হোম / আহতদের তালিকা / : মো: জাহিদুল ইসলাম
: মো: জাহিদুল ইসলাম

: মো: জাহিদুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

স্থায়ী ঠিকানা : চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

রক্তের দাগে গড়া ইতিহাস
মো: জাহিদুল ইসলাম ক্রমিক: ১১৫ আইডি: ঢাকা সিটি ১১৫
পরিচিতি মো: জাহিদুল ইসলাম ১৯৯৫ সালের ১৭ জুলাই কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। কুমিল্লা জেলা রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে অবস্থিত, একটি ঐতিহ্যবাহী ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানেই তার শৈশব, কৈশোর ও প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটে। শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত সাভার, একদিকে যেমন আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে, তেমনি অপরদিকে এখানকার মানুষ এখনো তাদের সামাজিক বন্ধন, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ ধরে রেখেছে। এই আবহেই গড়ে উঠেছেন জাহিদুল, যার জীবন দর্শনে গ্রামীণ মানবিকতা ও শহুরে চেতনার এক অনন্য সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়।
জাহিদুল ইসলামের শিক্ষাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং বাংলাদেশের প্রগতিশীল চিন্তাধারা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং মানবিক বোধের এক প্রাণকেন্দ্র। এই পরিসরে থেকেই জাহিদুলের চিন্তা-চেতনা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা গভীরতর হতে থাকে। একজন ছাত্র হিসেবে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। জন্মসূত্রে জাহিদুল ইসলামের শিকড় যেমন বাংলাদেশের রাজধানীর উপকণ্ঠে প্রোথিত, তেমনি তার মানসিক গঠনে রয়েছে এ দেশের ইতিহাস, সংগ্রাম ও স্বপ্নের প্রতিফলন। তার পারিবারিক পটভূমি, শিক্ষা ও পরিবেশ মিলিয়ে একটি বলিষ্ঠ মানবিক চরিত্রের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। ব্যক্তি জাহিদুল একাধারে ছাত্র, সচেতন নাগরিক ও সমাজ পরিবর্তনে আগ্রহী তরুণ, যিনি তার জীবনকে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত করার স্বপ্ন লালন করে চলেছেন। পারিবারিক অবস্থা জাহিদুল ইসলামের পরিবার একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট পরিপাটি ও বন্ধনপূর্ণ পরিবার। যদিও পরিবারের সদস্যরা আজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন দেশ ও বিদেশে, তবু তাঁদের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক ও ভালোবাসার বন্ধন অটুট রয়েছে। এই পরিবারের অভিভাবক ছিলেন মীর আহম্মেদ, যিনি কিছু বছর আগে ইন্তেকাল করেছেন। পিতার মৃত্যুর পর পরিবারের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছেন মা জাহানারা আহম্মেদ। তিনি এখন সংসারের মূল অভিভাবক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে তিনি সন্তানদের নিয়ে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে চলেছেন। জাহিদুলের চার ভাই মিজানুর, মোস্তফা, জাকির ও সুমন সবাই বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। তারা প্রবাসে থেকে পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করে পরিবারকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পাঠান। এই প্রবাসী ভাইদের অবদানেই পরিবারটি এখন পর্যন্ত আর্থিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। যদিও তারা শারীরিকভাবে দূরে আছেন, তবু তাদের আন্তরিকতা, যোগাযোগ ও ভালোবাসা পরিবারে প্রতিনিয়ত অনুভূত হয়। একমাত্র বোন দিলরুবা বিবাহিত এবং তিনি বর্তমানে নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তবুও পারিবারিক বন্ধন ও দায়িত্ববোধ থেকে তিনি প্রায়ই যোগাযোগ রাখেন এবং পরিবারের খোঁজখবর নেন। পিতার মৃত্যু এই পরিবারে একটি গভীর শূন্যতা ও আবেগঘন পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে জাহিদুলের জীবনে এই শোক এক স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। বাবার অনুপস্থিতিতে মায়ের কঠোর পরিশ্রম ও ভাইদের ত্যাগ তাঁকে দায়িত্বশীল করে তুলেছে। পরিবারের অভ্যন্তরে ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক সহযোগিতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেটিই তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। এ পরিবার শুধু রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে গঠিত নয়, বরং আত্মিক মমত্ব, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার এক অনন্য নিদর্শন। জাহিদুল এ পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন, যা তাঁর চরিত্র ও জীবনদর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক সহিংসতার ঘটনা যার শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্র জাহিদুল ইসলাম। ঐদিন বিকেলে তিনি বটতলা এলাকায় অবস্থান করছিলেন, তখন হঠাৎ করে ছাত্রলীগের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে তাঁর ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা লোহার রড ও বাঁশ দিয়ে ধারাবাহিকভাবে তাঁর মাথায় আঘাত করতে থাকে। মাথায় প্রচণ্ড আঘাতের ফলে তাঁর খুলির একাংশ ফেটে গিয়ে তীব্র রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে জাহিদুল অচেতন হয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থল রক্তে ভেসে যায়। উপস্থিত সহপাঠীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসেন এবং তাকে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে তার মাথার আঘাত প্রাথমিকভাবে সেলাই করা হলেও চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন, তাঁর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। খুলির ফাটল এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা থাকায় জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তাঁকে ভর্তি করে নিউরো-সার্জারি বিভাগের অধীনে চিকিৎসা দেয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, তাঁর মাথায় যেভাবে আঘাত করা হয়েছে, তা থেকে মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তার স্ক্যাল্পের একাংশ ছিঁড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে। এছাড়াও, মাথায় একাধিক স্থানে গভীর জখম থাকায় তাঁকে আইসিইউতে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এই নির্মম হামলার ঘটনায় জাহিদুল শুধু শারীরিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হননি, মানসিকভাবেও মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। তাঁর পরিবার ও সহপাঠীরা এই বর্বরতার ন্যায্য বিচার দাবি করেছেন। শান্তিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এমন নৃশংসতা গোটা শিক্ষাঙ্গনকে স্তব্ধ করে দেয়। আজও তিনি চিকিৎসাধীন এবং ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে এগোচ্ছেন, তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘ সময় ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হবে। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ জাহিদুল ইসলাম ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় এক ভয়াবহ সশস্ত্র হামলার শিকার হন। হামলার পর তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় দ্রুত এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে তাঁর মাথার ক্ষতস্থান পরীক্ষা করে চিকিৎসকেরা অবিলম্বে সেলাই দেন। মাথার আঘাত ছিল অত্যন্ত গভীর ও বিপজ্জনক, তাই তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। চিকিৎসকদের মতে, মাথায় আঘাতজনিত কারণে শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জটিলতা দেখা দিতে পারে। হাসপাতালের পর্যবেক্ষণ চলাকালীন সময়ে জাহিদুলের মধ্যে সেই লক্ষণগুলোই ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। কয়েকদিন অতিবাহিত হলেও তাঁর তীব্র মাথাব্যথা কমে না, বরং তা আরও বেড়ে যায়। পাশাপাশি তাঁর দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হতে শুরু করে, মাঝে মাঝেই মাথা ঘোরা ও স্মৃতিভ্রষ্টতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এই ধরনের উপসর্গগুলো আঘাতজনিত নিউরোলজিক্যাল ট্রমার নির্দেশ দেয়, যা একটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। জাহিদুল একসময় যে সকল দৈনন্দিন কাজ নির্বিঘ্নে করতে পারতেন, এখন তা তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেখাপড়া, সামাজিক যোগাযোগ, এমনকি নিজের যত্ন নেয়ার ক্ষেত্রেও তিনি অক্ষম হয়ে পড়ছেন। মস্তিষ্কে আঘাতজনিত জটিলতা তাঁর মনোবল ও আত্মবিশ্বাসকেও ভেঙে দেয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, জাহিদুল ইসলামের দ্রুত স্নায়ুবিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়ে। তাঁকে নিয়মিত সিটি স্ক্যান, এমআরআই এবং অন্যান্য নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এছাড়াও তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়া অত্যাবশ্যক, কারণ ট্রমা-পরবর্তী মানসিক চাপ, তার আচরণ ও অনুভূতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ঘটনার ফলে জাহিদুল কেবল শারীরিকভাবে নয়, মানসিক ও সামাজিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁর চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তার জন্য একটি সমন্বিত ও সহানুভূতিশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। যাতে করে তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। প্রস্তাবনা ১. তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। ২. একটি স্থায়ী চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা। পরিশেষে, জাহিদুল ইসলামের ওপর সংঘটিত সহিংসতা শুধু তাৎক্ষণিক শারীরিক ক্ষতিই নয়, বরং তার শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ পথচলায় এক গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে। আহত এই শিক্ষার্থীর দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এক নজরে মো: জাহিদুল ইসলাম
নাম : মো: জাহিদুল ইসলাম
পিতা : মীর আহম্মেদ, মৃত
মাতা : জাহানারা আহম্মেদ, বৃদ্ধ
ভাই : মিজানুর রহমান, প্রবাসী
ভাই : মোস্তফা, প্রবাসী
ভাই : জাকির, প্রবাসী
ভাই : সুমন, প্রবাসী
বোন : দিলরুবা, বিবাহিত
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
স্থায়ী ঠিকানা : চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই, ২০২৪
আক্রমণকারী : যৌথবাহিনী
আহত হওয়ার স্থান : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায়

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍