হোম / আহতদের তালিকা / দ্বীন ইসলাম
 দ্বীন ইসলাম

দ্বীন ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা/ পদবী: শিক্ষক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

দ্বীন ইসলামের পরিচিতি:

দ্বীন ইসলাম ফেনীর শান্তগ্রাম বড় বাড়ীর সন্তান। জন্ম ১৯৯৭ সালের ২ এপ্রিল। পিতার নাম আরব আলী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী; মাতা শাহেনা বেগম, গৃহিণী। পরিবারে সাদামাটা জীবনযাপন, সীমিত আয়ে ছোট্ট সংসার। তবু সেই সংসার ছিল ভালোবাসা আর বিশ্বাসের বন্ধনে বাঁধা।

শৈশব থেকেই দ্বীন ইসলামের স্বভাব ছিল শান্ত ও সংযমী। ধর্মীয় শিক্ষা, মানবিক চেতনা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধে বেড়ে ওঠা এক তরুণ। শিক্ষকতা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ফেনী তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসার শিক্ষক। শ্রেণিকক্ষে তিনি কেবল অক্ষরের পাঠ দিতেন না; ছাত্রদের চোখে তিনি স্বপ্ন জাগাতেন ন্যায়ের, সত্যের, আর মানুষের মর্যাদার।

বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের জুলাই-আগস্ট :

ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচার হাসিনার বিরুদ্ধে সারাদেশে চলছে উত্তাল আন্দোলন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাস। বাংলার আকাশ তখন উত্তাল, রাস্তাঘাট অস্থির, তরুণদের বুকের ভেতর জমে ওঠা ক্ষোভ জেগে উঠেছে বজ্রধ্বনির মতো।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী থেকে প্রান্তিক শহরগুলোতে। ছাত্রদের কণ্ঠে কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—
“সমতার সমাজ চাই, বৈষম্যের শৃঙ্খল ভাঙতে হবে।”

কিন্তু ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা ফ্যাসিস্ট হাসিনা সেই কণ্ঠস্বরকে ভয় পেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, এই আন্দোলন যদি জোয়ারে পরিণত হয় তবে তাঁর দীর্ঘদিনের একনায়কতন্ত্র টিকবে না। তাই শুরু হলো দমন-পীড়নের নীল নকশা। আওয়ামী বাহিনী ও পেটুয়া পুলিশ নামিয়ে দেওয়া হলো রাজপথে। ছাত্রদের মিছিলের দিকে ছুটল কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, আর রক্তঝরা গুলি।

স্বৈরশাসনের রক্তচক্ষু আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল, তখন সরকার দেশের ইন্টারনেট বন্ধ করে দিল। তথ্যপ্রবাহ রুদ্ধ হলো, মানুষের কণ্ঠ যেন বন্দি হলো অন্ধকারে। কারফিউ জারি করে শহরগুলোকে রূপান্তরিত করা হলো মৃত্যুপুরীতে। রাস্তায় যারা নামল, তাদের অনেকেই আর বাড়ি ফিরল না—নির্বিচারে চলল খুন, গুম, গুলি।

চট্টগ্রাম বিভাগও এই হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি। বন্দুকের নল, সন্ত্রাসী বাহিনীর গর্জন, পুলিশের লাঠিচার্জ—সব মিলিয়ে জনপদগুলো দমবন্ধ অন্ধকারে ঢেকে গেল। তবুও আন্দোলনের আগুন নিভে যায়নি।

ফেনীবাসী সেই অগ্নিগর্ভ দিনে প্রমাণ করেছিল, ভয়কে জয় করা যায়। তারা জানত সামনে মৃত্যু দাঁড়িয়ে আছে, তবুও রাজপথ ছাড়েনি। রাতের আঁধারে শহরে যখন শোক নেমে আসত, তখনও ভোরবেলায় ফেনীর তরুণেরা নতুন কণ্ঠে উচ্চারণ করত তাদের দাবি। তাদের প্রতিজ্ঞা ছিল একটাই—
“ন্যায় প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।”

এইভাবে জুলাই-আগস্টের দিনগুলো হয়ে উঠল ইতিহাসের অগ্নিপর্ব। রক্তে ভিজল রাজপথ, তবু মানুষের স্বপ্ন থামল না। বাংলার আকাশে তখনও ভেসে বেড়াচ্ছিল প্রতিরোধের গর্জন।

চট্রগ্রামের সার্কিট হাউস এলাকার চিত্র:


২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল চট্টগ্রামের রাজপথে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তরুণরা শান্তিপূর্ণভাবে স্লোগান তুলছিল। তাদের দাবির মূল কথা একটাই—সমাজে বৈষম্য ও অবিচার দূর করতে হবে।

দ্বীন ইসলামও সেদিন আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—শিক্ষক শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়, সমাজের অন্যায়ের প্রতিবাদেও তাঁকে দাঁড়াতে হবে। সকাল ১১টা থেকে আন্দোলন চলল নিরবচ্ছিন্ন। দুপুর ১টার পর মিছিলকারীরা নামাজের জন্য বিরতি নিল।

দ্বীন ইসলাম সড়ক পরিবহন মসজিদে প্রবেশ করলেন।

কিন্তু নামাজের শান্ত সুর ভেঙে গেল হঠাৎ। গুলির কর্কশ শব্দ কাঁপিয়ে দিল মসজিদের দেয়াল। হতভম্ব মানুষ বাইরে ছুটল। দ্বীন ইসলামও বেরিয়ে এলেন, আবার আন্দোলনের যোগ দিলেন। মুহূর্তেই রাজপথ রক্তাক্ত হয়ে উঠল। সশস্ত্র গুণ্ডা বাহিনী একের পর এক গুলি ছুড়ছে আন্দোলনকারীদের দিকে।

একটি গুলি দ্বীন ইসলামের ডান পায়ে এসে বিঁধল। তিনি হোঁচট খেলেন, শরীর কেঁপে উঠল। আরেকটি গুলি এসে গেঁথে গেল তাঁর পিঠে। প্রচণ্ড যন্ত্রণা তাঁকে মাটিতে ফেলে দিল, কিন্তু তাঁর চোখে তখনও ছিল এক ধরনের অদম্য দৃঢ়তা—“ন্যায়ের আন্দোলন রুখে দেওয়া যাবে না।”

চিকিৎসা ও সুস্থতা:


রক্তাক্ত শরীরে তিনি কোনো মতে বাড়ি ফিরে এলেন। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই পরিবারের চাপে যেতে হলো হাসপাতালে। তাঁকে নেওয়া হলো ফেনী আলকেমি হাসপাতালে।

হাসপাতালের করিডর তখন টেনশনের ভারে ভারী। স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা দ্বীন ইসলামের মুখে ব্যথার ছাপ, তবু ঠোঁটে এক অদ্ভুত নীরবতা। চিকিৎসক ডা. আব্দুল্লাহ দীর্ঘক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিলেন—অপারেশন ছাড়া আর উপায় নেই।

অপারেশন থিয়েটারের উজ্জ্বল আলোয় শুরু হলো তাঁর জীবনের বড় লড়াই। চেতনানাশক ওষুধে ডুবে যাওয়ার আগে তিনি চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করলেন—“হে আল্লাহ, আমাকে বাঁচিয়ে রাখো। আমি এখনো ছাত্রদের পড়াতে চাই, তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে চাই।”

অস্ত্রোপচারের সময় ধৈর্য আর নিখুঁত দক্ষতায় চিকিৎসকের হাতে বের করা হলো শরীরে গেঁথে থাকা গুলিগুলো। অনেকটা সময় পরে অবশেষে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন দ্বীন ইসলাম।

পরবর্তী চিকিৎসা :

অস্ত্রোপচারের পর তাঁর দিনগুলো কাটল বিশ্রামে। স্যালাইন, ইনজেকশন, ব্যথানাশক, ওষুধ—সবকিছু মিলে ধীরে ধীরে ক্ষত শুকোতে শুরু করল। ডাক্তার তাঁকে কঠোরভাবে সতর্ক করলেন—
“হাঁটাচলা কম করবেন। নিয়মিত ওষুধ খাবেন। যতটা সম্ভব বিশ্রামে থাকবেন।”

পরিবার তাঁকে ঘিরে রাখল ভালোবাসার ছায়ায়। মায়ের স্নেহ, বাবার দোয়া আর ভাইবোনের যত্ন তাঁকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনল স্বাভাবিক জীবনের দিকে।

তবে চিকিৎসা শুধু শরীরের ক্ষত সারায়। হৃদয়ের ভেতরে যে ক্ষত রয়ে গেল, তার ওষুধ কোথাও নেই। রাতের ঘুম ভেঙে যায় অনেক সময়; কানে বাজে সেই গুলির শব্দ, চোখে ভেসে ওঠে রক্তাক্ত রাজপথ।

পুনর্বাসন ও প্রস্তাবনা:

ধীরে ধীরে তিনি আবার হাঁটতে শিখলেন, ধীরে ধীরে ফিরলেন কর্মজীবনে। শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের সামনে পাঠদান শুরু করলেন। শিশুরা তাঁকে দেখে মুগ্ধ চোখে তাকাত, তাদের কাছে তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন, একজন বীরও।

তবে দ্বীন ইসলামের নিজের ভেতরে চিরস্থায়ী হয়ে রইল আগস্টের সেই দুপুরের অভিজ্ঞতা। তিনি জানেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানেই রক্ত দিতে হয়, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তবুও তাঁর বিশ্বাস অটল—
ন্যায়ের স্বপ্নকে কখনো গুলিতে নিভিয়ে দেওয়া যায় না।

তিনি শিক্ষক, তাকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য আর্থিক অনুদান দেওয়া যেতে পারে।


আহত হওয়ার সংক্ষিপ্ত চিত্র :

আহত হওয়ার স্থান :

ফেনী সার্কিট হাউস রোডের মাথায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনে।

আক্রমণকারী:
আওয়ামী সন্ত্রাসীরা।

আক্রমণকাল:
৪ আগস্ট ২০২৪
বেলা ২ টা।


এক নজরে সংক্ষিপ্ত তথ্য:

নাম:দ্বীন ইসলাম
জন্ম তারিখ: ২ এপ্রিল ১৯৯৭
জন্মস্থান :ফেনী
পেশা/ পদবী: শিক্ষক
ফেনী তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসা
নিজ জেলা: ফেনী

স্থায়ী ঠিকানা :

গ্রাম: বড় বাড়ী,পূর্ব বিজয় সিংহ
ইউনিয়ন : ফেনী পৌরসভা
থানা:ফেনী সদর
জেলা: ফেনী

বর্তমান ঠিকানা :

বাসা: বড়বাড়ী
মহল্লা: সার্কিট হাউস
থানা: ফেনী সদর
জেলা: ফেনী



পিতার নাম: আরব আলী
পিতার পেশা: অবসর
মায়ের নাম: শাহেনা বেগম
মায়ের পেশা: গৃহিণী


পারিবারিক অবস্থা :
আয়ের পরিমাণ: আয় নাই
আয়ের উৎস : চাকরি

পরিবারের সদস্য সংখ্যা:
দিল মোহাম্মদ ভাই
রুবাইয়া ইসলাম বুশরা তার মেয়ে।মা বাবা স্ত্রী এই নিয়ে সংসার।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍