মো: রহিম মিয়া
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : দিন্মজুর (বর্তমানে কর্মহীন)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম পরিচয়
মো: রহিম মিয়া একজন সম্ভাবনাময় কিশোর। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২০০৭ সালের ১০ জুন হবিগঞ্জ জেলার বিরামপুর উপজেলার এক দরিদ্র পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সৎ ও পরিশ্রমী। তার শৈশব কেটেছে বিরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তবে আর্থিক সংকটে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পরিবারের হাল ধরতে শুরু করেন। শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবনে পদার্পণ করেন রহিম মিয়া। তার বাবা একজন দিনমজুর এবং মা গৃহিণী। পরিবারে আর্থিক দীনতা লেগেই থাকত কিন্তু তবুও যেন সুখের কমতি নেই কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর বাস্তবতা তার স্বপ্ন রুদ্ধ করে দেয়। মাধ্যমিক শ্রেণির আগেপরে অর্থাভাবে তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের আয় এতটাই কম যে, লেখাপড়ার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তার চোখের সামনে একে একে সব স্বপ্ন ঝরে পড়তে থাকলেও তিনি হার মানেননি। বর্তমানে রহিম বেকার অবস্থায় আছেন। তবে বেকারত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক সাহসী, দায়িত্বশীল কিশোরের নিরন্তর সংগ্রাম। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবে তিনিই পরিবারের সব আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ালেও তিনি মনের ভেতর আজও একটাই বিশ্বাস লালন করেন, একদিন তিনি আবার পড়ালেখা শুরু করবেন, পরিবারের পাশে শক্তভাবে দাঁড়াবেন এবং সমাজে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। রহিমের এই জীবনগাথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে পারে যদি আমরা সেই প্রতিভার পাশে দাঁড়াতে পারি। পারিবারিক প্রেক্ষাপট রহিমের পরিবারে সদস্য মাত্র তিনজন। তিনি নিজে, তার বাবা এবং মা। তার পিতা মো: সেলিম মিয়া বয়স ৪০ বছরের বেশি, পেশায় একজন কৃষিজীবী দিনমজুর। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেটে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে পরিবারের নিত্য প্রয়োজন। কোনো নির্দিষ্ট জমি না থাকায় ভাড়ায় কিংবা অন্যের জমিতে কাজ করে আয় করতে হয়। তাদের পারিবারিক জমির পরিমাণ মাত্র ৫ শতক, যা বসতঘর ও আংশিকভাবে সবজি চাষে ব্যবহৃত হয়। রহিমের মা মোছা: রিনা বেগম, বয়স প্রায় ৩৬ বছর, পেশায় একজন রাঁধুনী। আশপাশের বাড়িতে রান্নার কাজ করে সংসারে কিছুটা সহায়তা করেন, তবে তা অনিয়মিত এবং খুব সীমিত আয়ের উৎস। তাদের মাসিক গড় আয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা, যা সেলিম মিয়ার দিনমজুরি থেকেই প্রধানত আসে। এই সামান্য আয়ের মধ্যেই চলে খাবার, চিকিৎসা, পোশাক, সন্তান পালনের খরচসহ সব প্রয়োজনীয় ব্যয়। তারা তিনজন বসবাস করেন একটি ছোট টিনের ঘরে। ঘরটি বছরের বেশিরভাগ সময়েই রোদে গরম এবং বৃষ্টিতে ভিজে পড়ে। বৈদ্যুতিক সংযোগ থাকলেও বিদ্যুৎ আসে অনিয়মিতভাবে, আর পানির জন্য ব্যবহার করেন নলকূপ। এই কষ্টের মধ্যেও রহিম চেষ্টা করছিল পড়ালেখা চালিয়ে যেতে। কিন্তু অভাবের তাড়নায় তার শিক্ষাজীবন থেমে গেছে। তবুও সে আশাহত নয়। পরিবারের একমাত্র সন্তান হিসেবে তিনি দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়েই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে চান। রহিমের এই বাস্তবতা একদিকে যেমন কষ্টের, অন্যদিকে তেমনই এক সংগ্রামী মনোভাবের প্রতীক, যা সাহায্য ও সহানুভূতির স্পর্শ পেলে বদলে যেতে পারে একটি পরিবারের পুরো জীবনচিত্র। ঘটনার বিবরণ সেদিন ছিল এক প্রতিবাদের বিকেল। চারপাশে জমেছিল ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিল। একটি ন্যায্য দাবির পক্ষে দাঁড়ানোর ডাক। সেখানে কোনো সন্ত্রাস ছিল না, ছিল না কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড। ছিল কেবল নিরস্ত্র মানুষের কণ্ঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত প্রতিবাদের ভাষা। রহিম মিয়াও সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলে উপস্থিত ছিলেন। একজন কিশোর হিসেবে তার মনে ছিল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ করেই সে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ বাহিনী। শুরু হয় লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ সরাসরি গুলি চালানো। গুলির আওয়াজে চারদিক থমকে যায়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে। এই সহিংস অভিযানের মাঝেই রহিম গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশের ছোড়া গুলি গিয়ে লাগে তার মাথা, হাত এবং পায়ে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারদিকে ছুটোছুটি, চিৎকার তার মাঝেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন রহিম। একজন কিশোর, যার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, কেবল ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক সাহসী মন। এটি ছিল এক নির্মম ও অমানবিক আক্রমণ একটি নিষ্পাপ, নিরস্ত্র কিশোরের ওপর বর্বর রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের প্রতিফলন। যিনি কোনো রাজনৈতিক নেতার প্ররোচনায় নয়, বরং নিজের বিবেক ও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে রাস্তায় নেমেছিলেন। সেই প্রতিবাদই যেন হয়ে উঠল তার অপরাধ। রহিমের আহত দেহ কাঁপিয়ে দেয় শুধু তার পরিবারকেই নয়, বরং প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়। তার শরীরের রক্ত আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার অমানবিকতাকে প্রকাশ করে দেয়। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি ন্যায়সঙ্গত দাবির মিছিলে অংশ নেয়া অপরাধ নয়। বরং সেই কণ্ঠরোধ করতে যারা নির্দয় হামলা চালায়, তাদের বিচার হওয়াই জরুরি। রহিম এখন শুধু একজন আহত কিশোর নয়, তিনি হয়ে উঠেছেন অন্যায়ের বরুদ্ধে দাঁড়ানো এক প্রতীক, একটি সাহসী প্রজন্মের প্রতিনিধি। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর স্থানীয় মানুষের সহায়তায় মো: রহিম মিয়াকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁর মাথা, হাত ও পায়ের জখম দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে গুলির গভীরতা ও শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা আর দেরি না করে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠিয়ে দেন জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)-এ। পঙ্গু হাসপাতালে রহিমকে প্রায় এক মাস ভর্তি রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। সেখানে তাঁর হাত ও পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। পাশাপাশি শুরু হয় ক্ষতস্থানে নিয়মিত ড্রেসিং ও ফিজিওথেরাপি। শরীরজুড়ে ব্যথা, পুঁজ ও সংক্রমণের পাশাপাশি চলাফেরার সীমাবদ্ধতা তাঁকে দিন দিন দুর্বল করে তুলছিল। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন তাঁকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার। এই দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মাঝেই রহিমের পরিবার পড়ে যায় এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে। বাবা মো: সেলিম মিয়া একজন দিনমজুর, মা মোছা: রিনা বেগম গৃহস্থালির কাজ করে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়ে চলে না এমন চিকিৎসা ব্যয়। ওষুধ, অপারেশন, যাতায়াত, খাবার ও থাকার খরচ মিলে প্রতি সপ্তাহে কয়েক হাজার টাকা প্রয়োজন হচ্ছিল। তবুও পরিবার হাল ছাড়েনি। ধারদেনা, আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য, এমনকি নিজের ব্যবহৃত সামগ্রী বিক্রি করেও তারা ছেলের জীবন বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এই কঠিন সময়েও বাবা-মা তাদের সন্তানকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ফেলেননি। রহিমের চিকিৎসা ছিল শুধু শারীরিক পুনর্বাসন নয়, বরং এক পরিবারের নিরবিচার ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে রহিম মিয়া তুলনামূলকভাবে শারীরিকভাবে সুস্থ। তবে এখনও তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না হাত ও পায়ের আঘাত তার দৈনন্দিন জীবনে সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে পূর্ণ সুস্থতার জন্য ফিজিওথেরাপি ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। প্রস্তাবনা ১. রহিম মিয়ার চিকিৎসার খরচ বহন করা। ২. মাসিক বা এককালীন সহযোগিতা করা। ৩. পরিবারটির টিকে থাকার জন্য তার বাবার একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
এক নজরে মো: রহিম মিয়া
নাম : মো: রহিম মিয়া
জন্ম তারিখ : ১০ জুন ২০০৭
পেশা : দিন্মজুর (বর্তমানে কর্মহীন)
স্থানী ঠিকানা : বিরামপুর সদর, হবিগঞ্জ
পিতা : মো: সেলিম মিয়া
মাতা : মোছা: রিনা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৪২
মাতা : বয়স: ৩৭, গৃহিণী
পরিবারের সদস্য : ৩ জন
বাড়ি ও সম্পদ : টিনের ঘরম ৫ কড়া
পরিবারের মাসিক আয় : ১৫ হাজার
আয়ের উৎস : পিতা
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪.০০টা আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : জহিরা জামে মসজিদ সংলগ্ন, ফেনী
মো: রহিম মিয়া একজন সম্ভাবনাময় কিশোর। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২০০৭ সালের ১০ জুন হবিগঞ্জ জেলার বিরামপুর উপজেলার এক দরিদ্র পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সৎ ও পরিশ্রমী। তার শৈশব কেটেছে বিরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তবে আর্থিক সংকটে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পরিবারের হাল ধরতে শুরু করেন। শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবনে পদার্পণ করেন রহিম মিয়া। তার বাবা একজন দিনমজুর এবং মা গৃহিণী। পরিবারে আর্থিক দীনতা লেগেই থাকত কিন্তু তবুও যেন সুখের কমতি নেই কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর বাস্তবতা তার স্বপ্ন রুদ্ধ করে দেয়। মাধ্যমিক শ্রেণির আগেপরে অর্থাভাবে তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের আয় এতটাই কম যে, লেখাপড়ার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তার চোখের সামনে একে একে সব স্বপ্ন ঝরে পড়তে থাকলেও তিনি হার মানেননি। বর্তমানে রহিম বেকার অবস্থায় আছেন। তবে বেকারত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক সাহসী, দায়িত্বশীল কিশোরের নিরন্তর সংগ্রাম। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবে তিনিই পরিবারের সব আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ালেও তিনি মনের ভেতর আজও একটাই বিশ্বাস লালন করেন, একদিন তিনি আবার পড়ালেখা শুরু করবেন, পরিবারের পাশে শক্তভাবে দাঁড়াবেন এবং সমাজে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। রহিমের এই জীবনগাথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে পারে যদি আমরা সেই প্রতিভার পাশে দাঁড়াতে পারি। পারিবারিক প্রেক্ষাপট রহিমের পরিবারে সদস্য মাত্র তিনজন। তিনি নিজে, তার বাবা এবং মা। তার পিতা মো: সেলিম মিয়া বয়স ৪০ বছরের বেশি, পেশায় একজন কৃষিজীবী দিনমজুর। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেটে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে পরিবারের নিত্য প্রয়োজন। কোনো নির্দিষ্ট জমি না থাকায় ভাড়ায় কিংবা অন্যের জমিতে কাজ করে আয় করতে হয়। তাদের পারিবারিক জমির পরিমাণ মাত্র ৫ শতক, যা বসতঘর ও আংশিকভাবে সবজি চাষে ব্যবহৃত হয়। রহিমের মা মোছা: রিনা বেগম, বয়স প্রায় ৩৬ বছর, পেশায় একজন রাঁধুনী। আশপাশের বাড়িতে রান্নার কাজ করে সংসারে কিছুটা সহায়তা করেন, তবে তা অনিয়মিত এবং খুব সীমিত আয়ের উৎস। তাদের মাসিক গড় আয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা, যা সেলিম মিয়ার দিনমজুরি থেকেই প্রধানত আসে। এই সামান্য আয়ের মধ্যেই চলে খাবার, চিকিৎসা, পোশাক, সন্তান পালনের খরচসহ সব প্রয়োজনীয় ব্যয়। তারা তিনজন বসবাস করেন একটি ছোট টিনের ঘরে। ঘরটি বছরের বেশিরভাগ সময়েই রোদে গরম এবং বৃষ্টিতে ভিজে পড়ে। বৈদ্যুতিক সংযোগ থাকলেও বিদ্যুৎ আসে অনিয়মিতভাবে, আর পানির জন্য ব্যবহার করেন নলকূপ। এই কষ্টের মধ্যেও রহিম চেষ্টা করছিল পড়ালেখা চালিয়ে যেতে। কিন্তু অভাবের তাড়নায় তার শিক্ষাজীবন থেমে গেছে। তবুও সে আশাহত নয়। পরিবারের একমাত্র সন্তান হিসেবে তিনি দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়েই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে চান। রহিমের এই বাস্তবতা একদিকে যেমন কষ্টের, অন্যদিকে তেমনই এক সংগ্রামী মনোভাবের প্রতীক, যা সাহায্য ও সহানুভূতির স্পর্শ পেলে বদলে যেতে পারে একটি পরিবারের পুরো জীবনচিত্র। ঘটনার বিবরণ সেদিন ছিল এক প্রতিবাদের বিকেল। চারপাশে জমেছিল ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিল। একটি ন্যায্য দাবির পক্ষে দাঁড়ানোর ডাক। সেখানে কোনো সন্ত্রাস ছিল না, ছিল না কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড। ছিল কেবল নিরস্ত্র মানুষের কণ্ঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত প্রতিবাদের ভাষা। রহিম মিয়াও সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলে উপস্থিত ছিলেন। একজন কিশোর হিসেবে তার মনে ছিল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ করেই সে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ বাহিনী। শুরু হয় লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ সরাসরি গুলি চালানো। গুলির আওয়াজে চারদিক থমকে যায়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে। এই সহিংস অভিযানের মাঝেই রহিম গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশের ছোড়া গুলি গিয়ে লাগে তার মাথা, হাত এবং পায়ে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারদিকে ছুটোছুটি, চিৎকার তার মাঝেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন রহিম। একজন কিশোর, যার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, কেবল ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক সাহসী মন। এটি ছিল এক নির্মম ও অমানবিক আক্রমণ একটি নিষ্পাপ, নিরস্ত্র কিশোরের ওপর বর্বর রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের প্রতিফলন। যিনি কোনো রাজনৈতিক নেতার প্ররোচনায় নয়, বরং নিজের বিবেক ও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে রাস্তায় নেমেছিলেন। সেই প্রতিবাদই যেন হয়ে উঠল তার অপরাধ। রহিমের আহত দেহ কাঁপিয়ে দেয় শুধু তার পরিবারকেই নয়, বরং প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়। তার শরীরের রক্ত আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার অমানবিকতাকে প্রকাশ করে দেয়। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি ন্যায়সঙ্গত দাবির মিছিলে অংশ নেয়া অপরাধ নয়। বরং সেই কণ্ঠরোধ করতে যারা নির্দয় হামলা চালায়, তাদের বিচার হওয়াই জরুরি। রহিম এখন শুধু একজন আহত কিশোর নয়, তিনি হয়ে উঠেছেন অন্যায়ের বরুদ্ধে দাঁড়ানো এক প্রতীক, একটি সাহসী প্রজন্মের প্রতিনিধি। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর স্থানীয় মানুষের সহায়তায় মো: রহিম মিয়াকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁর মাথা, হাত ও পায়ের জখম দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে গুলির গভীরতা ও শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা আর দেরি না করে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠিয়ে দেন জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)-এ। পঙ্গু হাসপাতালে রহিমকে প্রায় এক মাস ভর্তি রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। সেখানে তাঁর হাত ও পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। পাশাপাশি শুরু হয় ক্ষতস্থানে নিয়মিত ড্রেসিং ও ফিজিওথেরাপি। শরীরজুড়ে ব্যথা, পুঁজ ও সংক্রমণের পাশাপাশি চলাফেরার সীমাবদ্ধতা তাঁকে দিন দিন দুর্বল করে তুলছিল। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন তাঁকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার। এই দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মাঝেই রহিমের পরিবার পড়ে যায় এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে। বাবা মো: সেলিম মিয়া একজন দিনমজুর, মা মোছা: রিনা বেগম গৃহস্থালির কাজ করে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়ে চলে না এমন চিকিৎসা ব্যয়। ওষুধ, অপারেশন, যাতায়াত, খাবার ও থাকার খরচ মিলে প্রতি সপ্তাহে কয়েক হাজার টাকা প্রয়োজন হচ্ছিল। তবুও পরিবার হাল ছাড়েনি। ধারদেনা, আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য, এমনকি নিজের ব্যবহৃত সামগ্রী বিক্রি করেও তারা ছেলের জীবন বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এই কঠিন সময়েও বাবা-মা তাদের সন্তানকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ফেলেননি। রহিমের চিকিৎসা ছিল শুধু শারীরিক পুনর্বাসন নয়, বরং এক পরিবারের নিরবিচার ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে রহিম মিয়া তুলনামূলকভাবে শারীরিকভাবে সুস্থ। তবে এখনও তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না হাত ও পায়ের আঘাত তার দৈনন্দিন জীবনে সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে পূর্ণ সুস্থতার জন্য ফিজিওথেরাপি ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। প্রস্তাবনা ১. রহিম মিয়ার চিকিৎসার খরচ বহন করা। ২. মাসিক বা এককালীন সহযোগিতা করা। ৩. পরিবারটির টিকে থাকার জন্য তার বাবার একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
এক নজরে মো: রহিম মিয়া
নাম : মো: রহিম মিয়া
জন্ম তারিখ : ১০ জুন ২০০৭
পেশা : দিন্মজুর (বর্তমানে কর্মহীন)
স্থানী ঠিকানা : বিরামপুর সদর, হবিগঞ্জ
পিতা : মো: সেলিম মিয়া
মাতা : মোছা: রিনা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৪২
মাতা : বয়স: ৩৭, গৃহিণী
পরিবারের সদস্য : ৩ জন
বাড়ি ও সম্পদ : টিনের ঘরম ৫ কড়া
পরিবারের মাসিক আয় : ১৫ হাজার
আয়ের উৎস : পিতা
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪.০০টা আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : জহিরা জামে মসজিদ সংলগ্ন, ফেনী
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍