হোম / আহতদের তালিকা / মো. ইমরান
মো. ইমরান

মো. ইমরান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ছাত্র ও শিক্ষক (কোচিং সেন্টার)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো. ইমরান, জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার তারতাপাড়া গ্রামের এক মেধাবী ছাত্র। যিনি জন্মগ্রহণ করেন ২০০৩ সালের ৩ মার্চ। জীবিকার তাগিদে পড়ালেখার পাশাপাশি একটি বেসরকারি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করতেন। স্বপ্ন দেখতেন পরিবারের হাল ধরার। কিন্তু সব স্বপ্ন থেমে যায় ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যায়, আশুলিয়ার বাইপাইল থানার পাশে পুলিশের গুলিতে তার স্বপ্ন থমকে দাঁড়ায়। পুলিশের গুলি সরাসরি আঘাত করে তার মস্তিষ্কে।

ইমরানের পরিবার চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তার পিতা বিল্লাল (৪৫) একজন সামান্য রিকশাচালক, মা নাসিমা আক্তার (৩৫) গৃহিণী। সংসারে সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। সেদিন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ইমরান পুলিশের গুলির শিকার হন। মাথায় গুলির আঘাতে তার মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেই থেকে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। ইমরানের চিকিৎসা চালিয়ে নিতে তার পিতাকে নিজের রিক্সাটিও বিক্রি করে দিতে হয়েছে। আয়বিহীন এক দুর্বিষহ জীবনে পরিবারের বোঝা হয়ে দিন পার করছেন ইমরান।

আন্দোলনের রক্তাক্ত প্রতিচ্ছবি
জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার তারতাপাড়া গ্রামের তরুণ ইমরান। পরিবারে বড় ছেলে হিসেবে কাঁধে ছিল দায়িত্বের ভার। শিক্ষকতা করে পরিবারের আয়ের একটি বড় অংশ যোগাড় করতেন। পাসপোর্ট করার জন্য আন্দোলনের ঠিক কিছুদিন আগেই ঢাকায় আসেন তিনি। তখনই দেশজুড়ে শুরু হয় উত্তাল জুলাই আন্দোলন। ঢাকায় অবস্থানকালে অস্থায়ী একটি চাকরিতে যোগ দেন ইমরান। সে সময় তিনি আশুলিয়া থানার পাশের একটি এলাকায় বসবাস করছিলেন। ২০২৪ সালের ৪ আগস্টে জুলাই আন্দোলনে অংশ নিতে রাস্তায় নামেন তিনি। দুপুর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে বাসায় ফিরে খানিক বিশ্রাম নেন। কিন্তু বিকেলের দিকে বাইরে গুলির শব্দ শুনে আবার ফিরে যান আন্দোলনস্থলে। সন্ধ্যার দিকে উত্তেজনা চরমে ওঠে। একপাশে ছিল পুলিশ, অন্যপাশে ছাত্ররা। ইমরান তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। ঠিক সে মুহূর্তেই পাশের একটি ছাদ থেকে পুলিশ গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। একটি গুলি সরাসরি এসে আঘাত করে ইমরানের মাথায়। মুহূর্তেই তিনি নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপরের কিছুই তিনি মনে করতে পারেন না। সন্ধ্যায় তার গ্রামের বাড়িতে ভাগ্নের ফোন নম্বরে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। যেখানে জানানো হয়, ইমরান গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সহযোদ্ধারা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে নিয়ে যান।

চিকিৎসার ভারে ভেঙে পড়া এক পরিবার
৪ আগস্ট মাথায় গুলি লাগার পর স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে একটি পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে নিতে চেষ্টা করেন, কিন্তু সেখানে তাকে ভর্তি নেয়া হয়নি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বাড়তে থাকলে শেষমেশ রাত বারোটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে রাতেই জরুরি অপারেশন শুরু হয়, যা টানা সকাল সাতটা পর্যন্ত চলে। মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে তিনি পরবর্তী ১৫ থেকে ২০ দিন কোনো কথা বলতে পারেননি। বিশ দিন পর তিনি প্রথমবারের মতো কথা বলেন, কিন্তু তার মধ্যে স্বাভাবিকতা আর ফিরে আসেনি।
ইমরান এক সময় স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ছিলেন পরিবারের ভরসা। কিন্তু ব্রেনে আঘাত লাগার ফলে তিনি এখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। মাঝে মাঝে তার আচরণ এতটাই অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে যে, তাকে সামলানো কঠিন হয়ে যায়। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে তিনি চার লাখ টাকা সহায়তা পেলেও এখন পর্যন্ত চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। পরিবারটি এখন ঋণে জর্জরিত। তার মস্তিষ্কের আঘাতে মাথার অর্ধেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে শুধু চামড়ার আবরণে ঢাকা মাথা, খুলির অংশ এখনও হাসপাতালে সংরক্ষিত আছে। মানসিক ও নিউরোসার্জারি বিশেষজ্ঞদের অধীনে তার চিকিৎসা চললেও এই চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল। নিয়মিত ওষুধ ও সেবা ছাড়া ইমরানের সুস্থতা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু তার দরিদ্র পরিবারের পক্ষে চিকিৎসার ভার বহন করা একেবারেই অসম্ভব। ইমরান এখন রাষ্ট্রের সহিংসতার শিকার হয়ে, জীবনের সব স্বপ্ন হারিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে।
ইমরান শুধু একজন ছাত্র কিংবা শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক স্বপ্নবাজ তরুণ, যিনি ন্যায়বিচারের আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে আজ নিজেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। তার পুনর্বাসন ও চিকিৎসা এখন মানবিক দায়, রাষ্ট্রের প্রতি এক অনিবার্য দায়িত্ব। ইমরানের এই বিপর্যয় শুধু তার একার নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও দায়হীনতার প্রতিচ্ছবি। তার পুনর্বাসন আজ শুধু করুণা নয়, এটি একটি ন্যায্য অধিকার।

জুলাই আন্দোলন ২০২৪
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক গণ আন্দোলনের সাক্ষী হয়। সারা দেশের ছাত্র-জনতা, শ্রমজীবী মানুষ, নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ সবাই রাস্তায় নেমেছিল গড়ার স্বপ্ন নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। সেই স্বপ্নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ, পুলিশি দমননীতি এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের ভয়ঙ্কর নির্যাতন। এই আন্দোলনের হৃদয়ে ছিলেন একদল স্বপ্নবাজ তরুণ, যারা বুক চিতিয়ে বলেছিল, “এই দেশ আমাদের, এই রাষ্ট্র আমাদের স্বপ্নের ধারক হওয়া উচিত।” মোঃ ইমরান ছিলেন তেমনই একজন তরুণ, যিনি শিক্ষকতা করতেন, পরিবারে ছিলেন বড় সন্তান, দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী। কিন্তু রাষ্ট্রের গুলিতে তার জীবন হয় বিপন্ন। গুলির আঘাতে ইমরান এখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। চিকিৎসার পরেও তার মস্তিষ্কের একটি বড় অংশ আর কখনোই স্বাভাবিক হবে না। সেই ইমরান, যার চোখে ছিল পরিবর্তনের আলো, আজ নিজের নামও ঠিকমতো বলতে পারেন না।
ইমরান একজনের নাম নয়, তিনি একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা চেয়েছিল শোষণহীন, ন্যায়ভিত্তিক সাম্যের বাংলাদেশ। যারা বুক পেতে দিয়েছিল গুলির সামনে, মাথা পেতে দিয়েছিল লাঠির আঘাতে, শুধু যেন মানুষের ভোট, মত প্রকাশ ও জীবনের অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়। জুলাই আন্দোলনের শহীদ, আহত ও নিখোঁজ তরুণেরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, গণতন্ত্র কোনো আমলাতান্ত্রিক নথিপত্রে টিকে থাকে না; গণতন্ত্র গড়ে ওঠে রক্ত, ঘাম, আর নির্ভীক চেতনায়। রাষ্ট্র যদি এই আত্মত্যাগকে ভুলে যায়, তাহলে তার ভিত্তি আরও দুর্বল হবে।
ইমরানদের স্বপ্নই একদিন সত্য হবে, এ আশাই ভবিষ্যতের আশ্রয়।




একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো. ইমরান
জন্ম তারিখ : ০৩/০৩/২০০৩
জন্মস্থান : তারতাপাড়া, মাদারগঞ্জ, জামালপুর
পেশা : ছাত্র ও শিক্ষক (কোচিং সেন্টার)
নিজ জেলা : জামালপুর
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: তারতাপাড়া, ইউনিয়ন: তারতাপাড়া, উপজেলা: মাদারগঞ্জ, জেলা: জামালপুর

পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : বিল্লাল, বয়স: ৪৫, পেশা: রিকশাচালক
মায়ের নাম : নাসিমা আক্তার, বয়স: ৩৫, পেশা: গৃহিণী
মাসিক আয় : ৮ হাজার টাকা (অনিয়মিত)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ০৫ জন

ভাই-বোনের বিবরণ
১. সিয়াম, বয়স: ১৭, পেশা: ছাত্র (বর্তমানে পড়াশুনা বন্ধ), শ্রেণি: ৯ম, সম্পর্ক: ভাই
২. সুমাইয়া, বয়স: ০৮, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি-নূরানী মাদ্রাসা, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : আশুলিয়া থানা সংলগ্ন
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, সন্ধ্যা: ৬.০০টা
আক্রমণকারী : আশুলিয়া থানার পুলিশ বাহিনী

পুনর্বাসনভিত্তিক প্রস্তাবনা রয়েছে
১. পুনর্বাসন ভাতা চালু করা
২. বাবার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা
৩. চিকিৎসার জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্ড প্রদান

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍