হোম / আহতদের তালিকা / মো. শরিফুল ইসলাম
মো. শরিফুল ইসলাম

মো. শরিফুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষকতা, প্রতিষ্ঠান: আল বেরুনি নূরানি ক্যাডেট হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও প্রাইভেট হাসপাতালের মালিক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শরিফুল ইসলামের জন্ম ১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি, শেরপুর জেলার শেরপুর সদর উপজেলার রউহা পাড়া গ্রামে। গ্রামটি মূলত কৃষিপ্রধান, সাধারণ মানুষের জীবনযাপন এখানে বিনম্র, পরিশ্রমনির্ভর এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে গঠিত। তাঁর বাবা মো. মোজাফফর আলী একজন কৃষক, যিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় মাঠে-ঘাটে হালচাষ, ধান লাগানো, ফসল তোলা আর বাজারে বিক্রির মধ্যে অতিবাহিত করেছেন। বাবার বয়স বর্তমানে ৫৭ বছর। মা মোছা. সরলা বেগম একজন গৃহিণী, যার বয়স ৫০। তিনি পরিবারে ধর্মীয় পরিবেশ, শৃঙ্খলা এবং স্নেহময় বন্ধনের বাহক। এই পরিবারে ছোটবেলা থেকেই শরিফুল ইসলাম পরিশ্রম, ধৈর্য ও আত্মনির্ভরতার শিক্ষা পান। জমি চাষের ফাঁকে বাবার সঙ্গে ক্ষেতখামারে কাজ করলেও লেখাপড়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনো হালকা হয়নি। তিনি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়, ও কলেজ থেকে শিক্ষাজীবন সূচনা ও ইতি টানেন। তাঁর চরিত্র গঠন, জীবনচর্চা ও আদর্শিক ভিত্তি পরিবার থেকেই গড়ে ওঠে। মা-বাবা তাকে শিখিয়েছেন সত্য বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং মেহনতকে ভয় না পাওয়া। শরিফুল ইসলাম বরাবরই সহজ-সরল জীবনযাপন পছন্দ করেন। তিনি পরিবারকেই নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে মানেন। তাঁর মতে, “আমার পরিবারই আমার প্রেরণা, আমার অস্তিত্ব।” রউহাপাড়ার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত একজন নম্র, সহানুভূতিশীল ও সাহায্যপ্রবণ মানুষ হিসেবে। গ্রামের ছোট-বড় কেউ অসুস্থ হলে কিংবা কোনো শিক্ষার্থী পড়ালেখার খরচে সমস্যায় পড়লে শরিফুল ইসলাম স্বাভাবিকভাবেই পাশে দাঁড়ান। তাঁর পরিবার এখনো সেই পুরনো রউহাপাড়ায় বসবাস করে, কিন্তু কাজের প্রয়োজনে তিনি নিজে বর্তমানে জামালপুর সদর থানার নান্দিনা পশ্চিম বাজারে বসবাস করছেন। তবে শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক তিনি কখনো ছিন্ন করেননি। সময় পেলেই চলে যান নিজের গ্রামে, বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে, বোনকে দেখতে কিংবা গ্রামীণ সমাজের সাথে নিজের আত্মিক বন্ধন মজবুত করতে। এই পারিবারিক পটভূমি শরিফুল ইসলামকে আজকের এই সাহসী মানুষে রূপান্তর করেছে। রাজনৈতিক হামলার শিকার হওয়ার পরও তিনি তাঁর পারিবারিক শিক্ষা, মূল্যবোধ ও আত্মমর্যাদাকে অটুট রেখেছেন। জন্ম, পিতৃপরিচয় ও গ্রামীণ শেকড়ই আজ তাঁর আত্মার ভিত, যে ভিত তাঁকে মজবুত রেখেছে সব রক্তাক্ত মুহূর্তেও।
পেশা ও জীবনধারা


মো. শরিফুল ইসলাম তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন শিক্ষকতাকে। এ পেশা শুধু তাঁর রুটি-রুজির উৎস নয়, এটি তাঁর জীবনের আদর্শ, আত্মার ধর্ম। তিনি বর্তমানে কর্মরত “আল বেরুনি নূরানী ক্যাডেট হাফিজিয়া মাদ্রাসায়”, যা একটি সম্মানজনক ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেখানে তিনি ছাত্রদের শিক্ষকতার পাশাপাশি চরিত্র গঠনে মনোযোগী হয়ে কাজ করছেন। তাঁর শিক্ষাদান কেবল পাঠ্যবইতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শিক্ষা দেন সততা, ন্যায়বিচার ও আলোকিত জীবনের। তাঁর ছাত্ররা তাকে শুধুমাত্র শিক্ষক নয়, অভিভাবক হিসেবেও দেখে। একজন শিক্ষক হয়েও শরিফুল ইসলাম এখানেই থেমে থাকেননি। সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে তিনি একটি ছোট প্রাইভেট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটি বৃহৎ পরিসরে হাসপাতাল না হলেও এলাকার গরিব মানুষদের জন্য এটি অনেক বড় আশ্রয়। সেখানে একজন স্বাস্থ্য সহকারী ও একজন প্যাথলজিস্টের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। দরিদ্র রোগীদের জন্য ওষুধের খরচ, চিকিৎসা ফি, সবই তিনি নিজ দায়িত্বে বহন করেন, যদি তাদের পক্ষে খরচ চালানো অসম্ভব হয়। তাঁর এই উদ্যোগ গ্রামের মানুষের কাছে মানবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বর্তমানে তিনি পরিবারসহ জামালপুর সদর থানার নান্দিনা পশ্চিম বাজার এলাকায় বসবাস করছেন। এলাকার মানুষ তাকে একজন নিষ্ঠাবান মানুষ হিসেবে জানে, যার জীবনজুড়ে আছে ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার। তাঁর জীবনযাত্রা অত্যন্ত সরল, অহংবোধ থেকে মুক্ত। তিনি সাধারণ কাপড় পরেন, সাধারণ ঘরে থাকেন এবং সাধারণ খাবার খেয়ে জীবন কাটান। কিন্তু তাঁর চিন্তা-ভাবনা, সামাজিক মনন এবং দৃঢ়তা অত্যন্ত উচুঁস্তরের। শিক্ষকতার পাশাপাশি শরিফুল ইসলাম নিজে ছাত্রদের লেখাপড়ার খরচ বহন করেন, এমনকি কিছু এতিম ছেলেকে মাদ্রাসায় বিনামূল্যে পড়ান। তাঁর বোন মাহাফুজা সিদ্দিকাও তাঁর সুশিক্ষার ধারাবাহিকতায় উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়ন করছে এবং তাঁর ছেলেও এখন স্কুলের শুরুতে পা রেখেছে। পরিবারের শিক্ষাগত অগ্রগতির পেছনে তাঁর এই পেশাগত সততা ও আত্মত্যাগই মূল চালিকা শক্তি। শিক্ষকতা ও সমাজসেবার মাধ্যমে তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছে: “জীবনের লক্ষ্য যদি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি, তবে পেশাও হতে হবে তাঁর পথে এক অনুসন্ধান”। এই বিশ্বাসই তাঁকে বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। শরিফুল ইসলামের জীবনধারা একজন সমাজ সংস্কারকের। তিনি কখনো কোনো দলের রাজনীতিতে জড়াননি, কিন্তু ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নে কখনো চুপ থাকেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, শিক্ষক মানেই কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়, সমাজ গঠনে নেতৃত্বদান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং তরুণদের আদর্শ পথে চালিত করাও তার দায়িত্ব। এই চেতনার মাধ্যমেই তিনি নিজের অস্তিত্ব গড়ে তুলেছেন একজন সৎ শিক্ষক ও মানবতার সেবকের রূপে। যার কাছে শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, জীবনবোধের এক প্রজ্বলিত শিখা।
পারিবারিক দায়িত্ব


মো. শরিফুল ইসলামের জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তাঁর ছোট পরিবার। মাত্র তিনজন সদস্য নিয়ে গঠিত এই পরিবার। তাঁর ছয় বছর বয়সী ছেলে, আঠারো বছর বয়সী একমাত্র ছোট বোন এবং তিনি নিজে। এই ক্ষুদ্র, কিন্তু গভীর ভালোবাসায় গড়া পরিবারই তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি। শিক্ষকতার মতো সম্মানজনক অথচ অর্থনৈতিকভাবে সীমিত আয়ের পেশা থেকে তিনি প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছেন পরিবারের জন্য। তাঁর ছেলে তাওসিফ বিন শরিফ, এখন প্রথম শ্রেণির ছাত্র। ছোট্ট এই শিশু এখনো পুরো পৃথিবী চিনে ওঠেনি, কিন্তু বাবার আদর্শ ও স্নেহময় উপস্থিতিতে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে মানবিক ও ঈমানদার চরিত্রে। শরিফুল ইসলাম চেষ্টা করেন প্রতিদিনই ছেলের লেখাপড়ার খোঁজখবর রাখতে, স্কুলশেষে তাকে একটু গল্প শোনাতে এবং কুরআনের কিছু অংশ শিখাতে। কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও সন্তানের ভবিষ্যতকে আলোকিত করতে তিনি নিজের আরাম ও প্রয়োজনকে উৎসর্গ করে। অন্যদিকে, তাঁর একমাত্র বোন মাহাফুজা সিদ্দিকা একজন একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। সে একজন মেধাবী ও লক্ষ্যে দৃঢ় মেয়ে, যাকে শরিফুল ইসলাম নিজের হাতে মানুষ করেছেন। বাবা-মা বয়সের ভারে গ্রামে অবস্থান করলেও বোনের পড়ালেখার সুব্যবস্থা করার জন্য তিনি তাকে নিজের সাথেই রাখেন। তাঁর স্বপ্ন, মাহাফুজা একদিন উচ্চশিক্ষা লাভ করে একজন আদর্শ নারী হিসেবে গড়ে উঠবে, সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে। এই দুইজনকে ঘিরেই শরিফুল ইসলামের প্রতিদিনের সংগ্রাম। খাবার, চিকিৎসা, বই-খাতা, স্কুল ফি সবই আসে তাঁর শিক্ষকতার সামান্য আয় থেকে। কোনো মাসে একটু বাড়তি খরচ হলে তিনি নিজের প্রয়োজন কমিয়ে খেয়ে, কম পরিধান করে তা সামাল দেন। সন্তানের জন্য তিনি বিনা দ্বিধায় নিজের চিকিৎসাও পিছিয়ে দেন। শরিফুল ইসলামের সংসারে নেই কোনো বিলাসিতা, নেই অবসর বিলাস বা ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা। কিন্তু যা আছে, তা হলো ভালোবাসা, দায়িত্ব ও পরম নির্ভরতা। তিনি নিজে সন্তান ও বোনকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেন, যেন তারা ভবিষ্যতে সত্য ও ইনসাফের পথে হাঁটে। তিনি বিশ্বাস করেন, “একজন শিক্ষক নিজের সন্তান ও ছাত্রকে আলাদাভাবে না; যার যত দায়িত্ব, তার প্রতি ততই ভালোবাসা থাকা উচিত”। তাই তিনি নিজের সন্তানের পাশাপাশি তাঁর ছাত্রদের প্রতিও পালন করেন পিতৃসুলভ দায়িত্ব। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কখনো অভিযোগ করেন না। বরং বলেন, “আল্লাহ্ আমাকে দুইজন মানুষ দিয়েছেন, তাদের সেবা করার তাওফিক দিয়েছেন এটাই আমার জীবনের বড় নিয়ামত।” এই পরিবারই এখন তাঁর একমাত্র ভরসা, একমাত্র স্বপ্ন, এবং একমাত্র শক্তি। এই তিনজনের মধ্যে দৃঢ় এক বন্ধন, যেখানে আছে স্নেহ, ত্যাগ আর প্রতিশ্রুতি। এই পারিবারিক দায়িত্বই আজ শরিফুল ইসলামকে যুগোপযোগী, আদর্শ শিক্ষক এবং সংগ্রামী মানুষে পরিণত করেছে।
হামলার প্রেক্ষাপট


২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকাল ৮টা ৩০ মিনিট। জামালপুর সদর থানার নান্দিনা মহল্লার পূর্ব বাজার এলাকার ব্র্যাক রোড। মো. শরিফুল ইসলাম প্রতিদিনের মতোই তাঁর দৈনন্দিন কাজ শুরু করেন। একজন শিক্ষক হিসেবে সকালে ছাত্রদের পড়াতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক এমন সময়, একদল ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় ক্যাডার তাঁর নাম ধরে ডাকতে থাকে। তাদের মধ্যে ছিলো পরিচিত সন্ত্রাসী আরাফাত, শ্যামল, আকাশ ও মারুফ। যাদের রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য। প্রথমে তাঁকে “দুই মিনিট কথা আছে” বলে পাশের রাস্তায় ডেকে নেয়। শরিফুল ইসলাম বুঝতে পারেননি কী অপেক্ষা করছে সামনে। যাওয়ার পর তিনি দেখেন, দু’টি প্রাইভেট কারে আগুন জ্বলছে। চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, মানুষের ভিড় নেই, দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করেছে। তাঁকে রাস্তায় নিয়ে গিয়ে আচমকাই মাথায় ঘুষি মারা হয়। মাথার আঘাতে তিনি মাটিতে পড়ে যান। এরপরই শুরু হয় নারকীয় নির্যাতন। রাস্তার উপর পড়ে থাকা একজন শিক্ষককে প্রায় ১০ মিনিট ধরে রড, লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। পিটুনির সঙ্গে চলতে থাকে হুমকি, কটুক্তি, প্রশ্ন “তুই কি আন্দোলনে টাকা দিস?” “তোর মাদ্রাসা ছাত্ররা মিছিলে যায় কেন? তুই কি ছাত্রদের জাগাচ্ছিস?”এমন সব জিজ্ঞাসাবাদ চলতে থাকে। শরিফুল ইসলাম কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারেন না, কারণ ব্যথা আর ভয় দুটোই তাঁর শরীরকে পঙ্গু করে দিয়েছে। পিঠ, পাজর, হাঁটু, মাথা সব জায়গায় আঘাতের চিহ্ন জমতে থাকে। আশেপাশের কেউ সাহস করে এগিয়ে আসেনি। এই হামলা ছিল সুপরিকল্পিত, বর্বর এবং রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায় পরিচালিত। নির্যাতনের একপর্যায়ে স্থানীয় একজন চেয়ারম্যানের ছেলে বিষয়টি দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে। নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে সে শরিফুল ইসলামকে একটি রিকশায় বসিয়ে জামালপুর সদর হাসপাতালের উদ্দেশ্যে পাঠায়। রিকশার ভেতরেই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এই হামলার পেছনের মূল কারণ ছিলো তাঁর শিক্ষার্থী ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট তরুণদের দ্বারা গঠিত এক নিরীহ আন্দোলনে তাঁর নৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ সন্দেহ করছিল, তিনি আন্দোলনকারীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের সচেতন করছেন, এবং চুপচাপভাবে সামান্য অর্থ দিয়ে সহায়তা করছেন। তাঁর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে সরকার একটি বার্তা দিতে চেয়েছিল- “কেউ আন্দোলনের পাশে দাঁড়ালে এমন পরিণতি হবে।” একজন নিরীহ শিক্ষককে রাস্তায় পিটিয়ে রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠী তার দমননীতি আরও একবার প্রমাণ করে দেয়। এই হামলার ভয়াবহতা শুধু তাঁর শরীরকেই থামিয়ে দেয়নি, তা সমাজে এক ভয়াবহ বার্তা ছড়িয়ে দেয়। যেখানে শিক্ষকও আর নিরাপদ নয়, যদি তিনি ছাত্রদের পাশে থাকেন। তবু এ ঘটনার মধ্যেও শরিফুল ইসলাম সাহস হারান না। তাঁর কণ্ঠে আজও প্রতিধ্বনিত হয়: “আমাকে মারো, কিন্তু আমি ছাত্রদের ভালোবাসা বন্ধ করবো না।”
চিকিৎসা ও পরবর্তী অবস্থা



৪ আগস্টের নির্মম হামলার পর মো. শরিফুল ইসলামকে অচেতন অবস্থায় স্থানীয় চেয়ারম্যানের ছেলের সাহায্যে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। জামালপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসকরা তাকে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করেন। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর আঘাত, বিশেষ করে মাথার আঘাত ছিল সবচেয়ে উদ্বেগজনক। হাসপাতালের অবস্থান ও চিকিৎসা সুযোগ সীমিত হওয়ায় দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে স্থানীয় পর্যায়ে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় শরিফুল ইসলামের শারীরিক অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। মাথায় আঘাতের কারণে তিনি প্রায় সময় মাথাব্যথায় ভুগছিলেন। রক্তস্বল্পতা ও পেটের বিভিন্ন জায়গায় রডের আঘাতের কারণে অসুবিধা হচ্ছিল। চিকিৎসকরা তাকে রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে রক্তদান, পেইনকিলার ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। তিনি প্রায় ২০ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকেন। এই দীর্ঘসময় শরিফুল ইসলাম নিজের জীবনের জন্য লড়াই চালিয়ে যান।
শরীরের শারীরিক আঘাত কিছুটা সেরে গেলেও তাঁর মস্তিষ্কের ওপর আঘাতের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। নিয়মিত মাথাব্যথা, মাঝে মাঝে মাথা ঘোরা, চোখের ধোঁয়াশা ও মানসিক চাপের কারণে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারছেন না। চিকিৎসকরা বারবার পরামর্শ দেন, উন্নত মানের সিটি স্ক্যান ও নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। মানসিকভাবে শরিফুল ইসলাম কঠিন চাপে রয়েছেন। নির্যাতনের স্মৃতি ও সামাজিক অন্যায়ের বেদনায় তার মেজাজ ও উদ্বিগ্নতা লক্ষ্য করা যায়। মাঝে মাঝে তিনি বিষণ্নতায় ভোগেন, ঘুম ঠিকমতো হয় না। তবে তাঁর দৃঢ় মনোবল তাঁকে হাল ছেড়ে দিতে দেয় না। শিক্ষকতা ও পারিবারিক দায়িত্ব পালন করলেও শারীরিক দুর্বলতার কারণে কাজের গতি অনেকটাই কমে গেছে। মাথাব্যথা ও দুর্বলতার কারণে দীর্ঘ সময় পড়াতে পারছেন না। সন্তান ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তিনি সময়মতো নিজেকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করছেন। একজন শিক্ষক, যিনি শান্তিপূর্ণভাবে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছেন, তাঁকে এই অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধার করতে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন শরিফুল ইসলাম। তাঁর মুখে বারংবার শোনা যায়, “আমি আমার শিক্ষা ও মানবতার জন্য লড়েছি, এই আঘাত আমাকে থামাতে পারবে না।” এই প্রত্যয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক নতুন শক্তি, যা তাকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনবে।
নির্যাতনের কারণ



মো. শরিফুল ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী নন। তিনি কখনো কোনো মিছিলে সম্মুখ সারিতে থাকেননি, মাইক হাতে বক্তব্য দেননি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক পোস্ট দেন না। তবে তাঁর অপরাধ তিনি একদল ছাত্রের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই ছাত্ররা ছিলো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা। প্রান্তিক ও নিপীড়িত শ্রেণির প্রতিনিধি, যারা ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অংশ। এদের কেউ কেউ তাঁর মাদ্রাসার ছাত্র। শরিফুল ইসলাম নিজের অবস্থান থেকে যে কাজটি করেছেন, তা হলো আর্থিক, নৈতিক এবং মানবিক সহায়তা। কারো বই কেনার টাকা নেই তিনি টাকা দিয়েছেন। কারো মিছিল শেষে রাতে ঘরে ফেরার বাসভাড়া নেই? তিনি ব্যবস্থা করেছেন। কোনো আহত ছাত্রকে হাসপাতালে নিতে কেউ আগায়নি? তিনি নিজে গিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন। এমনকি তাঁর মাদ্রাসা থেকেও কিছু ছাত্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। এ সব কিছুর কারণে তিনি স্থানীয় আওয়ামী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। স্থানীয় যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতাদের সন্দেহ ছিল, এই শিক্ষক আন্দোলনের "মদদদাতা"। এক শিক্ষকের হাতে যদি ছাত্রদের চেতনা জাগে, তা সরকারের জন্য হুমকি হতে পারে। এমন চিন্তাধারাই তাদেরকে হিংস্র করে তোলে। শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিক তল্পিবাহকরা তাঁকে “অর্থনৈতিক সহায়তাকারী” বলে চিহ্নিত করে এবং তাঁর উপর নজর রাখে। ৪ আগস্টের হামলা ছিল সেই দীর্ঘ পরিকল্পনার পরিণতি। তাঁকে অপমান করে, পিটিয়ে, আতঙ্কিত করে তাঁরা চেয়েছে আর কেউ যেন সাহস না পায় ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর। এটি ছিল একটি প্রকাশ্য হুমকি পুরো সমাজের উদ্দেশ্যে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ও যুব সংগঠনের সদস্যরা চায়নি, কেউ একজন মানুসিকভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াক। তাঁর পিটুনির সময় তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয় “তুই কত টাকা দিছিস ছাত্রদের?” “কতজন তোর মাদ্রাসা থেকে আন্দোলনে গিয়েছে?” এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতেই তাঁকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। এ প্রশ্নের মাধ্যমে তাঁর শিক্ষকতা ও মানবতার উপরই আঘাত হানা হয়। তাঁর উপর চালানো নির্যাতন একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল সততা, মানবতা এবং ছাত্রমুখীতা দমন করা। তিনি বলেন, “আমি ছাত্রদের পক্ষে ছিলাম, আছি, থাকবো। আমার অপরাধ, আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলাম।”
এখানে রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীনদের নগ্ন প্রতিশোধস্পৃহা প্রকাশ পায়, যেখানে একজন সাধারণ শিক্ষককেও রেহাই দেয়া হয় না। নির্যাতনের এই কারণটি প্রকাশ করে দেয়, দেশ আজ এমন এক পরিণতিতে পৌঁছেছে, যেখানে শিক্ষকের মানবিকতা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ।
অবস্থান ও প্রতিজ্ঞা


আঘাতের দাগ শরীরে, কিন্তু প্রতিজ্ঞার আগুন তাঁর চোখে। মো. শরিফুল ইসলাম আজও সাহস নিয়ে বলেন, “তারা চেয়েছিল আমাকে ভেঙে ফেলতে, কিন্তু আমি ভাঙিনি।” তিনি বর্তমানে শিক্ষকতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যদিও শারীরিকভাবে দুর্বল। নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং তিনি আজ আরও দৃঢ় মনোভাবে বিশ্বাস করেন, একজন শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠদান নয়, বরং অন্যায়-অনিয়ম-অসাম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াও তাঁর দায়িত্ব। তিনি স্কুলে ছাত্রদের শিখিয়ে চলেছেন সত্য বলার সাহস, প্রতিবাদ করার শক্তি, আর ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য। তিনি মনে করেন, এই সময়েই শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজ সচেতন মানুষদের উচিত তরুণদের পাশে দাঁড়ানো। সরকার ও তাদের দলীয় বাহিনী তাঁকে নির্যাতন করে এই বার্তা দিতে চেয়েছিল “তোমরা কেউ-ই নিরাপদ না।” কিন্তু তিনি এই বার্তা ফিরিয়ে দেন আরও শক্তিশালী বার্তায়। “যতবার তোমরা একজন শিক্ষককে পেটাবে, ততবার আরও হাজার শিক্ষক জেগে উঠবে।” তিনি ছাত্রদের ভালোবাসেন, কারণ ছাত্ররাই দেশ গড়বে। তিনি বলেন, “ছাত্রদের চেতনায় যদি আলোর সঞ্চার হয়, তবে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে পারে না।” এই বিশ্বাস তাঁকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আজও তিনি তাঁর ছেলেকে সামনে বসিয়ে বলেন, “সত্যের পথে থেকে যা, কখনো ভয় পাবি না।” এবং তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বারবার বলেন, “যারা জুলুম করে, তারা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু যারা সত্যকে আঁকড়ে ধরে, তাদের নাম ইতিহাসে লেখা থাকে।” নির্যাতিত হয়েও তিনি থেমে যাননি, বরং এক নীরব প্রতিরোধের নাম হয়ে উঠেছেন।

একনজরে আহত ব্যক্তির পরিচিতি
নাম : মো. শরিফুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ০১-০১-১৯৯৬
জন্মস্থান : শেরপুর সদর, শেরপুর
পেশা : শিক্ষকতা, প্রতিষ্ঠান: আল বেরুনি নূরানি ক্যাডেট হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও প্রাইভেট হাসপাতালের মালিক
নিজ জেলা : শেরপুর
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: রৌহা গড়পা, ইউনিয়ন: রউহা, থানা: শেরপুর সদর, জেলা: শেরপুর
বর্তমান ঠিকানা : মহল্লা নান্দিনা, পশ্চিম বাজার, থানা: সদর, জেলা: জামালপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো. মোজাফফর আলী
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৭
মায়ের নাম : মোছা. সরলা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫০
মাসিক আয় : ৫০,০০০ টাকা
আয়ের উৎস : চাকরি ও ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
সন্তান ও বোনের বিবরণ
১. মো. তাওসিফ বিন শরিফ, বয়স: ৬, ছাত্র, শ্রেণি: ১ম, সম্পর্ক: ছেলে
২. মোসা. মাহাফুজা সিদ্দিকা বয়স: ১৮, ছাত্রী, শ্রেণি: দ্বাদশ, ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস কলেজ, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : পূর্ববাজার, ব্রাক রোড, নন্দিনা
আক্রমণকারী : ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, রেজিম যুবলীগ, ও সন্ত্রাস ছাত্রলীগ ও তার নেতা-কর্মী আরাফাত, শ্যামল, আকাশ ও মারুফ
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ৮.৩৭টা

অর্থনৈতিক প্রস্তাবনা
১. উন্নত চিকিৎসার জন্য এককালীন চিকিৎসা তহবিল প্রদান
২. প্রাইভেট হাসপাতাল পরিচালনার জন্য সহায়তা
৩. ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা ও খাদ্যের জন্য শিক্ষা ভাতা
৪. বছর ও মাসে পুনর্বাসন ভাতা চালু
৫. “আহত শিক্ষক কল্যাণ প্রকল্পে” অন্তর্ভুক্ত করে স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍