হোম / আহতদের তালিকা / রেজাউল করিম
 রেজাউল করিম

রেজাউল করিম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষক, ব্লু এঞ্জেল বুদ্ধি প্রতিবন্দ্বী অটিস্টিক বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম পরিচয় রেজাউল করিম ৮ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার দক্ষিণ চাকমারকুল মিস্ত্রী পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবকাল থেকেই তিনি শিক্ষা গ্রহণের প্রতি বিশেষ আগ্রহ অনুভব করেন। তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় হেমায়েতুল কোরআন এবতেদায়ী মাদ্রাসা থেকে। পরবর্তী সময়ে দাখিল পর্যায়ের পাঠ শেষ করেন মাছুমিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া আলিম মাদ্রাসা, রাজারকুল, রামুতে। কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশের পর, তিনি তার উচ্চতর শিক্ষা শুরু করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেখানে তিনি অনার্স এবং মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে রেজাউল করিম ব্লু এঞ্জেল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে পার্টটাইম শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। যদিও তার আয় সীমিত, তবে তিনি নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য মেসের খরচ, পড়াশোনা এবং অন্যান্য জীবনযাত্রার খরচ সংগ্রাম করে মেটান। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী তিনি একটি স্থায়ী সরকারি চাকরির প্রত্যাশী, কিন্তু এখনও তা অর্জন করতে পারেননি। কঠোর পরিশ্রম ও অটুট মনোবল তাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে প্রেরণা যোগাচ্ছে। তিনি আশা করেন, একদিন তার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি পাবেন এবং একটি স্থায়ী কাজের সুযোগ পাবেন যা তাকে তার পরিবার ও সমাজের জন্য আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম করবে। পারিবারিক প্রেক্ষাপট রেজাউল করিমের পিতা জিয়াউল হোসাইন একজন প্রবীণ কৃষক, যিনি ৬৯ বছর বয়সেও অন্যের জমিতে চাষাবাদ করে পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে যাচ্ছেন। তার মা আছিয়া খাতুন একজন গৃহিণী, বয়স ৫৮ বছর। তাদের পরিবারটি বেশ বড়। সদস্য সংখ্যা ১০ জন, ৫ ভাই ও ৩ বোন। ২ ভাই এবং ৩ বোনই বিবাহিত এবং গৃহিণী, ছোট ভাই আরিফুল ইসলাম (২১) একজন শিক্ষার্থী ও পরিবার ভিত্তিকভাবে নির্ভরশীল। রেজাউল করিম বর্তমানে ঢাকার ওয়ারী এলাকায় একটি ছোট্ট মেসে থাকেন। তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস রুম্মান চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে অনার্স চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত। এই নবদম্পতি ভবিষ্যতে একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু বাস্তবতায় তা পূরণ তাদের জন্য কঠিন। পরিবারটির নিজস্ব কোনো জমিজমা নেই, শুধু ভিটে মাটি ছাড়া। রেজাউলের মাসিক আয় মাত্র ৮০০০ টাকা, যা তিনি ব্লু এঞ্জেল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে পার্টটাইম শিক্ষকতা এবং একটি টিউশনির মাধ্যমে অর্জন করেন। এই সামান্য আয়ে ঢাকার বাসা ভাড়া, খাবার, লেখাপড়ার খরচ এবং গ্রামের পরিবারের প্রয়োজন মেটানো অত্যন্ত কঠিন। তার পরিবার বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। তবুও রেজাউল আশা হারাননি। স্বপ্ন দেখেন স্থায়ী একটি চাকরি পাওয়ার যা, তার পরিবারকে সচ্ছলতা এনে দেবে এবং তার সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটাবে। ঘটনার বিবরণ ও আহত হওয়ার প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের জুলাই মাসজুড়ে দেশের শিক্ষার্থীরা কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নেমে আসে। দেশজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মানব বন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, সেমিনার ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবিগুলো তুলে ধরে। শিক্ষার্থীরা বারবার শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে, যাতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং একটি ন্যায্য, সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু এই অহিংস ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জবাবে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়ানক দমনমূলক। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের লক্ষ্য করে ছোড়া হতে থাকে রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও কখনো কখনো তাজা গুলিও। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারধর, আটক এবং এমনকি সরাসরি হামলা চালানো হয়। পরিস্থিতি এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, আন্দোলনকারীরা আত্মরক্ষায় বাধ্য হয় ফলে আন্দোলন কিছু কিছু এলাকায় সহিংসতায় রূপ নেয়। এই আন্দোলনে রেজাউল করিম ছিলেন একজন নির্ভীক ও সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। এই আন্দোলন শুরু হয় দেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বঞ্চনার প্রতিফলন হিসেবে বিশেষত কোটা বৈষম্য, ক্ষমতাসীন সরকারের ফ্যাসিবাদী দমননীতি ও গণতন্ত্র বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে। সারা দেশের মতো ঢাকাতেও এ আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়, যার কেন্দ্রে ছিলেন রেজাউল করিমের মতো সাহসী ছাত্ররা। ১১ জুলাই শাহবাগ মোড়ে রেজাউল প্রথম আন্দোলনে অংশ নেন এবং এরপর নিয়মিতভাবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত থাকেন। ১৪ জুলাই তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে অবস্থান নেন ও ছাত্রলীগের দমনমূলক হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। ১৮ জুলাই থেকে সরকার কর্তৃক ইন্টারনেট ও নেটওয়ার্ক সেবা বন্ধ করে দেয়া হলে আন্দোলন আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তবে রেজাউলদের মনোবল ভাঙেনি। ১৯ জুলাই বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে ঢাকার লক্ষ্মীবাজার এলাকায় আন্দোলনের সময় হঠাৎ পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় রেজাউল করিম পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটের আঘাতে মাথা ও কপালে আঘাতে জখম হন। একই সঙ্গে বাম পায়ে মারাত্মক আঘাত পান, কারণ দৌড়াতে গিয়ে ড্রেনে পড়ে তার পা ফেটে যায়। তীব্র ব্যথা ও রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও তিনি আন্দোলনের স্থান ত্যাগ করেননি। পরবর্তীতে ঋষিকেশ দাস রোডের একটি গলিতে আশ্রয় নেয়ার সময় ছাদ থেকে নিক্ষিপ্ত টিয়ারশেল গ্যাস তার মুখমণ্ডলে পড়ে। এতে তার চোখ ও মুখে তীব্র জ্বালাপোড়া শুরু হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যাঘাত ঘটে। দমবন্ধ পরিস্থিতিতে সহযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করে একটি ফার্মেসিতে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। সেখানে তার ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে এবং ব্যথানাশক ওষুধ দেয়া হয়। কিন্তু উন্নত চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় তার শারীরিক অবস্থা আজও দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ ঘটনার পর থেকে তিনি মানসিকভাবে পর্যুদপ্ত। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ আহত রেজাউল করিমের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে কিছুটা স্থিতিশীল হলেও মাথায় রাবার বুলেটের আঘাতের কারণে তিনি এখনো নিয়মিত তীব্র মাইগ্রেনের ব্যথায় ভুগছেন। এসব ব্যথা হঠাৎ শুরু হয় এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমে বড় বাধা সৃষ্টি করে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। তবে পরিবারের সংকটাপন্ন আর্থিক অবস্থার কারণে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ তার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছে না। বর্তমানে রেজাউল ঢাকায় একটি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে পার্টটাইম শিক্ষক হিসেবে অল্প আয়ে কাজ করছেন।
এই অবস্থায় রেজাউল করিম কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন যেন তাকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী একটি স্থায়ী সরকারি চাকরির সুযোগ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি তার চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। তার বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে তিনি আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন এবং তার পরিবারকে
স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন। প্রস্তাবনা ১. স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করা, যাতে পরিবার নিয়ে জীবন যাপন করতে পারে। ২. এককালীন সহযোগিতা করা যেতে পারে।
এক নজরে রেজাউল করিম
নাম : রেজাউল করিম
জন্ম তারিখ : ০৮-১০-১৯৯৯
জন্মস্থান : রামু, কক্সবাজার
পেশা : শিক্ষক, ব্লু এঞ্জেল বুদ্ধি প্রতিবন্দ্বী অটিস্টিক বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
স্ত্রী : জান্নাতুল ফেরদৌস রুম্মান
স্ত্রীর পেশা ও বয়স : ছাত্রী, ২২
নিজ জেলা : কক্সবাজার
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মিস্ত্রীপাড়া, ইউনিয়ন: চাকমারকুল, থানা: রামু, জেলা: কক্সবাজার
বর্তমান ঠিকানা : ৮৬/০২, জাহানারা ম্যানশন, নারিন্দা রোড, ঢাকা পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : জিয়াউল হোসাইন
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৬৯
মায়ের নাম : আছিয়া খাতুন
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫৮
মাসিক আয় : ৮০০০
আয়ের উৎস : পার্টটাইম শিক্ষকতা ও টিউশন
বাড়ির বিবরণ : সেমি পাকা
সম্পদের পরিমাণ : ভিটেমাটি ছাড়া কোনো সম্পদ নেই।
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ১০ জন
ভাই-বোনদের নাম
১. আরিফুল ইসলাম, বয়স: ২১, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: অনার্স ১ম বর্ষ
২. শামসু রোহান, বয়স: ২৮, পেশা: প্রবাসী বাকি ভাই-বোন (বিবাহিত)
আহত হওয়ার বিবরণ
আহত হওয়ার স্থান : লক্ষ্মীবাজার, পুরান ঢাকা
তারিখ ও সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৩.৩০মিনিট আক্রমণকারী : পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ
আঘাতের ধরন : রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল গ্যাস বর্তমান অবস্থা : মাথায় আঘাতের কারণে মাঝেমাঝে ব্যথা হয়

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍