগম কেঁদে বারবার বলছিলেন,ও তো শুধু পড়াশোনা করতে চেয়েছিল, ভালো মানুষ হতে চেয়েছিল। আল্লাহ যেন ওকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেন।
বর্তমানে মামুন চিকিৎসাধীন। হাতে প্লাস্টার এখনো রয়েছে, আর তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলে আছে। পরিবার চায়, মামুন যেন উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পায় এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু মধ্যবিত্ত এই পরিবারটির পক্ষে সব খরচ বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার ভবিষ্যৎ কি আবার স্বাভাবিক পথে ফিরবে, নাকি সেই দিনের নির্মম লাঠির আঘাত চিরদিনের মতো তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দেবে ু এই প্রশ্ন এখন মামুনের পরিবার ও স্বজনদের বুক চেপে ধরে আছে।


নাম : আব্দুল্লাহ আল মামুন
জন্ম তারিখ : ১ জানুয়ারি ২০০৩
জন্মস্থান : দাদিয়াপাড়া
পেশা : ছাত্র
প্রতিষ্ঠান : হাজিগঞ্জ আহমাদিয়া কামিল মাদরাসা
নিজ জেলা : চাঁদপুর
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা
গ্রাম: দাদিয়াপাড়া
ইউনিয়ন : রায়াশ্রী উত্তর
থানা: শাহরাস্তি
জেলা : চাঁদপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মকবুল হোসেন
মায়ের নাম : ফাহিমা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : শিক্ষক, ৫৬ বছর
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২ বছর
মাসিক আয় : ৫,০০০ টাকা
আয়ের উৎস: শিক্ষকতা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৪ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. আঃ রহমান, বয়স : ১৬, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ৯ম, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : হাজিগঞ্জ রজনীগন্ধা মার্কেট, চাঁদপুর
আহত হওয়ার সময়কাল : ৪ আগস্ট ২০২৪ ইং, বেলা ১১.৪০ মিনিট
আক্রমণকারী : মেহেদী হাসান রাব্বী (ছাত্রলীগ সভাপতি)

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍