হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ শাকিল শামছ
মোঃ শাকিল শামছ

মোঃ শাকিল শামছ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
মোঃ শাকিল শামছ ২০০২ সালের ১৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার আমিলাইস গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা শাকিল ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তাঁর বাবা বদরুদ্দোজা একজন ছোট ব্যবসায়ী, মাসিক আয়ে সংসার চালাতেন কষ্ট করে। মায়ের নাম মাসকুরা বেগম, একজন গৃহিণী।শাকিল তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। ভাই সোহেল অনার্সে পড়াশোনা করছে, আরেক ভাই সোহান কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে। ছোট বোন মনিরাজুল জান্নাত দশম শ্রেণির ছাত্রী। সংসারের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল বাবার ব্যবসা। সীমিত আয়ের মধ্যে পরিবারের খরচ, পড়াশোনার খরচ, চিকিৎসা সবই চালিয়ে নিতে হতো।শাকিল স্থানীয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে তিনি খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে ভর্তি হন ডিগ্রি ১ম বর্ষে। গ্রামের ছেলে হয়ে তিনি শহরে গিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। তিনি চেয়েছিলেন পড়াশোনা শেষে একটি সরকারি চাকরি করবেন। পরিবারের আর্থিক সংকট ঘুচিয়ে বাবা-মাকে সুখী জীবন দেবেন।গ্রামীণ জীবন, সীমিত আয়, আর স্বপ্নভরা চোখ এসব নিয়েই বেড়ে উঠেছিল শাকিল শামস।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথমবার এই আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, সরকারি চাকরিতে মেধার মূল্যায়ন হতে হবে। ৫৬% কোটা সংস্কারের দাবিতে দেশজুড়ে তরুণরা রাস্তায় নামে। সরকার তখন তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালায়। অবশেষে আন্দোলনের চাপে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান দেয়নি।২০২৪ সালে আবারও আন্দোলন জোরদার হয়। এবার শুধু কোটা সংস্কার নয়, শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগও ছিল শিক্ষার্থীদের এক দফা দাবি। দেশে-বিদেশে ছাত্র, তরুণ, শ্রমিক, কৃষক সবাই এই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে খাগড়াছড়িতেও আন্দোলন জোরদার হয়। স্থানীয় ছাত্ররা শাপলা চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। শাকিল শামস ছিলেন তাদের একজন। তিনি বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলনে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। তাঁর কাছে এটি শুধু ছাত্রদের আন্দোলন ছিল নাএটি ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই।৪ আগস্ট ২০২৪ সালে খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বরে বিশাল সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। সকাল থেকেই ছাত্ররা জড়ো হতে থাকে। শাকিলও সেদিন বন্ধুদের সাথে সেখানে উপস্থিত হন। তাঁর মনে ছিল উত্তেজনা, আবার ভয়ও ছিল। কিন্তু দেশের জন্য, প্রজন্মের জন্য তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন এই আন্দোলনে।
আহত হওয়ার ঘটনার বিবরণ
৪ আগস্ট দুপুর ১২টা ২০ মিনিট। শাপলা চত্বর ভরে গেছে ছাত্র-জনতার স্লোগানে। তারা আওয়াজ তুলছে এক দফা, এক দাবি হাসিনা সরকার তুই কবে যাবি । হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা দেশি বিদেশি অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হাতে লাঠি, রড, ধারালো অস্ত্র। তারা বিনা উসকানিতে শান্তিপূর্ণ মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।শাকিল হঠাৎ অনুভব করেন তাঁর শরীরে প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাঁর কোমর, পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত ঝরতে থাকে। আতঙ্কের মধ্যে তিনি মাটিতে পড়ে যান। এর মধ্যেই আক্রমণকারীরা তাঁর মুখে আঘাত করে। তাঁর দুটি দাঁত ভেঙে যায়। মাথায় গুরুতর চোট লাগে।চারপাশে আর্তচিৎকার। সহপাঠীরা দৌড়ে এসে তাঁকে মিছিল থেকে সরিয়ে আনে। রক্তে ভেজা কাপড়, মুখে যন্ত্রণা তবুও শাকিলের চোখে তখন আন্দোলনের আগুন নিভে যায়নি।
চিকিৎসা
আঘাত পাওয়ার পর তাঁকে দ্রুত খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর মাথায় সেলাই করা হয়, শরীরের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা দেওয়া হয়। মুখ থেকে দুটি দাঁত উঠে গিয়েছিল, সেই যন্ত্রণায় তিনি কথা বলতেও কষ্ট পাচ্ছিলেন।হাসপাতালে তিনি টানা দুই দিন ভর্তি ছিলেন। তাঁর পায়ে, কোমরে এবং মাথায় সেলাই দেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।বর্তমানে শাকিল চিকিৎসাধীন। তাঁর শরীরের ক্ষত শুকালেও দাঁতের ক্ষতি ও কোমরের ব্যথা তাঁকে দুর্বল করে তুলেছে। ডাক্তাররা বলেছেন, নিয়মিত চিকিৎসা ও বিশ্রাম ছাড়া সুস্থ হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু পরিবারটি আর্থিক সংকটে ভুগছে। বাবার সীমিত আয়ে সংসার চলে, তার ওপর অতিরিক্ত চিকিৎসার খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।তবুও শাকিল আশা ছাড়েননি। তিনি মনে করেন, তাঁর এই ত্যাগ বৃথা যাবে না। দেশের জন্য, ন্যায়ের জন্য, প্রজন্মের জন্য যে রক্ত ঝরেছে, তা একদিন ফলপ্রসূ হবেই।

নাম : মোঃ শাকিল শামছ
জন্ম তারিখ : ১৫/১২/২০০২
জন্মস্থান : সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম
পেশা : ছাত্র
প্রতিষ্ঠান : সরকারি কলেজ, খাগড়াছড়ি (ডিগ্রি ১ম বর্ষ, ২০২২ু২৩ সেশন)
নিজ জেলা : চট্টগ্রাম
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা
গ্রাম: আমিলাইস
ইউনিয়ন: নয়নপুর
থানা: সাতকানিয়া
জেলা: চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা: খাগড়াছড়ি সদর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: বদরুদ্দোজা
পিতার পেশা ও বয়স: ছোট ব্যবসায়ী, বয়স ৬২ বছর
মায়ের নাম: মাসকুরা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিণী, বয়স ৪৮ বছর
মাসিক আয়: ২৫,০০০/-
আয়ের উৎস: বাবার ছোট ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৭
ভাইবোনদের বিবরণ
১. মো: সোহেল শামী, বয়স ২২, পেশা: ছাত্র, অনার্স, সম্পর্ক: ভাই
২. সো: সোহান, বয়স ২০, পেশা: ছাত্র, ইন্টার ১ম বর্ষ, সম্পর্ক: ভাই
৩. মনিরাজুল জান্নাত, বয়স ১৬, পেশা: ছাত্রী, ১০ম শ্রেণি, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান: খাগড়াছড়ি সদর, শাপলা চত্বর (সেলিম মার্কেট ও ইজঞঈ কম্পিউটার সংলগ্ন এলাকা)
আহত হওয়ার সময়কাল: ০৪/০৮/২০২৪, দুপুর ১২:২০ মিনিট
আক্রমণকারী: আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍