পারভীন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
স্থায়ী ঠিকানা : করপাড়া, রামগঞ্জ, লক্ষীপুর
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম পরিচয়
পারভীন একজন সাধারণ তবে সাহসিকতায় উদ্দীপ্ত সংগ্রামী নারী, ১৯৯৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর যার জন্ম লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার করপাড়া গ্রামে। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এক গভীর অভাব-অনটনের পরিবেশে যেখানে প্রতিটি দিন মানে ছিল বেঁচে থাকার লড়াই। তার বাবা চাঁদ মিয়া ছিলেন একজন রিকশাচালক। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি রিকশা চালিয়ে যা আয় করতেন, তা দিয়েই চলতো পরিবারের খরচ। মা খুকি বেগম ছিলেন একজন গৃহিণী। তিনি সংসারের কাজ সামলানোর পাশাপাশি সন্তানদের মানুষ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। পারভীনের পরিবার ছিল সমাজের সেই প্রান্তিক শ্রেণির অংশ, যাদের জীবনপ্রবাহ চলে ক্ষুধা, পরিশ্রম এবং সীমাহীন ত্যাগের মধ্য দিয়ে।
ছোটবেলা থেকেই পারভীন দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হন। বিদ্যালয়ের প্রতি তার গভীর আগ্রহ থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষাজীবন স্থায়ী হয়নি। খুব অল্প বয়সেই তাকে সংসারের বোঝা কাঁধে নিতে হয়। মায়ের সঙ্গে রান্না, পানি আনা, ঘর পরিষ্কার, এমনকি ক্ষেতখামারে কাজ করতেও তাকে দেখা যেত। কিশোরী বয়সেই পারভীন বিবাহিত জীবনে পা রাখেন। জীবনের শুরু থেকেই সংসারকে টেনে নেয়ার, স্বামীর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন সহানুভূতিশীল, সহনশীল ও পরিশ্রমী নারী, যার জীবনযাত্রা নিছক বেঁচে থাকার গল্প নয় বরং সংগ্রামের মধ্যেও বেঁচে থাকার এক নিদর্শন। পারভীন বেগমের এই জীবনচিত্র শুধু একজন নারীর নয়, বরং হাজারো নিম্নবিত্ত নারীর গল্প, যারা প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার সাহস খুঁজে পান অভাবের ভেতর থেকেও। পারিবারিক প্রেক্ষাপট বর্তমানে পারভীন বেগম তার স্বামী রুবেল হাওলাদারের সঙ্গে বসবাস করছেন। রুবেল একজন অটোরিকশা চালক, যিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে চার সদস্যের সংসার চালানোর চেষ্টা করেন। একসময় স্বামী-স্ত্রী মিলে ঢাকার বিভিন্ন নির্মাণস্থলে রাজমিস্ত্রির সহকারী (রাজ-যোগালি) হিসেবে কাজ করতেন। দিনমজুরির মাধ্যমে তারা সংসার চালিয়ে নিতেন, সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন। তবে একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর তাদের স্বাভাবিক জীবনের গতি থেমে যায় এবং সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ঘটনার সময় তারা ঢাকার যাত্রাবাড়ি থানার অন্তর্গত দনিয়া এলাকায় বসবাস করতেন। তবে তাদের স্থায়ী ঠিকানা এখনো লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার করপাড়া গ্রামে রয়ে গেছে। পারভীন-রুবেল দম্পতির দু’টি সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে মোঃ ইব্রাহিম, যার বয়স ৮ বছর, সে একসময় নাজেরা মাদ্রাসায় পড়ালেখা করলেও বর্তমানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ছোট ছেলে মোঃ ইয়াসিন, বয়স ৪ বছর, এখন প্লে-গ্রুপে ভর্তি রয়েছে। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় তারা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলেছেন। পরিবারটির মাসিক আয় আনুমানিক ১৫,০০০ টাকা, যা রুবেল হাওলাদারের অটোরিকশা চালানোর মাধ্যমে আসে। এই সীমিত আয়ের মধ্য দিয়েই পরিবারের খরচ, বাসা ভাড়া, ছেলেদের পড়ালেখা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু চালাতে হয়, যা প্রতিনিয়তই এক কঠিন লড়াইয়ের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারভীন বেগমের জীবন কাহিনী এক সাধারণ নারীর অসাধারণ সাহস, সংগ্রাম ও বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি যেখানে প্রতিটি দিন টিকে থাকার নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়। তবুও তিনি আশায় বুক বাঁধেন, সন্তানের মুখে হাসি দেখার জন্য সব কিছু সহ্য করেন। ঘটনার বিবরণ দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে প্রতিদিনের মতো কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরছিলেন পারভীন বেগম। ঢাকার যাত্রাবাড়ি থানার সামনে এসে পৌঁছালে হঠাৎ এক ভয়াবহ দৃশ্যের সম্মুখীন হন তিনি। চারপাশে উত্তেজনা, শোরগোল আর মানুষের ছুটাছুটি। তিনি দেখতে পান পুলিশের গুলিতে এক তরুণ ছাত্র রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছে। তার শরীর থেকে রক্ত ঝরছে, ছেলেটি যন্ত্রণায় ছটফট করছে এবং সাহায্যের জন্য আকুলভাবে হাত বাড়িয়ে কান্নাকাটি করছে। পারভীন বেগম একজন মমতাময়ী মা এবং একজন মানবিক হৃদয়ের মানুষ। চারপাশের মানুষ যখন দূরে দাঁড়িয়ে ভয় পাচ্ছিল, তখন তিনি কোনো কিছু না ভেবেই দৌড়ে ছুটে যান ছেলেটিকে সাহায্য করতে। আহত ছেলেটিকে তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন তিনি, ঠিক তখনই ঘটে সেই বিভীষিকাময় ঘটনা। যাত্রাবাড়ি থানার পুলিশ হঠাৎই একটি শর্টগানের গুলি ছোড়ে তার দিকে একজন নিরীহ নারী, যিনি কেবল সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, তাকেও তারা রেহাই দেয়নি। এই গুলির ফলেই পারভীন বেগমের বাম চোখে মারাত্মক আঘাত লাগে। চোখ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে, তিনি চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মুহূর্তেই তার জীবন বদলে যায়। যে চোখ দিয়ে তিনি তার সন্তানদের মুখ দেখতেন, স্বপ্ন দেখতেন, সেই চোখ চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই একটি মর্মান্তিক মুহূর্ত পারভীনের স্বাভাবিক জীবনের ইতি টেনে দেয়। যে মানুষটি কখনো রাজনীতি করতেন না, কোনো সংঘর্ষে যুক্ত ছিলেন না, তিনি শুধু একজন আহত তরুণকে মানবতার খাতিরে সাহায্য করতে গিয়ে নিজেই গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনার পর তার দৈনন্দিন জীবন শুধু কষ্টকরই নয়, ভয়ানক দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
পারভীন বেগমের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বর্তমান বাস্তবতায় সাধারণ নাগরিকও নিরাপদ নয়। এমনকি একজন নিরীহ নারী যিনি শুধুই সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন, তাকেও নির্মম রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়। এই ঘটনার পর তার চিকিৎসা, পরিবার চালানো এবং নিজের অস্তিত্ব রক্ষা সবকিছুই হয়ে ওঠে এক নতুন ও কঠিন সংগ্রামের নাম। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর পারভীন বেগমকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তার চোখ থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয় এবং অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়। কয়েকদিন ধরে চিকিৎসার পর তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে হাসপাতাল থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে মূল সমস্যা তখনও রয়ে গিয়েছিল। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার কিছুদিন পর থেকেই পারভীন বেগমের বাম চোখে তীব্র ব্যথা, ঝাপসা দেখা এবং চোখের ভেতরে জটিল উপসর্গ দেখা দেয়। এসব উপসর্গ দিন দিন আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। পরে বাধ্য হয়ে তাকে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় যেখানে দীর্ঘ দেড় মাস ধরে তার চোখের বিশেষায়িত চিকিৎসা চলে। চিকিৎসকরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানিয়ে দেন, বাম চোখের ভেতরে রক্ত জমাট এবং নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা একাধিক অপারেশন করেন সেই চোখটি রক্ষার জন্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অপারেশন ও ওষুধের পরও দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে পারভীন বেগমের বাম চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ, আর ডান চোখেও তিনি ঝাপসা দেখেন। এ অবস্থায় রান্না, সেলাই, চলাফেরা সব কাজই তার জন্য কষ্টকর। একজন গৃহিণীর জীবন যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য কাজ থাকে সেখানে চোখের আলো হারিয়ে তিনি একপ্রকার অসহায় হয়ে পড়েছেন। শুধু শারীরিক নয়, এই আঘাত তার মানসিকতাকেও গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছে। তার জীবন এখন ক্রমেই সীমাবদ্ধ হয়ে আসছে অন্ধকার এক ভবিষ্যতের দিকে। বর্তমানে পারভীন বেগম সম্পূর্ণভাবে বাম চোখে অন্ধ এবং ডান চোখেও স্পষ্ট দেখতে পারেন না। এর ফলে তিনি আর কোনো ধরনের কাজ করতে অক্ষম। স্বামী রুবেল হাওলাদার একাই পরিবার পরিচালনার চেষ্টা করছেন, যা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। প্রস্তাবনা ১. চক্ষু সংক্রান্ত উন্নত চিকিৎসা ও নিয়মিত ফলোআপের ব্যবস্থা। ২. সন্তানদের পড়াশোনার জন্য উপবৃত্তি বা শিক্ষা সহায়তা। পরিশেষে, পারভীন বেগম একজন মা, একজন স্ত্রী এবং এক নিঃস্ব, আহত নারী যিনি কেবল একজন আহত ছাত্রকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজেই চিরতরে দৃষ্টিশক্তির একাংশ হারিয়েছেন। তার এই আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে বীরত্বের প্রতীক। এখন সময় এসেছে, তার পাশে দাঁড়ানোর। তার চোখের আলো না ফিরলেও যেন জীবনের আলো একটুও নিভে না যায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে এ রাষ্ট্রকে।
এক নজরে পারভীন
নাম : পারভীন
পিতা : চাঁদ মিয়া, বৃদ্ধ
মাতা : খুকি বেগম, বৃদ্ধ
ছেলে : মো: ইব্রাহীম, বয়স ৮
ছেলে : মো: ইয়াছিন, বয়স ৫
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
স্থায়ী ঠিকানা : করপাড়া, রামগঞ্জ, লক্ষীপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
পারভীন একজন সাধারণ তবে সাহসিকতায় উদ্দীপ্ত সংগ্রামী নারী, ১৯৯৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর যার জন্ম লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার করপাড়া গ্রামে। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এক গভীর অভাব-অনটনের পরিবেশে যেখানে প্রতিটি দিন মানে ছিল বেঁচে থাকার লড়াই। তার বাবা চাঁদ মিয়া ছিলেন একজন রিকশাচালক। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি রিকশা চালিয়ে যা আয় করতেন, তা দিয়েই চলতো পরিবারের খরচ। মা খুকি বেগম ছিলেন একজন গৃহিণী। তিনি সংসারের কাজ সামলানোর পাশাপাশি সন্তানদের মানুষ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। পারভীনের পরিবার ছিল সমাজের সেই প্রান্তিক শ্রেণির অংশ, যাদের জীবনপ্রবাহ চলে ক্ষুধা, পরিশ্রম এবং সীমাহীন ত্যাগের মধ্য দিয়ে।
ছোটবেলা থেকেই পারভীন দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হন। বিদ্যালয়ের প্রতি তার গভীর আগ্রহ থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষাজীবন স্থায়ী হয়নি। খুব অল্প বয়সেই তাকে সংসারের বোঝা কাঁধে নিতে হয়। মায়ের সঙ্গে রান্না, পানি আনা, ঘর পরিষ্কার, এমনকি ক্ষেতখামারে কাজ করতেও তাকে দেখা যেত। কিশোরী বয়সেই পারভীন বিবাহিত জীবনে পা রাখেন। জীবনের শুরু থেকেই সংসারকে টেনে নেয়ার, স্বামীর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন সহানুভূতিশীল, সহনশীল ও পরিশ্রমী নারী, যার জীবনযাত্রা নিছক বেঁচে থাকার গল্প নয় বরং সংগ্রামের মধ্যেও বেঁচে থাকার এক নিদর্শন। পারভীন বেগমের এই জীবনচিত্র শুধু একজন নারীর নয়, বরং হাজারো নিম্নবিত্ত নারীর গল্প, যারা প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার সাহস খুঁজে পান অভাবের ভেতর থেকেও। পারিবারিক প্রেক্ষাপট বর্তমানে পারভীন বেগম তার স্বামী রুবেল হাওলাদারের সঙ্গে বসবাস করছেন। রুবেল একজন অটোরিকশা চালক, যিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে চার সদস্যের সংসার চালানোর চেষ্টা করেন। একসময় স্বামী-স্ত্রী মিলে ঢাকার বিভিন্ন নির্মাণস্থলে রাজমিস্ত্রির সহকারী (রাজ-যোগালি) হিসেবে কাজ করতেন। দিনমজুরির মাধ্যমে তারা সংসার চালিয়ে নিতেন, সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন। তবে একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর তাদের স্বাভাবিক জীবনের গতি থেমে যায় এবং সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ঘটনার সময় তারা ঢাকার যাত্রাবাড়ি থানার অন্তর্গত দনিয়া এলাকায় বসবাস করতেন। তবে তাদের স্থায়ী ঠিকানা এখনো লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার করপাড়া গ্রামে রয়ে গেছে। পারভীন-রুবেল দম্পতির দু’টি সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে মোঃ ইব্রাহিম, যার বয়স ৮ বছর, সে একসময় নাজেরা মাদ্রাসায় পড়ালেখা করলেও বর্তমানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ছোট ছেলে মোঃ ইয়াসিন, বয়স ৪ বছর, এখন প্লে-গ্রুপে ভর্তি রয়েছে। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় তারা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলেছেন। পরিবারটির মাসিক আয় আনুমানিক ১৫,০০০ টাকা, যা রুবেল হাওলাদারের অটোরিকশা চালানোর মাধ্যমে আসে। এই সীমিত আয়ের মধ্য দিয়েই পরিবারের খরচ, বাসা ভাড়া, ছেলেদের পড়ালেখা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু চালাতে হয়, যা প্রতিনিয়তই এক কঠিন লড়াইয়ের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারভীন বেগমের জীবন কাহিনী এক সাধারণ নারীর অসাধারণ সাহস, সংগ্রাম ও বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি যেখানে প্রতিটি দিন টিকে থাকার নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়। তবুও তিনি আশায় বুক বাঁধেন, সন্তানের মুখে হাসি দেখার জন্য সব কিছু সহ্য করেন। ঘটনার বিবরণ দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে প্রতিদিনের মতো কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরছিলেন পারভীন বেগম। ঢাকার যাত্রাবাড়ি থানার সামনে এসে পৌঁছালে হঠাৎ এক ভয়াবহ দৃশ্যের সম্মুখীন হন তিনি। চারপাশে উত্তেজনা, শোরগোল আর মানুষের ছুটাছুটি। তিনি দেখতে পান পুলিশের গুলিতে এক তরুণ ছাত্র রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছে। তার শরীর থেকে রক্ত ঝরছে, ছেলেটি যন্ত্রণায় ছটফট করছে এবং সাহায্যের জন্য আকুলভাবে হাত বাড়িয়ে কান্নাকাটি করছে। পারভীন বেগম একজন মমতাময়ী মা এবং একজন মানবিক হৃদয়ের মানুষ। চারপাশের মানুষ যখন দূরে দাঁড়িয়ে ভয় পাচ্ছিল, তখন তিনি কোনো কিছু না ভেবেই দৌড়ে ছুটে যান ছেলেটিকে সাহায্য করতে। আহত ছেলেটিকে তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন তিনি, ঠিক তখনই ঘটে সেই বিভীষিকাময় ঘটনা। যাত্রাবাড়ি থানার পুলিশ হঠাৎই একটি শর্টগানের গুলি ছোড়ে তার দিকে একজন নিরীহ নারী, যিনি কেবল সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, তাকেও তারা রেহাই দেয়নি। এই গুলির ফলেই পারভীন বেগমের বাম চোখে মারাত্মক আঘাত লাগে। চোখ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে, তিনি চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মুহূর্তেই তার জীবন বদলে যায়। যে চোখ দিয়ে তিনি তার সন্তানদের মুখ দেখতেন, স্বপ্ন দেখতেন, সেই চোখ চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই একটি মর্মান্তিক মুহূর্ত পারভীনের স্বাভাবিক জীবনের ইতি টেনে দেয়। যে মানুষটি কখনো রাজনীতি করতেন না, কোনো সংঘর্ষে যুক্ত ছিলেন না, তিনি শুধু একজন আহত তরুণকে মানবতার খাতিরে সাহায্য করতে গিয়ে নিজেই গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনার পর তার দৈনন্দিন জীবন শুধু কষ্টকরই নয়, ভয়ানক দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
পারভীন বেগমের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বর্তমান বাস্তবতায় সাধারণ নাগরিকও নিরাপদ নয়। এমনকি একজন নিরীহ নারী যিনি শুধুই সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন, তাকেও নির্মম রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়। এই ঘটনার পর তার চিকিৎসা, পরিবার চালানো এবং নিজের অস্তিত্ব রক্ষা সবকিছুই হয়ে ওঠে এক নতুন ও কঠিন সংগ্রামের নাম। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর পারভীন বেগমকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তার চোখ থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয় এবং অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়। কয়েকদিন ধরে চিকিৎসার পর তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে হাসপাতাল থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে মূল সমস্যা তখনও রয়ে গিয়েছিল। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার কিছুদিন পর থেকেই পারভীন বেগমের বাম চোখে তীব্র ব্যথা, ঝাপসা দেখা এবং চোখের ভেতরে জটিল উপসর্গ দেখা দেয়। এসব উপসর্গ দিন দিন আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। পরে বাধ্য হয়ে তাকে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় যেখানে দীর্ঘ দেড় মাস ধরে তার চোখের বিশেষায়িত চিকিৎসা চলে। চিকিৎসকরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানিয়ে দেন, বাম চোখের ভেতরে রক্ত জমাট এবং নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা একাধিক অপারেশন করেন সেই চোখটি রক্ষার জন্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অপারেশন ও ওষুধের পরও দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে পারভীন বেগমের বাম চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ, আর ডান চোখেও তিনি ঝাপসা দেখেন। এ অবস্থায় রান্না, সেলাই, চলাফেরা সব কাজই তার জন্য কষ্টকর। একজন গৃহিণীর জীবন যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য কাজ থাকে সেখানে চোখের আলো হারিয়ে তিনি একপ্রকার অসহায় হয়ে পড়েছেন। শুধু শারীরিক নয়, এই আঘাত তার মানসিকতাকেও গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছে। তার জীবন এখন ক্রমেই সীমাবদ্ধ হয়ে আসছে অন্ধকার এক ভবিষ্যতের দিকে। বর্তমানে পারভীন বেগম সম্পূর্ণভাবে বাম চোখে অন্ধ এবং ডান চোখেও স্পষ্ট দেখতে পারেন না। এর ফলে তিনি আর কোনো ধরনের কাজ করতে অক্ষম। স্বামী রুবেল হাওলাদার একাই পরিবার পরিচালনার চেষ্টা করছেন, যা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। প্রস্তাবনা ১. চক্ষু সংক্রান্ত উন্নত চিকিৎসা ও নিয়মিত ফলোআপের ব্যবস্থা। ২. সন্তানদের পড়াশোনার জন্য উপবৃত্তি বা শিক্ষা সহায়তা। পরিশেষে, পারভীন বেগম একজন মা, একজন স্ত্রী এবং এক নিঃস্ব, আহত নারী যিনি কেবল একজন আহত ছাত্রকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজেই চিরতরে দৃষ্টিশক্তির একাংশ হারিয়েছেন। তার এই আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে বীরত্বের প্রতীক। এখন সময় এসেছে, তার পাশে দাঁড়ানোর। তার চোখের আলো না ফিরলেও যেন জীবনের আলো একটুও নিভে না যায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে এ রাষ্ট্রকে।
এক নজরে পারভীন
নাম : পারভীন
পিতা : চাঁদ মিয়া, বৃদ্ধ
মাতা : খুকি বেগম, বৃদ্ধ
ছেলে : মো: ইব্রাহীম, বয়স ৮
ছেলে : মো: ইয়াছিন, বয়স ৫
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
স্থায়ী ঠিকানা : করপাড়া, রামগঞ্জ, লক্ষীপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍