মো: আকাশ
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম পরিচয়
মো: আকাশ ১৯৯৮ সালের ৩১ জুলাই পিরোজপুর জেলার এক শান্ত, সবুজ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবকাল তার কেটেছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ধানক্ষেত, নদী আর কাদামাটির মেঠোপথে গড়া গ্রামীণ জীবনের পরিমণ্ডলে। ছোটবেলা থেকেই তিনি পরিশ্রমী ও আত্মনির্ভরশীল স্বভাবের ছিলেন। যদিও তার শিক্ষাজীবনের সুযোগ সীমিত ছিল, তবুও জীবনের বাস্তবতা তাকে দ্রুত বড় করে তোলে। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে খুব অল্প বয়সেই আকাশ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় চলে আসেন। বর্তমানে তিনি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার কাজলা এলাকায় বসবাস করছেন। ঢাকা শহরের ব্যস্ততম এই এলাকাতেই তার দিন শুরু হয় ভোরের আলো ফোটার আগেই, যখন তিনি রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামেন। প্রতিদিন ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করে তিনি নিজের পরিবারের জন্য সামান্য আয় সংগ্রহ করেন।
তার মাসিক আয় প্রায় ১৫,০০০ টাকা, যা দিয়ে ছয় সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের খরচ মেটানো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তার বাবা মো: শহিদ একজন প্রৌঢ় মানুষ, যিনি বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট পেশায় কর্মরত নন। মা পারভীন একজন গৃহিণী, যিনি ঘরের সব দায়িত্ব পালন করেন। আকাশের ছোট একটি কন্যা সন্তান আছে, নাম আদিবা। এই ছোট শিশুটির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আকাশ প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামে লড়াই করে যাচ্ছেন। রাজধানীর ব্যস্ততম রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত হলেও তিনি হার মানেন না। কারণ তার হৃদয়ে একটাই প্রত্যাশা, পরিবারকে একটু ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা। মো: আকাশের জীবন যেন হাজারো নিম্নবিত্ত শহরবাসীর প্রতিচ্ছবি যারা কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে সমাজের ভার বহন করছেন, অথচ সমাজ তাদের কষ্টগুলো প্রায়ই অদৃশ্য করে রাখে। তবুও আকাশের মতো মানুষগুলো প্রতিদিন ভোরে নতুন আশায় জেগে ওঠেন, কারণ তাদের জীবনের চালিকাশক্তি হলো দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা ও অটুট সংকল্প। পারিবারিক প্রেক্ষাপট মো: আকাশ ছয় সদস্যবিশিষ্ট নিম্ন আয়ের পরিবারে বসবাস করছেন, যার প্রতিটি সদস্যের জীবন-জীবিকা মূলত তার ওপরই নির্ভরশীল।
তার পিতা মো: শহিদ একজন দিনমজুর প্রকৃতির মানুষ। বয়সের ভারে এখন আগের মতো শারীরিক পরিশ্রম করতে না পারলেও তিনি পারিবারিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত নন। মা পারভীন একজন গৃহিণী, যিনি সংসারের প্রতিটি সদস্যের দেখভাল করেন এবং ঘরের ভেতরের যাবতীয় কাজ নিজ হাতে সামলান। আকাশের স্ত্রী একজন সাধারণ গৃহবধূ, যিনি তিন বছরের কন্যা আদিবার যত্ন ও লালন পালনের দায়িত্বে নিয়োজিত। পরিবারে আকাশের আরও দু’টি বোন রয়েছে। বড় বোন তানজিলা (বয়স ২০) বিবাহিত হলেও মাঝে মাঝে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। ছোট বোন তামান্না বর্তমানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। মেয়েটির পড়াশুনা, পোশাক, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয়তার দায়িত্বও আকাশকেই নিতে হয়। এমন এক প্রেক্ষাপটে মো: আকাশ রিকশাচালক হিসেবে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন রাস্তায় নামেন। তার মাসিক আয় প্রায় ১৫,০০০ টাকা, যা এই পরিবারের ছয় সদস্যের খাবার, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, শিশুর পড়াশুনা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে একেবারেই অপ্রতুল। মাসের শেষদিকে খাবার ও ওষুধের খরচ মেটানো দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।
মাঝে মাঝে মেয়ের আবদার কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের অসুস্থতা তাঁকে চরম আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়। তবুও আকাশের সংগ্রামে কোনো বিরতি নেই। প্রতিদিন সকালে ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, দিনভর ঘাম ঝরিয়ে যে আয় করেন তা দিয়েই সংসার চালানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করেন। তার হৃদয়ে কেবল একটাই আশা পরিবারটিকে বাঁচিয়ে রাখা, ছোট মেয়েটিকে শিক্ষিত করে তোলা এবং মায়ের মুখে একটু হাসি ফোটানো। মো: আকাশের জীবন একটি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অসাধারণ সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অভাবের মাঝেও ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং ত্যাগ অনন্য এক মানবিক চিত্র এঁকে দেয়। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তারিখটি মো: আকাশের জীবনে এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা হয়ে রয়ে গেছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, কাজলা এলাকায় সেই দিন ছাত্র ও সাধারণ জনতা শান্তিপূর্ণভাবে কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন। আকাশ, যিনি প্রতিদিনের মতো রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন, সেদিন ঘটনাস্থলের পাশেই অবস্থান করছিলেন। তবে কারও ধারণাও ছিল না যে, সেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ হঠাৎই রূপ নেবে ভয়াবহ সহিংসতায়। একপর্যায়ে বিনা উস্কানিতে পুলিশ বাহিনী আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। চারদিকে আতঙ্ক, চিৎকার আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যান মো: আকাশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এক পর্যায়ে একটি গুলি এসে সোজা তার মুখের বাম পাশের চোয়ালে আঘাত করে। মুহূর্তেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মুখমণ্ডল থেকে রক্ত ঝরতে থাকে, আর অসহনীয় যন্ত্রণা তাকে নিঃশব্দ করে দেয়। এই গুলির আঘাতে তার ৭-৮টি দাঁত সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায় এবং চোয়ালের হাড়ে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি হয়। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন এবং স্বাভাবিকভাবে খাওয়া বা মুখ নড়ানোর ক্ষমতাও ব্যাহত হয়। তবে এখানেই শেষ নয়। একই সময় তার বাম হাতের বাহুতেও আরেকটি গুলি লাগে। এতে হাতের ভেতরের স্নায়ু ও পেশীতে মারাত্মক ক্ষতি হয়। এর ফলে তিনি দৈনন্দিন কাজকর্ম বিশেষ করে রিকশা চালানো বা ভারী কিছু তোলার মতো শ্রমিকের কাজে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েন। আহত অবস্থায় স্থানীয় মানুষদের সহায়তায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে অস্ত্রোপচারের জন্য রেফার করা হয়। এই ঘটনার পর থেকে মো: আকাশ কেবল শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তার অক্ষমতা পুরো পরিবারকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। তার ছোট কন্যা আদিবা, বৃদ্ধ পিতা-মাতা, স্ত্রী ও ছোট বোনের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তায় ঠেকেছে। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করাও তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কীভাবে একটি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নির্মম শিকার হতে পারেন, এবং একটি পরিবার মুহূর্তেই নিরাপত্তা ও জীবনের নিশ্চয়তা হারিয়ে ফেলতে পারে। মো: আকাশ আজও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন শরীরে, মনে ও জীবনে। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ ঘটনার পরপরই আকাশকে গুরুতর আহত অবস্থায় দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নিয়ে যাওয়া হয়। রক্তাক্ত মুখমণ্ডল ও ঝুলে পড়া বাম হাত নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় তার অবস্থাই বলে দিচ্ছিল পরিস্থিতির ভয়াবহতা। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে মুখ ও হাতের ক্ষতস্থানে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। মুখের চোয়ালে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তার কয়েকটি দাঁত সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায় এবং হাড়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে বাম বাহুতে গুলির আঘাতে হাতের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। তবে চিকিৎসকগণ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, তার সুস্থতার জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার এবং পুনর্বাসন প্রয়োজন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছায় যে, উন্নত চিকিৎসার খরচ বহন করা একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে কিছুদিন পর বাধ্য হয়ে আকাশকে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর তিনি বাসায় থেকেই সীমিত পরিসরে মৌলিক ওষুধ এবং সাধারণ চিকিৎসা গ্রহণ করতে শুরু করেন। তবে এই অপ্রতুল চিকিৎসা আকাশের যন্ত্রণাকে লাঘব করতে পারেনি। এখনও তার মুখে দাঁতের ব্যথা, খাবার চিবানোর অসুবিধা এবং নিয়মিত মাথাব্যথা লেগেই থাকে। বাম হাতে তীব্র দুর্বলতা রয়ে গেছে, যার ফলে তিনি রিকশা চালানোর মতো শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করতে পারেন না। এই কারণে সংসারের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি এই দুর্ঘটনার মানসিক প্রভাবও তার জীবনে এক অদৃশ্য কিন্তু তীব্র ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। আগে যে মানুষটি প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে হাসি এনে দিতেন, সেই আকাশ আজ বিছানায় শুয়ে কেবল আর্তনাদ আর হতাশায় ডুবে থাকেন। তার চোখে এখন শুধুই অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা এবং অসহায়ত্ব।
এই ঘটনায় তার পরিবারও চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অক্ষমতা এখন তাদের ভবিষ্যতকে ঘিরে রেখেছে ঘন অন্ধকারে। ছোট কন্যা আদিবার চিকিৎসা, শিক্ষার ভবিষ্যৎ কিংবা বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রয়োজনীয় সেবাও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। প্রস্তাবনা ১. আকাশের চিকিৎসার খরচ বহন করা। ২.জীবিকা নির্বাহের জন্য একটা অটোরিকশা কিনে দেয়া যেতে পারে।
এক নজরে মো: আকাশ
নাম : মো: আকাশ
পিতা : মো: শহিদ, বৃদ্ধ
মাতা : পারভীন বেগম, বৃদ্ধ
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
আহত হওয়ার সময় : ১৪ জুলাই, ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : কাজলা, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা স্থায়ী ঠিকানা : পিরোজপুর সদর, পিরোজপুর
মো: আকাশ ১৯৯৮ সালের ৩১ জুলাই পিরোজপুর জেলার এক শান্ত, সবুজ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবকাল তার কেটেছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ধানক্ষেত, নদী আর কাদামাটির মেঠোপথে গড়া গ্রামীণ জীবনের পরিমণ্ডলে। ছোটবেলা থেকেই তিনি পরিশ্রমী ও আত্মনির্ভরশীল স্বভাবের ছিলেন। যদিও তার শিক্ষাজীবনের সুযোগ সীমিত ছিল, তবুও জীবনের বাস্তবতা তাকে দ্রুত বড় করে তোলে। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে খুব অল্প বয়সেই আকাশ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় চলে আসেন। বর্তমানে তিনি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার কাজলা এলাকায় বসবাস করছেন। ঢাকা শহরের ব্যস্ততম এই এলাকাতেই তার দিন শুরু হয় ভোরের আলো ফোটার আগেই, যখন তিনি রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামেন। প্রতিদিন ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করে তিনি নিজের পরিবারের জন্য সামান্য আয় সংগ্রহ করেন।
তার মাসিক আয় প্রায় ১৫,০০০ টাকা, যা দিয়ে ছয় সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের খরচ মেটানো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তার বাবা মো: শহিদ একজন প্রৌঢ় মানুষ, যিনি বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট পেশায় কর্মরত নন। মা পারভীন একজন গৃহিণী, যিনি ঘরের সব দায়িত্ব পালন করেন। আকাশের ছোট একটি কন্যা সন্তান আছে, নাম আদিবা। এই ছোট শিশুটির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আকাশ প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামে লড়াই করে যাচ্ছেন। রাজধানীর ব্যস্ততম রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত হলেও তিনি হার মানেন না। কারণ তার হৃদয়ে একটাই প্রত্যাশা, পরিবারকে একটু ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা। মো: আকাশের জীবন যেন হাজারো নিম্নবিত্ত শহরবাসীর প্রতিচ্ছবি যারা কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে সমাজের ভার বহন করছেন, অথচ সমাজ তাদের কষ্টগুলো প্রায়ই অদৃশ্য করে রাখে। তবুও আকাশের মতো মানুষগুলো প্রতিদিন ভোরে নতুন আশায় জেগে ওঠেন, কারণ তাদের জীবনের চালিকাশক্তি হলো দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা ও অটুট সংকল্প। পারিবারিক প্রেক্ষাপট মো: আকাশ ছয় সদস্যবিশিষ্ট নিম্ন আয়ের পরিবারে বসবাস করছেন, যার প্রতিটি সদস্যের জীবন-জীবিকা মূলত তার ওপরই নির্ভরশীল।
তার পিতা মো: শহিদ একজন দিনমজুর প্রকৃতির মানুষ। বয়সের ভারে এখন আগের মতো শারীরিক পরিশ্রম করতে না পারলেও তিনি পারিবারিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত নন। মা পারভীন একজন গৃহিণী, যিনি সংসারের প্রতিটি সদস্যের দেখভাল করেন এবং ঘরের ভেতরের যাবতীয় কাজ নিজ হাতে সামলান। আকাশের স্ত্রী একজন সাধারণ গৃহবধূ, যিনি তিন বছরের কন্যা আদিবার যত্ন ও লালন পালনের দায়িত্বে নিয়োজিত। পরিবারে আকাশের আরও দু’টি বোন রয়েছে। বড় বোন তানজিলা (বয়স ২০) বিবাহিত হলেও মাঝে মাঝে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। ছোট বোন তামান্না বর্তমানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। মেয়েটির পড়াশুনা, পোশাক, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয়তার দায়িত্বও আকাশকেই নিতে হয়। এমন এক প্রেক্ষাপটে মো: আকাশ রিকশাচালক হিসেবে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন রাস্তায় নামেন। তার মাসিক আয় প্রায় ১৫,০০০ টাকা, যা এই পরিবারের ছয় সদস্যের খাবার, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, শিশুর পড়াশুনা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে একেবারেই অপ্রতুল। মাসের শেষদিকে খাবার ও ওষুধের খরচ মেটানো দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।
মাঝে মাঝে মেয়ের আবদার কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের অসুস্থতা তাঁকে চরম আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়। তবুও আকাশের সংগ্রামে কোনো বিরতি নেই। প্রতিদিন সকালে ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, দিনভর ঘাম ঝরিয়ে যে আয় করেন তা দিয়েই সংসার চালানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করেন। তার হৃদয়ে কেবল একটাই আশা পরিবারটিকে বাঁচিয়ে রাখা, ছোট মেয়েটিকে শিক্ষিত করে তোলা এবং মায়ের মুখে একটু হাসি ফোটানো। মো: আকাশের জীবন একটি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অসাধারণ সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অভাবের মাঝেও ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং ত্যাগ অনন্য এক মানবিক চিত্র এঁকে দেয়। ঘটনার বিবরণ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তারিখটি মো: আকাশের জীবনে এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা হয়ে রয়ে গেছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, কাজলা এলাকায় সেই দিন ছাত্র ও সাধারণ জনতা শান্তিপূর্ণভাবে কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন। আকাশ, যিনি প্রতিদিনের মতো রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন, সেদিন ঘটনাস্থলের পাশেই অবস্থান করছিলেন। তবে কারও ধারণাও ছিল না যে, সেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ হঠাৎই রূপ নেবে ভয়াবহ সহিংসতায়। একপর্যায়ে বিনা উস্কানিতে পুলিশ বাহিনী আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। চারদিকে আতঙ্ক, চিৎকার আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যান মো: আকাশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এক পর্যায়ে একটি গুলি এসে সোজা তার মুখের বাম পাশের চোয়ালে আঘাত করে। মুহূর্তেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মুখমণ্ডল থেকে রক্ত ঝরতে থাকে, আর অসহনীয় যন্ত্রণা তাকে নিঃশব্দ করে দেয়। এই গুলির আঘাতে তার ৭-৮টি দাঁত সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায় এবং চোয়ালের হাড়ে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি হয়। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন এবং স্বাভাবিকভাবে খাওয়া বা মুখ নড়ানোর ক্ষমতাও ব্যাহত হয়। তবে এখানেই শেষ নয়। একই সময় তার বাম হাতের বাহুতেও আরেকটি গুলি লাগে। এতে হাতের ভেতরের স্নায়ু ও পেশীতে মারাত্মক ক্ষতি হয়। এর ফলে তিনি দৈনন্দিন কাজকর্ম বিশেষ করে রিকশা চালানো বা ভারী কিছু তোলার মতো শ্রমিকের কাজে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েন। আহত অবস্থায় স্থানীয় মানুষদের সহায়তায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে অস্ত্রোপচারের জন্য রেফার করা হয়। এই ঘটনার পর থেকে মো: আকাশ কেবল শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তার অক্ষমতা পুরো পরিবারকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। তার ছোট কন্যা আদিবা, বৃদ্ধ পিতা-মাতা, স্ত্রী ও ছোট বোনের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তায় ঠেকেছে। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করাও তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কীভাবে একটি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নির্মম শিকার হতে পারেন, এবং একটি পরিবার মুহূর্তেই নিরাপত্তা ও জীবনের নিশ্চয়তা হারিয়ে ফেলতে পারে। মো: আকাশ আজও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন শরীরে, মনে ও জীবনে। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ ঘটনার পরপরই আকাশকে গুরুতর আহত অবস্থায় দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নিয়ে যাওয়া হয়। রক্তাক্ত মুখমণ্ডল ও ঝুলে পড়া বাম হাত নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় তার অবস্থাই বলে দিচ্ছিল পরিস্থিতির ভয়াবহতা। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে মুখ ও হাতের ক্ষতস্থানে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। মুখের চোয়ালে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তার কয়েকটি দাঁত সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায় এবং হাড়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে বাম বাহুতে গুলির আঘাতে হাতের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। তবে চিকিৎসকগণ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, তার সুস্থতার জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার এবং পুনর্বাসন প্রয়োজন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছায় যে, উন্নত চিকিৎসার খরচ বহন করা একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে কিছুদিন পর বাধ্য হয়ে আকাশকে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর তিনি বাসায় থেকেই সীমিত পরিসরে মৌলিক ওষুধ এবং সাধারণ চিকিৎসা গ্রহণ করতে শুরু করেন। তবে এই অপ্রতুল চিকিৎসা আকাশের যন্ত্রণাকে লাঘব করতে পারেনি। এখনও তার মুখে দাঁতের ব্যথা, খাবার চিবানোর অসুবিধা এবং নিয়মিত মাথাব্যথা লেগেই থাকে। বাম হাতে তীব্র দুর্বলতা রয়ে গেছে, যার ফলে তিনি রিকশা চালানোর মতো শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করতে পারেন না। এই কারণে সংসারের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি এই দুর্ঘটনার মানসিক প্রভাবও তার জীবনে এক অদৃশ্য কিন্তু তীব্র ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। আগে যে মানুষটি প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে হাসি এনে দিতেন, সেই আকাশ আজ বিছানায় শুয়ে কেবল আর্তনাদ আর হতাশায় ডুবে থাকেন। তার চোখে এখন শুধুই অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা এবং অসহায়ত্ব।
এই ঘটনায় তার পরিবারও চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অক্ষমতা এখন তাদের ভবিষ্যতকে ঘিরে রেখেছে ঘন অন্ধকারে। ছোট কন্যা আদিবার চিকিৎসা, শিক্ষার ভবিষ্যৎ কিংবা বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রয়োজনীয় সেবাও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। প্রস্তাবনা ১. আকাশের চিকিৎসার খরচ বহন করা। ২.জীবিকা নির্বাহের জন্য একটা অটোরিকশা কিনে দেয়া যেতে পারে।
এক নজরে মো: আকাশ
নাম : মো: আকাশ
পিতা : মো: শহিদ, বৃদ্ধ
মাতা : পারভীন বেগম, বৃদ্ধ
পরিবারে সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
আহত হওয়ার সময় : ১৪ জুলাই, ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান : কাজলা, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা স্থায়ী ঠিকানা : পিরোজপুর সদর, পিরোজপুর
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍