হোম / আহতদের তালিকা / মো: জসীম উদ্দিন
মো: জসীম উদ্দিন

মো: জসীম উদ্দিন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

স্থায়ী ঠিকানা : শাহপুর, নোয়াখালী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

কণ্ঠে যার অদম্য দীপ্তি
মো: জসীম উদ্দিন ক্রমিক: ১১৮ আইডি: ঢাকা সিটি ১১৮
জন্ম পরিচয় মো: জসীম উদ্দিন ১৯৮৪ সালের ২৪ অক্টোবর নোয়াখালী জেলার শাহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম আবুল কাশেম এবং মাতা বদরের নেছা। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন একটি সংগ্রামী পরিবারের সন্তান, যার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামীণ জীবনের কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্য ছিল তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী। পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে শিক্ষাজীবন খুব বেশিদূর আগাতে পারেননি। জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে তাকে অল্প বয়সেই কাজের সন্ধানে নামতে হয়।
তরুণ বয়সে তিনি হেলপারের কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ চার বছর ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন খাতে হেলপার হিসেবে কাজ করে জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে নিজেকে একজন দক্ষ চালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে পেশাগত জীবনের এই উত্তরণ সহজ ছিল না। প্রতিদিনই নতুন চ্যালেঞ্জ, দীর্ঘ সময় রাস্তায় কাটানো, অপ্রতুল ঘুম এবং জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। জীবনের প্রতিটি ধাপে মো: জসিম ছিলেন নিরলস পরিশ্রমী ও আত্মবিশ্বাসী। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে, ভাই-বোনদের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি কোনো কষ্টের কথাই কল্পনায় আনেননি। ড্রাইভারের চাকরি করে যা আয় হতো, তা দিয়েই সংসার চালানোর পাশাপাশি অসুস্থ মা-বাবার চিকিৎসা, ছোট ভাই-বোনদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমানে তিনি শারীরিক সমস্যার কারণে আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ট্রাফিক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আজ তিনি কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। জীবনের এ পর্যায়ে এসে তাঁর জীবনের সংগ্রাম যেন নতুন এক মাত্রা পেয়েছে। এখন তিনি পরিবারসহ চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে। মো: জসিমের জীবন এক একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টায় পূর্ণ, আর প্রতিটি দিন ছিল একটি নতুন যুদ্ধ জয়ের গল্প। পারিবারিক প্রেক্ষাপট মো: জসিম একটি বৃহৎ ও দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আট ভাই-বোনের একজন, যেখানে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল। তাঁর পিতা মরহুম আবুল কাশেম ছিলেন একজন সহজ-সরল মানুষ, যিনি পরিবার চালাতে কঠোর পরিশ্রম করতেন। কিন্তু তাঁর অকাল মৃত্যু গোটা পরিবারকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। সে সময় মো: জসিমের বয়স খুবই অল্প, তবুও পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে তাঁকে দ্বিধা করতে হয়নি। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে শৈশবেই বুঝিয়ে দেয় বেঁচে থাকতে হলে সংগ্রাম করতে হয়। পরিবারের খাবার, চিকিৎসা, ভাই-বোনদের পড়াশোনা সবকিছুর যোগান দিতে গিয়ে তিনি নিজের স্বপ্নগুলোকে বিসর্জন দেন। অল্প বয়সেই তিনি হেল্পারের কাজ শুরু করেন। প্রায় চার বছর ধরে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে গাড়ির হেল্পার হিসেবে কাজ করেন দেশের বিভিন্ন সড়কে। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে পরবর্তীতে একজন পেশাদার গাড়িচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ দেয়। চালক হিসেবে মো: জসিম ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল ও সতর্ক। তাঁর হাতের উপর ভরসা করে একসময় পরিবার কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পায়। তাঁর উপার্জনেই পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাগুলো পূরণ হতো। কিন্তু এই শান্তি স্থায়ী হয়নি। অতিরিক্ত পরিশ্রম, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো এবং একাধিক শারীরিক আঘাতের কারণে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ে। বর্তমানে তিনি গুরুতর শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন, যা তাঁকে আর কোনো ধরনের কাজ করতে দিচ্ছে না। এই অবস্থায় মো: জসিম এখন পুরোপুরি কর্মহীন। পরিবারের আর্থিক অনটন আরও ঘনীভূত হয়েছে। আগে যিনি পরিবারের আশ্রয় ছিলেন, এখন তিনিই সাহায্যের অপেক্ষায়। তাঁর এই করুণ অবস্থায় কোনো চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ পরিবারের হাতে নেই প্রয়োজনীয় অর্থ। মো: জসিমের জীবন এক সংগ্রামী মানুষের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যিনি শৈশব থেকে কেবল লড়াই করেই কাটিয়েছেন। এখন তিনি সহানুভূতি, সহায়তা এবং চিকিৎসার অপেক্ষায় আবার একটু স্বস্তিতে বাঁচার আশায়। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ২০ জুলাই, পূর্বাচল, ঢাকায় একটি চলমান রাজনৈতিক ও নাগরিক আন্দোলনের সময় মো: জসিম এক হৃদয়বিদারক ঘটনার শিকার হন। সেদিন দেশব্যাপী চলছিল শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি, যেখানে সাধারণ জনগণ ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামেন। মো: জসিমও তেমনই অনেক সাধারণ মানুষের মতো ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কোনো দলের কর্মী হিসেবে নয়, বরং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে সবার সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন, কোনো প্রকার সহিংসতা কিংবা উসকানিমূলক আচরণেও জড়িত ছিলেন না। কিন্তু পরিস্থিতি হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ শুরু করে। এই আকস্মিক সহিংসতার মাঝে মো: জসিম গুলিবিদ্ধ হন। গুলি তাঁর শরীরের নিচের অংশে আঘাত করে এবং তিনি মূহূর্তের মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। রক্তে ভেজা কাপড় ও অসহায় মুখে তিনি ছটফট করছিলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষেরা দ্রুত তাঁর পাশে এগিয়ে আসেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সহায়তায় দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে তাঁকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাঁর ক্ষতস্থানে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন, তবে তাঁর অবস্থা গুরুতর ছিল।
এই ঘটনার পর জসিমের জীবন সম্পূর্ণভাবে বদলে যায়। একদিকে শারীরিকভাবে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা, বিশ্রাম ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হলেও অর্থের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। তিনি আগের মতো আর কাজ করতে পারেন না, ফলে পরিবারও নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। একজন নিরীহ, শান্তিপ্রিয় নাগরিক হয়েও কীভাবে হঠাৎ করে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হয়ে জীবন পাল্টে যায়। মো: জসিমের ঘটনা তারই একটি নির্মম উদাহরণ! তার বর্তমান জীবন চরম দুর্দশা আর অনিশ্চয়তার মাঝে বন্দি হয়ে আছে, যেখানে প্রয়োজন সহমর্মিতা, চিকিৎসা ও পুনরুদ্ধারের বাস্তবসম্মত সহায়তা। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর মো: জসিমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় তাঁর শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং অবস্থাও ছিল অত্যন্ত জটিল। চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টা, অস্ত্রোপচার ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তাঁর প্রাণ রক্ষার জন্য সবরকম প্রচেষ্টা চালানো হয়। দিন-রাতের সেই লড়াই শেষে, চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তাঁর জীবন রক্ষা পেলেও, শরীরের ভেতর রয়ে গেছে গভীর ক্ষতচিহ্ন এবং স্থায়ী জটিলতা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি একাধিক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যান এবং দীর্ঘ সময় বিছানায় শুয়ে কাটাতে হয় তাঁকে। শরীরের সেই অংশে এখনও মাঝে মাঝেই ব্যথা, অসারতা ও দুর্বলতা অনুভব করেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পরও মো: জসিম পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। তিনি বাসায় ফিরে এলেও নিয়মিত ওষুধ, শারীরিক থেরাপি এবং বিশ্রাম প্রয়োজন ছিল, যা একজন স্বল্প আয়ের মানুষ হিসেবে তাঁর পক্ষে চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অভাবে তাঁর শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। আগে যিনি একজন পরিশ্রমী গাড়িচালক হিসেবে পরিবারের ভরসাস্থল ছিলেন, এখন তনি কর্মহীন, দুর্বল ও অসহায় এক মানুষে পরিণত হয়েছেন। প্রতিদিন তাঁর শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না; সামান্য কাজ করলেও প্রচণ্ড ব্যথা আর ক্লান্তি তাঁকে পিছু ছাড়ে না। প্রস্তাবনা ১. জসিমের চিকিৎসার খরচ বহন করা। ২. জীবিকা নির্বাহের জন্য তার মায়ের একটা দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়া যেতে পারে। বর্তমানে মো: জসিম শারীরিকভাবে দুর্বল, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং আর্থিকভাবে চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় দিনযাপন করছেন। তাঁর জীবন যেন থমকে গেছে নতুন করে শুরু করার জন্য নেই প্রয়োজনীয় সহায়তা, নেই চিকিৎসার সুবিধা কিংবা পুনর্বাসনের সুযোগ। তাঁর এই অসহায় পরিস্থিতি আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে যেখানে একজন নিরীহ নাগরিক রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হয়ে চিরতরে জীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়েছেন, এবং আজ তিনি অপেক্ষা করছেন নতুন আশার, মানবিক সহানুভূতির এবং ন্যায়বিচারের।
এক নজরে মোঃ জসীম উদ্দিন
নাম : মো: জসীম উদ্দিন
স্থায়ী ঠিকানা : শাহপুর, নোয়াখালী
পিতা : মো: আবুল কাশেম, মৃত
মাতা : বদরের নেছা, বয়স ৯০
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ১০ জন
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই, ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : পুর্বাচল, ঢাকা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍