হোম / আহতদের তালিকা / মোঃ ইমরান
  মোঃ ইমরান

মোঃ ইমরান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

‎পেশা : শ্রমিক
‎প্রতিষ্ঠান : গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
‎২০০৬ সালের ২৪ মার্চ, রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার ঝর্ণাটিলা গ্রামে জন্ম নেয় মোঃ ইমরান। পাহাড়ের বুকে ছোট্ট গ্রামে দরিদ্র এক পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। বাবা মোঃ বাদল ছিলেন এক সাধারণ মানুষ, কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুরতায় ২২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাবার অকাল মৃত্যু ইমরানের জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। মাত্র ষোল বছর বয়সেই তাকে সংসারের ভার নিতে হয়। মা লায়লা ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক, মাসে কেবল ১৫ হাজার টাকা আয় করতেন। সংসারে ছিল ছোট ভাই মোঃ ওমর (১৬), আরেক ভাই মোঃ ইসমাইল (২৩) এবং ছোট বোন মোছা: জান্নাত (৭)। একজনের সামান্য উপার্জনে এত বড় পরিবার চালানো ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। দারিদ্র্য ইমরানের শৈশব কেড়ে নিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পরিবর্তে জীবিকার খোঁজে তাকে শ্রমিক হতে হয়। অল্প বয়সেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি নেয়, কখনো দিনমজুরের মতো কাজ করে, আবার কখনো ঢাকার পোশাক কোম্পানিতে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে জীবনযাপন করে। তার স্বপ্ন ছিল একদিন পরিবারের হাল ধরা, মা বোনদের কষ্ট লাঘব করা।
‎
‎আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলেন। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মেধার যেন মূল্যায়ন হয়। সেজন্য তারা ৫৬% কোটার সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি না মেনে বরং তাদের উপর পুলিশ নির্যাতন করে। প্রচন্ড গণআন্দোলনের মুখে সরকার কোটা ব্যবস্থা মেনে নিলেও সেটার কোন স্থায়ী সমাধান দিয়েছিলেন না। যার ফলে ২০২৪ সালে নতুন করে কোটার সংস্কারের আন্দোলন গড়ে উঠে। তরুণ তরুণীরা চাকরির ক্ষেত্রে মেধার মূল্যায়নের দাবি তোলে। ঢাকার রাজপথে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রতিটি জেলায়।ইমরান তখন ঢাকায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি করছিল। কাজের ফাঁকে সে নিয়মিত আন্দোলনের খবর রাখত। তার মনে হতো এই আন্দোলন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নয়, বরং দরিদ্র ঘরের সব সন্তানের আন্দোলন। কেননা, যদি মেধার ভিত্তিতে চাকরি হয় তবে দেশ সুন্দর ভাবে পরিচালিত হবে। এই বিশ্বাস থেকেই সে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে।
‎
‎আহত হওয়ার ঘটনা
‎২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, বিকাল প্রায় ৫টা ৩০ মিনিট। আশুলিয়ার বেক্সিমকো চক্রবর্তী এলাকায় হাজারো শিক্ষার্থী শান্তিপূর্ণ মিছিল করছিল। মিছিলে তখন স্লোগান ভেসে আসছিল মেধার মূল্য চাই, কোটার সংস্কার চাই। ইমরান সেদিন সহকর্মী ভাইদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু হঠাৎই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পুলিশ এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীরা একত্রিত হয়ে মিছিলকারীদের উপর গুলি চালায়। ‎আতঙ্কে সবাই ছুটোছুটি করছিল। ঠিক সেই সময় দুটি গুলি এসে ইমরানের শরীরে আঘাত করে। একটি গুলি তার পেট ভেদ করে বেরিয়ে যায়, আরেকটি গুলি পাকস্থলীর ভেতরে থেকে যায়। মুহূর্তেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।চারদিকে বিশৃঙ্খলা টিয়ারশেল, চিৎকার আর রক্তে ভেসে যাওয়া রাস্তায় অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল ইমরান। সহপাঠী আন্দোলনকারীরা ঝুঁকি নিয়ে তাকে তুলে শেখ ফজিলাতুননেছা মেডিকেলে নিয়ে যায়।
‎
‎চিকিৎসার সংগ্রাম
‎হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা দ্রুত অপারেশন করেন। একটি গুলি বের করা সম্ভব হয়, কিন্তু পাকস্থলীর ভেতরে আরেকটি বুলেট রয়ে যায়। সেই বুলেট তার অন্ত্র আর মলাশয়ের খুব কাছে অবস্থান করছে। অপারেশনের পর তাকে শাহবাগ পিজি স্থানান্তর করা হয়। কয়েক দফা সেলাই আর জটিল চিকিৎসার পরেও তার শরীরে ব্যথা কমেনি। প্রতিদিনই তাকে নতুন করে যন্ত্রণা পোহাতে হয়। ডাক্তাররা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন অবিলম্বে উন্নত চিকিৎসা ও অপারেশন না করলে তার জীবন হুমকির মুখে পড়বে। কিন্তু মা লায়লার মাসিক আয় মাত্র ১৫ হাজার টাকা। এই আয় দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন, সেখানে উন্নত চিকিৎসার খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব। তাদের এখন এমনকি থাকার মতো পাকা ঘরও নেই। সবকিছুই ভাড়ায় কিংবা অস্থায়ীভাবে চলছে।ইমরান হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে শুধু একটি কথাই বলে,আমি তো শুধু চাইছিলাম মা, ভাই, বোনদের মুখে ভাত তুলে দিতে, কিন্তু আজ আমি নিজেই কারও ওপর বোঝা হয়ে গেছি।
‎
‎ভবিষ্যতের আশা ও পুনর্বাসন
‎অপারেশনের পর কিছুটা সুস্থ হলেও ইমরান এখনো জীবনের ঝুঁকিতে রয়েছে। শরীরের ভেতরে গুলি রয়ে যাওয়ার কারণে তার যন্ত্রণা প্রতিদিন বাড়ছে। সে হাঁটতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারে না চিকিৎসকেরা বলছেন উন্নত চিকিৎসা করলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে সেই খরচ বহন করা সম্ভব নয়। এখন তাদের সবচেয়ে বড় চাহিদা একটা নিরাপদ ঘর, আর ইমরানের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ।আগে ইমরান ঢাকায় পোশাক কোম্পানিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। ভবিষ্যতে সে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, হয়তো ছোট ব্যবসা শুরু করতে পারে। তার ইচ্ছা মায়ের কষ্ট লাঘব করা এবং ভাই বোনদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। তার গল্প আজ শুধু এক ব্যক্তির নয়, বরং হাজারো দরিদ্র ঘরের সন্তানদের গল্প। যারা মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চায়, কিন্তু স্বৈরাচারী শাসনের বুলেট তাদের জীবনকে থামিয়ে দেয়।
‎
‎তথ্য কণিকা
‎নাম : মোঃ ইমরান
‎জন্ম তারিখ : ২৪-০৩-২০০৬
‎জন্মস্থান : ঝর্ণাটিলা, ৭নং ওয়ার্ড, লংগদু, রাঙ্গামাটি
‎পেশা : শ্রমিক
‎প্রতিষ্ঠান : গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি
‎নিজ জেলা : রাঙ্গামাটি
‎স্থায়ী ঠিকানা :
‎গ্রাম – ঝর্ণাটিলা
‎ইউনিয়ন – লংগেদু
‎থানা – লংগেদু
‎জেলা – রাঙ্গামাটি
‎বর্তমান ঠিকানা :
‎ওয়ার্ড নং ৭, ঝর্ণাটিলা, লংগদু, রাঙ্গামাটি
‎পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
‎পিতার নাম : মোঃ বাদল (মৃত)
‎মায়ের নাম : লায়লা
‎মায়ের পেশা: গার্মেন্টস শ্রমিক
‎মাসিক আয় : ১৫,০০০ টাকা
‎আয়ের উৎস : গার্মেন্টস চাকরি
‎পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
‎ভাইবোনদের বিবরণ
‎১. মোঃ ইসমাইল, বয়স ২৩, সম্পর্ক – ভাই
‎২. মোঃ ওমর, বয়স ১৬, সম্পর্ক – ভাই
‎৩. মোছা: জান্নাত, বয়স ৭, ছাত্রী,৩য় শ্রেণী, সম্পর্ক বোন
‎ঘটনার স্থান : বেক্সিমকো চক্রবর্তী, আশুলিয়া, ঢাকা
‎আহত হওয়ার সময়কাল : ০৪/০৮/২০২৪ বিকাল ৫:৩০ মিনিটে
‎আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍