হোম / আহতদের তালিকা / মোবারক হাছান
মোবারক হাছান

মোবারক হাছান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : চা দোকানের ব্যবসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম
২৫ ডিসেম্বর ১৯৯২ ইতিহাসের পাতায় একটি দিন, যেদিন লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার রামগঞ্জ ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্রে জন্ম নেন এক সাহসী সন্তান মোবারক হাছান। তাঁর জন্মছিল যেন এক আলোর সঞ্চার, এক সংগ্রামী চেতনার সূচনা। পিতা মৃত নুরুল ইসলাম ছিলেন মাটি ও মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এক কৃষক, যিনি তার কঠোর শ্রমে গড়ে তুলেছিলেন একটি আদর্শিক পরিবার। মা মোছা: মমতাজ বেগম, আজ ৬৫ বছরের এক কোমল হৃদয়ের মমতাময়ী নারী, যিনি সন্তানদের অন্তরে শিষ্টাচার, দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাসের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। এই পারিবারিক মূল্যবোধই মোবারক হাছানের চরিত্র গঠনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
পারিবারিক জীবন মোবারক হাছান এক সাধারণ, কিন্তু গর্বিত জীবন যাপন করেন। সংসারের চালিকাশক্তি হিসেবে তিনি নিজের পরিশ্রমকে করেছেন সর্বস্ব। তিন সন্তানের জনক তিনি। এক পুত্র ও দুই কন্যা। তাঁর বড় ছেলে তাহসীন বর্তমানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্যই তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেন। তাঁর পরিবার যেন এক ছোট্ট কিন্তু গভীর ভালোবাসার সংসার, যেখানে সংগ্রাম আছে, আছে স্বপ্ন দেখার সাহস। কর্মজীবন চায়ের দোকান- এটাই তাঁর জীবিকার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু এই দোকান শুধু আয়-রোজগারের জায়গা নয়, ছিল সমাজ চিন্তার একটি ক্ষুদ্র পাঠশালা। চায়ের কাপের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে তিনি দেখতেন সমাজের অসংগতি, বৈষম্য ও নির্যাতনের নির্মম চিত্র। সাধারণ মানুষের মুখে উচ্চারিত হতাশার শব্দগুলো তাঁকে ভাবাতো, আলোড়িত করতো তাঁর অন্তর। এখান থেকেই জন্ম নেয় এক প্রতিবাদী সত্তা; ন্যায়ের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সংগ্রামী জীবন মোবারক হাছানের জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি দেশের রাজপথে ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে াঁড়ান। ভয় কিংবা জীবন হারানোর আশঙ্কা তাঁর সংকল্পকে টলাতে পারেনি। নির্যাতনের কালো ছায়ায় থেকেও তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল দীপ্তি; একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ এবং আপসহীন মনোভঙ্গি তাঁকে পরিণত করে এক জীবন্ত কিংবদন্তীতে। তাঁর জীবন শুধু আজকের প্রজন্ম নয়,আগামীর পথচলার জন্যও এক অনিবার্য বাতিঘর হয়ে থাকবে। সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ গুলিবিদ্ধ হওয়ার হৃদয়বিদারক ঘটনা ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার পাশের একটি পয়েন্টে চলছিল শান্তিপূর্ণ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে তখন তরুণ ছাত্ররা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই সময় মোবারক হাছান কয়েকজন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনরত ছাত্রদের প্রতি সংহতি জানাতে এগিয়ে যান। তাঁদের হাতে ছিল কিছু শুকনো খাবার ও মিনারেল পানির বোতল; মানবিক সহায়তার নিঃস্বার্থ বহিঃপ্রকাশ। কোনো শ্লোগান নয়, কোনো আক্রমণ নয়; তাঁরা শুধু ভালোবাসা ও সহমর্মিতার নিদর্শন নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি মোড় নেয় এক ভয়াবহ রূপে। কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই নিরাপত্তা বাহিনীর দিক থেকে শুরু হয় নির্বিচার গুলিবর্ষণ। সেই গুলির একটি মোবারক হাছানের চোখের নিচের হাড়ে (অরবিটাল বোন) সজোরে আঘাত হানে। প্রচণ্ড ব্যথা ও রক্তক্ষরণের ফলে তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মুহূর্তেই চারপাশে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক, আর তাঁর সহযোগীরা প্রাণপণে চেষ্টা করেন তাঁকে বাঁচাতে।
সহযোগীদের দ্রুততায় মোবারক হাছানকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তাঁর অবস্থার জটিলতা দেখে চিকিৎসকরা তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করেন। চোঁখের নিচের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তাঁর দৃষ্টি ও মুখমণ্ডলের স্বাভাবিকতা হুমকির মুখে পড়ে যায়। চিকিৎসা শুরু হলেও সে আঘাত শুধু শারীরিক ক্ষত হয়ে থাকেনি, থেকে গেছে এক জীবন্ত স্মৃতি হয়ে; রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নগ্ন ও নির্মম চিত্র হিসেবে। এই ঘটনা মোবারক হাছানের সংগ্রামী জীবনে যুক্ত করে এক নতুন অধ্যায়; যেখানে শুধু মত প্রকাশ নয়, সহমর্মিতা দেখানোও হয়ে ওঠে অপরাধ। তাঁর এই আত্মত্যাগ ও অটল মনোবল ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। চিকিৎসা সম্পর্কিত সামগ্রিক বর্ণনা গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর মোবারক হাছানকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শুরু হয় তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা। প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা ও জটিলতা বিবেচনায় চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং তাকে দ্রুত ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল, কাকরাইলে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী ডাক্তারি পরীক্ষায় ধরা পড়ে, গুলির আঘাতে তাঁর চোখের নিচের হাড়; অর্থাৎ অরবিটাল বোন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে, যা চিকিৎসকদের মতে একটি মারাত্মক ট্রমাটিক ইনজুরি। এই ভাঙন শুধু মুখমণ্ডলের গঠনে ব্যাঘাত ঘটায়নি, এর প্রভাব পড়েছে চোখের ওপরও। বাম চোখে তিনি মাঝে মাঝে দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো সমস্যায় ভুগছেন; যা অস্বাভাবিক এবং অশনি সংকেত বহন করে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, দৃষ্টিশক্তির এই অনিয়মিততা ভবিষ্যতে স্থায়ী ক্ষতির দিকে ধাবিত হতে পারে। বর্তমানে তিনি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সম্পূর্ণ সুস্থতার জন্য নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা, উন্নত স্ক্যান ও থেরাপি চালিয়ে যেতে হচ্ছে। একদিকে শারীরিক যন্ত্রণার বিরুদ্ধে যুদ্ধ,অন্যদিকে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার নিরন্তর চেষ্টা; এই দুইয়ের মাঝখানে তিনি দৃঢ়চেতা মানসিকতা নিয়ে টিকে আছেন। এই চিকিৎসা-অধ্যায় শুধু একটি ট্রাজেডি নয় বরং তাঁর সংগ্রামী জীবনের একটি কঠিন, কিন্তু দীপ্তিমান অধ্যায়। চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং। পূর্বে কী ধরনের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: ছোট্ট দোকান আছে একটা। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরির মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
এক নজরে মোবারক হাছান
নাম : মোবারক হাছান
জন্ম তারিখ : ২৫/১২/১৯৯২
জন্মস্থান : নোয়াখালী
পেশা : চা দোকানের ব্যবসা
নিজ জেলা : নোয়াখালী
পেশাগত পরিচয় : চায়ের দোকান
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: রামগঞ্জ শহর, ইউনিয়ন: রামগঞ্জ থানা: রামগঞ্জ, জেলা: লক্ষ্মীপুর
বর্তমান ঠিকানা : ১০/৭/০১, উত্তর সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ি, ঢাকা পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মৃত মোঃ নুরুল ইসলাম
পিতার পেশা ও বয়স : মৃত
মায়ের নাম : মোছাঃ মমতাজ বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৫
মাসিক আয় : ১৫০০০
আয়ের উৎস : চায়ের দোকান
বাড়ির বিবরণ : ভাড়া বাসায়
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
সন্তানদের নাম
১. তাহসীন, বয়স: ১২ পেশাঃ ছাত্র, শ্রেনিঃ ৬ষ্ঠ, সম্পর্ক: ছেলে
২. তান্নী আক্তার, বয়স: ৬ পেশা: ছাত্রী, শ্রেনি: ১ম, সম্পর্ক: মেয়ে
৩. তারান্নুম, বয়স: ১.৬, সম্পর্ক: মেয়ে
আহত হওয়ার বিবরণ
আহত হওয়ার স্থান : ঢাকার যাত্রাবাড়ী রায়েরবাগ, শনিরআখড়া এলাকায়
তারিখ ও সময় : ১৮ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৩ টার দিকে। আক্রমণকারী : পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্তৃক
আঘাতের ধরণ : গুলির আঘাতে তার চোখের নিচের হাড় (চোখের অরবিটাল বোন) ফেটে গেছে
চিকিৎসা : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল
বর্তমান অবস্থা : বাম চোখে তিনি হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি হারানোর সমস্যায় ভুগছেন। দৃষ্টিশক্তির এই অবস্থা ভবিষ্যতে স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍