হোম / আহতদের তালিকা / মো: মোশারফ হোসেন
মো: মোশারফ হোসেন

মো: মোশারফ হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

স্থায়ী ঠিকানা : সিংগিমাড়ী, হাতিবান্ধা, লালমনিরহাট

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম পরিচয়
মো: মোশারফ হোসেন লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার সিঙ্গিমারী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের এক নিভৃত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দুঃসহ জীবনের মাঝেও মোশারফ ছিলেন একজন স্বপ্নবাজ তরুণ। অল্প বেতনের কাজ করেও তিনি সঞ্চয় করতেন, ভবিষ্যতের একটি সুন্দর দিনের আশায়। অথচ এই পরিশ্রমী যুবকের জীবনে এক সময় নেমে আসে অন্ধকার, যা তার স্বপ্নগুলোকে থামিয়ে দেয়। কিন্তু সেই গল্প এরপরের অধ্যায়। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া মোশারফ ছোটবেলা থেকেই জীবন সংগ্রামের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিলেন। পারিবারিক আর্থিক অনটন ও সীমাহীন অভাবের মাঝেও তিনি হার মানেননি। প্রতিকূলতার মাঝেও শিক্ষার প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ ছিল।
২০১৭ সালে তিনি হাতীবান্ধা সরকারি আলিমুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থাকলেও পারিবারিক বাস্তবতা তাঁকে সেই পথ থেকে সরিয়ে দেয়। মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে, ভাইয়ের মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দিতে এবং সংসারের অভাব ঘোচাতে তিনি বাধ্য হন কর্মজীবনে প্রবেশ করতে। এক বুক স্বপ্ন আর দায়িত্ববোধ নিয়ে মোশারফ পাড়ি জমান রাজধানীসংলগ্ন গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানার বোর্ডমিল এলাকায়। সেখানে গিয়ে তিনি একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি নেন। গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে শুরু হয় তার নতুন সংগ্রামমুখর জীবন। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজের জন্য ছুটে যাওয়া, সারা দিন শ্রমের বিনিময়ে সামান্য মজুরি অর্জন করা এবং রাতের ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া এই ছিল তার জীবনচক্র। কিন্তু মোশারফ হাল ছাড়েননি। পরিবারে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আনার প্রত্যয়ে তিনি পরিশ্রমকে সঙ্গী করে নেন। তার চিন্তা ছিল নিজের জীবনকে স্থিতিশীল করে পরিবারের দারিদ্র্য দূর করবেন, ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন, মা-বাবাকে ভালোভাবে দেখবেন।
পারিবারিক প্রেক্ষাপট পরিবারে বাবা-মা ছাড়াও এক ভাই রয়েছে। তবে ভাই উপার্জনক্ষম নন। তার বাবা আব্দুস সালাম, একজন বৃদ্ধ কৃষক যিনি এখন বয়সের ভারে আর কাজ করতে পারেন না। মা মোমেনা বেগমও বয়স ও নানাবিধ শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন। দুজনেই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, নিয়মিত ওষুধ এবং চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে মোশারফ হয়ে উঠেছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, যার শ্রম ও আয়েই চলত পুরো সংসার। গাজীপুরে গার্মেন্টস কর্মী হিসেবে তার অল্প আয়ে কোনো রকমে সংসার চালাতেন তিনি। নিজের খরচ সীমিত রেখে যা আয় মেটাতেন।যা আয় করতেন, তার বেশিরভাগটাই পাঠিয়ে দিতেন বাড়িতে মা-বাবার চিকিৎসা, ভাই-বোনদের পড়াশোনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ পারিবারিক বাস্তবতা তাঁকে সেই পথ থেকে সরিয়ে দেয়। মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে, ভাইয়ের মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দিতে এবং সংসারের অভাব ঘোচাতে তিনি বাধ্য হন কর্মজীবনে প্রবেশ করতে। এক বুক স্বপ্ন আর দায়িত্ববোধ নিয়ে মোশারফ পাড়ি জমান রাজধানীসংলগ্ন গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানার বোর্ডমিল এলাকায়। সেখানে গিয়ে তিনি একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি নেন। গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে শুরু হয় তার নতুন সংগ্রামমুখর জীবন। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজের জন্য ছুটে যাওয়া, সারা দিন শ্রমের বিনিময়ে সামান্য মজুরি অর্জন করা এবং রাতের ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া এই ছিল তার জীবনচক্র। কিন্তু মোশারফ হাল ছাড়েননি। পরিবারে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আনার প্রত্যয়ে তিনি পরিশ্রমকে সঙ্গী করে নেন। তার চিন্তা ছিল নিজের জীবনকে স্থিতিশীল করে পরিবারের দারিদ্র্য দূর করবেন, ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন, মা-বাবাকে ভালোভাবে দেখবেন। কিন্তু তার হঠাৎ আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া এবং কর্মক্ষমতা হারানোর পর পুরো পরিবার যেন এক ধাক্কায় পড়ে যায় দুঃসহ এক অন্ধকারে। আয়শূন্য হয়ে যায় তাদের সংসার। মা-বাবার ওষুধ কেনার টাকাও এখন হাতে থাকে না। চিকিৎসার ব্যয়, যাতায়াত খরচ, পুষ্টিকর খাবার, পুনর্বাসন সবকিছুই এখন পরিবারের কাছে কল্পনার মতো। প্রতিদিন তারা লড়ছে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে। একদিকে প্রিয় সন্তানের যন্ত্রণা, অন্যদিকে ক্ষুধা ও ঋণের বোঝা এই দ্বৈত যন্ত্রণা তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। মোশারফের পরিবার এখন সমাজের সহযোগিতার আশায় প্রহর গুনছে। কেউ পাশে দাঁড়ালে হয়তো তারা আবার একটু আলো দেখতে পারবে। না হলে অন্ধকারই হয়ে উঠবে তাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ। ঘটনার বিবরণ তারিখটি ছিল ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ তখন ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের প্রতিটি প্রান্তে। শিক্ষার্থীরা সাম্য, ন্যায়ের দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে রাজপথে নেমেছিল। সেই আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে ও সাধারণ জনগণের পক্ষে কণ্ঠ মিলাতে মো: মোশারফ হোসেনও অংশ নেন কালিয়াকৈর থানার সামনে আয়োজিত এক শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে। সেদিন দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে, কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা বা উসকানি ছাড়াই হঠাৎ করেই থানা প্রাঙ্গণ থেকে গুলি চালাতে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে আন্দোলনকারীরা। চারপাশে আতঙ্ক, কান্না আর রক্তের দৃশ্য। এই গুলিবর্ষণে মোশারফ হোসেন গুরুতরভাবে আহত হন। তাঁর শরীর বিদ্ধ হয় ৩০টিরও বেশি রাবার বুলেটে। সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাতটি ছিল মাথায় যেখানে এখনো একটি রাবার বুলেটের পেলেট রয়ে গেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সেটি অপসারণ করলে তার প্রাণ হানির আশঙ্কা রয়েছে, তাই অস্ত্রোপচার সম্ভব হয়নি। এছাড়া তার ডান ও বাম হাতে, পিঠে এবং বাম পায়ে রাবার বুলেটের গভীর ক্ষত তৈরি হয়। পিঠে পুলিশের লাঠির আঘাতে মেরুদণ্ডে এমন ভয়াবহ জখম হয় যে হাড় পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে পড়ে। সেই আঘাত এখনো তাকে তীব্র ব্যথা ও চলাফেরার সীমাহীন কষ্টে ভোগাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুতর অবস্থা দেখা দেয় বাম পায়ে। সেখানে গুলির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করতে হয়। সেই অস্ত্রোপচারে পায়ের কিছু অংশে টিস্যু অপসারণ করতে হয়, যার ফলে তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারছেন না। বর্তমানে তিনি শারীরিকভাবে প্রায় পঙ্গু অবস্থায় রয়েছেন, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের। মোশারফ হোসেনের ওপর ঘটে যাওয়া ভয়াবহ নিপীড়নের চিত্র ফুটে ওঠে। তাঁর জীবন যেন এক মুহূর্তেই বদলে গেছে। প্রয়োজনে এর পরবর্তী চিকিৎসাজনিত ব্যয় ও আর্থিক সংকট নিয়েও আলাদা করে লিখে দিতে পারি।
বিশেষ বিবরণ সেদিন পুলিশ বাহিনী নতুন ফন্দী আটে। সমঝোতা করার জন্য একজনকে ইশারায় ডাক দেন। এরপর মোশাররফ দুই হাত সম্প্রসারিত করে খুশি মনে এগিয়ে যায়। কাছাকাছি পোঁছালে পুলিশ রাইফেল তাক করে। গুলি চালানোর পূর্ব মুহূর্তে ঘটনা বুঝতে পেরে মোশাররফ কোন রকম দৌড়ে পালিয়ে যায়। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মুহূর্তেই রক্তাক্ত, অচেতন অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মো: মোশারফ হোসেন। আশপাশের সাধারণ মানুষের সহায়তায় তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কালিয়াকৈরের তানহা মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। কিন্তু ওই চিকিৎসাকেন্দ্রের সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও জরুরি চিকিৎসা সামর্থ্য তার জটিল ও গুরুতর আঘাত সামাল দিতে অক্ষম ছিল। সময় যেন তখন দৌড়ে চলছিল তার জীবনের বিপরীতে। চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত তাকে ঢাকা শহরের ইবনে সিনা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানকার নিউরো ও ট্রমা বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে মাথার অভ্যন্তরে জমে থাকা রক্ত ও টিস্যুর চাপ হ্রাসে অস্ত্রোপচার করা হয় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে বিদ্ধ কিছু রাবার বুলেটের টুকরো অপসারণ করা সম্ভব হয়। সেই সময় তার জীবন কিছুটা স্থিতিশীল হলেও, ঝুঁকি একেবারে কাটেনি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন মোশারফের মাথায় এখনো কিছু রাবার বুলেটের টুকরো রয়ে গেছে, যা অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থানে অবস্থান করছে। অপারেশন করে সেগুলো সরানোর চেষ্টা করলে মারাত্মক মস্তিষ্কের ক্ষতি কিংবা সরাসরি জীবনহানি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে অপারেশন না করেই তাকে সেই টুকরো নিয়েই বাঁচতে হচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত মাথাব্যথা, ঝাপসা দৃষ্টিসহ নানা ধরনের শারীরিক কষ্ট তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে উন্নত ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রয়োজনে তাকে দেশের বাইরে বিশেষায়িত নিউরো সেন্টারে পাঠানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠছে না। বর্তমানে মোশারফ একজন স্থায়ী শারীরিক ঝুঁকির মধ্যে দিন পার করছেন। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, শ্রমজীবন কিংবা মানসিক স্বস্তি সবই আজ তার কাছে এক অপার দুঃস্বপ্ন। তিনি এখন শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত ও মানসিকভাবে আতঙ্কগ্রস্ত এক তরুণ। তিনি চলাফেরা করতে পারলেও প্রতিনিয়ত মাথা ও পায়ের যন্ত্রণায় কাতর থাকেন। তার মতো একজন পরিশ্রমী ও স্বপ্নবাজ যুবকের জীবন আজ চিরতরে থেমে যাওয়ার পথে। প্রস্তাবনা ১. তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। ২. একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। পরিশেষে, মো: মোশারফ হোসেন কেবল একজন আহত কিশোর নয়, বরং এই প্রজন্মের সাহসী কণ্ঠস্বর যিনি ন্যায়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন এবং মূল্য চুকিয়েছেন রক্ত দিয়ে। আজ তার পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব, যেন সে আবার স্বপ্ন দেখতে পারে, সুন্দর ভাবে বাচতে পারে।
এক নজরে মো: মোশারফ হোসেন
নাম : মো: মোশারফ হোসেন
পিতা : আব্দুস সালাম, বৃদ্ধ
মাতা : মোমেনা বেগম, বৃদ্ধ
ভাই : মো: মোবারক
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
স্থায়ী ঠিকানা : সিংগিমাড়ী, হাতিবান্ধা, লালমনিরহাট
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : কালিয়াকৈর, গাজীপুর

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍