হোম / আহতদের তালিকা / রিয়াদ হাওলাদার
 রিয়াদ হাওলাদার

রিয়াদ হাওলাদার

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আন্দোলনে তার উপস্থিতি ছিল এক অনুপ্রেরণার উৎস

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম পরিচয়
রিয়াদ হাওলাদার একজন উদ্যমী ও সংগ্রামী ছাত্র, যিনি দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগের গৌরনদী উপজেলার কমলাপুর গ্রামে ২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে প্রাকৃতি সৌন্দর্যেঘেরা কমলাপুর গ্রামে, যেখানে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন এখনো জীবন্ত। রিয়াদ ছোটবেলা থেকেই মেধাবী, সচেতন এবং দায়িত্বশীল একজন ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শিক্ষা জীবনের প্রাথমিক ধাপ পেরিয়ে তিনি বর্তমানে মাদারীপুর সরকারি কলেজে পড়াশোনা করছেন এবং রসায়ন বিভাগে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করতে শিখেছেন। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে রিয়াদ একজন নির্ভরযোগ্য ও সহযোগিতাপূর্ণ মানুষ। কলেজ জীবনে বিভিন্ন বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছেন।

ভবিষ্যতে তিনি একজন দক্ষ ও মানবিক গুণসম্পন্ন প্রশাসক কিংব শিক্ষাবিদ হিসেবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চান। তার স্বপ্ন একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা, যেখানে প্রত্যেক মানুষ তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার পাবে। রিয়াদের জীবনদর্শন মূলত আত্মত্মউন্নয়ন ও জনকল্যাণভিত্তিক, যা তাকে দিন দিন আরও পরিণত করে তুলছে। কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা ও সততার মাধ্যমে তিনি তার স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলেছেন।
পারিবারিক অবস্থা
রিয়াদ হাওলাদার এক সংগ্রামী কৃষক পরিবারের সন্তান। তার পিতা আবুল হোসেন একজন প্রান্তিক কৃষক, বয়স ৫৫ বছর। পরিবার চালানোর মূল দায়িত্ব তারই কাঁধে। মাঠে ঘাটে পরিশ্রম করে কোনোভাবে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন। তার মা, নাসিমা বেগম (বয়স ৫০), একজন সাধারণ গৃহিণী হিসেবে সংসারের প্রতিটি কাজ নিঃশব্দে সামলান। এই পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬ জন। তাদের মাসিক আয় মাত্র ৮,০০০ টাকা, যা বর্তমান বাজারদরে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর জন্য খুবই অপ্রতুল। প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, সন্তানদের পড়ালেখা, ওষুধপত্র, এবং অন্যান্য জরুরি ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারটি প্রায়শই চরম সংকটে পড়ে। অনেক সময় প্রয়োজনীয় জিনিস থেকেও তারা বঞ্চিত থাকে।
অভাব-অনটনের মাঝেই রিয়াদ নিজের পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। বাবা-মায়ের কঠোর শ্রম আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে তার স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে। অর্থনৈতিক কষ্ট সত্ত্বেও রিয়াদের পরিবার সততা ও আত্মমর্যাদায় বিশ্বাসী। এই সংগ্রামী জীবনের গল্প শুধু তাদের একার নয়, বরং দেশের লাখো দরিদ্র পরিবারের প্রতিচ্ছবি।

ঘটনার বিবরন
রিয়াদ হাওলাদার একজন সাহসী, সজাগ ও দায়িত্বশীল ছাত্র হিসেবে দেশের চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সকালে মাদারীপুরের সকুনি লেক এলাকায় হাজারো ছাত্র-জনতা ন্যায়ের দাবিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিয়েছিল। ওই আন্দোলনের প্রথম সারিতে ছিলেন রিয়াদ, যার কণ্ঠে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও দৃঢ় প্রতিবাদ। তিনি সামাজিক অসাম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে কখনো পিছপা হননি, তাই আন্দোলনে তার

উপস্থিতি ছিল এক অনুপ্রেরণার উৎস।
কিন্তু শান্তিপূর্ণ অবস্থান একপর্যায়ে অগ্নিগর্ত হয়ে ওঠে, যখন পুলিশ ও ছাত্রলীগের যৌথবাহিনী হঠাৎ করে অতর্কিত ও নির্মম হামলা চালায়। লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ছোড়ে এবং ছাত্র-জনতাকে ধাক্কাধাক্কি করে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে রিয়াদ পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন; তার হাত ও পায়ে মারাত্মক আঘাত লাগে। আহত অবস্থাতেও তিনি মানসিকভাবে দৃঢ় ছিলেন, কিন্তু পুলিশের সহিংসতার শিকার হয়ে তাকে রাস্তা থেকে জোরপূর্বক টেনে তুলে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের পর থানায় নিয়ে যাওয়া হলে রিয়াদের ওপর শারীরিক নির্ঘাতন চালানো হয়। বারবার মারধর ও কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের ফলে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। তবুও তাকে কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়নি, এমনকি প্রাথমিক চিকিৎসারও ব্যবস্থা করা হয়নি। দীর্ঘদিন বিনা বিচারে আটক থাকার পর, দেশের রাজনীতিক অস্থিরতার মাঝে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষনা আসার পর ৫ আগস্ট রিয়াদসহ অন্যান্য বন্দীকে মুক্তি দেয়া হয়। এই কঠোর সময়গুলোতে রিয়াদের শরীরের আঘাত ও মানসিক শোক আজও স্থায়ীভাবে তার মধ্যে বিরাজ করছে। তবে তার সংগ্রাম ও সাহস আজও অন্য অনেক তরুণের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে, যারা দেশের বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন।

চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ
গ্রেফতারের পর রিয়াদ হাওলাদারকে মাদারীপুর জেলা জেল হাজতের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও তার হাত ও পায়ে

মারাত্মক আঘাত ও প্রচণ্ড ব্যথা ছিল, সেখানে তাকে কেবল সীমিত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসকরা উপরের নির্দেশনা অনুসরণ করে উন্নত চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেননি। শারীরিক অবস্থার অবনতি সত্ত্বেও তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি, যার ফলে রিয়াদের পায়ে রক্ত জমাট বেঁধে যায় এবং হাতের ফুলে যাওয়া অংশে ব্যথা অসহনীয় হয়ে ওঠে। এই অবহেলার মধ্যে দিন যাপন করতে হয় তাকে, কিন্তু রিয়াদ হার মানেনি। কারণ তার জন্য এই লড়াই শুধু নিজস্ব নয়, এটি বৃষত্তর একটি আন্দোলনের অংশ।
বর্তমানে রিয়াদের শরীরের প্রতিটি অংশেই তীব্র ব্যথা বিরাজ করছে, বিশেষ করে আঘাতপ্রাপ্ত হাত ও পায়ে। দীর্ঘদিনের শারীরিক নির্যাতন এবং মানসিক চাপের কারণে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন অতি কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যান্ত বিশ্রাম ছাড়া তার আরোগ্য অসম্ভব। তার পরিবারও তার অবস্থা দেখে গভীর উদ্বিগ্ন। তবু রিয়াদের অটুট মনোবল ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি তাকে প্রতিনিয়ত লড়াই চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করে, যেন সে একদিন পূর্ণ সুস্থ হয়ে আবার দেশের জন্য কাজ করতে পারে।
প্রস্তাবনা
রিয়াদ হাওলাদারের উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। বিশেষ করে তার হাড়ের এক্সরে, রিহ্যাবিলিটেশন থেরাপি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি এই ঘটনার মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতেও তাকে মনোরোগ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব গ্রহণ না করলে এই মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।


এক নজরে মো: রিয়াদ হাওলাদার
নাম : মো: রিয়াদ হাওলাদার
জন্ম তারিখ : ০১-০২-২০০৩
জনন্মস্থান : গৌরনদী, বরিশাল
পেশা : ছাত্র, মাদারীপুর সরকারি কলেজ, অনার্স তৃতীয় বর্ষ, বিভাগ: রসায়ন
প্রতিষ্ঠান: বার্থী ডিগ্রী কলেজ
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা
গ্রাম: কমলাপুর, ইউনিয়ন: খাঞ্জাপুর, থানা: গৌরনদী, জেলা: বরিশাল
পিতার নাম : মো: আবুল হোসেন হাওলাদার
মায়ের নাম।: নাছিমা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৫
মাতার পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫০
পরিবারের সদস্য ৬
ভাই : ৪ জন
আহত হওয়ার স্থান : শকুনি লেক পার্ক, মাদারীপুর
তারিখ ও সময় : ১৮ জুলাই ২০২৪, সকাল ১১.০০টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ
আঘাতের ধরণ: হাতে ও পীঠে লাঠি দিয়ে জখম

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍