হোম / আহতদের তালিকা / দেলোয়ার হোসেন
দেলোয়ার হোসেন

দেলোয়ার হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা/পদবী: চালক, পরিবহন চালক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জীবন পরিচয়ঃ
দেলোয়ার হোসেন ৬ জুলাই ১৯৯৫ সালে খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পেশায় একজন পরিবহন চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার স্থায়ী ঠিকানা খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি থানার তিনটহরী ইউনিয়নের গোদাতলী গ্রামে, কিন্তু বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের লতিফপুর এলাকায় বসবাস করছেন।
পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচ, যেখানে পিতা মোঃ মনু মিয়া বেকার, মাতার নাম বেগমের নেছা, গৃহিণী, এবং একমাত্র ছেলে য়াব্দুল কাইয়ূম ছাত্র হিসেবে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছেন। পরিবারের মাসিক আয় প্রায় ১০ হাজার টাকা, যা কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। দেলোয়ার হোসেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৫ই আগস্ট ২০২৪ সালের বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে টাইগারবাস এলাকায় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার সময় তার ওপর নৃশংস ছাত্রলীগ ও ফ্যাসিস্ট সরকারের রক্তপিপাসু মব গোষ্ঠী হামলা চালায়। এতে তার হাতে গুলি লাগে এবং চোখেও প্রচুর আঘাতপ্রাপ্ত হন। হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়।
দেলোয়ার হোসেনের জীবন যাত্রা ছিল সাধারণ, কিন্তু দেশের ন্যায়বিচারের জন্য তার সাহসিকতা এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণ তাকে সমাজে অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের দায়িত্ব ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করে চলেছেন।
রক্তাক্ত ৫ই আগস্ট ২০২৪
৫ই আগস্ট ২০২৪, বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মর্মান্তিক দিন হিসেবে চিহ্নিত। অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। ছাত্রজনতা মাঠে নেমেছিল কোটা সংস্কারের দাবী নিয়ে। কিন্তু তৎকালীন প্রধানম্নত্রী শেখ হাসিনার বর্বরতা, পুলিশদের অসামাজিক কার্যক্রম সাধারন মানুষকে খেপিয়ে তোলে। জুলাই থেকে শুরু করে আগস্টের ৫ তারিখ পর্যন্ত তারা বহু মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। শেখ হাসিনা যখন ছাত্রজনতাকে “রাজাকারের বাচ্চা” বলে আখ্যায়িত করেন,তখন ছোট, বড়, নির্বিশেষে সকল মানুষ রাজপথে নামে এর প্রতিবাদ জানানোর জন্য। পরবর্তিতে তা এক দফা এক দাবীতে রুপ নেয়।
দেলোয়ার হোসেনর ভাষায়,সকাল ১১টার দিকে টাইগারবাসে অবস্থান করি, অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে। আন্দোলনের মূল দাবী ছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ। সকাল থেকে পরিবেশ ছিল উত্তপ্ত, কিন্তু আন্দোলনকারীরা দৃঢ়, সাহসী ও অটল মনোবল নিয়ে তাদের অবস্থান ধরে রাখে এক দফার দাবিতে, হাসিনার পদত্যাগ।
দুপুর ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে, টাইগারবাস এলাকায় আমাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলছিল, সেই সময় নিষ্ঠুর, নৃশংস এবং হিংস্রপ্রীত যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মব গুষ্টি আমার উপর আক্রমণ করে। তাদের আচরণ ছিল নিষ্ঠুর, ভয়ংকর এবং রক্তপিপাসু। তারা দস্যুপ্রবণ, পাষণ্ড এবং কলঙ্কিতভাবে আমাদের উপর হামলা চালায়। আমার হাতে গুলি লাগে এবং চোখে প্রচুর আঘাত পাই। চোখে এখন ঝাপসা দেখা দিচ্ছে, হাতের আঘাতের জন্য অপারেশন করতে হয়। এই আক্রমণ ছিল নির্দয়, অমানবিক ও নরপিশাচসুলভ।
আমি আন্দোলনের অংশগ্রহণে একাধিকবার এগিয়ে যাই, কিন্তু আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অসভ্য, নৃশংস এবং দুষ্কৃতিকারী কর্মকাণ্ড আমাদের সাহস পরীক্ষা করে। তাদের আচরণ ছিল ধূর্ত, রক্তপিপাসু এবং ঘৃণ্য। আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ পদক্ষেপ ও প্রতিবাদকে তারা বর্বরভাবে দমন করার চেষ্টা করে।
আমরা আন্দোলনে আমাদের অবস্থান ধরে রাখি, আমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করি, যাতে দেশের জনগণ সরকারের অবৈধতা ও অসদাচরণের বিরুদ্ধে আমাদের সাহসিকতা দেখতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের কুখ্যাত পুলিশ ও দস্যুপ্রবণ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী হামলা আমাদের উপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি করে। তাদের আচরণ ছিল রক্তপিপাসু, ভয়ংকর এবং অসভ্য।
আমাদের আহত হওয়ার পর বেশ কয়েকটি হাসপাতালে যাই, কিন্তু ভর্তি হতে রাজি হননি। অবশেষে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি হই। চিকিৎসা এখনো চলছে। হাতের আঘাত এখনও পুরোপুরি সারেনি, চোখের আঘাতের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন। আন্দোলনের এ দিনের ঘটনা প্রমাণ করে, যে তীব্র ও নিষ্ঠুরভাবে সরকারের দমননীতি পরিচালিত হচ্ছে, এবং সাধারণ জনগণ ও শান্তিপ্রিয় আন্দোলনকারীরা কতটা বিপদে রয়েছে।
৫ই আগস্টের এই রক্তাক্ত দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে নির্দয়, দাগি, রক্তপিপাসু এবং হিংস্র সন্ত্রাসী বাহিনী দেশের জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করতে কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে। তবে এই দিনে আমাদের সাহস, দৃঢ়তা ও আন্দোলনের অটল মনোবলই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।
আহত হওয়া এবং চিকিৎসা সম্পর্কিত বিবরণঃ
৫ই আগস্ট ২০২৪, টাইগারবাসে অবস্থানকালে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নৃশংস, রক্তপিপাসু হামলার শিকার হন দেলোয়ার । হামলার সময় তার হাতে গুলি লাগে এবং চোখেও প্রচুর আঘাত পান তিনি। ঘটনাস্থলে অবস্থান করলেও সহিংসতার তাণ্ডব এত ভয়ংকর ছিল যে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। আঘাত পাওয়ার পর প্রথমে কয়েকটি স্থানীয় হাসপাতালে যান দেলোয়ার, কিন্তু তারা ভর্তি নিতে রাজি হয়নি। শেষে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি হন।
হাতে গুরুতর আঘাতের কারণে অপারেশন করতে হয়েছে। অপারেশনের পরও হাত সম্পূর্ণ সুস্থ হননি এখনও ব্যথা এবং চলাচলে অসুবিধা অনুভব করেন। চোখের আঘাত আরও মারাত্মক; আঘাতের কারণে চোখে ঝাপসা দেখা দেয়। ডাক্তার বলেছেন, নিয়মিত চিকিৎসা না করলে চিরকাল চোখের আলো হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। তাই চোখের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ও ফলো-আপ প্রয়োজন।
চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে হাতের ব্যথা ও ফিসার নিরাময়, চোখের আঘাতের জন্য চোখের পরীক্ষা ও ওষুধ, এবং কিছু ফিজিওথেরাপি। চোখের আঘাতের জন্য অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে এবং নিয়মিত চোখের ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এই চিকিৎসা চলমান এবং অনেক ধৈর্য ও যত্নের প্রয়োজন। আহত হওয়ার পর শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক চাপও খুব বেশি ছিল, কারণ অমানবিক হামলার কারণে জীবনের নিরাপত্তা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
আন্দলনে অবদান ও বীরত্বঃ
৫ই আগস্ট ২০২৪, টাইগারবাসে অবস্থানকালে দেলোয়ার অসহযোগ আন্দোলনের সাহসী অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিজের ভূমিকা পালন করেন। সকালে পৌঁছে তিনি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু করেন। তখন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মূল দাবী ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও পিছপা হয়নি কেউ, বরং আরও দৃঢ় মনোবল নিয়ে সামনে এগিয়ে যান সবাই।
দুপুরে, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নিষ্ঠুর, রক্তপিপাসু হামলার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও দেলোয়ার সাহস অটল রাখেন। নিষ্ঠুর ছাত্রলীগস, পুলিশ আন্দোলনে অংশগ্রহনকারীদের উপর আক্রমণ চালিয়ে হাত এবং চোখে গুরুতর আঘাত করে, কিন্তু দেলোয়ার আন্দোলন ত্যাগ করেন না। এই সাহসিকতা প্রমাণ করে যে, সঠিক ও ন্যায়ের পথে লড়াই করার ক্ষেত্রে আমার দৃঢ় অঙ্গীকার কতটা দৃঢ়।
তিনি বলেন, আমি শুধু নিজেকে রক্ষা করি না, বরং আশেপাশের অন্যান্য আন্দোলনকারীদেরও উৎসাহিত করি। আমার উপস্থিতি এবং অটল মনোবল অন্যান্যদেরকে উদ্দীপনা জোগায়, যাতে তারা ভয় পেয়ে না ফিরে যায়। নিষ্ঠুর হামলার পরও আমি পুনরায় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হই, যা আমার বীরত্ব এবং দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে।
আমার এই সাহসিকতা ও বীরত্ব আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তাক্ত আগস্টের অমলিন অংশ হিসেবে থাকবে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে রক্ষা করা, সন্ত্রাসের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান বজায় রাখা, এবং অন্যদের উদ্দীপনা জোগানো—এসবই আমার অবদানকে ইতিহাসে বীরত্বের মর্যাদা দিয়েছে।
প্রস্তাবনাঃ
৫ই আগস্ট ২০২৪ সালের রক্তাক্ত আন্দোলনে আহত হওয়ার পর থেকে চিকিৎসা চলমান রয়েছে। হাতে গুরুতর আঘাত এবং চোখের ঝাপসা নিরাময়ের জন্য নিয়মিত ফলো-আপ ও বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন। অপারেশন ও ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে হাতের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে, আর চোখের আঘাতের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা জরুরি, নাহলে স্থায়ী দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। পূর্বে আহত ব্যক্তি চালক পেশায় ছিলেন, তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুনর্বাসন প্রয়োজন। তাই প্রস্তাব করা হয়, শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নতুন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা। চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষ হলে ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি করা যেতে পারে, যেমন খাদ্য ও ডেলিভারি ব্যবসা বা স্থানীয় পণ্য বিক্রয়। এভাবে আহত ব্যক্তির চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে তাকে সমাজের স্বনির্ভর, সক্রিয় এবং দক্ষ নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে
এক নজরে- দেলোয়ার হোসেন
 নাম: << দেলোয়ার হোসেন >>
 জন্মতারিখ: ০৬ জুলাই ১৯৯৫
 জন্মস্থান: মানিকছড়ি
 পেশা/পদবী: চালক, পরিবহন চালক
 স্থায়ী ঠিকানা: গোদাতলী, থানা: মানিকছড়ি, ইউনিয়ন: তিনটহরী, খাগড়াছড়ি
 বর্তমান ঠিকানা: লতিফপুর, থানা: আকবরশাহ, চট্টগ্রাম
 পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৫
 পিতার নাম ও অবস্থা: মোঃ মনু মিয়া, বেকার, বয়স ৬০
 মাতার নাম ও পেশা: বেগমের নেছা, গৃহিণী, বয়স ৫৫
 যোগাযোগঃ ০১৮৭৯৫৯৪৫৬৭
 ভাই/ছেলের নাম ও বয়স: য়াব্দুল কাইয়ূম, বয়স ১০, ছাত্র, মাদ্রাসা
 আহত হওয়ার তারিখ ও স্থান: ৫ আগস্ট ২০২৪, টাইগার বাম রোড
 চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: চোখ ও হাতের চিকিৎসা চলমান, পূর্ণরূপে সুস্থ হতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন; পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান হিসেবে ব্যবসা প্রস্তাবিত

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍