মোহাম্মদ মেহেদী হাসান
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
স্থায়ী ঠিকানা : রসুলগঞ্জ, পাটগ্রাম, লালমনিরহাট
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
“তাদের চোখে ছিল যন্ত্রণা, কিন্তু কণ্ঠে ছিল সত্য উচ্চারণের অদম্য দীপ্তি”
মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ক্রমিক: ১০৬ আইডি: ঢাকা সিটি ১০৬
জন্ম পরিচয় মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ২০০০ সালের ১৩ অক্টোবর লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার রসুলগঞ্জ নামক এক শান্তিপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে গ্রামীণ প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরশে, যেখানে নদী, মাঠ আর কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর তাকে একদিকে যেমন প্রকৃতির সন্তান করে গড়ে তুলেছে, অন্যদিকে তেমনি জীবনের গভীরতর বাস্তবতাও ছুঁয়ে গেছে তার মননে। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি সমাজের নানা বৈষম্য, অবিচার ও অনিয়ম নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন একাধারে স্পষ্টভাষী, সাহসী এবং ন্যায়পরায়ণ চিন্তাধারার একজন তরুণ। প্রতিবাদ করার সাহস, নেতৃত্বের গুণাবলি ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানই বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
পরিবারের আর্থিক বাস্তবতার কারণে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে না গেলেও থেমে থাকেননি তিনি। জীবিকার প্রয়োজনে গাজীপুর জেলার সাফিপুর এলাকার একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। কঠোর পরিশ্রম, দায়িত্বশীলতা এবং সততার মাধ্যমে তিনি কর্মক্ষেত্রেও নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন। কর্মজীবনে প্রবেশের পরও সমাজ ও রাষ্ট্রের বিষয়ে তাঁর সচেতনতা হ্রাস পায়নি; বরং সময়ের প্রেক্ষাপটে তিনি আরো সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং নিপীড়িতের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সাহসিকতা তিনি সবসময় দেখিয়েছেন। সাধারণ কর্মজীবী হলেও মেহেদী হাসান ছিলেন সেইসব নির্ভীক তরুণদের একজন, যারা বিশ্বাস করেন পরিবর্তন আসে প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে, সাহসিকতার মাধ্যমে। তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে কোনো প্রান্ত থেকে উঠে আসা একজন তরুণও হতে পারে সামাজিক জাগরণের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজকের বাংলাদেশে এমন সাহসী, নীতিবান ও সচেতন তরুণদের প্রয়োজন যারা নিজেদের জীবিকার সাথে সাথে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নও লালন করেন। মোহাম্মদ মেহেদী হাসান সেই বিরল উদাহরণগুলোর অন্যতম। পারিবারিক প্রেক্ষাপট মোহাম্মদ মেহেদী হাসানের পরিবারটি বাংলাদেশের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিচ্ছবি। লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার রসুলগঞ্জ গ্রামে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও, পারিবারিক দিক থেকে তারা কখনো আর্থিক সচ্ছলতা উপভোগ করতে পারেনি। তার পিতা আব্দুল মান্নান একজন স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের মানুষের সেবা করে এসেছেন। তবে বয়সের ভারে এখন তিনি অনেকটাই কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৬০ বছর এবং বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ায় তিনি নিয়মিতভাবে কাজ করতে পারেন না। মেহেদীর মা শামসুন্নাহার একজন নিরলস গৃহিণী। সংসারের প্রতিটি সদস্যের দেখভাল, ঘরের কাজ, অসুস্থ স্বামীর যত্ন সব কিছুই এক হাতে সামলাতে হয় তাকে। বয়সের ভারে তিনিও এখন ৫৫ বছর বয়সী একজন পরিশ্রান্ত নারী, যিনি কখনো নিজে আরাম পাননি, বরং পরিবারটাই ছিল তার জীবনের মূল দায়িত্ব। মেহেদী তাদের একাধিক সন্তানের একজন হলেও, বাস্তবে পরিবারের অনেকখানি দায়িত্বই এখন তার কাঁধে এসে পড়েছে। তরুণ বয়সেই তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন শুধুমাত্র পরিবারের চাকা সচল রাখতে। গাজীপুর জেলার সাফিপুর এলাকার একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক হিসেবে তার মাসিক আয় মাত্র ১৫,০০০ টাকা, যা বর্তমান বাজারদরে এককথায় অপ্রতুল। এই সামান্য আয় দিয়েই তাঁকে পরিবার চালাতে হয়, বাবা-মার ও নিজের চিকিৎসার খরচ সামলাতে হয়, এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হয়।
এত সীমিত আয়ের মধ্যে দিয়ে সংসারের সব চাহিদা পূরণ করা এক কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে তার জন্য। তার ওপর যদি কোনো অসুস্থতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তখন এই আর্থিক ভার অমানবিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মেহেদীর জীবনের এই পর্বটি কেবল তার একক সংগ্রামের নয়, বরং হাজারো মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনের এক নিঃশব্দ চিত্র। মেহেদী হাসানের জীবন তাই কেবল একটি ব্যক্তি জীবনের গল্প নয় এটি বাংলাদেশের অসংখ্য পরিশ্রমী, সংগ্রামী তরুণের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অন্ধকার দিন বিশেষ করে সেই তরুণদের জন্য, যারা দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ন্যায়বিচার ও সমঅধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ছিলেন সেই সাহসী তরুণদের একজন, যিনি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কঠিন পরিশ্রমের দিনশেষেও নিজের ক্লান্ত শরীর নিয়ে ছুটে যান গাজীপুরের আন্দোলনস্থলে। গেট নাম্বার ৩-এর সামনে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেন, যেন তার উপস্থিতি দিয়েই প্রতিবাদের ভাষা জাগ্রত করেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি আনসার সদস্যরাও অতর্কিতভাবে গুলি চালায়। কোনো ধরনের সতর্কবার্তা বা পূর্বসংকেত ছাড়াই এই নির্মম হামলা শুরু হয়। মুহূর্তেই চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ দিগ্বিদিক ছুটে পালাতে থাকে।
এই বর্বরোচিত গুলিবর্ষণের শিকার হন মোঃ মেহেদী হাসান। তার শরীরে বিদ্ধ হয় অন্তত ১৫টি শটগানের গুলি। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, গুলির টুকরো তার দুটি চোখে প্রবেশ করে, যা তার দৃষ্টিশক্তিকে চরম হুমকির মুখে ফেলে। ঘটনাস্থলেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, রক্তে ভেসে যায় তার শরীর, কাপড়ে ছড়িয়ে পড়ে তাজা রক্তের দাগ। এই ঘটনাটি তার জীবনকে এক মুহূর্তেই সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দেয়। তিনি শুধু শারীরিকভাবেই গুরুতর আহত হননি, বরং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। একজন স্বপ্ন দেখা, কর্মঠ তরুণ হঠাৎ করেই চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল একজন মানুষে পরিণত হন। চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কা এবং শরীরজুড়ে গুলির ক্ষত তাকে আজীবনের এক সংগ্রামে নিক্ষেপ করে। মেহেদীর এই করুণ অভিজ্ঞতা শুধু একটি ব্যক্তির কাহিনি নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের নির্মম প্রমাণ, যা এক প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার নিষ্ঠুর চেষ্টা। এমন ঘটনা আমাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেয় ন্যায়ের পথে দাঁড়ানো কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তবু কতটা প্রয়োজনীয়।
চকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গাজীপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যান। শরীরজুড়ে ১৫টি শটগানের গুলির আঘাত এবং চোখে গুলির টুকরো প্রবেশ করায় তাঁর অবস্থার অবনতি হতে থাকে মুহূর্তে। আহত হওয়ার পর স্থানীয় কিছু সহানুভূতিশীল মানুষ দ্রুত তাকে গাজীপুরের তাহমিনা ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানকার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। জাতীয় চক্ষু হাসপাতালে শুরু হয় তার বেঁচে থাকার জন্য প্রথম ধাপের লড়াই। চিকিৎসকরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, চোখে জমাট বাঁধা রক্ত অপসারণ করতে হবে। সেই অনুযায়ী প্রথম দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে, ৮ আগস্ট তার একটি চোখ থেকে গুলির একটি বড় টুকরো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। যদিও এতে সাময়িকভাবে রক্তক্ষরণ কমে, তবে চোখের ভেতরে থাকা অন্যান্য গুলির টুকরো তখনো থেকে যায়, যা ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকদের পরামর্শে, উন্নততর চিকিৎসার লক্ষ্যে ২৬ আগস্ট তাকে স্থানান্তর করা হয় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে । সেখানে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের একটি অভিজ্ঞ টিম মেহেদীর অবস্থা মূল্যায়ন করেন। তারা জানান, চোখের ভেতরে থাকা বাকি গুলির টুকরোগুলো অপসারণের ঝুঁকি এতটাই বেশি যে তা করলে সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সেই টুকরোগুলোকে নাড়াচাড়া না করাই নিরাপদ বিবেচিত হয়। বর্তমানে মেহেদী হাসান চরম ঝুঁকিপূর্ণ শারীরিক অবস্থায় রয়েছেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত, ভবিষ্যতে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত। তিনি এখনো নিয়মিতভাবে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও সিএমএইচ-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসা ব্যয় প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে, অথচ তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য দিন দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রস্তাবনা ১. তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। ২. একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। পরিশেষে, এই ঘটনাটি শুধু একজন মেহেদী হাসানের ওপর নয়, বরং আমাদের সমাজের সেই তরুণদের প্রতিচ্ছবি, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিচ্ছেন। তাঁর সুস্থতা ও পুনর্বাসনের জন্য সকলের সহানুভূতি ও সহায়তা প্রয়োজন।
এক নজরে মেহেদী হাসান
নাম : মেহেদী হাসান
পিতা : আব্দুল মান্নান,বৃদ্ধ
মাতা : শামসুন্নাহার, বৃদ্ধ
ভাই : মো: শামিম
ভাই : মো: মাহির
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
বর্তমান ঠিকানা : ৩ নং গেট, গাজীপুর
স্থায়ী ঠিকানা : রসুলগঞ্জ, পাটগ্রাম, লালমনিরহাট
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : ৩ নং গেট, গাজীপুর
মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ক্রমিক: ১০৬ আইডি: ঢাকা সিটি ১০৬
জন্ম পরিচয় মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ২০০০ সালের ১৩ অক্টোবর লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার রসুলগঞ্জ নামক এক শান্তিপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে গ্রামীণ প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরশে, যেখানে নদী, মাঠ আর কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর তাকে একদিকে যেমন প্রকৃতির সন্তান করে গড়ে তুলেছে, অন্যদিকে তেমনি জীবনের গভীরতর বাস্তবতাও ছুঁয়ে গেছে তার মননে। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি সমাজের নানা বৈষম্য, অবিচার ও অনিয়ম নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন একাধারে স্পষ্টভাষী, সাহসী এবং ন্যায়পরায়ণ চিন্তাধারার একজন তরুণ। প্রতিবাদ করার সাহস, নেতৃত্বের গুণাবলি ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানই বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
পরিবারের আর্থিক বাস্তবতার কারণে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে না গেলেও থেমে থাকেননি তিনি। জীবিকার প্রয়োজনে গাজীপুর জেলার সাফিপুর এলাকার একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। কঠোর পরিশ্রম, দায়িত্বশীলতা এবং সততার মাধ্যমে তিনি কর্মক্ষেত্রেও নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন। কর্মজীবনে প্রবেশের পরও সমাজ ও রাষ্ট্রের বিষয়ে তাঁর সচেতনতা হ্রাস পায়নি; বরং সময়ের প্রেক্ষাপটে তিনি আরো সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং নিপীড়িতের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সাহসিকতা তিনি সবসময় দেখিয়েছেন। সাধারণ কর্মজীবী হলেও মেহেদী হাসান ছিলেন সেইসব নির্ভীক তরুণদের একজন, যারা বিশ্বাস করেন পরিবর্তন আসে প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে, সাহসিকতার মাধ্যমে। তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে কোনো প্রান্ত থেকে উঠে আসা একজন তরুণও হতে পারে সামাজিক জাগরণের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজকের বাংলাদেশে এমন সাহসী, নীতিবান ও সচেতন তরুণদের প্রয়োজন যারা নিজেদের জীবিকার সাথে সাথে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নও লালন করেন। মোহাম্মদ মেহেদী হাসান সেই বিরল উদাহরণগুলোর অন্যতম। পারিবারিক প্রেক্ষাপট মোহাম্মদ মেহেদী হাসানের পরিবারটি বাংলাদেশের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিচ্ছবি। লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার রসুলগঞ্জ গ্রামে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও, পারিবারিক দিক থেকে তারা কখনো আর্থিক সচ্ছলতা উপভোগ করতে পারেনি। তার পিতা আব্দুল মান্নান একজন স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের মানুষের সেবা করে এসেছেন। তবে বয়সের ভারে এখন তিনি অনেকটাই কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৬০ বছর এবং বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ায় তিনি নিয়মিতভাবে কাজ করতে পারেন না। মেহেদীর মা শামসুন্নাহার একজন নিরলস গৃহিণী। সংসারের প্রতিটি সদস্যের দেখভাল, ঘরের কাজ, অসুস্থ স্বামীর যত্ন সব কিছুই এক হাতে সামলাতে হয় তাকে। বয়সের ভারে তিনিও এখন ৫৫ বছর বয়সী একজন পরিশ্রান্ত নারী, যিনি কখনো নিজে আরাম পাননি, বরং পরিবারটাই ছিল তার জীবনের মূল দায়িত্ব। মেহেদী তাদের একাধিক সন্তানের একজন হলেও, বাস্তবে পরিবারের অনেকখানি দায়িত্বই এখন তার কাঁধে এসে পড়েছে। তরুণ বয়সেই তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন শুধুমাত্র পরিবারের চাকা সচল রাখতে। গাজীপুর জেলার সাফিপুর এলাকার একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক হিসেবে তার মাসিক আয় মাত্র ১৫,০০০ টাকা, যা বর্তমান বাজারদরে এককথায় অপ্রতুল। এই সামান্য আয় দিয়েই তাঁকে পরিবার চালাতে হয়, বাবা-মার ও নিজের চিকিৎসার খরচ সামলাতে হয়, এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হয়।
এত সীমিত আয়ের মধ্যে দিয়ে সংসারের সব চাহিদা পূরণ করা এক কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে তার জন্য। তার ওপর যদি কোনো অসুস্থতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তখন এই আর্থিক ভার অমানবিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মেহেদীর জীবনের এই পর্বটি কেবল তার একক সংগ্রামের নয়, বরং হাজারো মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনের এক নিঃশব্দ চিত্র। মেহেদী হাসানের জীবন তাই কেবল একটি ব্যক্তি জীবনের গল্প নয় এটি বাংলাদেশের অসংখ্য পরিশ্রমী, সংগ্রামী তরুণের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অন্ধকার দিন বিশেষ করে সেই তরুণদের জন্য, যারা দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ন্যায়বিচার ও সমঅধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ছিলেন সেই সাহসী তরুণদের একজন, যিনি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কঠিন পরিশ্রমের দিনশেষেও নিজের ক্লান্ত শরীর নিয়ে ছুটে যান গাজীপুরের আন্দোলনস্থলে। গেট নাম্বার ৩-এর সামনে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেন, যেন তার উপস্থিতি দিয়েই প্রতিবাদের ভাষা জাগ্রত করেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি আনসার সদস্যরাও অতর্কিতভাবে গুলি চালায়। কোনো ধরনের সতর্কবার্তা বা পূর্বসংকেত ছাড়াই এই নির্মম হামলা শুরু হয়। মুহূর্তেই চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ দিগ্বিদিক ছুটে পালাতে থাকে।
এই বর্বরোচিত গুলিবর্ষণের শিকার হন মোঃ মেহেদী হাসান। তার শরীরে বিদ্ধ হয় অন্তত ১৫টি শটগানের গুলি। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, গুলির টুকরো তার দুটি চোখে প্রবেশ করে, যা তার দৃষ্টিশক্তিকে চরম হুমকির মুখে ফেলে। ঘটনাস্থলেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, রক্তে ভেসে যায় তার শরীর, কাপড়ে ছড়িয়ে পড়ে তাজা রক্তের দাগ। এই ঘটনাটি তার জীবনকে এক মুহূর্তেই সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দেয়। তিনি শুধু শারীরিকভাবেই গুরুতর আহত হননি, বরং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। একজন স্বপ্ন দেখা, কর্মঠ তরুণ হঠাৎ করেই চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল একজন মানুষে পরিণত হন। চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কা এবং শরীরজুড়ে গুলির ক্ষত তাকে আজীবনের এক সংগ্রামে নিক্ষেপ করে। মেহেদীর এই করুণ অভিজ্ঞতা শুধু একটি ব্যক্তির কাহিনি নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের নির্মম প্রমাণ, যা এক প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার নিষ্ঠুর চেষ্টা। এমন ঘটনা আমাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেয় ন্যায়ের পথে দাঁড়ানো কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তবু কতটা প্রয়োজনীয়।
চকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গাজীপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যান। শরীরজুড়ে ১৫টি শটগানের গুলির আঘাত এবং চোখে গুলির টুকরো প্রবেশ করায় তাঁর অবস্থার অবনতি হতে থাকে মুহূর্তে। আহত হওয়ার পর স্থানীয় কিছু সহানুভূতিশীল মানুষ দ্রুত তাকে গাজীপুরের তাহমিনা ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানকার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। জাতীয় চক্ষু হাসপাতালে শুরু হয় তার বেঁচে থাকার জন্য প্রথম ধাপের লড়াই। চিকিৎসকরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, চোখে জমাট বাঁধা রক্ত অপসারণ করতে হবে। সেই অনুযায়ী প্রথম দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে, ৮ আগস্ট তার একটি চোখ থেকে গুলির একটি বড় টুকরো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। যদিও এতে সাময়িকভাবে রক্তক্ষরণ কমে, তবে চোখের ভেতরে থাকা অন্যান্য গুলির টুকরো তখনো থেকে যায়, যা ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকদের পরামর্শে, উন্নততর চিকিৎসার লক্ষ্যে ২৬ আগস্ট তাকে স্থানান্তর করা হয় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে । সেখানে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের একটি অভিজ্ঞ টিম মেহেদীর অবস্থা মূল্যায়ন করেন। তারা জানান, চোখের ভেতরে থাকা বাকি গুলির টুকরোগুলো অপসারণের ঝুঁকি এতটাই বেশি যে তা করলে সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সেই টুকরোগুলোকে নাড়াচাড়া না করাই নিরাপদ বিবেচিত হয়। বর্তমানে মেহেদী হাসান চরম ঝুঁকিপূর্ণ শারীরিক অবস্থায় রয়েছেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত, ভবিষ্যতে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত। তিনি এখনো নিয়মিতভাবে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও সিএমএইচ-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসা ব্যয় প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে, অথচ তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য দিন দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রস্তাবনা ১. তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। ২. একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। পরিশেষে, এই ঘটনাটি শুধু একজন মেহেদী হাসানের ওপর নয়, বরং আমাদের সমাজের সেই তরুণদের প্রতিচ্ছবি, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিচ্ছেন। তাঁর সুস্থতা ও পুনর্বাসনের জন্য সকলের সহানুভূতি ও সহায়তা প্রয়োজন।
এক নজরে মেহেদী হাসান
নাম : মেহেদী হাসান
পিতা : আব্দুল মান্নান,বৃদ্ধ
মাতা : শামসুন্নাহার, বৃদ্ধ
ভাই : মো: শামিম
ভাই : মো: মাহির
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
বর্তমান ঠিকানা : ৩ নং গেট, গাজীপুর
স্থায়ী ঠিকানা : রসুলগঞ্জ, পাটগ্রাম, লালমনিরহাট
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : ৩ নং গেট, গাজীপুর
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍