হোম / আহতদের তালিকা / শেখ মো: সজিব
শেখ মো: সজিব

শেখ মো: সজিব

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ঠিকানা : সায়েদাবাদ, ঢাকা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

পরিচয় শেখ মো: সজিব জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯০ সালের ২ জুন, ঢাকার উত্তর সায়েদাবাদ এলাকায়। তিনি বেড়ে ওঠেন একটি দরিদ্র, কিন্তু সৎ ও পরিশ্রমী পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই জীবনযুদ্ধে নেমে পড়া সজিব কিশোর বয়সেই পিতার পাশে দাঁড়ান। লেখাপড়া বেশি দূর এগোয়নি, তবে হাতে খাটুনি আর পরিশ্রমে কখনও ঘাটতি রাখেননি। ধীরে ধীরে একজন দক্ষ ফার্নিচার মিস্ত্রি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। দীর্ঘদিন ধরে কাঠের কাজ করে সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন সজিব। বৃদ্ধ পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তানসহ আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতেন। হাতে ছিল শিল্পীর মতো নৈপুণ্য, একেকটা আসবাব যেন হতো তার সৃষ্ট কোনো নিঃশব্দ কবিতা। পরিবারের জন্য স্বপ্ন ছিল সন্তানদের শিক্ষিত করবেন, পিতা-মাতাকে স্বাচ্ছন্দ্য দেবেন।
পারিবারিক অবস্থা আজ সজিব আর কাজ করতে পারেন না। বিছানায় পড়েই দিন কাটে তার। পরিবারের সদস্যরা অনাহারে, অর্ধাহারে দিন পার করছে। মা-বাবা দু’জনেই বৃদ্ধ ৭৫ বছর বয়সী পিতা আবুল ফজল ও ৭০ বছর বয়সী মা আলেয়া বেগম এখন সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সংসারে নেই কোনো আয়। ছোট ছোট শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে বুক ভেঙে যায় সজিবের। একদিন যিনি ছিলেন হাতের কাজে স্বনামধন্য, আজ তিনি নিঃস্ব, অসহায় ও নিভৃত এক জীবনের পথিক। জীবনযুদ্ধ থেকে ছিটকে তিনি পড়ে আছেন জীবনের এক করুণ অধ্যায়ে, যেখানে স্বপ্নগুলো শুধুই স্মৃতি, আর প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে এক নিঃসহায় সংগ্রাম। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই স্বপ্নভরা জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। এক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। কাঠ কাটার সময় ভারী যন্ত্রপাতির আঘাতে তার মেরুদণ্ডে মারাত্মক ক্ষতি হয়। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, তিনি আর আগের মতো কাজ করতে পারবেন না। ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসা করাতে গিয়ে শেষ সম্বলটুকুও শেষ হয়ে যায়। ঘটনার বিবরন দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। সকাল থেকেই শেখ মো: সজিব রাজধানীর রায়েরবাগ এলাকায় চলমান ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এই আন্দোলনের পাশে ছিলেন ছাত্রদের ন্যায্য দাবি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই নিজের লড়াই মনে করতেন। সেদিন জুমার নামাজের পর কিছু সময়ের জন্য বাসায় ফিরলেও, স্ত্রীর অনুরোধ উপেক্ষা করে আবার সন্ধ্যায় রাজপথে নেমে যান। তার বিশ্বাস ছিল ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই প্রকৃত নাগরিক দায়িত্ব। কিন্তু সেই রাতে ঘটে যায় ভয়াবহ এক মর্মান্তিক ঘটনা। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে কদমতলী থানার সামনে অবস্থান করছিলেন তিনি। হঠাৎ করেই পুলিশি দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে একটি স্নাইপার বন্দুক থেকে ছোড়া গুলি সজিবের ডান চোখে সোজা আঘাত করে। গুলিটি তার রেটিনা ছিন্ন করে মস্তিষ্কের খুলি পর্যন্ত গিয়ে আটকে যায়। এক মুহূর্তেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়। প্রচণ্ড রক্তপাত শুরু হয়। চোখের ক্ষতিতে শুধু দৃষ্টি হারাননি, সেই আঘাতে ভেঙে যায় তার তিনটি সামনের দাঁতও। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সজিব, আর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে রক্ত, আর্তনাদ ও বিভীষিকার এক নির্মম দৃশ্য। এই একটি গুলিই বদলে দেয় তার পুরো জীবন।
চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শেখ মো: সজিব পাশের একটি ট্রাকের নিচ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কোনোমতে নিজেকে সরিয়ে নেন। পরে স্থানীয় সালমান হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও সেখানে তার অবস্থা খারাপ দেখে তাকে রয়েল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর চক্ষু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য তাকে ওর চক্ষু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সেখানে যথাযথ চিকিৎসা না হওয়ায় এবং অবহেলার কারণে তার চোখে মারাত্মক ইনফেকশন শুরু হয়। চোখের ভেতরে গুলি আটকে থাকার ফলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং অবশেষে তার ডান চোখ সম্পূর্ণরূপে অকেজো হয়ে যায়। চোখের যন্ত্রণার পাশাপাশি মাথায় তীব্র ব্যথা শুরু হয়। মাঝে মাঝে তার আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। নিজের চুল ছিঁড়ে ফেলা, ঘরের জিনিসপত্র ভাংচুর করা এরূপ আচরণ পরিবারকে আরও আতঙ্কিত করে তোলে। শুধু দৃষ্টিশক্তি নয়, সেই রাতের গুলিতে তিনি হারিয়েছেন মানসিক স্বাভাবিকতাও। বর্তমানে তিনি অসুস্থ, কর্মক্ষম নন এবং পরিবারের সঙ্গে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। সংসারে আয় বলতে কিছু নেই। বাবা-মা দুজনেই বৃদ্ধ, সন্তান দু’টি ছোট, একজন মাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে, অপরজন মাত্র এক বছর বয়সী। সংসারের বোঝা, নিজের শারীরিক যন্ত্রণা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে শেখ মো: সজিব এখন চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে আছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার জন্য উন্নতমানের চোখের অপারেশন, দাঁতের চিকিৎসা এবং মানসিক থেরাপি অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু পরিবারের হাতে অর্থ নেই, নেই কোনো সহায়তা। তাঁর চোখের ভেতরে এখনো গুলির টুকরো রয়ে গেছে এবং প্রতিদিন সেই যন্ত্রণা তাকে আরও দুর্বল করে তুলছে। প্রস্তাবনা ১। তাঁর চোখের চিকিৎসা প্রয়োজন ২। মানসিক চিকিৎসা ব্যবস্থা করা ৩। দাঁতের চিকিৎসা প্রয়োজন ৪। অনলাইনে আর্টিফিসিয়াল ফুলের ব্যবসা। স্ত্রী এই কাজে দক্ষ শেখ মো: সজিব এখন চোখ হারানো, দাঁত ভাঙা, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও কর্মহীন এক মানুষ। একদিন যে মানুষটি সংসার চালাতেন, আজ তিনি নিজেই পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তার জীবন পুনর্গঠনের জন্য এখন প্রয়োজন সহানুভূতি, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা। এ মুহূর্তে, তার পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক দায়িত্ব।
এক নজরে শেখ মো: সজিব
নাম : শেখ মো: সজিব
পিতা : আবুল ফজল, বয়স ৭৫
মাতা : আলেয়া বেগম, বয়স ৭০
ছেলে : মো: ওয়াজেদ, ৩য় শ্রেণি
ছেলে : মো: ওয়ালিদ, বয়স ১
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ঠিকানা : সায়েদাবাদ, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই, ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : রায়েরবাগ, ঢাকা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍