আহসান হাবীব
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
চাঁদপুরের কচুয়ার পালাখাল গ্রামের সন্তান আহসান হাবীব। তিনি একজন শ্রমজীবী মানুষ, যিনি দুই সন্তানকে নিয়ে গড়ে তুলছিলেন ছোট্ট একটি স্বপ্নের সংসার। দিনমজুরির ঘামে পরিবার বাঁচানো এই সাধারণ মানুষটি ১৯ জুলাই ২০২৪-এ যাত্রাবাড়ীর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে দাঁড়িয়েছিলেন ন্যায়ের পক্ষে আর সেদিনই সন্ত্রাসীদের গুলিতে তাঁর বাম পায়ের হাড় ও স্নায়ু চূর্ণ হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসা, অচল জীবন আর কর্মহীনতার পরেও তিনি আজও পরিবারের ভবিষ্যৎকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর গল্প তীব্র অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক নিরীহ নাগরিকের বেদনামাখা দলিল, যা মানবিক সমাজের দায়িত্ববোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
আহসান হাবীব
ক্রমিক ০৫৬
আইডি: ঢাকা সিটি ০৫৬
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
আহসান হাবীব জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি, চাঁদপুর জেলার কচুয়া থানার পালাখাল নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। তাঁর পিতা মৃত মকবুল হোসেন ছিলেন এক পরিশ্রমী মানুষ, যিনি জীবদ্দশায় পরিবারের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। পিতার অকাল মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারটি এক ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। মাতা জ্যোস্না বেগম একজন গৃহিণী। বর্তমানে বয়স ৫৫ বছর হলেও এখনো তিনি সংসারের সবকিছু পরিচালনা করে যাচ্ছেন। আহসানের পরিবারে মোট সদস্য পাঁচজন মা, স্ত্রী এবং দুই ছোট সন্তান নিয়ে গঠিত এই পরিবার। ছোটবেলা থেকেই আহসান ছিলেন দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল ও সংগ্রামী মন-মানসিকতার মানুষ। পিতার অভাব তাকে অল্প বয়সে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
বসবাস ও সংসার জীবন
বর্তমানে আহসান হাবীবের বাস রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার অন্তর্গত দক্ষিণ দনিয়া, পাটেরবাগ এলাকার ১৪৫৭ নম্বর বাড়িতে। এখানে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ বসবাস করছেন। তার সংসারটি একেবারেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সীমিত স্বপ্নে গড়া। বড় ছেলে ইয়ামিন আরহাম, বয়স পাঁচ বছর, একজন মাদ্রাসা ছাত্র: ছোট মেয়ে জামিলা আয়াত, বয়স তিন বছর, এখনও স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি। স্ত্রী একজন গৃহিণী হিসেবে পুরো সংসার সামলাচ্ছেন। আহসান নিজেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, যিনি দিন-রাত খেটে পরিবারের আহার জোগাতেন।।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও আহত হওয়ার ঘটনা
২০২৫ সালের ১৯ জুলাই, দেশজুড়ে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন আহসান হাবীবও ছিলেন প্রতিবাদী জনতার অংশ। যাত্রাবাড়ী টোলপ্লাজার সামনে সকাল ১১টার দিকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ যাত্রাবাড়ী এলাকার ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হেলমেট, লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। বিনা উস্কানিতে তাদের গুলির শিকার হন আহসান হাবীব। বাম পায়ে সরাসরি গুলি লাগে। রক্তে ভিজে যায় তার কাপড়, মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। এটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত, বর্বর, এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
প্রাথমিক চিকিৎসা ও গুরুতর শারীরিক ক্ষতি
আহসানকে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় সালমান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর এক্স-রে ও অন্যান্য টেস্টের মাধ্যমে ধরা পড়ে, তার বাম পায়ের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে এবং আরও খারাপ সংবাদ ছিল তার পায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নার্ভ ছিঁড়ে গেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, সেই নার্ভ আর কখনও স্বাভাবিক হবে না। এই ক্ষতির ফলে তার হাটাচলা সীমিত হয়ে পড়ে। তিনি তখন থেকে কার্যত পঙ্গু অবস্থায় ছিলেন।
দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও যন্ত্রণাময় সময়
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরবর্তী আট মাস আহসান একপ্রকার শয্যাশায়ী ছিলেন। এক সময়ের কর্মঠ মানুষটি বিছানায় পড়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারতেন না। প্রাইভেট হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয়, প্রতিনিয়ত ওষুধপত্র খেতে হয়, ফিজিওথেরাপি করতে হয় এবং বিভিন্ন মেডিকেল টেস্টের জন্য প্রচুর টাকা ব্যয় হয়। একদিকে শারীরিক যন্ত্রণা, অন্যদিকে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারকে খাওয়ানোর চিন্তা এই দুইয়ের মাঝে তিনি এক ভয়াবহ মানসিক সংকটে পড়েন।
বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে আহসান হাবীব হাঁটতে পারলেও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। তার পায়ে আজও অসহ্য ব্যথা অনুভব করেন, মাঝে মাঝে জ্বালা-পোড়াও হয়। চিকিৎসকেরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন তার ছিঁড়ে যাওয়া রগ কখনো আর আগের মতো হবে না। বর্তমানে চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো নিয়মিত ওষুধ সেবন ও থেরাপি চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত চিকিৎসা বাবদ প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে যন্ত্রণার শেষ নেই।
কর্মহীনতা ও জীবিকার সঙ্কট
আহসান হাবীব আগে বিভিন্ন ধরনের খাটুনির কাজ করতেন, যা দিয়ে সংসার চলে যেত। কিন্তু গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে তিনি আর এমন কোনো কাজ করতে পারছেন না। দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, ভারী কিছু তুলতে পারেন না। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে তার জীবিকার কোনো স্থায়ী উৎস নেই। স্ত্রী ও দুই সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে চরম অর্থকষ্টে ভুগছেন। এই অবস্থায় তিনি ছোটখাটো, হালকা দায়িত্বের একটি চাকরি বা কাজ পেলে নিজের আত্মসম্মান রক্ষা করে চলতে পারতেন।
সন্তানের ভবিষ্যৎ ও পিতৃত্বের কষ্ট
আহসানের বড় ছেলে ইয়ামিন মাত্র ৫ বছর বয়সে একটি মাদ্রাসায় পড়ে। ছোট মেয়ে আয়াতের বয়স মাত্র তিন বছর। তিনি একজন আদর্শ পিতা হতে চেয়েছিলেন, সন্তানদের মানুষ করতে চেয়েছিলেন শিক্ষিত করে। কিন্তু গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার সেই স্বপ্নগুলো আজ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। অর্থের অভাবে সন্তানদের পড়াশোনা, পুষ্টি, এমনকি চিকিৎসা পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ আজ ধুকে ধুকে মরছে।
সহায়তা ও পুনর্বাসনের আকুতি
আহসান হাবীব এখন রাষ্ট্রের কাছে সাহায্যপ্রার্থী। তিনি চান একটি উপযুক্ত চাকরি, যাতে বসে বসে কাজ করা যায় এবং সামান্য বেতন পেলেও তা দিয়ে তিনি পরিবার চালাতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি আর্থিক সহায়তা প্রত্যাশা করছেন, যাতে তার চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম চালু রাখা যায়। এটি তার নিজের জন্য নয়, বরং স্ত্রী ও সন্তানদের সুস্থ ভবিষ্যতের জন্যই তার এই আবেদন।
রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব
আহসান হাবীবের জীবনের এই নির্মম পরিণতি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেয়ার দায়ে আজ একজন পঙ্গু মানুষ, একজন অসহায় বাবা, একজন নিঃস্ব স্বামী। রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব এড়াতে পারে? সমাজ কি চুপ করে থাকতে পারে? আহসানের মতো মানুষদের পাশে দাঁড়ানো মানেই ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো, মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানো। এখনই সময় তার পাশে দাঁড়ানোর, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকার নিশ্চয়তা দিয়ে তাকে পুনরায় সমাজে ফিরিয়ে আনার।
লেখক কথন
আহসান হাবীবের জীবন আজ একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন। একজন সচেতন নাগরিক কীভাবে নিপীড়নের শিকার হন এবং কীভাবে রাষ্ট্র ও সমাজ তাকে অসহায় করে তোলে তা এ ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। আমরা চাই, তিনি যেন আবার আশার আলো দেখেন, স্বপ্ন দেখতে পারেন আর একটি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পান। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত, তাকে দ্রুত সহায়তা প্রদান ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
প্রস্তাবনা
১. পরিবারে আর্থিক সহযোগিতা করা উচিত।
২. সন্তানদের লেখাপড়ায় বৃত্তি দেয়া যেতে পারে।
এক নজরে আহসান হাবীব
নাম: আহসান হাবীব
জন্ম তারিখ: ০১-০১-১৯৯২
পারিবারিক তথ্য
পিতা: মৃত মকবুল হোসেন
মাতা: জোন্না বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিণী, ৫৫ বছর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫ জন
বর্তমান ঠিকানা: ১৪৫৭ দক্ষিন দনিয়া, পাটেরবাগ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: পালাখাল,
থানা: কচুয়া, জেলা: চাঁদপুর
সন্তানদের বিবরণ
১. ইয়ামিন আরহাম, বয়স: ৫ বছর, মাদ্রাসা ছাত্র
২. জামিলা আয়াত, বয়স: ৩ বছর
আহত হওয়ার স্থান: যাত্রাবাড়ী টোলপ্লাজা সংলগ্ন
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ১৯-০৭-২০২৪, সকাল ১১:০০টা
আক্রমণকারী: যাত্রাবাড়ী এলাকার ছাত্রলীগ
ক্রমিক ০৫৬
আইডি: ঢাকা সিটি ০৫৬
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
আহসান হাবীব জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি, চাঁদপুর জেলার কচুয়া থানার পালাখাল নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। তাঁর পিতা মৃত মকবুল হোসেন ছিলেন এক পরিশ্রমী মানুষ, যিনি জীবদ্দশায় পরিবারের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। পিতার অকাল মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারটি এক ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। মাতা জ্যোস্না বেগম একজন গৃহিণী। বর্তমানে বয়স ৫৫ বছর হলেও এখনো তিনি সংসারের সবকিছু পরিচালনা করে যাচ্ছেন। আহসানের পরিবারে মোট সদস্য পাঁচজন মা, স্ত্রী এবং দুই ছোট সন্তান নিয়ে গঠিত এই পরিবার। ছোটবেলা থেকেই আহসান ছিলেন দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল ও সংগ্রামী মন-মানসিকতার মানুষ। পিতার অভাব তাকে অল্প বয়সে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
বসবাস ও সংসার জীবন
বর্তমানে আহসান হাবীবের বাস রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার অন্তর্গত দক্ষিণ দনিয়া, পাটেরবাগ এলাকার ১৪৫৭ নম্বর বাড়িতে। এখানে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ বসবাস করছেন। তার সংসারটি একেবারেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সীমিত স্বপ্নে গড়া। বড় ছেলে ইয়ামিন আরহাম, বয়স পাঁচ বছর, একজন মাদ্রাসা ছাত্র: ছোট মেয়ে জামিলা আয়াত, বয়স তিন বছর, এখনও স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি। স্ত্রী একজন গৃহিণী হিসেবে পুরো সংসার সামলাচ্ছেন। আহসান নিজেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, যিনি দিন-রাত খেটে পরিবারের আহার জোগাতেন।।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও আহত হওয়ার ঘটনা
২০২৫ সালের ১৯ জুলাই, দেশজুড়ে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন আহসান হাবীবও ছিলেন প্রতিবাদী জনতার অংশ। যাত্রাবাড়ী টোলপ্লাজার সামনে সকাল ১১টার দিকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ যাত্রাবাড়ী এলাকার ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হেলমেট, লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। বিনা উস্কানিতে তাদের গুলির শিকার হন আহসান হাবীব। বাম পায়ে সরাসরি গুলি লাগে। রক্তে ভিজে যায় তার কাপড়, মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। এটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত, বর্বর, এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
প্রাথমিক চিকিৎসা ও গুরুতর শারীরিক ক্ষতি
আহসানকে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় সালমান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর এক্স-রে ও অন্যান্য টেস্টের মাধ্যমে ধরা পড়ে, তার বাম পায়ের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে এবং আরও খারাপ সংবাদ ছিল তার পায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নার্ভ ছিঁড়ে গেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, সেই নার্ভ আর কখনও স্বাভাবিক হবে না। এই ক্ষতির ফলে তার হাটাচলা সীমিত হয়ে পড়ে। তিনি তখন থেকে কার্যত পঙ্গু অবস্থায় ছিলেন।
দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও যন্ত্রণাময় সময়
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরবর্তী আট মাস আহসান একপ্রকার শয্যাশায়ী ছিলেন। এক সময়ের কর্মঠ মানুষটি বিছানায় পড়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারতেন না। প্রাইভেট হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয়, প্রতিনিয়ত ওষুধপত্র খেতে হয়, ফিজিওথেরাপি করতে হয় এবং বিভিন্ন মেডিকেল টেস্টের জন্য প্রচুর টাকা ব্যয় হয়। একদিকে শারীরিক যন্ত্রণা, অন্যদিকে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারকে খাওয়ানোর চিন্তা এই দুইয়ের মাঝে তিনি এক ভয়াবহ মানসিক সংকটে পড়েন।
বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে আহসান হাবীব হাঁটতে পারলেও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। তার পায়ে আজও অসহ্য ব্যথা অনুভব করেন, মাঝে মাঝে জ্বালা-পোড়াও হয়। চিকিৎসকেরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন তার ছিঁড়ে যাওয়া রগ কখনো আর আগের মতো হবে না। বর্তমানে চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো নিয়মিত ওষুধ সেবন ও থেরাপি চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত চিকিৎসা বাবদ প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে যন্ত্রণার শেষ নেই।
কর্মহীনতা ও জীবিকার সঙ্কট
আহসান হাবীব আগে বিভিন্ন ধরনের খাটুনির কাজ করতেন, যা দিয়ে সংসার চলে যেত। কিন্তু গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে তিনি আর এমন কোনো কাজ করতে পারছেন না। দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, ভারী কিছু তুলতে পারেন না। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে তার জীবিকার কোনো স্থায়ী উৎস নেই। স্ত্রী ও দুই সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে চরম অর্থকষ্টে ভুগছেন। এই অবস্থায় তিনি ছোটখাটো, হালকা দায়িত্বের একটি চাকরি বা কাজ পেলে নিজের আত্মসম্মান রক্ষা করে চলতে পারতেন।
সন্তানের ভবিষ্যৎ ও পিতৃত্বের কষ্ট
আহসানের বড় ছেলে ইয়ামিন মাত্র ৫ বছর বয়সে একটি মাদ্রাসায় পড়ে। ছোট মেয়ে আয়াতের বয়স মাত্র তিন বছর। তিনি একজন আদর্শ পিতা হতে চেয়েছিলেন, সন্তানদের মানুষ করতে চেয়েছিলেন শিক্ষিত করে। কিন্তু গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার সেই স্বপ্নগুলো আজ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। অর্থের অভাবে সন্তানদের পড়াশোনা, পুষ্টি, এমনকি চিকিৎসা পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ আজ ধুকে ধুকে মরছে।
সহায়তা ও পুনর্বাসনের আকুতি
আহসান হাবীব এখন রাষ্ট্রের কাছে সাহায্যপ্রার্থী। তিনি চান একটি উপযুক্ত চাকরি, যাতে বসে বসে কাজ করা যায় এবং সামান্য বেতন পেলেও তা দিয়ে তিনি পরিবার চালাতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি আর্থিক সহায়তা প্রত্যাশা করছেন, যাতে তার চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম চালু রাখা যায়। এটি তার নিজের জন্য নয়, বরং স্ত্রী ও সন্তানদের সুস্থ ভবিষ্যতের জন্যই তার এই আবেদন।
রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব
আহসান হাবীবের জীবনের এই নির্মম পরিণতি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেয়ার দায়ে আজ একজন পঙ্গু মানুষ, একজন অসহায় বাবা, একজন নিঃস্ব স্বামী। রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব এড়াতে পারে? সমাজ কি চুপ করে থাকতে পারে? আহসানের মতো মানুষদের পাশে দাঁড়ানো মানেই ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো, মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানো। এখনই সময় তার পাশে দাঁড়ানোর, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকার নিশ্চয়তা দিয়ে তাকে পুনরায় সমাজে ফিরিয়ে আনার।
লেখক কথন
আহসান হাবীবের জীবন আজ একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন। একজন সচেতন নাগরিক কীভাবে নিপীড়নের শিকার হন এবং কীভাবে রাষ্ট্র ও সমাজ তাকে অসহায় করে তোলে তা এ ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। আমরা চাই, তিনি যেন আবার আশার আলো দেখেন, স্বপ্ন দেখতে পারেন আর একটি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পান। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত, তাকে দ্রুত সহায়তা প্রদান ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
প্রস্তাবনা
১. পরিবারে আর্থিক সহযোগিতা করা উচিত।
২. সন্তানদের লেখাপড়ায় বৃত্তি দেয়া যেতে পারে।
এক নজরে আহসান হাবীব
নাম: আহসান হাবীব
জন্ম তারিখ: ০১-০১-১৯৯২
পারিবারিক তথ্য
পিতা: মৃত মকবুল হোসেন
মাতা: জোন্না বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিণী, ৫৫ বছর
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫ জন
বর্তমান ঠিকানা: ১৪৫৭ দক্ষিন দনিয়া, পাটেরবাগ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: পালাখাল,
থানা: কচুয়া, জেলা: চাঁদপুর
সন্তানদের বিবরণ
১. ইয়ামিন আরহাম, বয়স: ৫ বছর, মাদ্রাসা ছাত্র
২. জামিলা আয়াত, বয়স: ৩ বছর
আহত হওয়ার স্থান: যাত্রাবাড়ী টোলপ্লাজা সংলগ্ন
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ১৯-০৭-২০২৪, সকাল ১১:০০টা
আক্রমণকারী: যাত্রাবাড়ী এলাকার ছাত্রলীগ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍