হোম / আহতদের তালিকা / হাসান মোহাম্মদ সোহেল
 হাসান মোহাম্মদ সোহেল

হাসান মোহাম্মদ সোহেল

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ
স্থায়ী ঠিকানা: বাজালিয়া, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও পরিচয়
হাসান মোহাম্মদ সোহেল জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯৮ সালের ২৪ জানুয়ারি, চট্টগ্রামের পাহাড়-নদীঘেরা শান্ত এক অঞ্চল বাজালিয়ায়, সাতকানিয়ার বুকে। গ্রামের মাটির ঘ্রাণ, শীতল কর্ণফুলীর ঢেউ আর নরম রোদে মাখানো শৈশবেই তার বেড়ে ওঠা। বাবা খায়ের আহমদ ছিলেন একজন দায়িত্বশীল কর্মজীবী, যিনি পরবর্তীতে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন (৫৮ তে), আর মা মর্জিয়া বেগম ছিলেন একজন স্নেহময় গৃহিণী, যিনি সংসারের প্রতিটি কোণকে আগলে রাখতেন নিঃশব্দে। পাঁচ সদস্যের পরিবারে সোহেল বড় হয় মমতা, শৃঙ্খলা ও শিক্ষা-ভিত্তিক এক পরিবেশে।

শিক্ষা ও তারুণ্যের শুরু
ছোটবেলা থেকেই সোহেল ছিল মেধাবী ও মননশীল। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে সে এগিয়ে যায় উচ্চতর শিক্ষার পথে, এবং পরবর্তীতে ভর্তি হয় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে। সেখানে সে শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়, বরং সমাজ সচেতন, সচল ও স্বপ্নবান এক তরুণ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলে। বর্তমানে খাজা রোড, চট্টগ্রামে অবস্থান করলেও তার হৃদয় এখনো বাজালিয়ার নদীর পাশে, নিজের শিকড়ে আবদ্ধ। সোহেলের শৈশব ও কৈশোরের গড়নেই তার ভবিষ্যতের সংগ্রামী আত্মা প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল—যার প্রতিফলন দেখা যায় পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে।

আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের জুলাই মাস। সারা দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঝড় উঠেছে—ঢাকা থেকে খুলনা, রংপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রাস্তায় নেমে এসেছে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। এই উত্তাল সময়েই ১৮ই জুলাই বিকাল ৪টার দিকে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট মোড়ে, পুলিশ বক্সের সামনে ছাত্রদের মিছিলে যোগ দেন সোহেল। ‘বৈষম্যের অবসান চাই’, ‘কোটা সংস্কার চাই’—এমন দাবিতে মুখরিত হয়ে ওঠে সমগ্র এলাকা। সোহেল ছিলেন সে মিছিলের প্রাণ, প্রতিবাদের এক দৃপ্ত কণ্ঠস্বর। তাঁর চোখেমুখে ছিল সত্যের দীপ্তি, কণ্ঠে ছিল জেগে ওঠা প্রজন্মের আহ্বান। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-পীড়ন থেমে থাকেনি। হঠাৎই পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একত্রিত সন্ত্রাসী বাহিনী মিছিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, অতর্কিতে চালায় বর্বর লাঠিচার্জ। সোহেলকেও ছুটে ধরে বাঁশ, লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয় নির্মমভাবে।

সংগ্রামী ভূমিকা ও ত্যাগ
সোহেল রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও তাঁর প্রতিবাদের চেতনা মুছে যায়নি। সহযোদ্ধারাই তাঁকে তুলে নিয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, যেখানে তাঁর গুরুতর জখমে চিকিৎসা চলে দীর্ঘসময়। অথচ এই হামলা ছিল নিছক একটি প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। ঠিক এই সময়েই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদের নির্মম হত্যাকাণ্ড আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও আন্দোলনের ঢেউ আরও প্রবল হয়। সোহেল ছিলেন সেই তরঙ্গের অন্যতম ধারক—যিনি শুধু স্লোগানে নয়, রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন ছাত্রসমাজ কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বদ্দারহাটের মাটিতে গড়ে ওঠা ছাত্র-জনতার সেই প্রতিরোধে সোহেলের ত্যাগ আজ হয়ে আছে এক প্রতীক, এক নির্ভীক প্রেরণা।

চিকিৎসার বর্ণনা
চোখে মুখে রক্ত, শরীরে বেঁচে থাকার ক্ষীণ প্রত্যাশা—এমন অবস্থায় সহযোদ্ধারা তাকে নিয়ে ছুটেছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু আশার সেই দরজায় গিয়েও ফিরে আসতে হয়। সেখানে ওষুধ নয়, তাকে দেওয়া হয় প্রশ্ন, স্যালাইনের বদলে শোনানো হয় মামলার ভয়। চিকিৎসার আগেই চাই ‘থানার কাগজ’—এ যেন জীবনের চেয়ে নিয়ম বড় হয়ে দাঁড়ায়! জীবন যখন ফুরিয়ে যাওয়ার মুখে, তখন আইন হয়ে ওঠে এক নির্মম উপহাস।

শেষমেশ সোহেলকে নিয়ে যাওয়া হয় ন্যাশনাল হাসপাতালে—মানবতার আশ্রয়ে। সেখানে তার শরীরের ক্ষত সেলাই করা হয়, কানের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা ধীরে ধীরে উপশম পায়। ব্যথা শুধু দেহে নয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুরতা তাকে গভীরে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। কিন্তু সেই ক্ষতই আজ সোহেলের লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় চিহ্ন—যা সে বয়ে বেড়ায় মাথা উঁচু করে, এক নির্ভীক প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে।

একনজরে
নাম: হাসান মোহাম্মদ সোহেল
জন্মতারিখ: ২৪/০১/১৯৯৮
জন্মস্থান: বাজালিয়া, চট্টগ্রাম
পেশা: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ
স্থায়ী ঠিকানা বাজালিয়া, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা: খাজা রোড, চট্টগ্রাম
পিতা: খায়ের আহমদ ( অবসর ৫৮)
মাতা: মর্জিয়া বেগম (গৃহিণী)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫
ঘটনার স্থান: বহদ্দারহাট মোড়,চট্টগ্রাম
আক্রমণকারী: স্থানীয় যুবলীগ ও পুলিশ বাহিনী
আক্রমণের তারিখ: বিকাল ৪.০০টা, ১৮ জুলাই ২৪

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍