হোম / আহতদের তালিকা / খলিলুর রহমান
খলিলুর রহমান

খলিলুর রহমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ব্যবসা (বস্ত্র)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

খলিলুর রহমানের জন্ম ১৯৮৯ সালের ৬ জুন, জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার কোনা মালঞ্চ গ্রামে। তার পিতা মো. আব্দুল মজিদ শেখ ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক এবং মা মোসাম্মাৎ কোহিনুর বেগম গৃহিণী। গ্রামীণ জীবনের কষ্ট, শৃঙ্খলা এবং সংগ্রামের ভিতরেই তার শৈশব কেটেছে। অর্থনীতিেিত অনার্স-মাস্টার্স পাশ করেও আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে কোন চাকুরি পানি। শিক্ষার প্রতি আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক অনটনের কারণে তাকে অল্প বয়সেই জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়। তার পরিবারে ছিল ৬ জন সদস্য। সবাই মিলেই ছিল একে অপরের শক্তি ও ভরসা। ছোটবেলায় নিজের গ্রামে একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করলেও পরবর্তীতে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ায় মাধ্যমিক স্তরে আর যেতে পারেননি। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে তিনি জীবন সংগ্রামে নেমে পড়েন। তার জীবনের প্রতিটি ধাপেই আছে কষ্ট, দায়িত্ব এবং আত্মত্যাগের গল্প। গ্রামে থাকাকালীন সময়ে তিনি স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ছিলেন একজন পরিশ্রমী যুবক হিসেবে। ছোট ছোট কাজ করে সংসারে সাহায্য করতেন এবং পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকতেন। তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজে কিছু করবেন। নির্ভরশীলতা নয়, আত্মনির্ভরতায় পথ খুঁজবেন। সে পথই তাকে পরবর্তীতে ব্যবসার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু গ্রামের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে শহরের দিকে পা বাড়ান তিনি। জীবন যেখানে সংগ্রামের সমার্থক, সেখানেই খলিলুর রহমান হয়ে ওঠেন এক সাহসী নাম।
কর্ম
খলিলুর রহমানের জীবনের কর্মপরিক্রমা শুরু হয় একেবারে নিচু স্তর থেকে। শৈশব থেকেই নানা প্রকার শ্রম দিয়ে সংসারের পাশে দাঁড়ান তিনি। কৈশোরে টিউশনি, কৃষিকাজ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার দিকে ঝুঁকলেও, তার ইচ্ছা ছিল নিজে কিছু গড়ে তোলার। ২০১৯ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে জামালপুরে একটি ক্ষুদ্র কাপড়ের দোকান শুরু করেন। শুরুতে মূলধন ছিল না, একটি ছোট টেবিল ও কয়েক গজ কাপড় দিয়ে বাজারে বসে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু তার সততা, পরিশ্রম এবং আন্তরিকতার ফলে ধীরে ধীরে দোকানটি মানুষের আস্থা অর্জন করে। তিনি নিজ হাতে দোকান চালাতেন, কাপড় কেটে দিতেন, হিসেব রাখতেন এবং বিক্রিও করতেন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে সময় দিতেন। দোকানের আয়ে সংসারের ব্যয় বহনের পাশাপাশি তিনি নিজের দুই সন্তান খাদিজা ও মুজাহিদের লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। জীবনে বড় কিছু করতে না পারলেও তিনি চাইতেন তার সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে সমাজে ভালো কিছু করুক। কাপড়ের দোকান ছিল তার জীবনের ভিত্তি সেখানে জড়িয়ে ছিল তার স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস এবং সংসারের অস্তিত্ব। কিন্তু ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনা সেই স্বপ্নের জায়গাটিকেই ভস্ম করে দেয়। আগুনে দগ্ধ হওয়ার পর থেকে দোকান পরিচালনা একরকম অসম্ভব হয়ে পড়ে। এখন একজন কর্মীকে দিয়ে দোকান চালাতে হচ্ছে, অথচ সে যেমন করে চায়, তেমন করে চলতে পারছে না। কর্মসংস্থানে ফেরার স্বপ্নটাও এখন শুধুই তার চোখের জলেই সীমাবদ্ধ।
পারিবারিক বর্ণনা
খলিলুর রহমানের পরিবার একটি সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। তার পিতা আব্দুল মজিদ শেখ একজন বয়স্ক অবসরপ্রাপ্ত কৃষক এবং মা কোহিনুর বেগম গৃহিণী। পরিবারে তিনি ছাড়াও আছেন তার স্ত্রী এবং দুই সন্তান। বড় মেয়ে খাদিজা জান্নাত খুশি বর্তমানে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে, আর ছোট ছেলে মুজাহিদুর রহমান মাত্রই প্লে গ্রুপে ভর্তি হয়েছে। পরিবারটি বরাবরই আত্মনির্ভরশীল ছিল। খলিলুর রহমান নিজের পরিশ্রমেই ঘর চালাতেন, সন্তানদের পড়াশোনা করাতেন এবং পিতামাতার খরচও চালাতেন। স্ত্রী গৃহিণী হিসেবে সংসার দেখাশোনা করতেন। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয়জন হওয়ায় খরচও ছিল যথেষ্ট। কিন্তু খলিলুর রহমান কখনও কারো কাছে হাত পাতেননি। দোকানের আয় দিয়েই সংসার চালিয়ে যেতেন। ঈদে বাচ্চাদের নতুন জামা, ছুটির দিনে ঘুরতে যাওয়া, স্কুল ফি সবই ছিল তার জীবনের নিয়মিত অংশ। তবে আগুনে দগ্ধ হওয়ার পর এই ছন্দ ভেঙে যায়। এখন পরিবারটি ঋণের বোঝায় জর্জরিত, তার চিকিৎসা খরচে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা লেগেছে, যার মধ্যে ২ লক্ষ টাকা ধার করা। পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে আগলে রাখলেও, বাস্তবতার ভারে অনেক কিছুই আজ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ, স্ত্রী ও মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে খলিলুর রহমান এখন শুধুই প্রার্থনা করেন কিছুটা সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরতে পারবেন কি না।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশে বৈষম্য, দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে এক অসাধারণ ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন শুরু হয়। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সরকারি নিপীড়ন, পুলিশ হেফাজতে হত্যা, গুম, এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনরোষ। এই আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ পথে নামে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও একটি জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু সাধারণ জনগণও এতে একাত্ম হয়ে পড়ে। জামালপুরেও ছাত্র-জনতা সম্মিলিতভাবে মিছিল শুরু করে। এই আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক সচেতনতা ও ন্যায়বিচারের চেতনাভিত্তিক। খলিলুর রহমানও একজন সাধারণ ব্যবসায়ী হয়েও এই আন্দোলনের নৈতিকতাকে সমর্থন করেন। তিনি মনে করতেন, একটি দেশের উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন তার জনগণ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে, বেঁচে থাকতে পারে সম্মানের সঙ্গে। চার আগস্ট থেকে তিনি নিজেই এলাকার যুবকদের নিয়ে মিছিল শুরু করেন। আন্দোলনের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ছিল ব্যক্তিগত নয়। বরং দেশের ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু একটি পরিকল্পিত আগুনের ঘটনায় তিনি নিজেই হয়ে যান নির্যাতনের শিকার। এই ঘটনা আন্দোলনের এক করুণ চিত্র হয়ে রয়ে যায়।
আন্দোলনে যোগদান
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ফ্যাসিবাদ আন্দোলনে খলিলুর রহমান সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন চার আগস্ট থেকে। জামালপুরের হাজরাবাড়ি এলাকায় তিনি স্থানীয় যুবকদের সংগঠিত করেন এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে মিছিলের আয়োজন করেন। পাঁচ আগস্ট দুপুর ১:৩০ মিনিটের দিকে আন্দোলনকারীরা যখন হাজরাবাড়ি পৌর আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন আওয়ামী-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ককটেল বোমা নিক্ষেপ করে। সেই আগুন ভুলবশত খলিলুর রহমানের শরীরের উপর এসে পড়ে। তীব্র আগুনে মুহূর্তে তার জামা-কাপড় পুড়ে যায় এবং দগ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীরা তাকে উদ্ধার করে জামালপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
আহত পরবর্তী জীবন
আগুনে দগ্ধ হওয়ার পর খলিলুর রহমানের জীবন এক ভয়ানক মোড় নেয়। প্রথম সাত দিন জামালপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে এক মাস ছয় দিন ধরে একাধিক সার্জারি করা হয় গলা, হাত ও পায়ের চামড়া প্রতিস্থাপন, ক্ষত পরিষ্কার, এবং রক্ত সঞ্চালনের অপারেশন। ৩৬ দিন পর বাড়িতে ফিরলেও তার জীবন আর আগের মতো থাকেনি। প্রথম ২১ দিন তিনি হাঁটতে পারেননি, এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহে তার ড্রেসিং করতে হয় এবং নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ ও মলম ব্যবহার করতে হয়। রাতভর ব্যথায় ঘুমাতে পারেন না, শরীরের বিভিন্ন অংশ ফোলা থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শে তার জন্য বিশেষ পোশাক কিনতে হয়, যার দাম ১৬ হাজার টাকা। এই পোশাক সারাদিন শরীরে লাগিয়ে রাখতে হয়। বর্তমানে তিনি নিজ দোকানে যেতে পারেন না। একজন কর্মী রেখেছেন। তবে তিনি মনমতো চালাতে পারছেন না। চিকিৎসা ও সংসারের খরচ মিলিয়ে তিনি এক রকম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি চিন্তিত। চিকিৎসা চলমান থাকায় জীবন এখন শুধুই ব্যথা, ঋণ আর অনিশ্চয়তায় মোড়ানো।
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
খলিলুর রহমানের চিকিৎসা এক দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল প্রক্রিয়া। জামালপুর সদর হাসপাতাল থেকে শুরু করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি ছিলেন ৩৬ দিন। এ সময় তার তিনবার সার্জারি করা হয়। গলা, হাত ও পায়ের পুড়ে যাওয়া চামড়া প্রতিস্থাপন, ক্ষতস্থানে ইনজেকশন এবং সপ্তাহে দু’বার ড্রেসিং এই সবকিছু মিলিয়ে চিকিৎসা ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় তিন লক্ষ টাকা। চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে তার পরিবার ২ লক্ষ টাকা ঋণ করে। বর্তমানে তিনি প্রতি মাসে ২ বার ডাক্তার দেখান, ৯০০ টাকার মলম ব্যবহার করেন এবং প্রতি মাসে ১ হাজার টাকার ব্যান্ডেজ বা চিকিৎসা উপকরণ কিনতে হয়। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, তার ইনজেকশন নেয়ার দরকার হবে ছয় মাস পর, আর এক বছর পর আবার অপারেশন করতে হতে পারে। চিকিৎসা করতে গিয়ে তিনি অনেকবার হাসপাতালে যাওয়া-আসা করেছেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। এখন তার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো উন্নত চিকিৎসা ও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটে ভর্তি হওয়া এবং সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে থাকা এটাই তার পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ।
প্রস্তাবনা
১. উন্নত বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। তার শরীর এখনও আক্রান্ত, ফোলা ভাব ও ব্যথা রয়ে গেছে। উন্নত চিকিৎসা ছাড়া সুস্থ হওয়া সম্ভব নয়।
২. চিকিৎসায় ৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে পরিবার বর্তমানে ঋণগ্রস্ত। চিকিৎসা, ইনজেকশন, ওষুধের খরচ বহনে সরকার বা এনজিও সহায়তা দরকার।
৩. দোকান চালিয়ে সংসার চালানোর জন্য তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা ও মানসিক পুনর্বাসন, তার ট্রমা ও কষ্ট লাঘবে কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সহায়তা দরকার।

এক নজরে পরিচিতিনাম : খলিলুর রহমান
জন্ম : ০৬/০৬/১৯৮৯
জন্মস্থান : মেলান্দহ
পেশা : ব্যবসা (বস্ত্র)
নিজ জেলা : জামালপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: কোনা মালঞ্চ, ইউনিয়ন: হাজরাবাড়ি, থানা: মেলান্দহ, জেলা: জামালপুর

পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো. আব্দুল মজিদ শেখ (৭০)
মায়ের নাম : মোসাম্মাৎ কোহিনুর বেগম (৬০)
মাসিক আয় : ৩০.০০০ টাকা
আয়ের উৎস : ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. খাদিজা জান্নাত খুশি, বয়স ১০, ৩য় শ্রেণি
২. মুজাহিদুর রহমান, বয়স ৫, ছাত্র, শ্রেণি: প্লে

ঘটনার স্থান : হাজরাবাড়ি পৌর আওয়ামী লীগ অফিস সংলগ্ন, মেলান্দহ, জামালপুর
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১:৩০ মিনিট

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍