মো: সোহেল ইসলাম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
স্থায়ী ঠিকানা : হাজীপাড়া, বীরগঞ্জ, দিনাজপুর
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম পরিচয়
মো: সোহেল ইসলাম একজন সংগ্রামী ও অধ্যবসায়ী তরুণ। যিনি ১৯৯৮ সালের ১৭ মে জন্মগ্রহণ করেন দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার হঠাৎ পাড়া গ্রামে। শৈশব থেকেই পরিশ্রমী ও লক্ষ্যে অটুট এই তরুণ তার শিক্ষা জীবনের সূচনা করেন নিজ এলাকার সুজালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পার হয়ে তিনি ভর্তি হন বীরগঞ্জ হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও পরে ফাজিল মাদ্রাসায়, যেখানে তার ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে। তবে সপ্তম শ্রেণির পর পরিবর্তনের ধারায় তিনি স্থানান্তরিত হন জগদল উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখান থেকেই তিনি ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
এরপরে সোহেল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ভর্তি হন সৈয়দপুর সরকারি কলেজে এবং পাশাপাশি পূর্ব মল্লিকপুর এইচএস কলেজে অধ্যয়ন করেন। ২০১৭ সালে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, যা তার শিক্ষাজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বর্তমানে মো: সোহেল ইসলাম তেজগাঁও কলেজের ২০১৭-১৮ সেশনের একজন ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একটি চাকরিতেও নিয়োজিত ছিলেন, যা থেকে তার আত্মনির্ভরশীলতা ও পরিশ্রমের মানসিকতা স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়। জীবনের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি নিজের পথ গড়ে নিয়েছেন আত্মবিশ্বাস ও সংকল্পের মাধ্যমে। একজন সাধারণ গ্রামীণ পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি আজ উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন তার নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে। মো: সোহেল ইসলামের জীবন কাহিনী আমাদের শেখায়, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা থাকলে কোনো বাধাই জীবনের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারে না। পারিবারিক প্রেক্ষাপট মো: সোহেল ইসলামের পারিবারিক জীবন এক সাধারণ গ্রামীণ চিত্রের প্রতিফলন, যেখানে স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ একত্রে মিশে আছে। তার পিতা মো: আব্দুল মালেক, একজন বয়স্ক মানুষ যিনি বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। বয়স ষাট বছরের ঊর্ধ্বে হওয়ায় তার পক্ষে আর কোনো শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করা সম্ভব নয়। তার মাতা, মোছা: মেঘ নাহার, একজন রাঁধুনী হিসেবে কাজ করতেন এবং এখনো ঘরোয়া জীবনে পরিশ্রম করে যান। বয়স প্রায় ছাপ্পান্ন হলেও পরিবারে তার ভূমিকা এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোহেল ইসলামের স্ত্রী সাথী কাজী একজন শিক্ষিত নারী, যিনি এইচএসসি পাশ করেছেন। বর্তমানে তিনি একজন গৃহিণী হিসেবে পরিবারের দেখভাল করছেন। সোহেল ইসলামের পরিবারে মোট সদস্য সংখ্যা ছয়জন পিতা-মাতা, দুই ভাই, এক বোন এবং স্ত্রী। ভাই-বোনেরা সবাই বিবাহিত এবং নিজ নিজ সংসারে ব্যস্ত থাকলেও পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ সবার মাঝেই বিদ্যমান। তারা দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ থানার অন্তর্গত ৫নং সুজালপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মূড়িয়ালা হাজীপাড়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। পরিবারটির বসতঘরটি পাকা এবং তাদের নিজস্ব ১৬০ শতক কৃষিজমি রয়েছে। কিন্তু এ জমি থেকে বছরে মাত্র এক লক্ষ টাকার মতো আয় হয়, যা একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সম্পূর্ণ অপ্রতুল। অতীতে মো: সোহেল ইসলাম নিজের পরিশ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে একাই বছরে প্রায় ছয় লক্ষাধিক টাকা উপার্জন করতেন। তার এ আয়েই পরিবারে সচ্ছলতা এসেছিল। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এই দুর্ঘটনার পর পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম সংকটে পড়েছে। তার উপার্জন না থাকায় পরিবার এখন কৃষিজমির সামান্য আয়ে কোনোরকমে দিন যাপন করছে। এই বাস্তবতা আজ তাদের জন্য এক কঠিন সময়ের নামান্তর, যেখানে ভবিষ্যতের পথ শুধ সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন যথাযথ সহায়তা ও পুনর্বাসন। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, একটি শান্তিপূর্ণ বিকেল হঠাৎই রূপ নেয় বিভীষিকাময় এক দুঃস্বপ্নে। রাজধানীর রামপুরা বাড্ডা এলাকায় আয়োজিত এক অহিংস বৈষম্যবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নিতে যান মো: সোহেল ইসলাম। কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম অধিকারের দাবি জানানো যেখানে কোনো রাজনৈতিক উস্কানি বা সহিংসতা ছিল না। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ ছাত্র, যুবক ও নাগরিকরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কথা প্রকাশ করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পুলিশ বাহিনী ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র সদস্যরা যৌথভাবে ওই কর্মসূচির ওপর নির্মমভাবে হামলা চালায়। বিনা উসকানিতে চালানো গুলির এলোপাথাড়ি বর্ষণে মুহূর্তেই সৃষ্টি হয় আতঙ্ক ও রক্তাক্ত পরিস্থিতি। ঠিক তখনই একটি গুলি সোজা গিয়ে বিদ্ধ হয় মো: সোহেল ইসলামের পেটে। গুলিটি তার পিঠ দিয়ে ঢুকে পেট ভেদ করে বেরিয়ে যায়, যার ফলে তার শরীরে ঘটে মারাত্মক অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জখম। আঘাতটি ছিল এতটাই গভীর যে, তাৎক্ষণিকভাবে সোহেলের শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়া এই তরুণ তখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, কিন্তু আশপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া ত্রাস ও ভয়াবহতা কারো সাহায্যের হাত বাড়াতে দেয়নি। তার এই দুর্ঘটনা শুধু একজন যুবকের স্বপ্ন ভঙ্গ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দমননীতির এক ভয়ংকর চিত্র! একজন নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় নাগরিক, যিনি কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে দাঁড়িয়েছিলেন, তাকেই গুলি করে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঠেলে দেয়া এটি এক চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। মো: সোহেল ইসলামের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অহিংস প্রতিবাদ করাটাও আজ অনেকের জন্য জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বর্বরতার দৃষ্টান্ত আমাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে, কিন্তু ইতিহাস কখনো নীরব থাকে না। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়া মো: সোহেল ইসলামকে স্থানীয় সাধারণ মানুষ তৎক্ষণাৎ উদ্ধার করে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তার অবস্থা গুরুতর বিবেচনায় নিয়ে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন, কারণ গুলিটি পেট ভেদ করে শরীরের অভ্যন্তরে মারাত্মক ক্ষতি করেছিল। প্রথম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার প্রাণরক্ষা সম্ভব হলেও শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে যে ক্ষতি হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক। প্রথম অপারেশনের পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। প্রায় আড়াই মাস পর আবারও তাকে একটি জটিল ও বড় অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা ছিল তার জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক। এই দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও হাসপাতালের উচ্চমার্গের সেবা যার খরচ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
এই চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে মো: সোহেল ইসলামের সমস্ত ব্যক্তিগত সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, আহত হওয়ার পর তিনি তার পূর্বের কর্মজীবনে আর ফিরে যেতে পারেননি। শরীরের দুর্বলতা ও অপারেশনের পরবর্তী জটিলতা তার দৈহিক সক্ষমতা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কর্মহীন অবস্থায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। একজন পরিশ্রমী ও আত্মনির্ভরশীল তরুণ, যিনি আগে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন, আজ শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন। বর্তমানে মো: সোহেল ইসলাম তুলনামূলকভাবে শারীরিকভাবে সুস্থ। তবে আগের মতো কর্মক্ষম নন। চিকিৎসার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তার আয়ের প্রধান উৎস একসময় ছিল চাকরি ও ব্যবসা যা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলস্বরূপ, পুরো পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে আবার কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে তার জন্য এমন একটি কাজ বা উদ্যোগের প্রয়োজন, যা কম পরিশ্রমে আয় নিশ্চিত করতে পারে এবং তার স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায়। প্রস্তাবনা ১. তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য একটি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা। যেমন, ছোট ব্যবসা বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তহবিল ২. চিকিৎসার খরচ বহন করা। মো: সোহেল ইসলামের শারীরিক পুনর্বাসনের পাশাপাশি তার ভাইয়ের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে তা তার পরিবারের জন্য হবে একটি টেকসই সমাধান। এই পরিবারটি বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছে এবং একটি স্থায়ী, দায়িত্বশীল চাকরি, কিংবা নগদ অর্থ ও চিকিৎসা সহায়তা তাদের দুঃখের জীবনকে কিছুটা হলেও আলোকিত করতে পারে।
এক নজরে মো: সোহেল ইসলাম
নাম : মো: সোহেল ইসলাম
পিতা : আব্দুল মালেক, বৃদ্ধ
মাতা : মেঘ নাহার, বৃদ্ধ
স্ত্রী : সাথী কাজী
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
স্থায়ী ঠিকানা : হাজীপাড়া, বীরগঞ্জ, দিনাজপুর
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ বাহিনী
আহত হওয়ার স্থান : রামপুরা, বাড্ডা, ঢাকা
মো: সোহেল ইসলাম একজন সংগ্রামী ও অধ্যবসায়ী তরুণ। যিনি ১৯৯৮ সালের ১৭ মে জন্মগ্রহণ করেন দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার হঠাৎ পাড়া গ্রামে। শৈশব থেকেই পরিশ্রমী ও লক্ষ্যে অটুট এই তরুণ তার শিক্ষা জীবনের সূচনা করেন নিজ এলাকার সুজালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পার হয়ে তিনি ভর্তি হন বীরগঞ্জ হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও পরে ফাজিল মাদ্রাসায়, যেখানে তার ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে। তবে সপ্তম শ্রেণির পর পরিবর্তনের ধারায় তিনি স্থানান্তরিত হন জগদল উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখান থেকেই তিনি ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
এরপরে সোহেল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ভর্তি হন সৈয়দপুর সরকারি কলেজে এবং পাশাপাশি পূর্ব মল্লিকপুর এইচএস কলেজে অধ্যয়ন করেন। ২০১৭ সালে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, যা তার শিক্ষাজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বর্তমানে মো: সোহেল ইসলাম তেজগাঁও কলেজের ২০১৭-১৮ সেশনের একজন ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একটি চাকরিতেও নিয়োজিত ছিলেন, যা থেকে তার আত্মনির্ভরশীলতা ও পরিশ্রমের মানসিকতা স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়। জীবনের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি নিজের পথ গড়ে নিয়েছেন আত্মবিশ্বাস ও সংকল্পের মাধ্যমে। একজন সাধারণ গ্রামীণ পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি আজ উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন তার নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে। মো: সোহেল ইসলামের জীবন কাহিনী আমাদের শেখায়, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা থাকলে কোনো বাধাই জীবনের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারে না। পারিবারিক প্রেক্ষাপট মো: সোহেল ইসলামের পারিবারিক জীবন এক সাধারণ গ্রামীণ চিত্রের প্রতিফলন, যেখানে স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ একত্রে মিশে আছে। তার পিতা মো: আব্দুল মালেক, একজন বয়স্ক মানুষ যিনি বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। বয়স ষাট বছরের ঊর্ধ্বে হওয়ায় তার পক্ষে আর কোনো শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করা সম্ভব নয়। তার মাতা, মোছা: মেঘ নাহার, একজন রাঁধুনী হিসেবে কাজ করতেন এবং এখনো ঘরোয়া জীবনে পরিশ্রম করে যান। বয়স প্রায় ছাপ্পান্ন হলেও পরিবারে তার ভূমিকা এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোহেল ইসলামের স্ত্রী সাথী কাজী একজন শিক্ষিত নারী, যিনি এইচএসসি পাশ করেছেন। বর্তমানে তিনি একজন গৃহিণী হিসেবে পরিবারের দেখভাল করছেন। সোহেল ইসলামের পরিবারে মোট সদস্য সংখ্যা ছয়জন পিতা-মাতা, দুই ভাই, এক বোন এবং স্ত্রী। ভাই-বোনেরা সবাই বিবাহিত এবং নিজ নিজ সংসারে ব্যস্ত থাকলেও পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ সবার মাঝেই বিদ্যমান। তারা দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ থানার অন্তর্গত ৫নং সুজালপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মূড়িয়ালা হাজীপাড়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। পরিবারটির বসতঘরটি পাকা এবং তাদের নিজস্ব ১৬০ শতক কৃষিজমি রয়েছে। কিন্তু এ জমি থেকে বছরে মাত্র এক লক্ষ টাকার মতো আয় হয়, যা একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সম্পূর্ণ অপ্রতুল। অতীতে মো: সোহেল ইসলাম নিজের পরিশ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে একাই বছরে প্রায় ছয় লক্ষাধিক টাকা উপার্জন করতেন। তার এ আয়েই পরিবারে সচ্ছলতা এসেছিল। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এই দুর্ঘটনার পর পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম সংকটে পড়েছে। তার উপার্জন না থাকায় পরিবার এখন কৃষিজমির সামান্য আয়ে কোনোরকমে দিন যাপন করছে। এই বাস্তবতা আজ তাদের জন্য এক কঠিন সময়ের নামান্তর, যেখানে ভবিষ্যতের পথ শুধ সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন যথাযথ সহায়তা ও পুনর্বাসন। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, একটি শান্তিপূর্ণ বিকেল হঠাৎই রূপ নেয় বিভীষিকাময় এক দুঃস্বপ্নে। রাজধানীর রামপুরা বাড্ডা এলাকায় আয়োজিত এক অহিংস বৈষম্যবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নিতে যান মো: সোহেল ইসলাম। কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম অধিকারের দাবি জানানো যেখানে কোনো রাজনৈতিক উস্কানি বা সহিংসতা ছিল না। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ ছাত্র, যুবক ও নাগরিকরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কথা প্রকাশ করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পুলিশ বাহিনী ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র সদস্যরা যৌথভাবে ওই কর্মসূচির ওপর নির্মমভাবে হামলা চালায়। বিনা উসকানিতে চালানো গুলির এলোপাথাড়ি বর্ষণে মুহূর্তেই সৃষ্টি হয় আতঙ্ক ও রক্তাক্ত পরিস্থিতি। ঠিক তখনই একটি গুলি সোজা গিয়ে বিদ্ধ হয় মো: সোহেল ইসলামের পেটে। গুলিটি তার পিঠ দিয়ে ঢুকে পেট ভেদ করে বেরিয়ে যায়, যার ফলে তার শরীরে ঘটে মারাত্মক অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জখম। আঘাতটি ছিল এতটাই গভীর যে, তাৎক্ষণিকভাবে সোহেলের শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়া এই তরুণ তখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, কিন্তু আশপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া ত্রাস ও ভয়াবহতা কারো সাহায্যের হাত বাড়াতে দেয়নি। তার এই দুর্ঘটনা শুধু একজন যুবকের স্বপ্ন ভঙ্গ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দমননীতির এক ভয়ংকর চিত্র! একজন নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় নাগরিক, যিনি কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে দাঁড়িয়েছিলেন, তাকেই গুলি করে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঠেলে দেয়া এটি এক চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। মো: সোহেল ইসলামের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অহিংস প্রতিবাদ করাটাও আজ অনেকের জন্য জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বর্বরতার দৃষ্টান্ত আমাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে, কিন্তু ইতিহাস কখনো নীরব থাকে না। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়া মো: সোহেল ইসলামকে স্থানীয় সাধারণ মানুষ তৎক্ষণাৎ উদ্ধার করে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তার অবস্থা গুরুতর বিবেচনায় নিয়ে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন, কারণ গুলিটি পেট ভেদ করে শরীরের অভ্যন্তরে মারাত্মক ক্ষতি করেছিল। প্রথম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার প্রাণরক্ষা সম্ভব হলেও শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে যে ক্ষতি হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক। প্রথম অপারেশনের পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। প্রায় আড়াই মাস পর আবারও তাকে একটি জটিল ও বড় অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা ছিল তার জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক। এই দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও হাসপাতালের উচ্চমার্গের সেবা যার খরচ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
এই চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে মো: সোহেল ইসলামের সমস্ত ব্যক্তিগত সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, আহত হওয়ার পর তিনি তার পূর্বের কর্মজীবনে আর ফিরে যেতে পারেননি। শরীরের দুর্বলতা ও অপারেশনের পরবর্তী জটিলতা তার দৈহিক সক্ষমতা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কর্মহীন অবস্থায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। একজন পরিশ্রমী ও আত্মনির্ভরশীল তরুণ, যিনি আগে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন, আজ শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন। বর্তমানে মো: সোহেল ইসলাম তুলনামূলকভাবে শারীরিকভাবে সুস্থ। তবে আগের মতো কর্মক্ষম নন। চিকিৎসার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তার আয়ের প্রধান উৎস একসময় ছিল চাকরি ও ব্যবসা যা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলস্বরূপ, পুরো পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে আবার কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে তার জন্য এমন একটি কাজ বা উদ্যোগের প্রয়োজন, যা কম পরিশ্রমে আয় নিশ্চিত করতে পারে এবং তার স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায়। প্রস্তাবনা ১. তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য একটি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা। যেমন, ছোট ব্যবসা বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তহবিল ২. চিকিৎসার খরচ বহন করা। মো: সোহেল ইসলামের শারীরিক পুনর্বাসনের পাশাপাশি তার ভাইয়ের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে তা তার পরিবারের জন্য হবে একটি টেকসই সমাধান। এই পরিবারটি বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছে এবং একটি স্থায়ী, দায়িত্বশীল চাকরি, কিংবা নগদ অর্থ ও চিকিৎসা সহায়তা তাদের দুঃখের জীবনকে কিছুটা হলেও আলোকিত করতে পারে।
এক নজরে মো: সোহেল ইসলাম
নাম : মো: সোহেল ইসলাম
পিতা : আব্দুল মালেক, বৃদ্ধ
মাতা : মেঘ নাহার, বৃদ্ধ
স্ত্রী : সাথী কাজী
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৭ জন
স্থায়ী ঠিকানা : হাজীপাড়া, বীরগঞ্জ, দিনাজপুর
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট, ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ বাহিনী
আহত হওয়ার স্থান : রামপুরা, বাড্ডা, ঢাকা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍