সালমান বিন সুয়াইব
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা: ম্যানেজার, ইনভেন্ট ইলেক্ট্রিক কোম্পানি
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম
সালমান বিন সুয়াইব জন্মগ্রহণ করেন ২০০২ সালের ৪ ডিসেম্বর,সিলেট জেলার কোতোয়ালী থানার সদর ইউনিয়নের কাজলশাহ গ্রামে। মাটির গন্ধ মেশানো এই গ্রামেই তাঁর শৈশব পায়ে হেঁটে বেড়িয়েছে। গ্রামীণ প্রকৃতির কোল ঘেঁষে, চিরচেনা গাছপালা আর নিস্তব্ধ ভোরের পাখির ডাকে বড় হয়েছেন তিনি। শৈশব থেকেই সমাজের অসঙ্গতি ও বৈষম্য তাঁকে ভাবিয়ে তুলতো। এক অদ্ভুত প্রতিবাদী চেতনা যেন জন্ম থেকেই তাঁর হৃদয়ে বাস করত।
পারিবারিক জীবন
সালমানের পিতা মো: সুয়াইব ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী কৃষক। কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত আয়ে তিনি পরিবার চালিয়েছেন, সন্তানদের মানুষ করেছেন আদর্শিক ধাঁচে। তবে বর্তমানে তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সালমানের মা কুলসুম আক্তার একজন মমতাময়ী নারী, যিনি একাধারে মায়ের মমতা, শিক্ষিকার অনুপ্রেরণা ও নেত্রীর দৃঢ়তা নিয়ে সন্তানদের নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাসে গড়ে তুলেছেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে সালমান বড়। ছোট ভাই সুলতান বিন সুয়াইব এখনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এই ছোট্ট পরিবারটির জীবনের প্রতিটি দিন কেটেছে সাদামাটা জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে, কিন্তু আদর্শ আর ভালোবাসার ছোঁয়ায় তা হয়ে উঠেছে এক অনন্য জীবনছবি। বর্তমানে, আহত হয়ে কর্মহীন সালমান তাঁর বাবা-মা, ছোট ভাই এবং স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতেই বসবাস করছেন।
কর্ম জীবন
সালমান বিন সুয়াইব কর্মজীবনে ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান পেশাজীবী। তিনি ইনভেন্ট ইলেক্ট্রিক কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। কর্মস্থলে তিনি ছিলেন সৎ, দক্ষ এবং কর্মপ্রেমী। প্রযুক্তিনির্ভর এই পেশায় যুক্ত থেকেও তাঁর অন্তরজুড়ে ছিল দেশ, সমাজ ও মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা।
অফিসের নিয়মিত দায়িত্ব পালনের মধ্যেও তিনি সমাজ ও রাজনীতির ওপর গভীরভাবে চিন্তা করতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর মন ছিল সবসময় জেগে থাকা এক প্রতিবাদ।
সংগ্রামী জীবন
সালমানের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি দেশের রাজপথে নেমে আসেন ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে। নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েও তিনি পিছু হটেননি, ভয়কে পরাজিত করে তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। গুলি, নির্যাতন, রক্তপাত-কোনো কিছুই তাঁর অঙ্গীকারকে দমাতে পারেনি। জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোয় তাঁর সাহসিকতা, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ তাঁকে শুধু একজন সংগ্রামী কর্মী নয়, বরং এক অনন্য যোদ্ধায় রূপ দিয়েছে। তাঁর চেতনা, তাঁর পথচলা আজকের প্রজন্মের চোখে আদর্শ এবং আগামীর প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক।
তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন তরুণের হাতে যদি থাকে দৃঢ় সংকল্প আর হৃদয়ে থাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠা আগুন, তবে সে পারে ইতিহাসের ধারা বদলে দিতে। সালমান বিন সুয়াইবের জীবন তাই শুধু একটি নাম নয়, এটি এক স্লোগান-একটি প্রতিবাদের নাম, একটি সাহসের নাম।
জুলাই যোদ্ধার জবানিতে : এক চোখ হারানো এক বিপ্লবীর লাল রক্তের সাক্ষ্য ১৫ আগস্ট ২০২৪; এই তারিখটি আমার জীবনের ক্যালেন্ডারে শুধুই একটি দিন নয়,এটি এক রক্তাক্ত অধ্যায়, এক ভয়াল স্মৃতি, এক চোখে অন্ধ হওয়ার নির্মম দুঃখগাথা। ওই দিন আমি,একজন সাহসী ছাত্র হিসেবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলাম। পাশে ছিল হাজারো ছাত্র-জনতা, কণ্ঠে ছিল মুক্তির স্লোগান। বেলা প্রায় ১২টা। আন্দোলন চলছিল তীব্র উদ্দীপনায়, রামপুরার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির পেছনের গলিতে আমরা অবস্থান নিয়েছিলাম। হঠাৎ করে শুরু হয় পুলিশের ধাওয়া-সেই পরিচিত রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের উন্মত্ত আঘাত, যেখানে ছাত্রজনতার স্বপ্নকে দমন করতে উদ্যত হয় গুলির সন্ত্রাস। আমিও ছুটছিলাম, চিৎকার করছিলাম, লড়ছিলাম। ঠিক তখনই আমার দিকে তাক করে গুলি চালায় ফ্যাসিস্ট পুলিশ বাহিনী। মুহূর্তেই আমার দৃষ্টিজগৎ অন্ধকার হয়ে যায়-আমি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। সহযোদ্ধারা আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন জানতে পারলাম; আমার ডান চোখটি আর কোনোদিন পৃথিবী দেখবে না। আমার দৃষ্টির একটি দিক চিরতরে হারিয়ে গেছে, কিন্তু আমি দেখতে পেয়েছি এই রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী মুখোশের অন্তরালের নির্মমতা। আমি হারিয়েছি দৃষ্টিশক্তি, কিন্তু পেয়েছি বোধের এক গভীর আলো, যে আলো বলে দেয়; এই রাষ্ট্র ছাত্রদের শুধু দমন করতে জানে, শোষণের প্রতিবাদ মানেই তাদের চোখ উপড়ে ফেলা। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ শুধু কণ্ঠ রোধ করে না, তা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গিলে খায়, চোখের আলো নিভিয়ে দেয়, হৃদয়ের স্পন্দনে আতঙ্ক ঢেলে দেয়। আমি সেই আতঙ্কের প্রত্যক্ষ সাক্ষী, সেই অন্ধ চোখে আজো দেখতে পাই শোষকের গুলি, নিপীড়কের মুখোশ এবং ছাত্র জনতার প্রতিবাদের আগুন।
আমার চোখ গেছে, কিন্তু বিবেক জেগে আছে। আমি জানি, আমাদের এই যাত্রা থেমে নেই। যতদিন একজন ছাত্রও বেঁচে থাকবে, ততদিন এই চোখহারা বিপ্লবীর রক্তক্ষরণ বৃথা যাবে না। ফ্যাসিবাদের গুলিতে চোখ হারানো এক প্রতিবাদীর করুণ স্বীকারোক্তি- ডান চোখে আমার মোট পাঁচটি অপারেশন হয়েছে। প্রতিবারই একটিই আশা নিয়ে ছুরি-কাঁচির নিচে গিয়েছি- হয়তো আবার দেখতে পারব, আবার পৃথিবীর আলো ফিরবে আমার চোখে। কিন্তু না, সেই আলো আর ফেরেনি। সরকার একপর্যায়ে আমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠায়। সেখানেও চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করেন, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা কাজে লাগানো হয়, কিন্তু শেষমেশ তারা জানিয়ে দেন-এই চোখের দৃষ্টিশক্তি আর কখনোই ফিরবে না। আজ আমি ডান চোখে সম্পূর্ণ অন্ধ। যেদিকে একদিন স্বপ্ন দেখতাম, আজ সেদিকটাই অন্ধকার। আর যেটুকু দৃষ্টি বেঁচে আছে, সেই বাম চোখেও মাঝে মাঝে তীব্র যন্ত্রণা হয়। চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে, যেন চোখ নয়, সেখানে জমে আছে রক্তাক্ত প্রতিবাদের ভার। আমার চোখ হারানোর পেছনে আছে এক রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের লালচে ছায়া, যে ছায়া শুধু চোখ কাড়ে না, কাড়ে স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। আমি হয়তো আর দু’চোখে পৃথিবী দেখতে পারব না, কিন্তু আমার বিবেক এখন আগের চেয়ে অনেক স্পষ্টভাবে দেখতে পায়-এই রাষ্ট্র কাদের জন্য,কারা শাসক আর কারা শোষিত। এ চোখ হারানো কোনো ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি একটি জাতির ওপর রাষ্ট্রীয় দমননীতির দগদগে চিহ্ন। অর্থনৈতিক বর্ণনা গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে আমি একটি ইলেকট্রিক কোম্পানিতে ম্যানেজার পোস্টে ছিলাম ঢাকা বাড্ডায়। ওইখানে আমার বেতন ছিল ২৫ হাজার। আমার পরিবারের ৫ সদস্যকে আমি একাই ভরণপোষণ করতাম, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে আমার চাকরি হারাই, বর্তমানে আমার পরিবার চলে আমার বাবার নিজস্ব জায়গাটা ভাড়া দিয়ে মাসে ১৫০০০ টাকা ভাড়া পান, এটা আমাদের পরিবারের জন্য ৫ জন সদস এর জন্য খুব কঠিন।
জুলাই ফাউন্ডেশন এবং সরকার থেকে সবকিছু মিলিয়ে ৩ লক্ষ টাকা সাহায্য পেয়েছি চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কি ধরণের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: ম্যানেজার, ইনভেন্ট ইলেক্ট্রিক কোম্পানি। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরি বা ব্যবসার মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
এক নজরে সালমান বিন সুয়াইব
নাম : সালমান বিন সুয়াইব
জন্ম তারিখ : ০৪/১২/২০০২
জন্মস্থান : সিলেট
পেশা : ম্যানেজার, ইনভেন্ট ইলেক্ট্রিক কোম্পানি
স্ত্রীর নাম : জেরিন আক্তার
স্ত্রীর পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ২৩
নিজ জেলা : সিলেট
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : ম্যানেজার, ইনভেন্ট ইলেক্ট্রিক কোম্পানি
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: কাজলশাহ্, ইউনিয়ন: সিলেট সদর, থানা: কোতয়ালি, জেলা: সিলেট
বর্তমান ঠিকানা : ঐ
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: সুয়াইব
পিতার পেশা ও বয়স : অসুস্থ, ৫৫
মায়ের নাম : কুলসুম আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৭
মাসিক আয় : ১৫০০০
আয়ের উৎস : জায়গা ভাড়া
বাড়ির বিবরণ : সেমিপাকা
সম্পদের পরিমাণ : ১০ শতক
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫জন
ভাই বোনদের নাম
১. সুলতান বিন সুয়াইব, বয়স: ০৮ পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ১ম, সম্পর্ক: ভাই
আহতের চিত্র
আহত হওয়ার স্থান : জহুরুল সিটি, আফতাব নগর, রামপুরা ইস্ট ওয়েস্ট ভার্সিটির পিছনের গলিতে
তারিখ ও সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪ বেলা ১২.০০ টার সময় আক্রমণকারী : পুলিশ ও আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসী কর্তৃক
আঘাতের ধরণ : রামপুরা ইস্ট ওয়েস্ট ভার্সিটির পিছনের গলিতে পুলিশ আমাকে গুলি করলে আমার ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায় চিকিৎসা : আমার ডান চোখে মোট ৫টি অপারেশন হয়েছে, সরকার থেকে উন্নতি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল বর্তমান অবস্থা : তার ডান চোখ একেবারেই ডেমেজ হয়ে গেছে এখন আর দেখতে পান না
সালমান বিন সুয়াইব জন্মগ্রহণ করেন ২০০২ সালের ৪ ডিসেম্বর,সিলেট জেলার কোতোয়ালী থানার সদর ইউনিয়নের কাজলশাহ গ্রামে। মাটির গন্ধ মেশানো এই গ্রামেই তাঁর শৈশব পায়ে হেঁটে বেড়িয়েছে। গ্রামীণ প্রকৃতির কোল ঘেঁষে, চিরচেনা গাছপালা আর নিস্তব্ধ ভোরের পাখির ডাকে বড় হয়েছেন তিনি। শৈশব থেকেই সমাজের অসঙ্গতি ও বৈষম্য তাঁকে ভাবিয়ে তুলতো। এক অদ্ভুত প্রতিবাদী চেতনা যেন জন্ম থেকেই তাঁর হৃদয়ে বাস করত।
পারিবারিক জীবন
সালমানের পিতা মো: সুয়াইব ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী কৃষক। কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত আয়ে তিনি পরিবার চালিয়েছেন, সন্তানদের মানুষ করেছেন আদর্শিক ধাঁচে। তবে বর্তমানে তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সালমানের মা কুলসুম আক্তার একজন মমতাময়ী নারী, যিনি একাধারে মায়ের মমতা, শিক্ষিকার অনুপ্রেরণা ও নেত্রীর দৃঢ়তা নিয়ে সন্তানদের নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাসে গড়ে তুলেছেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে সালমান বড়। ছোট ভাই সুলতান বিন সুয়াইব এখনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এই ছোট্ট পরিবারটির জীবনের প্রতিটি দিন কেটেছে সাদামাটা জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে, কিন্তু আদর্শ আর ভালোবাসার ছোঁয়ায় তা হয়ে উঠেছে এক অনন্য জীবনছবি। বর্তমানে, আহত হয়ে কর্মহীন সালমান তাঁর বাবা-মা, ছোট ভাই এবং স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতেই বসবাস করছেন।
কর্ম জীবন
সালমান বিন সুয়াইব কর্মজীবনে ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান পেশাজীবী। তিনি ইনভেন্ট ইলেক্ট্রিক কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। কর্মস্থলে তিনি ছিলেন সৎ, দক্ষ এবং কর্মপ্রেমী। প্রযুক্তিনির্ভর এই পেশায় যুক্ত থেকেও তাঁর অন্তরজুড়ে ছিল দেশ, সমাজ ও মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা।
অফিসের নিয়মিত দায়িত্ব পালনের মধ্যেও তিনি সমাজ ও রাজনীতির ওপর গভীরভাবে চিন্তা করতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর মন ছিল সবসময় জেগে থাকা এক প্রতিবাদ।
সংগ্রামী জীবন
সালমানের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি দেশের রাজপথে নেমে আসেন ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে। নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েও তিনি পিছু হটেননি, ভয়কে পরাজিত করে তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। গুলি, নির্যাতন, রক্তপাত-কোনো কিছুই তাঁর অঙ্গীকারকে দমাতে পারেনি। জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোয় তাঁর সাহসিকতা, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ তাঁকে শুধু একজন সংগ্রামী কর্মী নয়, বরং এক অনন্য যোদ্ধায় রূপ দিয়েছে। তাঁর চেতনা, তাঁর পথচলা আজকের প্রজন্মের চোখে আদর্শ এবং আগামীর প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক।
তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন তরুণের হাতে যদি থাকে দৃঢ় সংকল্প আর হৃদয়ে থাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠা আগুন, তবে সে পারে ইতিহাসের ধারা বদলে দিতে। সালমান বিন সুয়াইবের জীবন তাই শুধু একটি নাম নয়, এটি এক স্লোগান-একটি প্রতিবাদের নাম, একটি সাহসের নাম।
জুলাই যোদ্ধার জবানিতে : এক চোখ হারানো এক বিপ্লবীর লাল রক্তের সাক্ষ্য ১৫ আগস্ট ২০২৪; এই তারিখটি আমার জীবনের ক্যালেন্ডারে শুধুই একটি দিন নয়,এটি এক রক্তাক্ত অধ্যায়, এক ভয়াল স্মৃতি, এক চোখে অন্ধ হওয়ার নির্মম দুঃখগাথা। ওই দিন আমি,একজন সাহসী ছাত্র হিসেবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলাম। পাশে ছিল হাজারো ছাত্র-জনতা, কণ্ঠে ছিল মুক্তির স্লোগান। বেলা প্রায় ১২টা। আন্দোলন চলছিল তীব্র উদ্দীপনায়, রামপুরার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির পেছনের গলিতে আমরা অবস্থান নিয়েছিলাম। হঠাৎ করে শুরু হয় পুলিশের ধাওয়া-সেই পরিচিত রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের উন্মত্ত আঘাত, যেখানে ছাত্রজনতার স্বপ্নকে দমন করতে উদ্যত হয় গুলির সন্ত্রাস। আমিও ছুটছিলাম, চিৎকার করছিলাম, লড়ছিলাম। ঠিক তখনই আমার দিকে তাক করে গুলি চালায় ফ্যাসিস্ট পুলিশ বাহিনী। মুহূর্তেই আমার দৃষ্টিজগৎ অন্ধকার হয়ে যায়-আমি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। সহযোদ্ধারা আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন জানতে পারলাম; আমার ডান চোখটি আর কোনোদিন পৃথিবী দেখবে না। আমার দৃষ্টির একটি দিক চিরতরে হারিয়ে গেছে, কিন্তু আমি দেখতে পেয়েছি এই রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী মুখোশের অন্তরালের নির্মমতা। আমি হারিয়েছি দৃষ্টিশক্তি, কিন্তু পেয়েছি বোধের এক গভীর আলো, যে আলো বলে দেয়; এই রাষ্ট্র ছাত্রদের শুধু দমন করতে জানে, শোষণের প্রতিবাদ মানেই তাদের চোখ উপড়ে ফেলা। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ শুধু কণ্ঠ রোধ করে না, তা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গিলে খায়, চোখের আলো নিভিয়ে দেয়, হৃদয়ের স্পন্দনে আতঙ্ক ঢেলে দেয়। আমি সেই আতঙ্কের প্রত্যক্ষ সাক্ষী, সেই অন্ধ চোখে আজো দেখতে পাই শোষকের গুলি, নিপীড়কের মুখোশ এবং ছাত্র জনতার প্রতিবাদের আগুন।
আমার চোখ গেছে, কিন্তু বিবেক জেগে আছে। আমি জানি, আমাদের এই যাত্রা থেমে নেই। যতদিন একজন ছাত্রও বেঁচে থাকবে, ততদিন এই চোখহারা বিপ্লবীর রক্তক্ষরণ বৃথা যাবে না। ফ্যাসিবাদের গুলিতে চোখ হারানো এক প্রতিবাদীর করুণ স্বীকারোক্তি- ডান চোখে আমার মোট পাঁচটি অপারেশন হয়েছে। প্রতিবারই একটিই আশা নিয়ে ছুরি-কাঁচির নিচে গিয়েছি- হয়তো আবার দেখতে পারব, আবার পৃথিবীর আলো ফিরবে আমার চোখে। কিন্তু না, সেই আলো আর ফেরেনি। সরকার একপর্যায়ে আমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠায়। সেখানেও চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করেন, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা কাজে লাগানো হয়, কিন্তু শেষমেশ তারা জানিয়ে দেন-এই চোখের দৃষ্টিশক্তি আর কখনোই ফিরবে না। আজ আমি ডান চোখে সম্পূর্ণ অন্ধ। যেদিকে একদিন স্বপ্ন দেখতাম, আজ সেদিকটাই অন্ধকার। আর যেটুকু দৃষ্টি বেঁচে আছে, সেই বাম চোখেও মাঝে মাঝে তীব্র যন্ত্রণা হয়। চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে, যেন চোখ নয়, সেখানে জমে আছে রক্তাক্ত প্রতিবাদের ভার। আমার চোখ হারানোর পেছনে আছে এক রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের লালচে ছায়া, যে ছায়া শুধু চোখ কাড়ে না, কাড়ে স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। আমি হয়তো আর দু’চোখে পৃথিবী দেখতে পারব না, কিন্তু আমার বিবেক এখন আগের চেয়ে অনেক স্পষ্টভাবে দেখতে পায়-এই রাষ্ট্র কাদের জন্য,কারা শাসক আর কারা শোষিত। এ চোখ হারানো কোনো ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি একটি জাতির ওপর রাষ্ট্রীয় দমননীতির দগদগে চিহ্ন। অর্থনৈতিক বর্ণনা গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে আমি একটি ইলেকট্রিক কোম্পানিতে ম্যানেজার পোস্টে ছিলাম ঢাকা বাড্ডায়। ওইখানে আমার বেতন ছিল ২৫ হাজার। আমার পরিবারের ৫ সদস্যকে আমি একাই ভরণপোষণ করতাম, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে আমার চাকরি হারাই, বর্তমানে আমার পরিবার চলে আমার বাবার নিজস্ব জায়গাটা ভাড়া দিয়ে মাসে ১৫০০০ টাকা ভাড়া পান, এটা আমাদের পরিবারের জন্য ৫ জন সদস এর জন্য খুব কঠিন।
জুলাই ফাউন্ডেশন এবং সরকার থেকে সবকিছু মিলিয়ে ৩ লক্ষ টাকা সাহায্য পেয়েছি চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা পূর্ণ চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত ফলোআপ ও মেডিকেল মনিটরিং।
পূর্বে কি ধরণের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন: ম্যানেজার, ইনভেন্ট ইলেক্ট্রিক কোম্পানি। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরির ব্যবস্থা, চাকরি বা ব্যবসার মাধ্যমে চিকিৎসা ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক দায়িত্ব বিবেচনায় মানবিক সহায়তা।
এক নজরে সালমান বিন সুয়াইব
নাম : সালমান বিন সুয়াইব
জন্ম তারিখ : ০৪/১২/২০০২
জন্মস্থান : সিলেট
পেশা : ম্যানেজার, ইনভেন্ট ইলেক্ট্রিক কোম্পানি
স্ত্রীর নাম : জেরিন আক্তার
স্ত্রীর পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ২৩
নিজ জেলা : সিলেট
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : ম্যানেজার, ইনভেন্ট ইলেক্ট্রিক কোম্পানি
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: কাজলশাহ্, ইউনিয়ন: সিলেট সদর, থানা: কোতয়ালি, জেলা: সিলেট
বর্তমান ঠিকানা : ঐ
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: সুয়াইব
পিতার পেশা ও বয়স : অসুস্থ, ৫৫
মায়ের নাম : কুলসুম আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৭
মাসিক আয় : ১৫০০০
আয়ের উৎস : জায়গা ভাড়া
বাড়ির বিবরণ : সেমিপাকা
সম্পদের পরিমাণ : ১০ শতক
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫জন
ভাই বোনদের নাম
১. সুলতান বিন সুয়াইব, বয়স: ০৮ পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: ১ম, সম্পর্ক: ভাই
আহতের চিত্র
আহত হওয়ার স্থান : জহুরুল সিটি, আফতাব নগর, রামপুরা ইস্ট ওয়েস্ট ভার্সিটির পিছনের গলিতে
তারিখ ও সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪ বেলা ১২.০০ টার সময় আক্রমণকারী : পুলিশ ও আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসী কর্তৃক
আঘাতের ধরণ : রামপুরা ইস্ট ওয়েস্ট ভার্সিটির পিছনের গলিতে পুলিশ আমাকে গুলি করলে আমার ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায় চিকিৎসা : আমার ডান চোখে মোট ৫টি অপারেশন হয়েছে, সরকার থেকে উন্নতি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল বর্তমান অবস্থা : তার ডান চোখ একেবারেই ডেমেজ হয়ে গেছে এখন আর দেখতে পান না
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍