হোম / আহতদের তালিকা / নিজাম উদ্দিন সুফেল
নিজাম উদ্দিন সুফেল

নিজাম উদ্দিন সুফেল

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

নিজাম উদ্দিন সুফেল কুমিল্লার এক পরিশ্রমী ও ধর্মভীরু তরুণ, যিনি ঢাকায় ইলেকট্রিক দোকানে কাজ করে পরিবারকে সহায়তা করতেন। ৪ আগস্ট ২০২৪ বংশালের শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের গুলিতে তাঁর গলায় গুরুতর আঘাত লাগে। দীর্ঘ চিকিৎসা, ব্যথা ও কাজের অক্ষমতার মধ্যে তিনি মানসিক ও আর্থিক সংকটে পড়েন।

এখন ছোট ফেরি-ব্যবসা চালিয়ে কঠিন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন, চিকিৎসা সহায়তা ও একটি স্থায়ী ব্যবসা গড়ার স্বপ্নে আগ্রহী। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হালাল উপার্জনে মা-বাবাকে ওমরাহ করানো।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

বংশালের শান্তিপূর্ণ মিছিলে
আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হানা
নিজাম উদ্দিন সুফেল
ক্রমিক: ০১৩
আইডি: ঢাকা সিটি ০১৩
জন্ম
মোঃ নিজাম উদ্দিন সুফেল ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার অন্তর্গত নাঙ্গলকোট থানার বটতলী ইউনিয়নের জিনিয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এক ধর্মভীরু, পরিশ্রমী, স্বপ্নবান তরুণ। তার পিতা জসিম উদ্দিন পেশায় একজন কৃষক, যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন মাঠে-ঘটে। তার মা মাছুমা বেগম একজন গৃহিণী, যার সমস্ত মনোযোগ ছিল পরিবারের প্রতি নিবেদিত। নিজাম একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছেন, যার রুটি-রুজির পথ সোজা ছিল না। ভাই-বোনদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বড় ভাই রুবেল একজন প্রবাসী, আর ছোট দুই বোন নাজমিন ও নাহিদা বর্তমানে শিক্ষা জীবনে রয়েছে। এ পরিবারের ভিত গড়া হয়েছিল সংগ্রাম, সাহস আর পরিশ্রম দিয়ে।
ঢাকায় আগমন ও কর্মজীবনের শুরু
নিজাম ঢাকায় এসেছেন জীবিকার তাগিদে। গ্রামে কৃষিকাজ করে কিংবা পড়াশোনা করে যে স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তা বুঝেই তিনি শহরে পা রাখেন। ওয়ারী এলাকায় বসবাস শুরু করে তিনি একটি ইলেকট্রিক সামগ্রীর দোকানে চাকরি নেন। যদিও আয়ের পরিমাণ ছিল খুব সীমিত প্রায় ১০,০০০ টাকা। তবুও সেই অর্থ দিয়েই তিনি নিজ পরিবারকে কিছুটা সহায়তা করতেন। নিজাম স্বপ্ন দেখতেন নিজে দোকান দেওয়ার। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। কিন্তু শহরের অস্থির বাস্তবতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আঘাতপ্রাপ্ত জীবন সে স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়েছে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিজাম উদ্দিন সুফেল একাত্ম হন। যদিও তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তবুও তার মধ্যে ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা। যেহেতু দোকানের মালিক আন্দোলনের দিনগুলোতে অধিকাংশ সময় দোকান বন্ধ রাখতেন, সেই সুযোগেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। নিজের আয় না থাকা অবস্থাতেও নিজের জীবনকে বাজি রেখে তিনি রাস্তায় নেমে আসেন।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়াবহ ঘটনা
৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টার দিকে বংশাল এলাকায় একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নেন নিজাম। হঠাৎ করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সেই মিছিল লক্ষ্য করে গুলি চালায়। একটি গুলি এসে সরাসরি তার গলার বাম পাশে বিদ্ধ হয়। মুহূর্তে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই হামলার কোনো ন্যায্যতা ছিল না। তিনি নিরস্ত্র, সাধারণ একজন নাগরিক। ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তার 'অপরাধ'। এমন নিষ্ঠুর ও অমানবিক ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে তার সারা শরীর।
চিকিৎসা-হয়রানি ও হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকেরা তখনও পরিস্থিতি ভয়াবহ বলেই তাকে ভর্তি না করে ৬ ঘণ্টা রেখে ছেড়ে দেন। তার গলার ভেতরে গুলিবিদ্ধ ছিল, অথচ তাকে কেবল ইনজেকশন ও স্যালাইন দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে বাসায় নিয়ে যাওয়ার দু'দিন পর মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয় ড্রেসিং করাতে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে পুনরায় স্যালাইন দিয়ে কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়। টানা দেড় মাস ধরে খণ্ড খণ্ড চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এখনো তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন। গলার ভেতরের ক্ষত এখনো মাঝে মাঝে ব্যথা, জ্বর ও দুর্বলতা সৃষ্টি করে।
শারীরিক ও মানসিক ক্ষয়
আজও গলার ভেতরের ক্ষত তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। মাঝে মাঝে এত তীব্র ব্যথা উঠে যে, তিনি কোনো কাজেই মন দিতে পারেন না। গলায় রয়ে যাওয়া ক্ষতের কারণে ডাক্তার বলেছেন ভবিষ্যতে কোনো ভারী কাজ করা যাবে না। শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও তিনি বিপর্যন্ত। জীবনের নিরাপত্তা নেই, আয় নেই, পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সামর্থ্য নেই।
জীবনের পুনরায় শুরু ও লড়াই
অনেক কষ্ট করে তিনি ছোট একটি ইলেকট্রিক সামগ্রীর ফেরি ব্যবসা শুরু করেছেন। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পণ্য বিক্রি করেন। কখনো লাভ হয়, কখনো হয় না। কিন্তু নিজের উপর বিশ্বাস রেখে লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যবসাই এখন তার একমাত্র ভরসা। তার মনেপ্রাণে ইচ্ছা একদিন এই দোকান বড় হবে, নিজের নামে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দোকান হবে, যেটা দিয়ে শুধু নিজের পরিবার নয়, অন্যদেরও সহায়তা করতে পারবেন।
একটি পবিত্র স্বপ্ন ওমরাহ হজ্ব
নিজামের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, তিনি হালাল টাকা উপার্জন করে পিতা-মাতাকে ওমরাহ হজ্ব করাতে চান। এই স্বপ্নটা তাকে প্রতিদিন পথ চলার অনুপ্রেরণা দেয়। তিনি চান, এই কষ্টার্জিত অর্থ দিয়েই মা-বাবাকে নিয়ে মক্কার পথে যাত্রা করবেন, কাবা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলবেন "আল্লাহ, আমি পেরেছি, আমি হালাল পথে চলেছি, তাদের স্বপ্ন পূরণ করেছি।" নিজাম উদ্দিনের গুলির আঘাতে শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, কিন্তু মনুষ্যত্ববোধ হারাননি। তার পবিত্র স্বপ্ন আছে, পরিশ্রমের শক্তি আছে, কষ্টের ইতিহাস আছে। এ জাতি যদি নিজামের মতো তরুণদের পাশে দাঁড়ায়, তবে এটি হবে এক সম্মানজনক নৈতিক দায়িত্ব পালন। রাষ্ট্রের উচিত, এই ক্ষতবিক্ষত হৃদয়টিকে একটু শান্তি দেওয়া।
প্রস্তাবিত সহযোগিতা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা
১. চিকিৎসা সহায়তা: গলার গভীর ক্ষতের উন্নত চিকিৎসা সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত করতে হবে।
২. ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারণ: একটি পূর্ণাঙ্গ ইলেকট্রিক দোকান গড়ার জন্য কমপক্ষে ১ লক্ষ টাকা সহায়তা প্রয়োজন।
৩. মাসিক ভাতা: আহত আন্দোলনকারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতা চালু করা হোক।
৪. স্বপ্নপূরণ কর্মসূচি: হজ ও ওমরা উপলক্ষে এককালীন অনুদান বা সহায়তা প্যাকেজের আওতায় নিজামের মতো স্বপ্নবানদের অন্তর্ভুক্তি।
এক নজরে নিজাম উদ্দিন সুফেল
নাম: নিজাম উদ্দিন সুফেল
জন্ম তারিখ: ০১-০১-২০০০
জন্মস্থান: কুমিল্লা
পেশা: ব্যবসা
প্রতিষ্ঠান: নিজাম এন্টারপ্রাইজ
নিজ জেলা: কুমিল্লা
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: জিনিয়ারা, ইউনিয়ন: বটতলী, থানা: নাঙ্গলকোট, জেলা: কুমিল্লা
বর্তমান ঠিকানা: ওয়ারী, ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতা: জসিম উদ্দিন, পেশা: কৃষক, বয়স: ৫২ বছর, এনআইডি: ৫৯৭৪৭৫৫০১৮
মাতা: মাছুমা বেগম, পেশা: গৃহিণী, বয়স: ৪৭ বছর
মাসিক আয়: ১০,০০০
আয়ের উৎস: ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৬ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. রুবেল, বয়স: ২৬, পেশা: প্রবাসী, শিক্ষাগত যোগ্যতা: এসএসসি
২. নাজমিন, বয়স: ১৮, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: এসএসসি
৩. নাহিদা, বয়স: ১৪, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: অষ্টম
আহত বিবরণ
ঘটনার স্থান: বংশাল
আহত হওয়ার সময় : ৪-৮-২০২৪, ১২.০০টা
আক্রমণকারী: সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ বাহিনী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍