হোম / আহতদের তালিকা / মো: রাফিদ
মো: রাফিদ

মো: রাফিদ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

স্বাধীনতার রক্তিম সাক্ষী: শিশু রাফিদের গল্প
“আহতরাই জানে, স্বাধীনতার পথ কখনো নির্বিচারে আসে না”—এই ধ্রুব সত্যের এক জীবন্ত ও করুণ প্রতিচ্ছবি ৯ বছর বয়সী শিশু মো. রাফিদ। মুন্সিগঞ্জের বালিগাঁও গ্রামের সন্তান রাফিদ, ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে পরিবারের সাথে থেকে মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগে পড়াশোনা করছিল। তার বাবা পাভেল হোসেন ভাড়ায় চালিত অটোরিকশা চালিয়ে ১০-১৫ হাজার টাকায় অতি কষ্টে চারজনের সংসার টেনে নিচ্ছিলেন।

২০২৪ সালের ২০ জুলাই রায়েরবাগ ফুটওভার ব্রিজ এলাকায় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় শিশুটি। শিক্ষক ও বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কোনো উসকানি ছাড়াই পুলিশ ও ছাত্রলীগ বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণের শিকার হয় সে। একটি রাইফেলের গুলি সরাসরি তার ডান পায়ে বিঁধে যায় এবং শর্টগানের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয় বাম পা। যন্ত্রণায় ছটফট করা এই শিশুটিকে যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানেও জোটে পুলিশি হয়রানি ও গ্রেপ্তারের হুমকি।

ছেলের জীবন বাঁচাতে ও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পরিবারটি তাকে বাসায় নিয়ে চিকিৎসা করাতে বাধ্য হয়। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে রাফিদের বাবা তার আয়ের একমাত্র উৎস অটোরিকশাটি বিক্রি করে দেন। আজ অটোরিকশা নেই, আয় নেই; আছে শুধু রাফিদের পায়ের তীব্র যন্ত্রণা আর দুঃসহ স্মৃতি।

হিফজ পড়ুয়া রাফিদ আজ পঙ্গুত্বের আশঙ্কায়। যে শিশুটি পবিত্র কুরআনের হাফেজ হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, তার সেই স্বপ্ন আজ অনিশ্চিত। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও দ্বিতীয় স্বাধীনতার জন্য এই অবোধ শিশুর আত্মত্যাগ জাতির বিবেকের কাছে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আহতরাই জানে, স্বাধীনতার পথ
কখনো নির্বিচারে আসে না
এক নজরে মোঃ মামুন


জন্মপরিচয়
এক নিষ্পাপ ও হৃদয়স্পর্শী শিশুর নাম রাফিদ। ২০১৪ সালের ২২ আগস্ট তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা পাবেল হোসেন ও মা রেখা বেগমের আদরের বড় সন্তান তিনি। তাদের মূল বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার গোলতলী ইউনিয়নের বালিগাঁও গ্রামে হলেও বর্তমানে পরিবারটি ঢাকার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের যাত্রাবাড়ি থানার ৬২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর গোবিন্দপুর, জিয়া সরনি রোডের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছে। রাফিদ এখন মাত্র ৯ বছর বয়সী। এ বয়সেই সে তামিমুল আছিয়া মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে অধ্যয়ন করছে।
প্রতিদিন তার কণ্ঠে কুরআনের আয়াত ধ্বনিত হয়, যা তার পরিবারকে গর্বিত করে। ছোটবেলা থেকেই সে আল্লাহর বাণী হৃদয়ে ধারণ করে বড় হচ্ছে। রাফিদের একটি ছোট ভাই রয়েছে, যার নাম ইয়াসিন, বয়স মাত্র ৪ বছর। দুই ভাইয়ের শৈশব কাটছে শহরের কোলাহলের মাঝেও সীমিত আয় ও অভাবের বাস্তবতায়। পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রাফিদের বাবা, যিনি একটি ভাড়ায় চালিত অটো রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। মাসিক আয় মাত্র ১৫ হাজার টাকা, যা দিয়ে ঢাকায় বসবাস, ভাড়া, খাবার, পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ চালানো অত্যন্ত কঠিন।
তবুও পরিবারটি আশা ছাড়ে না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে তারা প্রতিদিন লড়াই করছে নিঃশব্দে। রাফিদের চোখে যে স্বপ্ন ফুটে ওঠে, সেটি শুধু একটি শিশুর নয় একটি সংগ্রামী পরিবারের স্বপ্ন। পারিবারিক অবস্থা রাফিদের পরিবারটি একটি নিম্ন আয়ের পরিবার। তাদের আয়ের একমাত্র ভরসা রাফিদের বাবা পাবেল হোসেন। যিনি প্রতিদিন সকালে একটি ভাড়ায় চালিত অটো রিকশা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। এই অটো চালিয়েই তিনি পরিবার চালানোর চেষ্টা করেন। মাসে গড়ে আয় হয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা, যা দিয়ে ঢাকার মতো ব্যয়বহুল নগরীতে বাসা ভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অভাবঅনটনের মধ্যেও রাফিদের মাবাবা চেষ্টা করছেন সন্তানদের সুশিক্ষায় গড়ে তুলতে। বিশেষ করে রাফিদের হিফজ শিক্ষা অব্যাহত রাখতে তারা নীরবে অসীম ত্যাগ স্বীকার করে চলেছেন। কিন্তু সম্প্রতি নানা পারিবারিক ও আর্থিক চাপ তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। ঢাকার জীবনযাত্রার চাপ, প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য এবং আয়-ব্যয়ের অসম সমীকরণ এ পরিবারটিকে এক অসহায় অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। এই সংগ্রামী পরিবারের প্রতিটি দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়। তবু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তারা বাঁচার সাহস খুঁজছে। রাফিদের স্বপ্ন, যেন একদিন সে হাফেজে কোরআন হয়ে পরিবারের দুঃখ মোচনের পথ তৈরি করতে পারে। এই আশায় বুক বাঁধে মা বাবা। এই ছোট শিশুর জীবনেও লুকিয়ে আছে এক গভীর জীবন সংগ্রামের কাহিনি, যা আমাদের সমাজের হাজারো পরিবারে প্রতিদিন প্রতিফলিত হচ্ছে।

ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসজুড়ে বাংলাদেশের শিক্ষা অঙ্গনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সূচনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা একজোট হয়ে রাস্তায় নেমে আসে কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তারা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন, সেমিনার, প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য দাবি উপস্থাপন করে। শিক্ষার্থীদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, সমান সুযোগ নিশ্চিত করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সকল নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। কিন্তু এই অহিংস, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জবাবে রাষ্ট্র যে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা ছিল নিষ্ঠুর, অমানবিক ও দমনমূলক। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলন দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় ছোড়া হয় রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং কোথাও কোথাও তাজা গুলিও। শিক্ষার্থীদের মারধর, হয়রানি, আটকের পাশাপাশি সরাসরি হামলার ঘটনাও ঘটে। এই দমন-পীড়নের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক যে ঘটনাগুলোর একটি, তা হলো ছোট্ট শিশু রাফিদের ওপর বর্বর হামলা।

২০২৪ সালের ২০ জুলাই সকাল। রায়েরবাগ ফুটওভার ব্রিজ এলাকায় শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল ৯ বছর বয়সী রাফিদ। সেও চেয়েছিল নিজের মতো করে ন্যায় ও সমতার পক্ষে একটি কণ্ঠ যুক্ত করতে। যদিও বয়সে ছোট, কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল দেশপ্রেম ও ন্যায়বোধ। হঠাৎ করেই শান্তিপূর্ণ সেই পরিবেশে শুরু হয় পুলিশের গুলিবর্ষণ। কোনো আগাম সতর্কতা বা উসকানি ছাড়াই শুরু হয় রাইফেল, শর্টগান ও টিয়ারশেলের হামলা। সেই সময় ছোট্ট রাফিদ অন্যদের সঙ্গে দৌড়ানোর চেষ্টা করলেও খুব বেশি দূর যেতে পারেনি। একটি রাইফেলের গুলি এসে সরাসরি লাগে তার ডান পায়ে। ঠিক পর মুহূর্তেই শর্টগানের গুলি এসে আঘাত করে তার বাম পায়ে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। তার শরীর থেকে ঝরতে থাকে রক্ত, মুখে ফুটে ওঠে ভয় ও অসহায়তা। আশেপাশের লোকজন চিৎকার করে ওঠে, কেউ একজন দৌড়ে এসে তাকে টেনে নেয় নিরাপদ জায়গায়। একটি শিশুর পায়ে গুলির ক্ষত শুধু তার শরীরকে নয়, গোটা জাতির বিবেককে বিদীর্ণ করে দেয়। রাফিদকে দ্রুত স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নেয়া হয়, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয় ঢাকায়। চিকিৎসকরা জানায়, তার পায়ের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন।
এই ঘটনা শুধু রাফিদের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের এক জ্বলন্ত প্রমাণ। একটি শিশু যার হাতে বই থাকার কথা, তার শরীরে এখন গুলির চিহ্ন। এই ঘটনায় উঠে আসে এক ভয়ানক বাস্তবতা যেখানে ন্যায়ের দাবি তুললেই তা রুদ্ধ করার জন্য হিংস্র অস্ত্র চালানো হয়, এমনকি শিশুদের প্রতিও দেখানো হয় না কোনো করুণা। রাফিদের এই রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা আজ আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে: আমরা কেমন দেশ গড়ছি?

চিকিৎসা ও সংকট
আহত হওয়ার পর ছোট্ট রাফিদকে তাৎক্ষণিকভাবে রাজধানীর সালমান হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, তার পায়ের আঘাতে পচন শুরু হয়েছে এবং সংক্রমণরোধে ক্ষতিগ্রস্ত মাংসপেশির কিছু অংশ কেটে ফেলতে হয়। এই যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার মধ্যেই বিকেলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় উন্নত চিকিৎসার আশায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই নতুন এক ভয়ের মুখোমুখি হতে হয় পরিবারকে। হাসপাতালে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা রাফিদের বাবা-মাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে এবং তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারের হুমকি দেয়। আতঙ্কে ও সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা হাসপাতালে ভর্তি না করিয়েই তাকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসতে বাধ্য হন। পরবর্তী এক মাস রাফিদের চিকিৎসা চলে বাসায় থেকেই। প্রতিদিন তার পায়ের ক্ষত পরিষ্কার, ওষুধ ও ড্রেসিং বাবদ ব্যয় হতো গড়ে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। কিন্তু এ ব্যয় সামলানো নিম্ন আয়ের পরিবারটির পক্ষে ছিল প্রায় অসম্ভব। বাধ্য হয়ে পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস, ভাড়ায় চালানো অটোরিকশাটি বিক্রি করে দিতে হয়। এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েও পরিবারটি কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি সাহায্য পায়নি। চিকিৎসার পর রাফিদের শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে গেলেও সে এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়। মাঝে মধ্যে গুলির স্থানে তীব্র ব্যথায় ছটফট করে, রাতে ঘুম ভেঙে যায়। একজন কোমলমতি শিশুর জীবন আজ ব্যথা, আতঙ্ক ও সীমাহীন অনিশ্চয়তায় বন্দি হয়ে পড়েছে শুধু একটি ন্যায্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার অপরাধে।

একনজরে মো: রাফিদ
নাম : মো: রাফিদ
পিতা : পাভেল হোসেন
মাতা : রেখা বেগম
ভাই : ইয়াছিন
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
বর্তমান ঠিকানা : যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা : বালিগাও, মুন্সিগঞ্জ
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই, ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ বাহিনী
আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ, ঢাকা

প্রস্তাবনা
১. রাফিদের বাবার জন্য একটা সিএনজির ব্যবস্থা করা
২. চিকিৎসার খরচ বহন করা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍